- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫
‘অনুভবের তাজমহল’— ৫০ জন দৃষ্টিহীন ভ্রমণকারীর অনন্য সুন্দর অভিজ্ঞতা
রোদ্দুরের তেজ খেলা করছে বিস্তীর্ণ ভূমে। সাদা মার্বেলের উপর ছায়া পড়ছে প্রাচীন স্তব্ধ মিনারের। চারপাশে পর্যটকদের ভিড়। কিন্তু এক দল মানুষ আজ এখানে এসেছেন দেখার জন্য নয়, তাঁরা এসেছেন তাজমহলকে ‘অনুভব’ করতে। তাজমহল স্পর্শ প্রথমবারের মতো অনুভব করলেন ৫০ জন দৃষ্টিহীন মানুষ। কেউ মার্বেলের শীতলতায় মোহিত, কেউ খোদাইয়ের জটিলতা ছুঁয়ে ভাবছেন — এ কি ফুল, না কি হাতির শুঁড়? কেউ আবার পাশে দাঁড়ানো সঙ্গীকে উদ্দেশ করে রসিকতা করে বলে উঠলেন, ‘তুমিও আমার জন্য এমন কিছু বানাবে তো?’
এমনই এক অনন্য ভ্রমণ আয়োজন করেছিল ‘রাইজিং স্টার: খিলতে চেহরে’ নামে দিল্লিভিত্তিক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। উদ্দেশ্য একটাই দৃষ্টিহীন মানুষদের সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত করা। আর সে যাত্রায়, তাজমহল হয়ে উঠল আত্মার স্পর্শ, ভারতবর্ষের বিবিধ ঐতিহ্যের উন্মুক্ত পাঠশালা। দিল্লির ময়ূর বিহার থেকে বাসে করে এলেন তাঁরা, প্রত্যেকের গলায় ঝোলানো হলুদ রঙের আইডি কার্ড — এক পাশে নাম ও যোগাযোগের নম্বর, অন্য পাশে সংস্থার বিস্তারিত পরিচয়। নিরাপত্তা আর সংযোগের এক মেলবন্ধন। কেউ নিজের চাকরির গল্প করছেন, কেউ বলছেন সংসারের কথা। ৩২ বছর বয়সি চিত্রলেখা বলেন, ‘রোজকার জীবনে আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় ক-জন? এখানে সবাই আমার মতো, এখানে আমি যত খুশি তত বন্ধু বানাতে পারি।’
তাজমহলের মূল ফটকে পৌঁছনোর আগে প্রত্যেককে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি করে ছোট্ট রেপ্লিকা। মিনিয়েচার তাজমহল। যাতে তাঁরা স্পর্শ করে অন্তত একটি চিত্র কল্পনায় আঁকতে পারেন। তারপর গাইডের মুখে একের পর এক তথ্য। ইতিহাস থেকে স্থাপত্যের খুঁটিনাটি। যেমন, ‘তাজমহল পুরোপুরি দ্বিপার্শ্বীয় সমতলে নির্মিত। ৪ কোণে চারটি মিনার, মাঝখানে মূল গম্বুজ।’ আর এক গাইড বলেন, ‘মাকরানা মার্বেল দিয়ে তৈরি এই সৌধ সূর্যোদয়ে গোলাপি, দুপুরে ঝকঝকে সাদা, আর চাঁদের আলোয় রূপালি-নীল বর্ণ নেয়।’ এ কথা শুনে ভ্রমণকারীদের কেউ বলে উঠলেন, ‘তাহলে কি রাতেও দেখতে আসে লোক?’ তীব্র গরমের মধ্যেও জমজমাট আলোচনা চলতে থাকে — ভালবাসা, স্মৃতিসৌধ, এবং স্থাপত্য নিয়ে উৎসাহ শেষই হয় না তাঁদের। কিন্তু সব কিছুর ঊর্ধ্বে, ছিল অনুভব। রাজেশ কুমার সিং, পেশায় এক জন ব্যাংকার, বললেন, ‘আমি ৩ বছর বয়সে চোখ হারিয়েছি। তবে কোনো আক্ষেপ নেই। জীবনের সবচেয়ে সেরা ভ্রমণ হল এটা।’ তিনি আরো বললেন, ‘প্রথমে ভাবিনি এত উপভোগ করব। আজ এত নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হল, মনে হচ্ছে জীবনটা সত্যিই বড়ো হয়ে উঠল।’
অভাবনীয় এই ভ্রমণের নেপথ্যে সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা অমিত জৈন। ২০১৮ সালে কিছু দৃষ্টিহীন পড়ুয়ার সঙ্গে আলাপ হয় তাঁর। তাঁদের অনেকেরই ছিল একটাই অপূর্ণ স্বপ্ন — চোখে দেখতে না পারলেও তাঁরা ঘুরে দেখতে চান পৃথিবীটাকে। তার পরেই শুরু হয় ‘রাইজিং স্টার’-এর পথচলা। প্রথম ট্রিপ হয় ঋষিকেশে, ২০১৮-র ডিসেম্বর মাসে। সংস্থার প্রজেক্ট ম্যানেজার লাভলী সরকার বলেন, ‘ভ্রমণ কেবল দেখার নয়, এটি এক ধরনের শিক্ষা। নতুন মানুষ, নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ — সব কিছু মিলে এটি জীবন গঠনের অন্যতম মাধ্যম।’ তাঁর সহকর্মী মুসকান গুপ্তা জানান, ‘প্রত্যেক ট্রিপের আগে আমরা জায়গাটি ঘুরে দেখে আসি। প্রশাসনের অনুমতি নিই, যাতে কোনো অসুবিধা না হয়। লক্ষ্য একটাই — অন্তত এক লক্ষ দৃষ্টিহীন মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলা।’
তাজমহলের সামনে ছবি তোলার সময়ে ক্যামেরার দিকে নয়, আকাশের দিকে তাকিয়েই সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন, ‘উল্লাস!’। কেউ কেউ আবার বললেন, ‘এ ছবি তো আর আমরা দেখতে পাব না, কিন্তু মন দিয়ে হয়তো অনুভব করতে পারব।’ সারা দেশে যখন বিদ্বেষের কালো ঘনাচ্ছে, তখন এই মানুষেরা শিখিয়ে দিলেন, ভালোবাসা ঘৃণার চাইতেও বেশি সংক্রামক। বিবিধের মাঝে এটাই আমাদের দেশ, আমাদের ভারতবর্ষ। খোলা হৃদয়ের জানালা মেলে এই অনন্য সুন্দর মানুষদের পরবর্তী গন্তব্য? ৬ দিনের দুবাই সফর। অনেকেই এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন। কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের রাজি করানোর মরিয়া চেষ্টা করছেন। ভ্রমণপিপাসু সুপ্রিত কৌর আকাঙ্ক্ষা ভরা গলায় বললেন, ‘এইবার আমি বুর্জ খলিফা ছুঁয়ে দেখতে চাই — কেমন অনুভব হয়!’
তথ্যঋণ— দ্য প্রিন্ট/ আলমিনা খাতুন
❤ Support Us







