- দে । শ
- অক্টোবর ২, ২০২৬
বক্সার অরণ্যে বাঘিনী ! দু-মাসে আরও তিন বাঘ ছাড়ার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
অবশেষে অপেক্ষার অবসান। দীর্ঘ কয়েক দশক পরে বক্সার অরণ্যে ফের বাঘের স্থায়ী উপস্থিতি তৈরির লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ করল বন দফতর। গান্ধী জয়ন্তীর দিনে, শুক্রবার, বিহারের বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ থেকে আনা তিন বছরের একটি বাঘিনীকে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের বিশেষ সফট ‘এনক্লোজার’-এ ছাড়া হলো। উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাওঁ।
বক্সার অরণ্যে বাঘিনীকে ছাড়ার সে মুহূর্ত অবশ্য শুধু জঙ্গলের ভিতরে উপস্থিত অতিথিরাই দেখেননি। আলিপুরদুয়ার শহরের প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠানস্থলে বসানো জায়ান্ট স্ক্রিনেও সরাসরি দেখানো হয় গোটা পর্ব। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তখন অপেক্ষা কয়েক হাজার মানুষের, কখন নতুন ঠিকানায় পা রাখবে বক্সার নতুন অতিথি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রথম বাঘিনীকে ছাড়ার পর বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। আগামী দু–মাসের মধ্যে বক্সায় আরও তিনটি বাঘ ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বন দফতরের লক্ষ্য, ধাপে ধাপে এমন একটি প্রজননক্ষম বাঘের জনসংখ্যা তৈরি করা, যাতে বক্সা ফের স্থায়ী বাঘের আবাস হয়ে উঠতে পারে।
তবে শুক্রবারের এই মুহূর্তের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি। বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভে বাঘিনীকে ধরতে টানা সাত দিন অভিযান চালিয়েছিল বন দফতর এবং বিশেষজ্ঞদের দল। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম ভূপ্রকৃতি এবং ঘন জঙ্গলের মধ্যে প্রায় ৭০ জনের একটি দল অভিযানে নামে। সেই দলে ছিলেন বনকর্মী, ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া এবং ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির বিশেষজ্ঞেরা। বাঘিনীকে ধরার জন্য জঙ্গলে টোপ হিসাবে রাখা হয়েছিল একটি পূর্ণবয়স্ক মোষ। সেটিকে শিকার করে বাঘিনী জঙ্গলের আরও ভিতরে নিয়ে গেলে তার গতিবিধির সূত্র পাওয়া যায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শিকারের কাছাকাছি থাকা অবস্থাতেই ট্র্যাঙ্কুলাইজার বিশেষজ্ঞেরা ‘ডার্ট’ ছোড়েন। এক বারেই কাবু করা হয় বাঘিনীকে। তার পর শুরু হয় অন্য রকমের প্রস্তুতি, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তাকে নিয়ে আসতে হবে বক্সায়।
প্রথমে বাঘিনির গলায় পরানো হয় রেডিয়ো কলার। স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পর্যবেক্ষণের পরে বিশেষ খাঁচায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গোরক্ষপুর বিমানবন্দরে। সেখান থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানে করে হাসিমারা বায়ুসেনা ছাউনিতে নিয়ে আসা হয় তাকে। যাত্রাপথে নিয়মিত তার শারীরিক পরিস্থিতি পরীক্ষা করেন পশুচিকিৎসক ও বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞেরা। হাসিমারায় নামার পর ফের স্বাস্থ্য পরীক্ষা। তার পর সড়কপথে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভোরে রাজাভাতখাওয়া গেট দিয়ে বক্সার জঙ্গলে ঢোকে বাঘিনী। নতুন পরিবেশে আচরণ কেমন হয়, শারীরিক পরিস্থিতি কী রকম থাকে, স্বাভাবিক শিকারি প্রবৃত্তি বজায় আছে কি না, সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে তাকে সরাসরি গভীর জঙ্গলে ছাড়া হয়নি। রাখা হয় ২৫ মাইল এলাকায় তৈরি প্রায় ২.২ হেক্টরের বিশেষ ‘সফট এনক্লোজার’-এ।
বক্সায় পৌঁছনোর পর প্রথম দিনটি মূলত বিশ্রামেই কাটে। খাবারের প্রতি বিশেষ আগ্রহও দেখা যায়নি। পরের দিন অবশ্য বনকর্মীরা বাঘিনির আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। ঘেরাটোপের ভিতরে তাকে পায়চারি করতে দেখা যায়। পরে প্রায় ১০ কেজি টাটকা মাংসও দ্রুত খেয়ে ফেলে সে। জল খাওয়ার পাশাপাশি জলাশয়ে নেমে শরীর ঠান্ডা করার দৃশ্যও ক্যামেরায় ধরা পড়ে।স্বাভাবিক শিকারি আচরণ কতটা রয়েছে, তা বোঝার জন্য কাছাকাছি কয়েকটি হরিণও রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি লাগানো হয়েছে অনেকগুলি সিসিটিভি। তৈরি হয়েছে নজরদারির মাচা। মানুষের উপস্থিতিতে বাঘিনী যাতে অস্বস্তিতে না পড়ে, সে জন্য তার চারপাশে কড়া নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে। কোনো ভাবে ঘেরাটোপের বাইরে বেরিয়ে লোকালয়ের দিকে চলে গেলে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষ দলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বন দফতর সূত্রের খবর, এ প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু একটি বা দুটি বাঘ বক্সায় এনে রাখা নয়। একটি পুরুষ বাঘ এবং দুটি বাঘিনী নিয়ে প্রাথমিক ভাবে একটি প্রজননক্ষম ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তার আগে প্রথম বাঘিনির অভিযোজন ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। আগামী দু–বছরে অন্য রাজ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে অন্তত আরও ছ–টি বাঘ বক্সায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বন দফতর। বক্সার আয়তন প্রায় ৭০৭ বর্গ কিলোমিটার। এক সময় এ অরণ্যে বাঘের উপস্থিতি ছিল। বন দফতরের দাবি, ২০১৮ সালের বাঘ গণনাতেও বক্সা এলাকায় বাঘের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছিল। যদিও দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে স্থায়ী ভাবে বাঘের দেখা মেলেনি। মাঝেমধ্যে ট্র্যাপ ক্যামেরায় বাঘের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভুটান অথবা অসমের মানস জাতীয় উদ্যানের দিক থেকে কোনো বাঘ পথ ভুলে বক্সার জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিল।
তাই বক্সায় বাঘ ফেরানোর পরিকল্পনায় শুধু বাঘ আনা নয়, গোটা বাস্তুতন্ত্রকে প্রস্তুত করার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। শিকারযোগ্য প্রাণীর সংখ্যা এবং আবাসস্থল তৈরি, বন্যপ্রাণীদের চলাচলের করিডোর রক্ষা, মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমানো — প্রকল্পের মধ্যে রাখা হয়েছে এ সব বিষয়ই। বন দফতরের বক্তব্য, বক্সায় বাঘের সংখ্যা বাড়াতে সময় লাগবে। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ধাপে ধাপে সেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ দিন অনুষ্ঠানে বক্সার পর্যটন সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বক্সা এবং সংলগ্ন বনাঞ্চলকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের সহযোগিতায় বৃহৎ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জয়ন্তী এবং মানস সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২,০০০ একর জমিতে অরণ্য পর্যটনকেন্দ্র তৈরির প্রস্তাবের কথা জানান তিনি। হলং বনবাংলোকেও নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বাঘ ফিরলে পর্যটনের উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন প্রশাসনের কর্তারাও। উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ নির্ভর পর্যটনে বক্সার গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে। তবে তার আগে বাঘের জন্য নিরাপদ আর পর্যাপ্ত খাদ্যসমৃদ্ধ আবাস তৈরি করাই প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বনকর্তারা। রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ কুমার ওরাওঁ বলেন, বাঘিনীকে ছাড়ার আগে বক্সায় শিকারযোগ্য প্রাণীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার কাজ হয়েছে। পড়ে ধাপে ধাপে বাঘ আনা হবে, দীর্ঘ সময় ধরে তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। বক্সার জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এদিনের অনুষ্ঠান থেকে পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেও সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। বক্সাকে ‘টাইগার রিজার্ভ’ বলা হলেও দীর্ঘদিন বাঘশূন্য হয়ে পড়ে থাকার জন্য আগের সরকারের উদ্যোগের অভাবকে দায়ী করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান সরকারের উদ্যোগেই বক্সা ফের তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে। তবে, রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে অবশ্য এ মুহূর্তটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। বক্সার অরণ্যে বাঘ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ কার্যকর হলে উত্তরবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলে শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি ফের স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর সে লক্ষ্যে শুক্রবারের বাঘিনীই প্রথম পদক্ষেপ। আগামী দু–মাসে আরও তিনটি বাঘ আনার ঘোষণা বাস্তবে কতটা দ্রুত কার্যকর হয়, এখন নজর সেদিকেই।
❤ Support Us





