Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ৩, ২০২৬

চার বছরের অচলাবস্থার অবসান, চলতি সপ্তাহেই বাংলায় শুরু একশো দিনের কাজ। দেড় কোটি শ্রমদিবসে সম্মতি কেন্দ্রের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
চার বছরের অচলাবস্থার অবসান, চলতি সপ্তাহেই বাংলায় শুরু একশো দিনের কাজ। দেড় কোটি শ্রমদিবসে সম্মতি কেন্দ্রের

প্রায় চার বছর ধরে বন্ধ থাকার পর অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে ফের চালু হতে চলেছে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্প। দীর্ঘ আইনি লড়াইকেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনের পর এ বার গ্রামবাংলার শ্রমবাজারে ফের কর্মসংস্থানের চাকা ঘুরতে চলেছে। প্রশাসনিক সূত্রের খবরচলতি সপ্তাহের মধ্যেই প্রকল্পের আওতায় কাজ শুরু হতে পারে। সে লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য এক মাসের জন্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ থেকে দেড় কোটি শ্রমদিবস অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। সরকারি নির্দেশিকা হাতে এলেই জেলায় জেলায় কাজ বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতেএটি শুধু একটি প্রকল্পের পুনরারম্ভ নয়বরং চার বছর ধরে কার্যত স্থবির হয়ে থাকা গ্রামীণ কর্মসংস্থান ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ। রাজ্যের প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি জবকার্ডধারী পরিবার এ ঘোষণার দিকে তাকিয়ে ছিল দীর্ঘদিন ধরে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সংকট, কৃষির বাইরে বিকল্প আয়ের উৎসের অভাবের প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

২০২২ সালের মার্চ মাসে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পের অর্থবরাদ্দ স্থগিত করেছিল কেন্দ্রের মোদি সরকার। এরপর প্রকল্প কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। প্রতি বছর নিয়ম মেনে শ্রমদিবস সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠালেও রাজ্যের ভাগ্যে বরাদ্দ জোটেনি। বারবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ তৃণমূল নেতৃত্বরা। অন্যদিকে, কেন্দ্রের দাবি ছিলপ্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অর্থমুক্তি সম্ভব নয়। ক্রমশ সে বিরোধ আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছয়। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাইকোর্ট উভয়েই বাংলায় প্রকল্প পুনরায় চালুর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রকে দ্রুত পদক্ষেপের নির্দেশ দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণের পর গত ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রক রাজ্যের কাছে একাধিক শর্ত পাঠায়। প্রকল্পে স্বচ্ছতাআধার সংযুক্তিকরণডিজিটাল উপস্থিতি নথিভুক্তকরণ  উপভোক্তাদের তথ্য যাচাই-সহ বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর নিয়ম মানার কথা বলা হয়।

তৎকালীন তৃণমূল সরকার শর্তগুলি মেনে নিতে অনীহা প্রকাশ করলেও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। কেন্দ্রের নির্ধারিত শর্তগুলি কার্যকর করার বিষয়ে সম্মতি জানানো হয়। তার পর থেকেই প্রকল্প পুনরারম্ভের প্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়। মে মাসের শেষ সপ্তাহে মনরেগা’ সংক্রান্ত এগজিকিউটিভ কমিটির বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ওই বৈঠকেই বাংলায় কাজ শুরুর বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয় বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি। তার পর থেকেই শ্রমদিবস বরাদ্দের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সূত্রের খবরআগামী এক মাসের জন্য প্রায় দেড় কোটি শ্রমদিবস অনুমোদনের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারির অপেক্ষা। সনির্দেশিকা হাতে পেলেই কোন জেলায় কত শ্রমদিবস বরাদ্দ হবেকোন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং কত সংখ্যক শ্রমিককে কাজে যুক্ত করা হবেতার বিস্তারিত রূপরেখা প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার।

নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছেকাজ শুরু করার জন্য প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ। জেলা স্তরের আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং তথ্য যাচাইয়ের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক কর্তাদের দ্রুত কাজ শুরুর নির্দেশ পৌঁছে গিয়েছে। তবে চার বছর আগের ১০০ দিনের কাজের সঙ্গে এ বারের প্রকল্প পরিচালনার পার্থক্য থাকছে। এ বার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে ফেস রেকগনিশন অ্যাটেনডেন্স’ ব্যবস্থা। কাজে যোগ দেওয়ার সময় শ্রমিকদের মুখের পরিচয় যাচাই করে হাজিরা নথিভুক্ত করতে হবে। শুধু কাজের শুরুতেই নয়নির্দিষ্ট সময় অন্তর আবারও সে পরিচয় যাচাই করতে হবে। কেন্দ্রের মতেএর ফলে ভুয়ো জবকার্ডকাল্পনিক শ্রমিক এবং হাজিরা জালিয়াতির মতো অভিযোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

সরকারি হিসাব অনুযায়ীবর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে জবকার্ডধারীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫৬ লক্ষ। এর মধ্যে ২ কোটি ৫৫ লক্ষেরও বেশি উপভোক্তার আধার সংযুক্তিকরণ সম্পন্ন হয়েছে। যদিও ই-কেওয়াইসি এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। প্রায় ৭৫ শতাংশ উপভোক্তার তথ্য যাচাই শেষ হয়েছে। বাকি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রশাসন বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। ১ জুলাই থেকে সারা দেশে নতুন কর্মসংস্থান প্রকল্প চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। কেন্দ্র সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘মনরেগার পরিবর্তে চালু হতে চলেছে ভিবিজিআরজি’ নামের ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্প। ফলে হাতে সময় খুবই কম। তার আগে এক মাসের মধ্যে বরাদ্দ হওয়া শ্রমদিবসগুলির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাইছে প্রশাসন।

সোমবার এ বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। বৈঠকে জেলার আধিকারিকদের দ্রুত প্রকল্প চিহ্নিত করাপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা, শ্রমিকদের কাজে যুক্ত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় সম্ভাব্য কাজের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামবাংলার বহু পরিবার গত চার বছর ধরে এ প্রকল্পের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় ছিল। কৃষিকাজের মরসুমের বাইরে যাঁদের প্রধান ভরসা ছিল ১০০ দিনের কাজতাঁদের কাছে এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বড়ো স্বস্তির খবর। এখন শুধু কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষা। সে নির্দেশিকা জারি হলেই বাংলার গ্রামে গ্রামে আবার শোনা যাবে মাটি কাটার শব্দপুকুর সংস্কারের কাজরাস্তা মেরামতির উদ্যোগ আর কর্মসংস্থানের নতুন আশার গল্প।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!