Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • এপ্রিল ৯, ২০২৬

যুদ্ধ থামাতে ইসলামাবাদে মুখোমুখি বৈঠকে ইরান–আমেরিকা, দায়িত্বে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জিডি ভ্যান্স

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
যুদ্ধ থামাতে ইসলামাবাদে মুখোমুখি বৈঠকে ইরান–আমেরিকা, দায়িত্বে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জিডি ভ্যান্স

পশ্চিম এশিয়ার উত্তপ্ত আবহে কূটনীতির দাবার ছকে দ্রুত ঘুঁটি বদলাচ্ছে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি। সে প্রেক্ষাপটেই নাটকীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে-এ মুখোমুখি বৈঠকে বসতে চলেছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। মার্কিন প্রতিনিধিত্ব করবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। আসন্ন এই  বৈঠক ঘিরে এই মুহুর্তে জল্পনা আর অনিশ্চয়তায় তোলপাড় আন্তর্জাতিক মহলে।

কূটনৈতিক ময়দানে অপ্রত্যাশিত ভাবে সামনে এসেছে পাকিস্তান। পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির-এর সক্রিয় তৎপরতায় সংঘর্ষবিরতির খসড়া তৈরি হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সূত্রের খবর, বুধবার রাতভর বৈঠক করে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিলেন মুনির। সে আলোচনার ভিত্তিতেই একটি খসড়া শান্তিপ্রস্তাব তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে সামান্য পরিবর্তন করে মেনে নেয় দুই পক্ষ। পাকিস্তানের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে তাদের কৌশলগত অবস্থান। একদিকে ইরানের প্রতিবেশী হিসেবে দীর্ঘ সীমান্ত এবং সামাজিক-ধর্মীয় যোগসূত্র, অন্যদিকে আমেরিকার সঙ্গে ক্রমোন্নত সম্পর্ক; এই দুইয়ের সমন্বয়েই ইসলামাবাদ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্কও তাদের কূটনৈতিক শক্তিকে বাড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসছে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সরাসরি মধ্যস্থতায় না গিয়ে অপেক্ষাকৃত নীরব অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা, ইজরায়েল এবং ইরানের সঙ্গে একসঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এমন সংযত কৌশল নিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারত বরাবরই প্রকাশ্য মধ্যস্থতার বদলে পর্দার আড়ালের কূটনীতিকে প্রাধান্য দেয়, এমন যুক্তিও সামনে এসেছে। তবে সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য, বিশ্ব রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ভারতের দৃশ্যমান ভূমিকার অভাব চোখে পড়ার মতো। বিশেষত, যখন পাকিস্তান কূটনৈতিক সাফল্যের দাবিদার হয়ে উঠছে, তখন নয়াদিল্লির নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে দেশের অন্দরেই।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের এই সক্রিয়তার পিছনে নিজেদের স্বার্থও স্পষ্ট। পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল আমদানির উপর তাদের বিপুল নির্ভরতা রয়েছে। হরমুজ় প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে গিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি, ওই অঞ্চলে কর্মরত বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি নাগরিকের স্বার্থও জড়িত। ফলে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা তাদের জন্য কূটনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রয়োজনও বটে। জানা যাচ্ছে, ইসলামাবাদের বৈঠকের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে থাকবেন ভান্স। তাঁর সঙ্গে থাকছেন পশ্চিম এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রাক্তন উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। হোয়াইট হাউস সূত্রে ইঙ্গিত, এ বৈঠকের লক্ষ্য শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়, বরং সদ্য ঘোষিত দু-সপ্তাহের সংঘর্ষবিরতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পথ খোঁজা আর দ্রুত অবনতি হওয়া পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা।  তবে বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। ইরান ইতিমধ্যেই অভিযোগ তুলেছে, যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘিত হয়েছে একাধিক ক্ষেত্রে। বিশেষ করে লেবাননে ইজরায়েলের লাগাতার হামলাকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ তেহরান।

তাদের অভিযোগ, লেবাননে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লার উপর একের পর এক আক্রমণ চালানো হচ্ছে, যা যুদ্ধবিরতির পরিপন্থী। শুধু তাই নয়, ইরানের অভ্যন্তরেও ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছে, পাশাপাশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সংক্রান্ত শর্তও মানা হয়নি বলে দাবি করেছে তেহরান। ইরানের বক্তব্য, দশ দফা শর্তের ভিত্তিতে যে সংঘর্ষবিরতি হয়েছিল, তার অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দফা ইতিমধ্যেই ভঙ্গ হয়েছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—‘যুদ্ধবিরতির শর্ত একটাই, হয় সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি, নয়তো যুদ্ধ চলবে। দু-টি একসঙ্গে চলতে পারে না।’ তাঁর আরও অভিযোগ, লেবাননে যা চলছে তা কার্যত গণহত্যা, এবং তা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করছে। তেহরানের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট, এখন বল আমেরিকার কোর্টে, তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কি না, সেটাই দেখার।

অন্যদিকে, এ প্রশ্নে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান মার্কিন প্রশাসনের। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভান্স ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, লেবাননের ঘটনাকে আসন্ন আলোচনার অংশ করতে চায় না ওয়াশিংটন। তাঁর বক্তব্য, ‘ইরান যদি লেবাননের প্রসঙ্গ তুলে আলোচনা ভেস্তে দিতে চায়, সেটি তাদের সিদ্ধান্ত।” অর্থাৎ, আলোচনার সূচনাতেই দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকট হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিরতির প্রক্রিয়ার নেপথ্যে চিনের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। স্বয়ং ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে কৃতিত্ব নেয়নি চিন।

উত্তেজনার মধ্যেই বড়ো পদক্ষেপ করেছে ইরান, ফের বন্ধ করে দিয়েছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহণ হয়। তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশের তেলবাহী জাহাজ ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা।  এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ‘শান্তি’ বৈঠকের  তেহরান কার্যত ওয়াশিংটনকে চাপের মুখে ফেলতে চাইছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে, ইসলামাবাদের বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তারই এক বড়ো পরীক্ষা। বৈঠক সফল হলে পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতার নতুন দিশা খুলতে পারে, আর ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিতে পারে, এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!