Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র স্মৃ | তি | প | ট
  • অক্টোবর ২৬, ২০২৬

ভুলে যাবার ‘যো’ নেই

ইমরাজ হাসান
ভুলে যাবার ‘যো’ নেই

প্রবাদপ্রতিম শিল্পী, কবি, বহুমাত্রিক প্রতিভা যোগেন চৌধুরী অন্যভুবনে যাত্রা করেছেন। তাঁর প্রয়াণে শিল্প আকাশে ঝরে পড়ছে অবিরাম শোকধারা। আমাদের বুকে বাজছে স্বজন হারানোর বেদনা। ‘আরম্ভ’ পত্রিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সৃজনের, স্বজনের, সাহচর্যের, আত্মীয়তার।  তিনি লিখেছেন, প্রচ্ছদ এঁকেছেন, অলংকরণ করেছেন, বিভিন্ন সময় মতামত দিয়েছেন। পত্রিকার পাতায় তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি আর সে উপস্থিতির সঙ্গে জড়িয়ে তাঁর চিন্তা, তাঁর রসবোধ, তাঁর শিল্পবোধ এবং শিল্পকে ঘিরে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার উত্তরাধিকার। স্মরণ নয়, তাঁকে ভুলে যাবার ‘যো’ নেই আমাদের এক মুহূর্ত। তাঁর সবাক উপস্থিতি সর্বক্ষণ, সর্বোতভাবে জড়িয়ে থাকবেই।

আজ শুধু তাঁর বহুমাত্রিক কাজ নিয়ে কথা বললেই চলে না। তাঁর প্রতিটা ছবির ভিতরে যে মানুষ, শিল্প সম্পর্কে তাঁর অমোঘ প্রশ্ন, নিজের কাজকে বারবার নতুন করে আবিষ্কার করার যে তাগিদ, সেই নিবিড়, সদা কর্মব্যস্ত মানুষটির কাছেও ফিরে যাওয়া অত্যন্ত জরুরি। ‘আরম্ভ’–র উৎসব সংখ্যায়, পত্রিকার সম্পাদক বাহার উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি সেই ফিরে দেখার মূল্যবান অবলম্বন। সেখানে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী যোগেন চৌধুরী দূরবর্তী, দুর্বোধ্য ব্যক্তিত্ব নন। তিনি সহজ, সরল, অনাড়ম্বর কথোপকথনে নিজের শৈশব, শিল্পশিক্ষা, শিল্পী হয়ে ওঠার পথ, সমকালীন শিল্পপরিসর আর নতুন প্রজন্মের কাজ নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর কথার মধ্যে আত্মপ্রচার নেই; আছে দীর্ঘ অনুশীলনে অর্জিত অভিজ্ঞতার নির্ভার দৃঢ়তা।

১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের ডহরপাড়ায় জন্ম যোগেন চৌধুরীর। শৈশবের সেই গ্রাম, মাটির পুতুল গড়া, মৃৎশিল্পীদের কাজ দেখতে থাকা — এ সব অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই তাঁর চোখের প্রথম শিক্ষার শুরু। শিল্পী হওয়ার জন্য যে সব সময় আনুষ্ঠানিক পাঠশালার প্রয়োজন হয় না, তাঁর জীবনের প্রথম পর্ব যেন তারই সাক্ষ্য। চারপাশের মানুষ, তাঁদের হাতের কাজ, মাটি ও উপকরণের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক — শিশু যোগেনের দেখার অভ্যাসকে তৈরি করেছিল সেই জগৎ। তাঁর বাবা কৃষ্ণের কালীয়দমন পালার জন্য পটভূমি এঁকেছিলেন — বাল্যস্মৃতির এমন খুঁটিনাটিও তাঁর শিল্পী মনন তৈরির ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্প সেখানে কোনো বিচ্ছিন্ন, অভিজাত কর্মকাণ্ড নয়; জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক ধারাবাহিক সৃজনপ্রক্রিয়া।

১৯৪৮ সালে পরিবারের কলকাতায় চলে আসা, দেশভাগের অভিঘাত এবং শিয়ালদহ স্টেশনে উদ্বাস্তু মানুষের দৃশ্য তাঁর শৈশবস্মৃতির অংশ। সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, গ্রামের শৈশবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। কিন্তু দেশভাগের পরে মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও উদ্বাস্তু জীবনের দৃশ্য তাঁর স্মৃতিতে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল। মানুষ, তার অসহায়তা, শরীরের ভাষা এবং ইতিহাসের আঘাত — পরবর্তী সময়ে তাঁর ছবির জগৎকে বুঝতে গেলে এই জীবনপটও মনে রাখা প্রয়োজন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬০ সাল। কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার সময়। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের পাঠক্রমই শেষ পর্যন্ত শিল্পীর সম্পূর্ণ পরিচয় তৈরি করে না। শিল্পীর নিজস্ব ভাষা তৈরি হয় শেখা ও শেখাকে অতিক্রম করার মধ্য দিয়ে। যোগেন চৌধুরীর জীবনেও সেই অতিক্রমের ইতিহাস রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি তাঁকে আকর্ষণ করেছিল, গগণেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ জড়িয়ে ছিল তাঁকে সর্বদা। পাশ্চাত্য শিল্পের নানা রীতির সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটেছিল। কিন্তু সমস্ত প্রভাবকে নিজের শিল্পের চূড়ান্ত ভাষা করে তোলার বদলে তিনি ক্রমশ নিজের প্রকাশভঙ্গি খুঁজেছেন। বারবার ভেঙেছেন আঁকার শৈলী, চিন্তা-ভাবনা, প্রকাশের ভঙ্গিমা। তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র ভাষ্য। তাঁর কাছে শিল্পের শিক্ষা ছিল দেখার শিক্ষা, বোঝার শিক্ষা; তার পর সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের মতো করে রূপ দেওয়ার দীর্ঘ পরিশ্রম।

প্যারিসে বৃত্তি নিয়ে কাজ করা, পরে লন্ডনে থাকা — যোগেন চৌধুরীর শিল্পজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিদেশে গিয়ে ইউরোপীয় শিল্পের নানা রীতি ও শিল্পীদের কাজ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সে অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড়ো তাৎপর্য তাঁর কাছে কেবল নতুন শিল্পরীতির সঙ্গে পরিচয় নয়; বরং নিজের কাজকে কোন পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, সে বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে নেওয়া। সাক্ষাৎকারে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, পাশ্চাত্য শিল্পরীতিকে সরাসরি নিজের কাজে প্রতিফলিত হতে দিতে চাননি, ইউরোপীয় রীতির অনুকরণও করতে চাননি। অন্যের কাজ নকল করে নিজের শিল্পীসত্তা নির্মাণের পথ তিনি গ্রহণ করেননি। এখানে শিল্পের মৌলিকতা সম্পর্কে তাঁর গভীর বিশ্বাসের স্পষ্ট উচ্চারণ। কোনো শিল্পীর কাছে বিদেশি অভিজ্ঞতা মূল্যবান হতে পারে, কিন্তু সে অভিজ্ঞতা নিজের জীবন, সমাজ, ইতিহাস ও অনুভবের ভিতর দিয়ে রূপান্তরিত না হলে তা কেবল ধার করা ভাষা হয়েই থেকে যায়।

বিদেশ থেকে ফিরে মাদ্রাজে কাজ করার সময় তাঁর শিল্পভাষায় আবার পরিবর্তন আসে। পুপুল জয়করের উদ্যোগে সেখানে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। মাদ্রাজে তিনি তাঁতশিল্পের নানা যন্ত্র ও উপকরণকে নিজের ছবির কাজে ব্যবহার করেন। এ ঘটনাটি বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। সেখানে শিল্পের ভাষা গড়ে ওঠে শুধু শিল্পের ইতিহাস শিক্ষা থেকে নয়, জীবনের প্রবাহমান উপকরণ থেকেও। চারপাশের বস্তু, কারিগরি প্রক্রিয়া, স্থানীয় অভিজ্ঞতা — সবই শিল্পীর কাছে নতুন প্রকাশের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। নিজের কাজ কী, কেন তিনি আঁকেন — এ প্রশ্নগুলি নিয়ে তিনি একাধিক লেখায় নিজের মতামত দিয়েছেন। অর্থাৎ, ছবি আঁকার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত শিল্পভাবনা, উত্তরণের পথ খোঁজা ছিল যোগেন চৌধুরীর যাপনের অঙ্গ। তাঁর ছবির নিজস্বতা নিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁর রেখার কথা ফিরে ফিরে আসে। তাঁর ছবির মানুষ, তাদের শরীর, মুখ, ভঙ্গি, গড়ন — সব কিছুতেই এক ধরনের স্বতন্ত্র দৃশ্যভাষা। রেখা যেখানে কেবলই অবয়বের সীমানা টানার উপায় নয়, শরীরের অস্বস্তি, দুর্বলতা, জীবনের টানাপড়েন এবং সময়ের সুস্পষ্ট ছাপ।

অন্তর্গত জিজ্ঞাসা ঘিরে যোগেন চৌধুরী সর্বদা সতর্ক। শিল্পী কীভাবে নিজের ভাষা নির্মাণ করেন, কীভাবে দীর্ঘ অনুশীলনে সে ভাষাকে পরিণত করেন, কীভাবে একই সঙ্গে নিজের কাজের পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে চলেন — তাঁর দীর্ঘ শিল্পজীবন এসব প্রশ্নের সামনেই আমাদের দাঁড় করিয়েছে। তাঁর শিল্পের বৈশিষ্ট্য নিজস্বতার অন্বেষণ। আবার সেই নিজস্বতার মধ্যেই সার্বিকতার নির্যাস। মানুষ, চারপাশ সেখানে মূল প্রতিপাদ্য। নিজস্বতা অর্জন করে ফেললেই যে কাজ শেষ হয়ে যায় না, বরং প্রতিষ্ঠিত ভাষাকে নতুন করে পরীক্ষা করার দায়িত্ব শুরু হয় তখনই, যোগেন চৌধুরীর কাজে মর্মে ছড়িয়ে আছে এ দর্শন। যে শিল্পী নিজের সাফল্যের সূত্রকে বারবার ব্যবহার করে চলেন, তাঁর কাজ সহজেই পুনরাবৃত্তির ফাঁদে আটকে যেতে পারে। যোগেন চৌধুরী নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের প্রসঙ্গে এমন বিপদের কথাই বিশেষভাবে বলেছেন।

বিশ্বভারতীর কলাবিভাগে শিক্ষকতা করবার সময়, তিনি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পড়ার অভ্যাসের অভাব লক্ষ করেছিলেন। তাঁর মতে, ছবি আঁকতে হলে নিয়মিত পড়াশোনা, শিল্পের নিয়ম মেনে নিরন্তর অনুশীলন জরুরি। শুধু হাতে দক্ষতা থাকলেই একজন শিল্পী হয়ে ওঠা যায় না; নিজের বোধ ও বুদ্ধিকে কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। শিল্পের ইতিহাস, সমাজ, দর্শন, সাহিত্য — এই সব কিছুর সঙ্গে সংযোগ না থাকলে শিল্পীর চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাঁর এ বক্তব্যে  অভিজ্ঞ শিল্পশিক্ষকের উদ্বেগ রয়েছে, কিন্তু তার চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে শিল্প সম্পর্কে তাঁর সামগ্রিক ধারণা। শিল্পী হওয়া মানে কেবল যে ছবি তৈরি করা নয়; পৃথিবীকে বোঝার ক্ষমতা অর্জন করাও। যে শিল্পী পড়েন না, ভাবেন না, নিজের কাজকে প্রশ্ন করেন না, তাঁর কাছে নতুন বিষয় ও নতুন আঙ্গিকের সন্ধান ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠবে।

যোগেন চৌধুরী লক্ষ করেছিলেন, প্রচার ও দৃশ্যমানতার এ সময়ে অনেকেই অল্প সময়ের মধ্যে পরিচিতি পেয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পরিচিতি আর শিল্পের স্থায়ী মূল্য এক জিনিস নয়। কোন শিল্পীর কাজ সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকবে, আর কার কাজ বিস্মৃতির মধ্যে হারিয়ে যাবে — সে সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত সময়ই নেয়। তাঁর এহেন পর্যবেক্ষণে খ্যাতির বিরুদ্ধে কোনো সরল নীতিবাদ নয়,  হাজার হাজার বছরের শিল্পভাবনার দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতি আস্থা। তিনি বাজারের নিয়ন্ত্রণ এবং কাজের পুনরাবৃত্তিকেও সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বাজার যখন শিল্পের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তখন শিল্পীর সামনে সহজে বিক্রি হওয়ার মতো কাজ বারবার তৈরি করার প্রলোভন তৈরি হয়। নিজের পরিচিত শৈলীকে পুনরাবৃত্তি করে সাফল্য ধরে রাখার চেষ্টা নতুন ভাবনার পথ রুদ্ধ করে দিতে পারে। অথচ শিল্পের কাজই অচেনা কোনো অভিজ্ঞতার জন্য নতুন ভাষা খুঁজে নেওয়া। স্বতন্ত্র চিন্তা ও নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করতে পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

যোগেন চৌধুরী বাংলার শিল্পপরিসর নিয়েও কথা বলেছেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে, পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে শিল্পের বাণিজ্যিক সাফল্য তুলনামূলকভাবে বেশি; এর পিছনে অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও ছবি কেনার অভ্যাসের ভূমিকা রয়েছে। বাংলায় শিল্পের প্রতি আগ্রহ থাকলেও ছবি কেনার প্রবণতা ততটা শক্তিশালী নয় — এই বৈপরীত্য ক্রমশ প্রকট হচ্ছে আরও। শিল্প নিয়ে আলোচনা ও প্রশংসা হয়তো অনেক, কিন্তু শিল্পকর্ম কেনার অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে সেই আগ্রহ সব সময় প্রতিফলিত হয় না। বিদেশে সংগঠিত শিল্পচর্চার পরিসর এবং ভারতে তার সীমাবদ্ধতার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর সময়ের শিল্পীদের পরিচিতি অর্জনের জন্য দীর্ঘ পরিশ্রম করতে হতো; সংবাদমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতাও বিশেষ ছিল না। আজ প্রচারের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু সে বৃদ্ধি যে শিল্পের সামগ্রিক মানকে নিশ্চিত করে না, তা-ও তিনি স্পষ্ট করেছেন।

শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা নিয়েও তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট। শিল্পের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তার সংযোগ ঘটাতে সংরক্ষণ, সংগ্রহশালা এবং শিল্পকর্মের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব অপরিহার্য। তিনি আক্ষেপ করেছিলেন, দেশের দীর্ঘ শিল্প-ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রয়োজনীয় সংগ্রহ ও প্রদর্শনের পরিসর যথেষ্ট গড়ে ওঠেনি। কেন্দ্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যের প্রভাব এবং শিল্প-সংগ্রহের অবক্ষয় নিয়েও তাঁর তীব্র সমালোচনা সর্বজনবিদিত। শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিমান নয়, শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগই তাঁর বুক ফুঁড়ে, ফুটে ফুটে বেরিয়েছে বারবার। প্রশ্ন তুলেছেন, শিল্পের ইতিহাস যদি কেবল বইয়ের পাতায় বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত সংগ্রহে আটকে থাকে, যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহ ও প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা না থাকে, তা হলে নতুন প্রজন্ম তার সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক তৈরি করবে কীভাবে? শিল্পের উত্তরাধিকার রক্ষা করা মানে কি শুধু অতীতের কাজ সংরক্ষণ? না কি সে কাজের সঙ্গে ভবিষ্যতের সংলাপের সুযোগ তৈরি করে রাখা?

রাষ্ট্রপতি ভবনে কাজ করার সময় শিল্পীদের প্রতি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে তাঁর কিছু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর কথায় শোনা যায়। সে অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বুঝিয়েছেন, শিল্পের জন্য প্রতিষ্ঠান ও পৃষ্ঠপোষকতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সে পৃষ্ঠপোষকতা শিল্পের নিজস্ব মূল্যবোধ ও স্বাধীনতাকে সম্মান করেই হতে হবে। শিল্পের বিকাশের জন্য অর্থ, সংগ্রহ, প্রদর্শনী ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ দরকার; তার পাশাপাশি দরকার শিল্পকে দলীয় আনুগত্যের বাইরে রেখে মূল্যায়নের পরিবেশ। যোগেন চৌধুরীর শিল্পচিন্তাকে শুধু নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখলে তাঁর বহুমাত্রিকতা ধরা পড়ে না। সমাজের সহিংসতা ও ইতিহাসের অন্ধকারের সামনে তাঁর সমুজ্জ্বল উপস্থিতি ধ্রুবতারার মতই পথদিশারী। শিল্প কি কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশ? শিল্পীর কাজ কি সমাজের সংঘাত, মানুষের বিপন্নতা আর সময়ের নিষ্ঠুরতার বাইরে থাকতে পারে? যোগেন চৌধুরীর কাজ ও তাঁর কথাবার্তা অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়িয়ে যায়নি কখনো। তাঁর শিল্পে মানুষের শরীর ও অবয়বের গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনই তাঁর শিল্পীজীবনের অভিজ্ঞতায় রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ।

এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে তাঁর প্রতিটি ছবিকে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে পড়তে হবে। বরং তাঁর শিল্পের বহুমাত্রিকতা বোঝার জন্য মনে রাখতে হবে, মানুষের শরীর, তার ভঙ্গি, তার দুর্বলতা ও অস্বস্তি — এসবই বৃহত্তর সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। একজন শিল্পী কখনো সরাসরি ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানান, কখনো নিজের শিল্পভাষার ভিতর দিয়ে সময়ের অস্থিরতা ও মানুষের বিপন্নতার অনুভবকে ধারণ করেন। যোগেন চৌধুরীর জীবন ও কাজের মধ্যে এই দুই সম্ভাবনারই ঋজু, বেবাক উপস্থিতি।

‘আরম্ভ’ পত্রিকার প্রতিটা অক্ষর আজ যোগেন চৌধুরীকে স্মরণ করছে। প্রচ্ছদে, অলংকারে, কবিতায়, গদ্যে; শব্দ ও রেখা পাশাপাশি রেখে ফিরে পেতে চাইছে ‘যে দিন গেল চলে’। সাহিত্য ও শিল্পের মধ্যে যে পারস্পরিক আস্থা, যে সৃজনশীল বিনিময়, যে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, তা খুঁজে চলেছে। এ কেবলই প্রয়াণ শোক নয়। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস, তাঁর সৃষ্টির স্মৃতি আর সে সৃষ্টির ভেতরে গড়ে ওঠা আত্মীয়তারও শোকও। বিপুল খ্যাতি তাঁর, তবু কথোপকথনে রহস্যময়তার আড়াল নেই; সহজ, সরল, প্রভাবহীন ভঙ্গিতে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন তিনি। শিল্পের ক্ষেত্রে যে কঠোরতা ও আত্মশাসনের পরিচয় দিয়েছেন, কথাবার্তায় তার সঙ্গে জুড়ে যায় অনাড়ম্বরতা। নিজের কাজ নিয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস অটুট, কিন্তু সে আত্মবিশ্বাসকে প্রচারের ভাষায় সাজানোর প্রয়োজন কখনো অনুভব করেননি যোগেন চৌধুরী। সময়কে বুঝতে চেয়েছেন, নিজের শিল্পভাষাকে বারবার পরীক্ষা করেছেন, নতুন প্রজন্মের কাজ নিয়ে ভেবেছেন, শিল্পের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কখনো কঠোর সমালোচনা, কখনো স্মৃতির কোমলতা, কখনো শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। নানা স্বর একত্রিত হয়ে তৈরি করেছে তাঁর চিন্তার বিশাল আকাশ। আমরা সেই বিশাল আকাশের নিচে নতজানু হলাম।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!