- দে । শ
- অক্টোবর ২, ২০২৬
ধ্রুপদী বাংলা ভাষার জাতীয় গবেষণাকেন্দ্র বিশ্বভারতী ! তৈরি হতে পারে নতুন পদ ও গবেষণার পরিসর
রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন আর বাস্তবের শান্তিনিকেতন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চায় যার ইতিহাস এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো। এ বার সেই বিশ্বভারতীর কাঁধে আরও বৃহৎ দায়িত্ব। এক দিকে বাংলা ভাষা ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা পাওয়ার পরে ভাষাটির গবেষণা, সংরক্ষণ, অনুবাদ আর প্রাচীন নথি ডিজিটাইজেশনের কাজে জাতীয় স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে, জনজাতি ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশ্বভারতীকে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ বা উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্র।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার দিল্লি থেকে বিশ্বভারতীর উপাচার্যকে বার্তা পাঠিয়ে কেন্দ্র সরকার। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ বিকাশে বিশ্বভারতীর ভূমিকা কী হতে পারে, সেই সংক্রান্ত একটি রূপরেখা রয়েছে তাতে। বাংলা ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার পরে দেশের অন্যতম ঐতিহাসিক এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে যে বৃহত্তর গবেষণা-পরিকল্পনার কথা ভাবা হচ্ছে, সে চিঠিতে তারই ইঙ্গিত রয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের দাবি। পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলা ভাষা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা। বিশেষ করে প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক দলিল এবং ভাষা ও সাহিত্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ নথি ডিজিটাইজ করার উপর জোর দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় এবং বাংলা থেকে অন্য ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ রচনা অনুবাদের জন্য বড়ো প্রকল্প নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলা ভাষা ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে এই ক্ষেত্রগুলিতে কেন্দ্রীয় অর্থসাহায্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাড়তে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে।
শুধু গবেষণা নয়, বাংলা ভাষা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা প্রবীণ গবেষক ও পণ্ডিতদের জন্য বিশেষ পদ তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি-র তরফে বিশেষ পদ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। গবেষণামূলক বই প্রকাশ, গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপির সম্পাদনা এবং সমালোচনামূলক অনুবাদের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় সহায়তার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বাংলা ও জনজাতি ভাষায় অনন্য অবদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে দেওয়া হতে পারে বিশেষ সম্মান। এর ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চা কেবল ভাষা বিভাগের পরিসরে আটকে না থেকে ইতিহাস, দর্শন, সঙ্গীত, নৃত্য-সহ বিভিন্ন শাখার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। অর্থাৎ বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে আন্তঃবিষয়ক গবেষণার একটি বৃহৎ ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনাও সামনে আসছে।
২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা বাংলা-সহ পাঁচটি ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলা ছাড়াও তালিকায় ছিল মারাঠি, পালি, প্রাকৃত এবং অসমিয়া। সেই স্বীকৃতির পরেই বাংলা ভাষার প্রাচীনত্ব, সাহিত্যিক ঐতিহ্য, পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ এবং গবেষণার জন্য নতুন করে কেন্দ্রীয় উদ্যোগের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বভারতীর গুরুত্ব আলাদা। কারণ, শান্তিনিকেতনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকে। ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই শিক্ষার পরিসরে বাংলা ভাষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন ভাষা ও সাহিত্যচর্চার সঙ্গে নিবিড় ভাবে জুড়ে ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ক্ষিতিমোহন সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, নিত্যানন্দ বিনোদ গোস্বামী, প্রবোধচন্দ্র সেন, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, সৈয়দ মুজতবা আলী, প্রমথ চৌধুরী উপেন্দ্রকুমার দাশ, অশোকবিজয় রাহা, পঞ্চানন মণ্ডল, সত্যেন্দ্রনাথ রায়, ভূদেব চৌধুরী, ভবতোষ দত্ত, সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, র মতো পণ্ডিতেরাও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার কাজে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।
১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা পাওয়ার সময় বাংলা বিভাগ পূর্ণাঙ্গ বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে বিভাগের সাংগঠনিক কাঠামো ও পরিকাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন এসেছে। ২০০৯ সালে বাংলা বিভাগ ভাষাভবনের অধীনে আসে। তারও আগে ২০০৪ সালে আশ্রমের কেন্দ্রীয় অংশ থেকে বিভাগটি বিদ্যাভবন অঙ্গনে স্থানান্তরিত হয়। পরে ২০১২-১৩ সালে তা ভাষা-বিদ্যা ভবনের প্রথম তলায় চলে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বৃহৎ বিভাগ হিসাবেই বাংলা বিভাগের অবস্থান। ফলে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদার পরে বাংলা ভাষা নিয়ে জাতীয় স্তরের যে গবেষণা ও সংরক্ষণ কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে, তার সঙ্গে বিশ্বভারতীর ঐতিহাসিক পরিকাঠামো এবং দীর্ঘদিনের গবেষণার অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বভারতীকে ঘিরে কেন্দ্রের পরিকল্পনা অবশ্য শুধু বাংলা ভাষাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। জনজাতি ভাষা ও সাহিত্য নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আসতে পারে শান্তিনিকেতনের উপর। মঙ্গলবার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির জনজাতি বিষয়ক ও কল্যাণমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে কেন্দ্রীয় জনজাতি কল্যাণমন্ত্রী জুয়াল ওরাম জানান, শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীকে জনজাতি ভাষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে আরও একটি ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একই বৈঠকে ভুবনেশ্বরের ট্রাইবাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে একটি জাতীয় গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাবও অনুমোদিত হয়েছে বলে জানান তিনি। রাজ্যগুলির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, সংস্কৃতি এবং মূলনিবাসী সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাকে উৎসাহিত করাই ওই কেন্দ্রের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানানো হয়। বিশ্বভারতীকে জনজাতি ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণার উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পাশাপাশি শান্তিনিকেতন ও বিশ্বভারতীর সঙ্গে জনজাতি সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক চর্চারও দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি তৈরি হলে ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি এবং ইতিহাসকে একসঙ্গে নিয়ে গবেষণার পরিসর তৈরি হতে পারে।
মন্ত্রী জুয়াল ওরাম ওই বৈঠকে ‘বানবন্ধু কল্যাণ যোজনা’ বা ভিকেওয়াই-এর কথাও জানান। মূলনিবাসী মানুষের কল্যাণে পরীক্ষামূলক ভাবে অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, হিমাচল প্রদেশ, তেলঙ্গানা, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাতের একটি করে ব্লকে প্রকল্পটি চালু করা হয়েছে। প্রতিটি নির্বাচিত ব্লকের উন্নয়নের জন্য কেন্দ্র ১০ কোটি টাকা করে দেবে বলে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির সুপারিশের ভিত্তিতেই ব্লকগুলি বেছে নেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় সাক্ষরতার হার তুলনামূলক ভাবে কম, সেগুলিকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রের বক্তব্য, এ প্রকল্পের লক্ষ্য মূলত পরিকাঠামোর ঘাটতি পূরণ এবং তফসিলি উপজাতি ও সমাজের অন্যান্য অংশের মধ্যে মানবোন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে থাকা ব্যবধান কমানো। কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ও দফতর এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পকে সমন্বিত করে ফলাফলভিত্তিক ভাবে কাজ করার কথাও রয়েছে এই কর্মসূচিতে। প্রাথমিক ভাবে যে সব ব্লকে মোট জনসংখ্যার অন্তত ৩৩ শতাংশ তফসিলি উপজাতিভুক্ত, সেগুলিকে লক্ষ্য করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বাংলা ভাষার ধ্রুপদী মর্যাদা এবং আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার নতুন প্রস্তাব— দুই ক্ষেত্রেই বিশ্বভারতীর সামনে একটি বিস্তৃত জাতীয় ভূমিকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের হাতে যে প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বহুত্বের এক অনন্য শিক্ষাচর্চার ক্ষেত্র হয়ে রয়েছে, আগামী দিনে সেই প্রতিষ্ঠানই ভাষা সংরক্ষণ, প্রাচীন নথির ডিজিটাইজেশন, অনুবাদ, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা এবং জনজাতি ভাষা-সাহিত্য চর্চার আরও বৃহৎ পরিসর তৈরি করতে পারবে বলে আশা শিক্ষামহলের।
❤ Support Us





