- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জানুয়ারি ৯, ২০২৬
‘আঘাত করলে আমার পুনর্জন্ম হয়’ : ইডি অভিযানের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি দলনেত্রী মমতার
আইপ্যাকে ইডি অভিযানের প্রতিবাদে শুক্রবার রাজপথে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পদযাত্রা শেষে হাজরার জনসভা থেকে কেন্দ্র সরকার, বিজেপি, ইডি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে একের পর এক তোপ দাগলেন তিনি। এদিন, মুখ্যমন্ত্রীর কণ্ঠে ছিল চ্যালেঞ্জ, হুঁশিয়ারি আর বিরোধী দলনেত্রী থাকবার সময় অতীত লড়াইয়ের স্মৃতিমন্থন।
মিছিল শুরুর আগে যাদবপুরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই প্রণাম ও কৃতজ্ঞতা জানান এলাকার মানুষকে। নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বাংলার মানুষের সমর্থনই রাজ্যকে বিশ্বের দরবারে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তারপরেই তিনি স্পষ্ট করে দেন এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য। বলেন, দিল্লির বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অত্যাচার, অপমান ও অসম্মানের বিরুদ্ধে এবং বাংলার মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদেই এই রাস্তায় নামা। নেতাজির উদ্ধৃতি টেনে বলেন, ‘রাস্তাই আমাদের পথ দেখাবে।’ যাদবপুরকে তিনি বর্ণনা করেন লড়াইয়ের মাটি, উদ্বাস্তুদের মাটি হিসেবে।
বিকেল তিনটে নাগাদ মিছিল শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রীর এক পাশে ছিলেন তৃণমূল সাংসদ অভিনেতা দেব, অন্য পাশে বিধায়ক অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী। সঙ্গে ছিলেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম, মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, সায়নী ঘোষ, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, লাভলি মৈত্র-সহ তৃণমূলের একঝাঁক সাংসদ, বিধায়ক ও নেতা-নেত্রী। টলিপাড়ার একাধিক পরিচিত মুখও ছিলেন মিছিলে। রাস্তার দু-পাশে ক্রমশ বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় পেরিয়ে মিছিল পৌঁছয় হাজরায়। এ পদযাত্রার পটভূমি আগের দিনের ইডি অভিযান। বৃহস্পতিবার, আইপ্যাক সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের ফ্ল্যাট এবং সল্টলেকের অফিসে তল্লাশি চালায় ইডি। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পেরে বিজেপি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে তৃণমূলের নির্বাচনী কৌশল, নথি ও তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, ইডি তৃণমূলের যাবতীয় তথ্য ‘ট্রান্সফার’ করে নিয়ে গিয়েছে। এইঘটনাকে তিনি সরাসরি ‘অপরাধ’ বলে আখ্যা দেন এবং এর দায় চাপান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপর।
হাজরা মোড়ের সভামঞ্চে উঠে মমতা বলেন, ‘তোমরা সকাল ৬টা থেকে ঢুকেছো। আমি পৌঁছেছি প্রায় ১১টা ৪৫-এ। ততক্ষণে তো সব চুরি করে নিয়ে চলে গেছো।’ তাঁর দাবি, প্রথমে ভেবেছিলেন ইডি বুঝি কিছু জানতে এসেছে। কিন্তু প্রতীক জৈনের ফোন ধরতে না পারায় তাঁর সন্দেহ হয় দলের নথিপত্র সরানো হচ্ছে। তখনই তিনি তড়িঘড়ি সল্টলেকের অফিসে যান। এরপর বিজেপিকে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সব দখল করেছেন। যত এজেন্সি আছে সব দখল করেছেন। মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, বিহার জোর করে দখল করেছেন। অনেক রাজ্য জোর করে দখল করেছেন। ভাবছেন বাংলা দখল করবেন?’ তাঁর অভিযোগ, বাংলা নামটাই বিজেপির সহ্য হচ্ছে না। বাংলায় কথা বললেই মানুষকে মারধর করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, বাংলায় হিন্দিভাষীদের উপর কখনো তো অত্যাচার হয়নি, তাহলে বাঙালিদের উপর কেন এই হামলা?
নিজের অতীতের উপর হওয়া হামলার স্মৃতি টেনে এনে আবেগঘন হয়ে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী। হাজরা মোড়েই এক সময় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার কথা উল্লেখ করে বলেন, কী ভাবে সিপিএমের গুণ্ডারা লোহার চেন ও মোটা ডান্ডা নিয়ে হামলা চালিয়েছিল। মাথায় গুরুতর আঘাতে রক্তক্ষরণ, ব্রেন ও হাতে অস্ত্রোপচার, দীর্ঘ চিকিৎসার কথা তুলে ধরেন তিনি। জানান, আজও সে আঘাতের প্রভাব রয়েছে— ভোর চারটের আগে ঘুমোতে পারেন না। তবে সে প্রসঙ্গেই তাঁর ঘোষণা, ‘আমায় আঘাত না করলে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আঘাত করলে আমার পুনর্জন্ম হয়। আহত বাঘ সুস্থ বাঘের থেকেও ভয়ঙ্কর।’
এদিন, এসআইআর ইস্যুতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। নাম না করে এক শীর্ষ আধিকারিককে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করে বলেন, ‘৯০ বছরের বৃদ্ধাকে ডেকে পাঠানো হচ্ছে। নাকে নল লাগিয়ে তিন তলায় উঠতে হচ্ছে। লজ্জা করে না?’ তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে বিজেপিকে জেতানোর চক্রান্ত চলছে। বাংলাভাষী মানুষদের বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা বলে দাগানোর অভিযোগও করেন তিনি। প্রশ্ন তোলেন, যদি রোহিঙ্গা এতই থাকে, তবে অসমে কেন ‘এসআইআর’ হলো না। কয়লা পাচার মামলায় মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বিজেপি নেতৃত্বের দিকে আঙুল তোলেন। তাঁর মন্তব্য, ‘কয়লার টাকা কে খায়, কী ভাবে খায়— আমি জানি। গদ্দারের মাধ্যমে টাকা যায়। জগন্নাথ থেকে শুভেন্দু হয়ে অমিত শাহের কাছে পৌঁছয়।’ পাশাপশি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তাঁর কাছে সব পেনড্রাইভ রয়েছে। দেশের স্বার্থে এত দিন চুপ করে ছিলেন। কিন্তু লক্ষ্মণের সীমা পেরোলে সব ফাঁস করে দেবেন।
দিল্লিতে তৃণমূল সাংসদদের হেনস্তার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, ‘দিল্লিতে এমপিদের চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, আর বাংলায় বিজেপি নেতাদের জন্য লাল কার্পেট বিছিয়ে সভা করা হয়।’ জিএসটি ও কেন্দ্রীয় বঞ্চনার প্রসঙ্গে বলেন, চার বছর ধরে বাংলার উন্নয়নের টাকা আটকে রাখা হয়েছে। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে বিজেপিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন মমতা। বলেন, ছাব্বিশে তৃণমূলের নয়, বিজেপির পতন হবে। দিল্লিতে বিজেপি সরকার থাকবে না বলেও দাবি করেন তিনি। বিজেপিকে কটাক্ষ করে বলেন, বাংলা জিততে এলে নাডু নয়, ঝাঁটার আঘাত জুটবে। সবশেষে মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, ‘তুমি আমাকে এক দিন আটকাবে, আমি একশো দিনের ফসল তুলে নেব। আমাকে জেলে ভরলে তোমাকে সারা পৃথিবীতে জেলে ভরব।’ সভা শেষ হয় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে।
❤ Support Us






