- এই মুহূর্তে দে । শ
- আগস্ট ৭, ২০২৫
ঠিকানায় কেউ নেই, ফেরত আসছে কার্ড! রাজ্যে দেড় লক্ষ ভোটার কার্ড নিয়ে বিপাকে নির্বাচন কমিশন
২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে ওঠার আগেই রাজ্যজুড়ে ফের শোরগোল। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটার কার্ড ছাপা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে পারছে না। ঠিকানায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পোস্টম্যান ফিরে আসছেন খালি হাতে। রাজ্যজুড়ে প্রায় দেড় লক্ষ ভোটার কার্ড ফেরত এসেছে ডাকবিভাগের মাধ্যমে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর উদ্বিগ্ন, মুখে কেউ বলছে না, কিন্তু অন্দরের অস্বস্তি আর চাপা ক্ষোভ চোখে পড়ছে।
কমিশনের নতুন নিয়ম বলছে, ভোটার কার্ড ছাপা হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই তা প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ডাকবিভাগের। ভোটারদের হস্তগত করতেই হবে সেই পরিচয়পত্র। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু ক্ষেত্রে নথিচুক্ত ঠিকানায় কেউ নেই। আবার কোথাও ঠিকানা অস্পষ্ট, কোথাও আবার সংশ্লিষ্ট নামের কোনো নাগরিকের অস্তিত্বই মিলছে না। ফলে পোস্ট অফিস ‘নো রিপ্লাই’ স্ট্যাম্প মেরে ফেরত পাঠাচ্ছে একের পর এক কার্ড। ইসি সূত্রে জানা যাচ্ছে, শুধু উত্তর ২৪ পরগনার রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ৩০০-এর বেশি কার্ড পাঠানো হয়েছিল ভোটারদের ঠিকানায়। তার মধ্যে অধিকাংশই ফিরেছে ডাক বিভাগের ব্যর্থতার চিহ্ন নিয়ে। সেখান থেকেই সামনে আসে বিপুল সংখ্যক ‘আনরিসিভড কার্ড’-এর তথ্য। সিইও দফতর তা জানার পরই রাজ্যজুড়ে সমস্ত জেলার কাছে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়। ফল চমকে দেওয়ার মতো, প্রায় দেড় লক্ষের কাছাকাছি ভোটার কার্ডের মালিকের কোনো হদিশ নেই।
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, ‘আমরা আরো একবার সংশ্লিষ্ট ঠিকানাগুলিতে কার্ড পাঠাব। যদি এবারও প্রাপক পাওয়া না যায়, সেক্ষেত্রে ওই কার্ডগুলি আগামী ২০ আগস্টের পর জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ফের সিইও দফতরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’ কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল সংখ্যক ভোটার কার্ড কীভাবে এমন ভূল তথ্যের ভিত্তিতে ছাপা হল? না কি ‘ভুয়ো’ ভোতার তত্ব প্রমাণ নিয়ে হাজির হচ্ছে নির্বাচনী আবহে! কে বা কারা দায়ী এই প্রাথমিক যাচাইয়ের গাফিলতির জন্য? বিজেপি নেতা রাহুল সিনহার অভিযোগ, ‘এ সব নাম এমনিই বাদ হয়ে যাবে। যাদের নাম নেই, ঠিকানা নেই, ছবি নেই, তারা ভোটারের পরিচয়ে তালিকাভুক্ত ছিল। এতদিন ধরে এই ভুয়ো ভোটারদের জালিয়াতিতেই ভোটের ফল বদল হয়েছে। প্রযুক্তির যুগে এখন সব ধরা পড়ছে।’ তাঁর স্পষ্ট ইঙ্গিত, ভোটার তালিকায় কারচুপি করে বহু অস্তিত্বহীন নাম ঢুকিয়েছে বর্তমান শাসক দল তৃণমূল, ও পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট সরকার। ফলে প্রকৃত ভোটারের অধিকার খর্ব হয়েছে।’
অন্যদিকে, ভোটার কার্ড বিতর্কে নয়া মাত্রা যোগ করেছে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। কয়েকদিন আগে ২ ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগ, তাঁরা ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অনিয়ম করেছেন। শুধু বরখাস্তই নয়, তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের নির্দেশও দিয়েছে কমিশন। ফলে চাপে রাজ্য প্রশাসন। রাজ্যের আমলাদের সংগঠন ডব্লিউবিসিএস (এক্সিকিউটিভ) অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যে মুখ্যসচিবকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছে, যেন এ বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কমিশনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পুনর্বিবেচনা করা হয়। তাঁদের বক্তব্য, ‘যদি কোনো প্রক্রিয়াগত ভুল থেকেও থাকে, তা ইচ্ছাকৃত নয়। এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ সরকারি কর্মচারীদের মনোবলে চোট দিচ্ছে, যা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পক্ষে বিপজ্জনক।’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি কাউকে শাস্তি হতে দেব না। নির্বাচন কমিশন বিজেপির হাতের পুতুল হয়ে উঠেছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের পরই আরো কড়া কমিশনের অবস্থান। তারা জানিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অমান্য করা হলে মুখ্যসচিবের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে পিছপা হবে না কমিশন। সংবিধানের ৩২৪ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনা ও ভোটার তালিকা সংশোধনের পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনের হাতে। এ প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকার বাধ্য কমিশনকে সহায়তা করতে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এমন সিদ্ধান্ত, বলছে নবান্ন। পাল্টা নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ সারা বছর ধরেই চলতে পারে, তার সঙ্গে নির্বাচনের সময়সীমার কোনও সম্পর্ক নেই।
উল্লেখ্য, রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ৩টি গুরুত্বপূর্ণ পদে (অতিরিক্ত সিইও, যুগ্ম সিইও ও ডেপুটি সিইও) নিয়োগের জন্য যে ৯ জন কর্মকর্তার নাম পাঠিয়েছিলেন, কমিশন তাঁদের কাউকেই মঞ্জুরি দেয়নি। নতুন করে নাম পাঠাতে বলেছে। বোঝাই যাচ্ছে, নয়া ইস্যু ঘিরে আবার রাজ্য ও কমিশনের টানাপোড়েন শুরু হতে চলেছে।
❤ Support Us







