- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- অক্টোবর ২৯, ২০২৬
গালিভারের বিস্ময়যাত্রার তিনশো বছর ! সুইফ্টের ব্যঙ্গের কলমে আজও নগ্ন সভ্যতার মুখ
রাজনীতি থেকে যুদ্ধ, বিজ্ঞানচর্চা থেকে সাম্রাজ্যবাদ — মানুষের অহংকার, ক্ষমতার লোভ আর যুক্তিবোধের সীমাবদ্ধতাকে নির্মম ব্যঙ্গের আলোয় তুলে ধরেছিল ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’। ১৭২৬ সালের ২৮ অক্টোবর লন্ডনে বেঞ্জামিন মোটের প্রকাশনায় প্রথম প্রকাশিত হয়। সারা পড়ে যায় গোটা বিশ্বে। বহু ভাষায় অনূদিত হতে থাকে এই চমকপ্রদ কাহিনী। প্রকাশের তিনশো বছর পরেও জোনাথন সুইফ্টের কালজয়ী উপন্যাস কেন প্রাসঙ্গিক?
লিলিপুটের ক্ষুদ্রকায় মানুষ, ব্রবডিংন্যাগের দৈত্যাকার অধিবাসী, আকাশে ভাসমান লাপুটা দ্বীপ কিংবা যুক্তিবাদী ঘোড়াদের দেশ হুইনিম — শৈশবের কল্পনার জগতে এ সব নামের সঙ্গে পরিচয় হয়নি, এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া কঠিন। অথচ বিস্ময়কর অভিযানের অদ্ভুত আখ্যানের আড়ালে যে তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিদ্রুপ, সামাজিক সমালোচনা এবং মানবসভ্যতার অন্তর্নিহিত অসংগতির নির্মম ব্যবচ্ছেদ লুকিয়ে রয়েছে, তা অনেক সময়েই আড়ালে থেকে যায়। তিনশো বছর আগে, ১৭২৬ সালের ২৮ অক্টোবর, প্রকাশিত হয়েছিল জোনাথন সুইফ্টের কালজয়ী উপন্যাস ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’। প্রকাশের তিন শতক পূর্ণ হওয়ার এ মুহূর্তে ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, নিছক কল্পকাহিনি হিসাবে নয়, বরং মানুষের সভ্যতা, রাজনীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার এক অসামান্য দলিল হিসাবেই বইটির গুরুত্ব আজও অক্ষুণ্ণ।
উপন্যাসটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ‘ট্রাভেলস ইনটু সেভারাল রিমোট নেশনস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে। লেখক হিসাবে সেখানে সুইফ্টের নাম ছিল না। কাল্পনিক নাবিক ও শল্যচিকিৎসক লেমুয়েল গালিভারের ভ্রমণবৃত্তান্তের আকারে প্রকাশিত হয়েছিল বইটি। পাঠকের কাছে আখ্যানটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার এই কৌশল নিছক সাহিত্যিক ছলনা নয়, কল্পিত ভ্রমণের বিবরণকে বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো করে সাজিয়ে সুইফ্ট এমন এক জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে পরিচিত পৃথিবীর রাজনীতি, ধর্মীয় বিরোধ, যুদ্ধ, বিজ্ঞানচর্চা এবং সামাজিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন আলোয় ধরা পড়ে। পাঠক প্রথমে বিস্মিত হন, তার পরে হাসেন, আবার শেষ পর্যন্ত হাসির মধ্যেই চারপাশের পরিচিত মুখগুলি চিনতে পারেন।
উপন্যাসের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত হয়েছে প্রদর্শনী, সাহিত্য উৎসব, আলোচনা সভা, শিল্প প্রতিযোগিতা এবং কর্মশালা। জোনাথন সুইফটের প্রাক্তন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজেও বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। সুইফটের রচনা, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী সময়ে বইটির নানা রূপান্তর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ট্রিনিটি কলেজের প্রদর্শনীর অন্যতম সহ-আয়োজক এবং সহকারী গ্রন্থাগারিক স্টেফানি ব্রিন জানান, আজকের পাঠকদের কাছে গালিভারের লিলিপুট যাত্রাই সবচেয়ে পরিচিত। কিন্তু এই প্রদর্শনীতে গালিভারের অন্য অভিযানগুলিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা এই প্রদর্শনীর। অনলাইনেও তা দেখার সুযোগ রয়েছে। কলেজের সংগ্রহে থাকা কয়েকশো সংস্করণ ও জনপ্রিয় রূপান্তর থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে নানা উপাদান। তার মধ্যে রয়েছে পুরনো খোদাইচিত্র, পাতা খুললে ত্রিমাত্রিক দৃশ্য ফুটে ওঠে এমন বই, ১৯৭৬ সালের মার্ভেল কমিকসের একটি সংস্করণ এবং ১৭৬১ সালে প্রকাশিত একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণের একমাত্র পরিচিত টিকে থাকা কপি।
সুইফটের মূল উপন্যাসে গালিভারের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পাশাপাশি বাড়িতে ফেলে আসা তাঁর স্ত্রী মেরির জীবনও রয়েছে। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি মূল কাহিনিতে বিশেষ জায়গা পায়নি। গালিভার যখন অভিযানে বেরিয়ে পড়েন, তখন মেরি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় বাড়িতে থেকে যান। দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর স্বামী ফিরে এলেও তাঁর আচরণে বিরক্তি ও অসন্তোষের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক লেখকেরা এই উপেক্ষিত চরিত্রটিকে নতুন ভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন। ‘অ্যালিসন ফেল-এর দ্য মিস্ট্রেস অফ লিলিপুট’ এবং লরেন চ্যাটারের ‘গালিভার’স ওয়াইফ’ এর উদাহরণ। ট্রিনিটি কলেজের প্রদর্শনীতে এ ধরনের রচনার মাধ্যমে গালিভারের কাহিনিকে নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আইরিশ ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে বইটির প্রথম দিকের সংস্করণ থেকে শুরু করে আধুনিক সংস্করণ পর্যন্ত নানা সংগ্রহ রয়েছে। সেই সংগ্রহে ডাচ, জার্মান, স্প্যানিশ, লিথুয়ানীয় এবং আইরিশ ভাষার অনুবাদও রয়েছে। আইরিশ লেখকের লেখা হিসেবে গালিভার’স ট্রাভেলস সর্বাধিক অনূদিত রচনাগুলির অন্যতম। ১৭২৭ সালে ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষাতেও দ্রুত বইটি ছড়িয়ে পড়ে। সংগ্রহের একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য বই হল ১৭৭২ সালের সুইডিশ সংস্করণ। মজার বিষয়, এটি মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত হয়নি; ফরাসি অনুবাদকে ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল সুইডিশ সংস্করণটি। অনুবাদের এই ধারাবাহিকতা দেখায়, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় পৌঁছনোর পথে বইটির নতুন পাঠক এবং নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়েছে।
১৭২৬ সালের মার্চ মাসে এক আইরিশ ধর্মযাজক লন্ডনে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রাতের অন্ধকারে এক প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। লেখক জানতেন, তাঁর রচনা সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির বহু প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। তাই নিজের পরিচয় গোপন রেখেই বইটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই ধর্মযাজকই জোনাথন সুইফট, যিনি পরবর্তী সময়ে ডাবলিনের সেন্ট প্যাট্রিকস ক্যাথিড্রালের ডিন হিসেবে পরিচিত হন
বইটির বিভিন্ন সংস্করণে চিত্রশিল্পীদের ভূমিকাও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আর্থার র্যাকহ্যাম, ফ্রিৎস আইখেনবার্গ, মাইলো উইন্টার্স এবং উইলি পোগানির মতো শিল্পীরা গালিভারের অভিযানকে তাঁদের নিজস্ব শিল্পভাষায় তুলে ধরেছেন। উনিশ শতকের শেষভাগে শিশুদের বইয়ের চিত্রায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন গর্ডন ব্রাউন। ১৮৯০ সালে ব্ল্যাকি অ্যান্ড সন প্রকাশিত ‘গালিভার’স ট্রাভেলস ইনটু সেভারাল রিমোট রিজিয়নস অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ সংস্করণে তাঁর সূক্ষ্ম রেখাচিত্র কাহিনিকে জীবন্ত করে তুলেছিল। সে সময় বই ও সাময়িকপত্রে ব্যবহৃত রেখাভিত্তিক চিত্র মুদ্রণের নতুন প্রযুক্তি কাঠখোদাইয়ের পুরনো পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। ব্রাউনের চিত্রায়ণ এবং বইটির সোনালি অলংকরণে সজ্জিত মলাট সেই সময়ের মুদ্রণশিল্পের বিকাশের পরিচয় বহন করে।
শিশুদের বইয়ের স্বর্ণযুগ বলে পরিচিত ১৮৮০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আর্থার র্যাকহ্যাম ও উইলি পোগানি বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। র্যাকহ্যামের জলরং এবং সূক্ষ্ম রেখা গালিভারের অভিযানকে রূপকথার আবহ দিয়েছিল। পোগানির শক্তিশালী রেখা ও দক্ষ বিন্যাস ছবিগুলিতে নাটকীয়তা এনে দেয়। দু’জনের চিত্রায়ণেই গালিভার অনেকটা রোমাঞ্চকর অভিযাত্রীর রূপ পেয়েছেন। জন হাসালের চিত্রশৈলী ছিল ভিন্ন। বিজ্ঞাপন ও পোস্টারের জন্য বেশি পরিচিত এই ইংরেজ শিল্পী শিশুদের গল্প এবং ছড়ার বইয়েও কাজ করেছেন। মোটা কালো রেখা ও সমতল রঙের ব্যবহার তাঁর ছবির বৈশিষ্ট্য। অ্যাগনেস গ্রোজিয়ার হারবার্টসনের লেখা শিশুদের উপযোগী গালিভার’স ট্রাভেলস সংস্করণে তাঁর চিত্রায়ণ কাহিনিতে হাস্যরস ও পরিচিতির আবহ তৈরি করেছিল। বিশ শতকের ষাটের দশকে ‘কনস্টেবল’ প্রকাশিত শিশুদের সংস্করণে হান্স বাল্টজারের রঙিন চিত্রও উল্লেখযোগ্য। তাঁর ছবিতে ছোটখাটো লিলিপুটবাসীদের গতিশীল উপস্থিতি এবং লেখার সঙ্গে ছবির সৃজনশীল বিন্যাস শিশুদের বইয়ের নকশা ও মুদ্রণপ্রযুক্তির পরিবর্তিত ধারণাকে তুলে ধরে। আমেরিকান শিল্পী মারিয়া লুইস কার্কও শিশুদের বইয়ের চিত্রায়ণে বিশেষ পরিচিত ছিলেন। আর্থার র্যাকহ্যামের একটি সমৃদ্ধ সংস্করণে রয়েছে ছবিতে সজ্জিত মলাট, অলংকৃত অন্তর্মলাট এবং ১২টি পূর্ণপৃষ্ঠার রঙিন চিত্র। এসব সংস্করণ প্রমাণ করে, বইটির জনপ্রিয়তা কেবল তার লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; মুদ্রণ, চিত্রায়ণ ও বইয়ের নকশার ইতিহাসেও তার প্রভাব রয়েছে।
কোনো জনপ্রিয় বইকে ঘিরে পাঠকের আগ্রহ কখনো কখনো মূল লেখকের সৃষ্টির সীমানা ছাড়িয়ে যায়। আজকের দিনে যাকে ‘ফ্যান ফিকশন’ বলা হয়, গালিভার’স ট্রাভেলস প্রকাশের পর তার অনুরূপ নানা রচনাও দেখা গিয়েছিল। ১৭২৭ সালে প্রকাশিত ‘মেমোয়ার্স অফ দ্য কোর্ট অফ লিলিপুট’ তার একটি উদাহরণ। লেখকের নাম ছাড়াই প্রকাশিত এই বইয়ে গালিভারের লিলিপুটে থাকার সময়কার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজদরবারের গুজব, ষড়যন্ত্র ও কেলেঙ্কারির বিবরণ দেওয়া হয়। একই বছরে ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’-এর একটি অননুমোদিত তৃতীয় খণ্ডও প্রকাশিত হয়। সেটি ছিল একই সঙ্গে জাল অনুকরণ এবং মূল কাহিনির ধারাবাহিকতা রচনার চেষ্টা। লেখক সুইফটের লেখার ধরন নকল করার পাশাপাশি দেনিস ভ্যারাসের হিস্তোয়ার দে সেভারাম্ব (১৬৭৫) বই থেকেও উপাদান গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়।সুইফটের মূল রচনার তুলনায় দুর্বল অনুকরণ হিসেবে সমালোচিত হলেও বইটি সে সময় যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল, পরে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিতও হয়। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, প্রকাশের অল্প সময়ের মধ্যেই গালিভারের কাহিনি পাঠক ও লেখকদের কল্পনায় স্বাধীনভাবে বিস্তার লাভ করেছিল।
সুইফ্টের জন্ম ১৬৬৭ সালে, আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে। ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যঙ্গকার হিসাবে পরিচিত তিনি, একই সঙ্গে ছিলেন ধর্মযাজক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও তৎকালীন ব্রিটিশ ও আইরিশ সমাজজীবনের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। তাঁর রচনায় ব্যঙ্গ নিছক কৌতুকের উপকরণ নয়, ক্ষমতাবানদের ভণ্ডামি, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কৌশল, সামাজিক বৈষম্য আর মানুষের আত্মম্ভরিতাকে আঘাত করাই তাঁর লেখার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’-এ সেই প্রবণতা পূর্ণতা পেয়েছিল এক অভিনব সাহিত্য আঙ্গিকে। অষ্টাদশ শতকের ব্রিটিশ সমাজের আত্মম্ভরিতা, রাজনৈতিক দ্বিচারিতা, ধর্মীয় সংঘাত এবং মানুষের ক্ষমতালিপ্সাকে কল্পনার আশ্রয়ে বিদ্ধ করেছিল গালিভারের ভ্রমণ উপন্যাস। কাল্পনিক দেশগুলিতে এক অভিযাত্রীর অভিজ্ঞতার আড়ালে সুইফট তুলে ধরেছিলেন তাঁর সময়ের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নানা অসংগতি।
১৭২৬ সালের মার্চ মাসে এক আইরিশ ধর্মযাজক লন্ডনে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি রাতের অন্ধকারে এক প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। লেখক জানতেন, তাঁর রচনা সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির বহু প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। তাই নিজের পরিচয় গোপন রেখেই বইটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই ধর্মযাজকই জোনাথন সুইফট, যিনি পরবর্তী সময়ে ডাবলিনের সেন্ট প্যাট্রিকস ক্যাথিড্রালের ডিন হিসেবে পরিচিত হন। রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। টোরি দলের সমর্থক সুইফট সমকালীন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও আলোকায়ন-পর্বের কিছু চিন্তাধারার সমালোচনায় সরব ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আয়ারল্যান্ডের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও একাধিক তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক রচনা লেখেন তিনি। তাঁর বিখ্যাত ব্যঙ্গরচনা ‘আ মডেস্ট প্রোপোজাল’-এ আইরিশ দরিদ্রদের দুর্দশা দূর করার নামে ধনীদের কাছে তাদের সন্তানদের খাদ্য হিসেবে বিক্রি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই ভয়াবহ কল্পিত প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে সুইফট আসলে দরিদ্র মানুষের প্রতি শাসক ও বিত্তবানদের নির্মম উদাসীনতাকে সামনে এনেছিলেন।
‘গালিভার’স ট্রাভেলস’-এর প্রথম পর্বে জাহাজডুবির পরে গালিভার এসে পড়েন লিলিপুটে। সেখানে তাঁর চারপাশের মানুষের উচ্চতা মাত্র কয়েক ইঞ্চি। কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ক্ষমতার লড়াই ও পারস্পরিক বিদ্বেষের কোনো খামতি নেই। বরং ক্ষুদ্র শরীরের সঙ্গে তাঁদের বিরাট অহংকারের বৈপরীত্যই হয়ে ওঠে সুইফ্টের ব্যঙ্গের প্রধান হাতিয়ার। লিলিপুটের রাজসভায় কে কতটা ক্ষমতাবান, কে কোন পক্ষের অনুগত, কে কী ভাবে শাসকের আস্থা অর্জন করবেন — এই সব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় ক্ষমতার অলিন্দের জীবন। এমনকি উঁচু দড়ির উপর দিয়ে লাফিয়ে বা কসরত দেখিয়ে রাজকীয় অনুগ্রহ অর্জনের মতো অদ্ভুত প্রতিযোগিতাও সেখানে রাজনৈতিক পদলাভের উপায়। অন্যদিকে, ডিমের কোন দিক থেকে খোসা ভাঙা উচিত, তা নিয়ে বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতের সৃষ্টি হয়।
এ ঘটনাগুলির মধ্যে নিছক হাস্যরস খুঁজে পাওয়া সহজ। কিন্তু সুইফ্টের ব্যঙ্গের আসল লক্ষ্য আরও গভীরে। মানুষের বিশ্বাস, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য যখন যুক্তি ও সহনশীলতার পরিবর্তে ক্ষমতা দখলের অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন সামান্য মতপার্থক্যও ভয়াবহ সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। যে বিরোধের গুরুত্ব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সামান্য, ক্ষমতার রাজনীতি তাকে অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত করতে পারে। তিনশো বছর পরেও অনন্য ব্যঙ্গের প্রাসঙ্গিকতা অস্বীকার করা কঠিন। রাজনৈতিক দলাদলি, ব্যক্তিপূজা, বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা আর জনজীবনের জরুরি সমস্যাকে সরিয়ে রেখে প্রতীকী সংঘাতে মেতে থাকার প্রবণতা — সব ক্ষেত্রেই লিলিপুটের সেই ক্ষুদ্র অথচ আত্মম্ভরী মানুষদের ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। সুইফ্ট মনে করিয়ে দেন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আকার যত বড়োই হোক না কেন, তার চিন্তার পরিধি কখনো কখনো লিলিপুটের বাসিন্দাদের আকারেরই হয়।
দ্বিতীয় যাত্রায় গালিভার পৌঁছন ব্রবডিংন্যাগে। এ বার পৃথিবীর পরিচিত অনুপাত সম্পূর্ণ বদলে যায়। লিলিপুটে যিনি ছিলেন দৈত্যের মতো, এখানে তিনিই ক্ষুদ্র প্রাণী। এ পরিবর্তন শুধু কাহিনির চমক নয়, মানুষের আত্মপরিচয়কে প্রশ্ন করারও এক কার্যকর সাহিত্যিক কৌশল। ব্রবডিংন্যাগের রাজা যখন গালিভারের মুখে ইউরোপের রাজনীতি, যুদ্ধ, অস্ত্রশস্ত্র ও শাসনব্যবস্থার বিবরণ শোনেন, চরম বিস্মিত হন ইউরোপীয় সভ্যতার নৈতিক দৈন্য দেখে। যে সমাজ নিজেকে উন্নত, সভ্য, যুক্তিবাদী বলে মনে করে, সে সমাজের মানুষই কী ভাবে যুদ্ধের আয়োজন করে, ক্ষমতার জন্য লড়াই করে, ধ্বংসের উপকরণ নির্মাণে নিজেদের বুদ্ধিকে কাজে লাগায়, তা রাজার কাছে এক গভীর নৈতিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এখানে সুইফ্ট ইউরোপের আত্মম্ভরিতাকে উল্টে দেন। গালিভার যে সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বের কথা গর্বের সঙ্গে তুলে ধরতে চান, অন্যের চোখে সে সভ্যতাই হয়ে ওঠে হিংসা ও লোভের আধার। সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব যে নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ নয়, এই পর্বে সেই কথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিক পৃথিবীতেও রাষ্ট্রের শক্তি বিচার করতে গিয়ে সামরিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে প্রায়শই প্রধান মাপকাঠি হিসাবে দেখা হয়। কিন্তু সে উন্নতির সুফল কতখানি মানুষের কাছে পৌঁছয়, রাষ্ট্র তার দুর্বলতম নাগরিকদের কতটা সুরক্ষা দেয়, ক্ষমতার প্রয়োগেই বা কতটা সংযম দেখায় — এসব প্রশ্ন অনেক সময়েই পিছনের সারিতে চলে যায়। ব্রবডিংন্যাগের রাজার দৃষ্টিভঙ্গি সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলিকেই সামনে নিয়ে আসে।
তৃতীয় পর্বে সুইফ্টের ব্যঙ্গের লক্ষ্য হয়ে ওঠে জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মম্ভরিতা। গালিভার পৌঁছন লাপুটা নামের এক ভাসমান দ্বীপে। সেখানকার বাসিন্দারা গণিত, সংগীত এবং বিমূর্ত চিন্তায় এতটাই নিমগ্ন যে বাস্তব জীবনের সাধারণ প্রয়োজনের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। পরে লাগাডোর বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্রেও গালিভার এমন সব গবেষণা ও প্রকল্পের সন্ধান পান, যেগুলির লক্ষ্য বিশাল, কিন্তু বাস্তব ফলাফল অনেক ক্ষেত্রেই হাস্যকর। সুইফ্টের এই ব্যঙ্গকে বিজ্ঞানবিরোধিতা হিসাবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর আপত্তি জ্ঞান বা অনুসন্ধানের প্রতি নয়; আপত্তি সেই জ্ঞানচর্চার প্রতি, যা মানুষের বাস্তব প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিছক আত্মপ্রদর্শনের উপকরণে পরিণত হয়। নতুন কিছু আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা যখন তার সামাজিক উপযোগিতা, নৈতিক তাৎপর্য আর বাস্তব প্রয়োগের প্রশ্নকে আড়াল করে দেয়, তখন জ্ঞানও ক্ষমতার মতোই আত্মম্ভরিতার আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে এসব প্রশ্নের গুরুত্ব বেড়েছে। তথ্যের বিপুল বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উন্নতি, বিভিন্ন সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান খোঁজার প্রবণতা আধুনিক সমাজকে নতুন সম্ভাবনা দিয়েছে। কিন্তু কোনো প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হলেই তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, এমন তো নিশ্চয়তা নেই। প্রযুক্তির ব্যবহার কার স্বার্থে হচ্ছে, তার সামাজিক মূল্য কতটা, এবং তার ফলে মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত থাকছে — প্রশ্নগুলি এড়িয়ে গেলে উন্নতির দাবিই শেষ পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে পড়বে। লাপুটার বাসিন্দাদের মতো আজকের সময়েও মানুষ কখনো কখনো উপায়কে লক্ষ্য বলে ভুল করেন। সাফল্যের পরিমাপ তখন বাস্তব সমস্যার সমাধানে নয়, বরং কত নতুন পদ্ধতি, কত জটিল ব্যবস্থা কিংবা কত অভিনব প্রযুক্তি তৈরি করা গেল, তার উপর নির্ভর করে। তিনশো বছর আগে সুইফ্ট যে বুদ্ধিবৃত্তিক বিচ্ছিন্নতার ব্যঙ্গ করেছিলেন, আজ তার নতুন নতুন রূপ দেখা যায়।
উপন্যাসের শেষ পর্বে গালিভার পৌঁছন হুইনিমদের দেশে। সেখানে যুক্তিবাদী ঘোড়ারা সমাজ পরিচালনা করে। তাদের বিপরীতে রয়েছে ইয়াহু নামে মানবসদৃশ প্রাণীরা, যাদের আচরণে ফুটে ওঠে লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণ। হুইনিমদের সংযত ও যুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে ইয়াহুদের আচরণের তুলনা করতে করতে গালিভার নিজের প্রজাতির প্রতিই বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েন।এ পর্বে সুইফ্টের ব্যঙ্গ আরও গভীর, আরও অস্বস্তিকর। লিলিপুটে তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার হাস্যকর দিক দেখিয়েছিলেন, ব্রবডিংন্যাগে সভ্যতার আত্মম্ভরিতাকে প্রশ্ন করেছিলেন, লাপুটায় জ্ঞানচর্চার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু হুইনিমদের দেশে এসে প্রশ্নটি আর কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের স্বভাব, নৈতিকতা এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তার ধারণাই হয়ে ওঠে বিচারের বিষয়।
তবে হুইনিমদের সমাজকে নিখুঁত আদর্শ হিসাবে দেখাও সমস্যাহীন নয়। আবেগ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত যুক্তিনির্ভর সমাজের ধারণার মধ্যেও প্রশ্ন রয়েছে। গালিভারের প্রতিক্রিয়া এতটাই চরম হয়ে ওঠে যে তিনি মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখতেও অক্ষম হয়ে পড়েন। অন্যায়ের সমালোচনা করতে গিয়ে গোটা মানবজাতিকেই ঘৃণা করার এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এখানেই উপন্যাসটির অন্যতম বড়ো শক্তি। সুইফ্ট শুধু মানুষের ভণ্ডামি স্পষ্টভাবে প্রকাশই করেন না, সেই ভণ্ডামির সমালোচনা করতে গিয়ে সমালোচক নিজেও কী ভাবে একপেশে দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হতে পারেন, সে সম্ভাবনাও সামনে আনেন। যুক্তি প্রয়োজন, কিন্তু সহমর্মিতা ছাড়া যুক্তি কি পূর্ণতা পায়? মানুষের দুর্বলতা চিহ্নিত করা জরুরি, কিন্তু সে দুর্বলতার জন্য মানুষকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা কি সমাধান? হুইনিমদের দেশে গালিভারের অভিজ্ঞতা পাঠককে এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
তিনশো বছরে পা দেওয়া ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’-এর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তার কল্পনার বিস্তার। ক্ষুদ্র মানুষের দেশে দৈত্যাকার গালিভার, দৈত্যদের দেশে ক্ষুদ্র গালিভার, আকাশে ভাসমান দ্বীপ কিংবা মানুষের মতো আচরণকারী প্রাণী — এ সব দৃশ্য কল্পনাপ্রবণ পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে। সে কারণেই উপন্যাসটির নানা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ ও শিশুতোষ রূপান্তর বহু প্রজন্মের পাঠকের কাছে সুপরিচিত। আবার, এ জনপ্রিয়তার পাশাপাশি একটি সীমাবদ্ধতাও তৈরি হয়েছে। অভিযানের রোমাঞ্চ অনেক সময় মূল উপন্যাসের রাজনৈতিক ও দার্শনিক তাৎপর্যকে আড়াল করে দেয়। শিশুদের জন্য তৈরি সংক্ষিপ্ত সংস্করণে কাহিনির জটিলতা এবং তৎকালীন রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে সুইফ্টের মন্তব্যের অনেকটাই বাদ পড়ে যায়। ফলে পাঠক গালিভারের বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হন, কিন্তু সে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে লেখক যে পৃথিবীকে প্রশ্ন করেছিলেন, তার সবটা আর সামনে আসে না। অথচ উপন্যাসটির স্থায়িত্বের রহস্য শুধু কল্পনার অভিনবত্বে নয়। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক বৈষম্য, যুদ্ধের যুক্তিকরণ, জ্ঞানচর্চার অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার এমন এক বিশ্লেষণ, যা নির্দিষ্ট সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে। আঠারো শতকের ব্রিটিশ ও আইরিশ রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে জন্ম নেওয়া এই রচনা তাই আজও নতুন করে পাঠের দাবি জানায়।
কোনো সাহিত্যকর্মের তিনশো বছর টিকে থাকা, কখনো মুদ্রণবিহীন না হওয়া, নিছক তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রমাণ নয়। তার মধ্যে এমন কিছু প্রশ্ন থাকতে হয়, যেগুলির উত্তর এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বদলে যায়, অথচ প্রশ্নগুলির প্রয়োজন ফুরোয় না। ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’-এর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। আজকের পৃথিবী আঠারো শতকের ইউরোপ নয়। রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অভাবনীয় উন্নতি করেছে, মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও সামাজিক সম্পর্কের ধারণাও বহুলাংশে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, মতাদর্শগত অসহিষ্ণুতা, যুদ্ধের প্রস্তুতি, জাতীয় শ্রেষ্ঠত্বের দাবি এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে নৈতিক অগ্রগতির সমার্থক মনে করার প্রবণতা এখনও নানা রূপে ফিরে আসে। সুইফ্টের কৃতিত্ব এই নয় যে, তিনি ভবিষ্যতের প্রতিটি সমস্যার পূর্বাভাস দিয়ে গিয়েছিলেন। বরং তাঁর সাহিত্য এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, যার সাহায্যে মানুষ নিজের সময়ের অসংগতিগুলিকে নতুন করে দেখতে পারে। পরিচিত ব্যবস্থাকে অপরিচিত করে তোলা, ক্ষমতার ভাষাকে হাস্যকর করে দেওয়া, সভ্যতার আত্মপ্রশংসার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নৈতিক প্রশ্নগুলিকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসাই তাঁর ব্যঙ্গের স্থায়ী শক্তি।
ব্যঙ্গেরও সীমা রয়েছে। কাউকে বিদ্রুপ করা সহজ, কিন্তু বিদ্রুপের পরে কী ধরনের সমাজ নির্মাণ করা উচিত, তার উত্তর দেওয়া কঠিন। সুইফ্টের উপন্যাস সে উত্তর সরাসরি দেয় না। পাঠককে নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করতে বাধ্য করে। তাঁর কল্পনার জগৎ তাই কেবল হাসির উপকরণ নয়; তা আত্মসমালোচনারও ক্ষেত্র। তিন শতক পেরিয়ে আজও পাঠকের কাছে ফিরে আসছে সে, কারণ গালিভারের যাত্রা শেষ পর্যন্ত দূর দেশ আবিষ্কারের কাহিনি নয়। তা সমাজ, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ক্ষমতা, অক্ষমতা, রাজনীতি, সীমাবদ্ধতাকে চিনে নেওয়ার যাত্রা। লিলিপুটের ক্ষুদ্রতা, ব্রবডিংন্যাগের দৈত্যাকার আয়না, লাপুটার বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিবৃত্তি কিংবা হুইনিমদের কঠোর যুক্তিবাদ — প্রতিটি পর্বই মানুষের আত্মপরিচয়ের একটি দিক উন্মোচন করে। সুইফ্টের উপন্যাসের সবচেয়ে কঠিন অস্বস্তি সম্ভবত এখানেই। গালিভার যত দূরেই যাত্রা করুন, শেষ পর্যন্ত তাঁকে ফিরে আসতে হয় মানুষের কাছেই। আর পাঠকও বই বন্ধ করার পরে আবিষ্কার করেন, যে পৃথিবীকে দেখে এতক্ষণ হাসছিলেন, তিনিও আসলে সেখানেই আছেন।
❤ Support Us








