Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৮, ২০২৬

প্রয়াত ভারতীয় সিনেমার দাপুটে অভিনেতা নানা পটেকর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রয়াত ভারতীয় সিনেমার দাপুটে অভিনেতা নানা পটেকর

প্রয়াত হলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পটেকর । বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর । প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ায় নিজের বাড়িতে বুকে ব্যথা অনুভব করার পর আচমকাই সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যান অভিনেতা । চিকিৎসকদের দল বাড়িতে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ সিপিআর দিয়েও তাঁকে ফেরাতে পারেনি । পরে তড়িঘড়ি তাঁকে গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় । সেখানেও চিকিৎসকদের প্রায় ৪৫ মিনিটের চেষ্টার পর তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় ।
সংবাদসংস্থা এএনআই জানিয়েছে, ভোর সওয়া ৫টা নাগাদ নানা পটেকরকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল । তার আগে বাড়িতেই চিকিৎসকেরা তাঁকে সিপিআর দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করেন । অভিনেতার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে হাসপাতালেই তাঁর দেহের ময়নাতদন্ত করা হবে ।
নানার পুত্র মালহার পটেকর জানিয়েছেন, বুকে ব্যথা অনুভব করার পরই চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তাঁর বাবা । খবর পেয়ে চিকিৎসকদের একটি দল দ্রুত গোয়ার বাড়িতে পৌঁছয় । কিন্তু সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখেন, অভিনেতা ইতিমধ্যেই সংজ্ঞাহীন । একটানা সিপিআর দেওয়ার পরও তাঁর জ্ঞান ফেরেনি । এরপর দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় । সকাল সাড়ে ৫টা ২০ মিনিট নাগাদ চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন ।
১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নানা পটেকরের । তাঁর আসল নাম বিশ্বনাথ পটেকর । তবে অভিনয়জগতে ‘নানা পটেকর’ নামেই তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন । চলচ্চিত্রে আসার আগে মুম্বইয়ের জেজে স্কুল অফ আর্ট-এ পড়াশোনা করেছিলেন তিনি । থিয়েটারের মাধ্যমে অভিনয়ের জগতে হাতেখড়ি । ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সূচনা । পরবর্তী কয়েক দশকে হিন্দি ও মরাঠি সিনেমার পাশাপাশি তামিল ছবিতেও কাজ করেছেন তিনি ।
নানা পাটেকর অনেক বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেছেন । তাঁর সবচেয়ে পরিচিত চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে রয়েছে ‘‌অঙ্কুশ’‌, ‘‌প্রতিঘাট’‌, ‘‌প্রহার’‌, ‘‌তেরঙ্গা’‌, ‘‌ক্রান্তিবীর’‌, ‘‌অগ্নিসাক্ষী’‌, ‘‌খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’‌, ‘‌আব তক ছাপ্পান’‌, ‘‌অপহরণ’‌, ‘‌রাজনীতি’‌, ‘‌ওয়েলকাম’ এবং ‘‌ওয়েলকাম ব্যাক’‌। গম্ভীর ও শক্তিশালী চরিত্রের পাশাপাশি তিনি কমেডি এবং বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রেও নিজের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখেছিলেন। ‘‌ক্রান্তিবীর’‌ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পান।
১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘‌ক্রান্তিবীর’‌ নানা পাটেকরের কর্মজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন । এর আগে তিনি ‘‌পরিন্দা’‌ এবং পরে ‘‌অগ্নিসাক্ষী’‌ চলচ্চিত্রের জন্যও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। সামগ্রিকভাবে, তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, চারটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার এবং দুটি ফিল্মফেয়ার মারাঠি পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৩ সালে তিনি পদ্মশ্রী সম্মানেও ভূষিত হন।
নানা পাটেকর শুধু একজন অভিনেতাই ছিলেন না, পরিচালক হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেন । তাঁর পরিচালিত ‘‌প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’‌ তাঁর পরিচালক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা সিনেমা । পরবর্তীকালে ‘‌নাটসম্রাট’‌–এর মতো মারাঠি ছবিতে তাঁর অভিনয়ও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হিন্দি এবং মারাঠি উভয় চলচ্চিত্রেই সক্রিয় ছিলেন। চলচ্চিত্র ছাড়াও মঞ্চে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ।
নানা পাটেকর ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালে তিনি ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে সাম্মানিক ক্যাপ্টেন পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময় তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টে সাম্মানিক মেজর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। নানা পাটেকরের মৃত্যুতে একটা মেডিকো–লিগ্যাল মামলা দায়ের করা হয়েছে। নানা পাটেকরের মৃত্যুতে বলিউডে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ।
নানার অভিনয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর স্বতন্ত্র সংলাপ বলার ধরন, গলার স্বরের ওঠানামা, স্থির দৃষ্টি এবং শক্তিশালী শরীরী ভাষা । কখনও ভয়ঙ্কর, কখনও অসহায়, কখনও আবার নিখাদ হাসির চরিত্র — বিভিন্ন ধরনের ভূমিকায় নিজের অভিনয়ের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন তিনি । ‘আব তক ছাপ্পান’-এ সদু আগাশে এবং ‘ওয়েলকাম’-এ উদয় শেট্টি — দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর চরিত্রে অভিনয় করেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন তিনি। আর ‘নটসম্রাট’-এ গণপত বেলভালকরের চরিত্রে তাঁর অভিনয় যেন নতুন উচ্চতা পায়। সেখানে সংলাপের পাশাপাশি সংলাপের পরের নীরবতা, মুখের অভিব্যক্তি এবং শরীরী ভাষার মাধ্যমেই চরিত্রের অহংকার, অসহায়তা ও স্মৃতির ভারকে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছিলেন তিনি । তাই নানা পটেকরকে শুধু ‘দাপুটে অভিনেতা’ হিসেবে দেখলে তাঁর অভিনয়ের ব্যাপ্তি সম্পূর্ণ ধরা যায় না । ভারতীয় মূলধারার সিনেমায় তিনি এমন এক অভিনেতা, যিনি চরিত্রকে শুধু পর্দায় উপস্থাপন করেননি; চরিত্রের অস্বস্তি, ক্ষত, ক্রোধ এবং দুর্বলতাকেও নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
১৯৭৮ সালে নীলকান্তি পাটেকরকে বিয়ে করেন নানা । অভিনয়ের জগতে আসার আগে নীলকান্তি একটি ব্যাঙ্কে কাজ করতেন এবং থিয়েটারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন । থিয়েটারে কাজ করার সময়ই তাঁদের পরিচয় । নানার অভিনয়জীবনের শুরুর দিনগুলিতে নীলকান্তি তাঁর পাশে ছিলেন । তবে সময়ের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয় । বহু বছর ধরে তাঁরা আলাদা থাকলেও তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি।
বিয়ের পর তাঁদের প্রথম পুত্রসন্তান দুর্বাসার জন্ম হয়। জন্ম থেকেই নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল সে । ২০২৪ সালের একটি সাক্ষাৎকারে নানা নিজেই জানিয়েছিলেন, দুর্বাসার একটি চোখে সমস্যা ছিল এবং আরও কিছু শারীরিক জটিলতাও ছিল । মাত্র আড়াই বছর বয়সেই তার মৃত্যু হয় ।
ছেলেকে হারানোর সেই ঘটনা নানার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল । পরবর্তী সময়ে নিজের সেই সময়ের মানসিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ছেলের অসুস্থতাকে ঘিরে মানুষের প্রতিক্রিয়া কী হবে — সেই চিন্তাই তখন তাঁকে বেশি তাড়িত করত। বহু বছর পর নিজের সেই মনোভাব নিয়েও আত্মসমালোচনা করেছিলেন তিনি । পরে তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র মালহার পটেকরের জন্ম হয় । বাবার মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমকে তিনিই নিশ্চিত করেছেন ।
নানা পটেকর তিন বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন । তাঁর উল্লেখযোগ্য ছবির তালিকায় রয়েছে ‘নটসম্রাট’, ‘ওয়াজুদ’, ‘পরিন্দা’, ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘যশবন্ত’ এবং আরও বহু ছবি। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে।
চলতি বছরেও পর্দায় সক্রিয় ছিলেন নানা । অনিল কপূরের সঙ্গে তাঁকে দেখা গিয়েছিল ‘সুবেদার’ ছবিতে । ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া বিশাল ভরদ্বাজের ‘ও রোমিয়ো’ ছবিতেও অভিনয় করেন এই বর্ষীয়ান অভিনেতা ।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে নানা পটেকর তৈরি করেছিলেন এক স্বতন্ত্র অভিনয়-ভাষা । গলার স্বর, চোখের দৃষ্টি, শরীরী ভাষা এবং সংলাপের নিজস্ব ছন্দ — সব মিলিয়ে ভারতীয় সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি ছিল আলাদা। তাঁর প্রয়াণে শেষ হল এক দীর্ঘ, বহুমাত্রিক অভিনয়জীবনের অধ্যায় ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!