Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • অক্টোবর ১৯, ২০২৫

মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা

বাহার উদ্দিন
মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা

চিত্রকর্ম : বাহারউদ্দিন

 
জুবিন গর্গের মৃত্যুতে, মৃত্যুর উদযাপনের সজল মহিমায় আমরা স্তম্ভিত। এ এক অপ্রত্যাশিত ভূ-কম্পন। কম্পিত শাসক, কম্পিত নানা রঙের রাজনীতি এবং সমাজের উজ্জ্বল আর প্রান্তিকের সমস্ত মুখ। জুবিন নিজেকে মুক্ত, মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা ভাবতেন। নির্ভুল ভাবনা। জীবন জুড়ে, থমকে পড়া ইহজাগতিকতার শেষেও, জুবিনের কণ্ঠে, জুবিনের বেদনাবোধে, জুবিনের প্রাণচাঞ্চল্যে ছড়িয়ে আছে নির্মল আর মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘার সংরাগ।

 
১৯৭২ সালের ১৮ নভেম্বর, জুবিন ওরফে বাবা ঠাকুরের জন্ম গারো পাহাড়ের তুরা শহরে। মেঘালয় তখন সবে পৃথক রাজ্য হয়েছে, জুবিনের বাবা মোহিনী বরঠাকুর গারো পাহাড়ে ম্যাজিস্ট্রেটের পদে কর্মরত। কপিল ঠাকুর ছদ্মনামে কবিতা আর গান লিখতেন, কবি হিসাবে তিনি সুপরিচিত। তাঁর লেখা গান নিয়মিত বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হতো।
 
বৃহত্তর অসমে যাঁরা কবিতার পাশাপাশি গানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতেন, গান নিয়ে ভাবতেন, যেমন হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নবকান্ত বরুয়া, ভূপেন হাজারিকা, হীরেন ভট্টাচার্য-র মতো দিকদর্শীরা, তাঁদের সমকক্ষ না হলেও, কপিল ঠাকুরের স্বাতন্ত্র্য তাঁকে অন্যরকম বলতে আর ভাবতে শেখায়। সমৃদ্ধ পারিবারিক ঘরানা, উজান অসমের আদি বাসিন্দা, বড়ো হয়েছেন সংস্কৃতিপ্রবন জোরহাটে, বাগিচা ঘেরা শহরে, যে-কোনো উদারমনস্ক অসমিয়াদের মতো গানের তরঙ্গ ছুঁয়ে থাকত তাঁর ভাবাবেগকে, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বিহু গান, লোক গান, লোক নৃত্য নিঃশব্দে উচ্চারিত হতো তাঁর রক্ত প্রবাহে, চরাচরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনির গুনগুন আশৈশব কপিলের স্বরধ্বনিতে বেজে উঠত। বিবাহের সূত্রেও গানের সঙ্গে মিশে যায় তাঁর সীমান্তহীন সত্তা, স্ত্রী ইলি বরঠাকুর সুপরিচিত সঙ্গীত শিল্পী এবং অভিনেত্রী। স্বামী-স্ত্রী দু-জনের সহমতে ছেলে ‘গল্ডি’-র নাম রাখা হয় জুবিন গর্গ। তাঁরা সম্ভবত ভেবেছিলেন বিশ্ববিশ্রুত জুবিন মেহতার মতো গল্ডিও হয়ে উঠবে গানের শিল্পী। জুবিনের বরঠাকুর পদবি খসে পড়ল অচিরে, প্রায় বালক বয়সেই জুবিন গর্গ নামে আত্মপরিচিতি স্পর্ধিত করে তোলে উদীয়মান শিল্পীকে। পরে শ্রেণী ও ধর্মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যিনি বলতে পারেন, আমার কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই। একইভাবে, জাতিসত্তার শুদ্ধতা নিয়েও তাঁকে কখনো সংশয়াচ্ছন্ন হতে দেখা যায়নি, অকপটে বলতে পারতেন, আমি অর্ধেক অসমিয়া, অর্ধেক বাঙালি। কবি নবকান্ত বরুয়া যেমন বলতেন, অসমিয়া আমার মাতৃভাষা আর বাংলা আমার ধাতৃ; ঠিক একইরকম জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ নবকান্ত বরুয়ার মতো জুবিনকেও স্পর্শ করেনি কখনো। ক্ষুদ্রচিন্তার সংকীর্ণ অববাহিকা অতিক্রম করে দু-জনই নির্মাণ ও আত্মনির্মাণে, বৃহত্তর অসম, বৃহত্তর ভারত-ভাবনায়— শিল্প-স্বরূপ আর আত্মজাগৃতির উৎসকে আমৃত্যু ছুঁয়ে থাকলেন।
 

জাতিসত্তার শুদ্ধতা নিয়েও তাঁকে কখনো সংশয়াচ্ছন্ন হতে দেখা যায়নিঅকপটে বলতে পারতেনআমি অর্ধেক অসমিয়াঅর্ধেক বাঙালি কবি নবকান্ত বরুয়া যেমন বলতেনঅসমিয়া আমার মাতৃভাষা আর বাংলা আমার ধাতৃঠিক একইরকম জাতিবিদ্বেষবর্ণবিদ্বেষ নবকান্ত বরুয়ার মতো জুবিনকেও স্পর্শ করেনি কখনো

 
অসমিয়া মধ্যবিত্তের হয়ে ওঠাকেও নির্দিষ্ট চিহ্নের দিকে একসময় চালিত করে বাংলার উনিশ শতকের নবজাগরণ, সে জাগৃতিতে পশ্চিমি প্রভাবের চাইতে অনেক বড়ো ছিল গৃহঅভ্যাসের সন্ধান আর আত্মসমীক্ষা। বাংলার নবজাগরণ যে অপূর্ণতা আর অর্ধসমাপ্তি নিয়ে বিবর্তিত, বিতর্কিত, সে দিকে এগোয়নি অসমিয়া মধ্যশ্রেণীর ভাবনাচিন্তা, বৃহত্তর অসমের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত অসমিয়ারা বেঁচে থাকতে চেয়েছেন, ইংরেজি ও বাংলাভাষা তাঁদের ভাবনাচিন্তার রসদ জুগিয়েছে— মুফিজুদ্দিন আহমেদ হাজারিকা [১৮৭০-১৯৫৮], রমাকান্ত চৌধুরী [১৮৪৬-১৮৮৯], ভোলানাথ দাস [১৮৫৮-১৯২৯], লক্ষীনাথ বেজ বরুয়া [১৮৬৪-১৯৩৮], যে-ভাবে বৃহত্তর অসমকে নিয়ে ভেবেছেন, বিভিন্ন জনজাতির সংস্কৃতিকে জড়িয়ে থাকতে চেয়েছেন তাঁদের যাবতীয় ইহকর্মে এবং জাতির পুর্ণরূপের সন্ধান করেছেন, তারই নবীনতম আরেক চেহারা আমরা দেখতে পেলাম জুবিন গর্গের আত্মপ্রকাশে। তাঁর লোকপ্রীতি, তাঁর মধ্যবিত্তায়ন খন্ডিত নয়, সম্পূর্ণ অখণ্ড। কবিতা লিখতেন, গান রচনা করতেন, নিজেকে বিশ্বনাগরিকতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ভাবতেন, তাঁর সজল উচ্চারণে লেগে থাকত কিরাত জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে সমস্ত অনার্যের ঐতিহ্য আর মর্মব্যথা; এজনই সম্ভবত জুবিনের মৃত্যুতে উপচে পড়ে জনস্রোতের কান্না, কেবল বিলাপ নয়, অশ্রু নয়, এ কান্নায় একটি অকাল মৃত্যুর উদযাপনও দেখতে পেল বিশ্ব। বীরের মৃত্যুতে কাঁদতে নেই, বলেছিলেন প্রগাঢ় প্রজ্ঞার আহমেদ শরীফ। বঙ্গমণীষার এ বার্তার আহ্বানকে, জেনে কিংবা না জেনে, শোকে বিহ্বল হয়ে রাস্তায় নামল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জলস্রোত। স্রোত বইছে এখনো, যতদিন গান থাকবে, কবিতা থাকবে, ততদিন লোকশ্রুতির নায়কের মতো মহাজনতা স্মরণ করবে জুবিন গর্গকে। ভবিষ্যদ্রষ্টা শিল্পী জীবদ্দশায় হয়তো জানতেন তাঁর মৃত্যুর খবর; জানতেন জলতরঙ্গে লেখা আছে তাঁর মৃত্যুশোক, তাঁর প্রাণ চাঞ্চল্যে ঝলসে উঠত জনস্রোতের আওয়াজ, প্রায়ই তাঁকে বলতে শোনা যেত, ‘মোর মৃত্যুর পিছত এই গানটো [আমার মৃত্যুর পর এই গানটি] আপনাদের গাইতে হবে, এ দেহার মূল্য নাই…’ গানের দেহাত্মক, বেদনাত্ম, তীব্রতা ছুঁয়ে থাকত হাসিমুখের জুবিনকে। জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়াল, বিষ্ণুরাভা, ভূপেন হাজারিকাকে কি ছাড়িয়ে গেলেন জুবিন? প্রশ্ন জাগে। জুবিনের এসব পুর্বগামীদের কাউকেই উত্তরপূর্ব ভুলবে না, আজান ফকির থেকে ভুপেন, সবাইকে মনে রাখবে শাশ্বতের ধারা, জুবিনকেও বারবার স্মরণ করবে। যে-সর্বপ্রাণ সচেতনের মগ্নচেতনাকে জড়িয়ে থাকে, চালিত করে মেধার মনন প্রক্রিয়াকে, সমস্ত সুরকে, গান বা কবিতার উচ্চারণকে যে আত্মতা আর নিয়তির কথা শুনিয়ে যায়, সে চেতন বা অবচেতনের শেষ কোথায়? মৃত্যুতে না মৃত্যুহীন আত্মর জাগরণে? এসব প্রশ্ন উসকে দিয়ে গেল জুবিনের হঠাৎ মৃত্যু !
 

বীরের মৃত্যুতে কাঁদতে নেইবলেছিলেন প্রগাঢ় প্রজ্ঞার আহমেদ শরীফ বঙ্গমণীষার এ বার্তার আহ্বানকেজেনে কিংবা না জেনেশোকে বিহ্বল হয়ে রাস্তায় নামল উত্তরপূর্বাঞ্চলের জলস্রোত  স্রোত বইছে এখনোযতদিন গান থাকবেকবিতা থাকবেততদিন লোকশ্রুতির নায়কের মতো মহাজনতা স্মরণ করবে জুবিন গর্গকে

 
রহস্যময় অবসান। আমরা আশাবাদী, জুবিনের আত্মতা জেগে থাকবে, জেগে থাকবে মানুষ আর জীবনকে তাঁর ভালোবাসার প্রভূত সহজিয়া ভাবাবেগ। শ্রী চৈতন্য, শঙ্কর দেব, আজান ফকির, লানন সাঁই, রবীন্দ্রনাথ মানুষের নিরাকারকে যে দৃষ্টিতে দেখতে শিখিয়েছেন, সে-রকম দেখবার আরেক অনন্ত দূত হয়ে জেগে থাকবেন জুবিন গর্গ। নিজেকে মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা ভাবতেন। আর্যাবর্তের আগন্তুকদের রাজনীতি, সমাজনীতি এবং যাপনের রুদ্ধ দরজাকে বরদাস্ত করতে অভ্যস্ত ছিলেন না, বড়ো হয়েছেন অসমের নানা জায়গায়, বাবার চাকরি সূত্রে ঈশান বাংলার করিমগঞ্জ থেকে উজান ও নিম্নাঞ্চলের শহরে, মফস্বলে, কিন্তু শহুরেপনা, মফস্বলিয়ানা কখনো তাঁর কণ্ঠকে চেপে রাখার সুযোগ পায় নি। জলে ও জঙ্গলে, ব্রহ্মপুত্রর বাঁকে আর পাঁকে গড়ে উঠেছে তাঁর শিল্পস্বভাব। নবকান্ত বরুয়া, হেম বরুয়া, দেবকান্ত বরুয়ার মিত্রময়তায় আপ্লুত ছিল তাঁর ধর্মহীন ধর্মবোধ। এ ভাবেই তাঁকে নিয়ে, তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ঐতিহ্য নিয়ে ভাবতে পারি আমরা, ব্যক্তি-প্রতিভা ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারকে আলিঙ্গন করে ক্রমশ হয়ে-ওঠে, এরকম হয়ে-ওঠা কখনো পূর্ণ হয়, কখনো নজরুল প্রতিভার মতো অসমাপ্ত থেকে যায়। তবু যে ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেয় সে, তা অমূল্য, অনন্ত।
 

নিজেকে মুক্ত কাঞ্চনজঙ্ঘা ভাবতেন আর্যাবর্তের আগন্তুকদের রাজনীতিসমাজনীতি এবং যাপনের রুদ্ধ দরজাকে বরদাস্ত করতে অভ্যস্ত ছিলেন নাবড়ো হয়েছেন অসমের নানা জায়গায়বাবার চাকরি সূত্রে ঈশান বাংলার করিমগঞ্জ থেকে উজান ও নিম্নাঞ্চলের শহরেমফস্বলেকিন্তু শহুরেপনামফস্বলিয়ানা কখনো তাঁর কণ্ঠকে চেপে রাখার সুযোগ পায় নি জলে ও জঙ্গলেব্রহ্মপুত্রর বাঁকে আর পাঁকে গড়ে উঠেছে তাঁর শিল্পস্বভাব। 

 
অসমের বহুভাষিকতার পরমাত্মীয়, জুবিন গর্গ তাঁর স্বনির্মাণের শর্তরূপকে, সত্যকে গ্রহণীয়, বরণীয় করতে করতে, মাঝপথে হারিয়ে গেলেন, তাঁর পূর্ণতা রূপান্তরিত, পরিপূর্ণ হবার সুযোগ পেল না। সর্বপ্রাণের [প্যানথেয়েজিম] আরেক মহান উপাসককে ছিনিয়ে নিল রহস্যময় সমুদ্র, এ রহস্যময়তার কারিগর কে? নিয়তি না আরোপিত ষড়যন্ত্র, এ প্রশ্নের জবাব জমা রইল ক্ষোভে, লাখো লাখো মানুষের ক্রুদ্ধ কান্না আর অশ্রুতে।
 
ভাবতে, বলতেও ভাল লাগছে, আমাদেরই সমকালের একজন দুরন্ত অশ্বারোহী ৪০ টি ভাষায় ৩৮ হাজার গান গেয়েছেন, অসংখ্য গান লিখেছেন, গানে সুর সংযোগ করে গেছেন, কবিতায়ও নিবেদিত তাঁর কসরত, বাদ্যশিল্পী হিসাবে তাঁর প্রকাশ, আত্মপ্রকাশ অবশ্যই সূর্যমুখী। বিহু গানে, বিহুতলীর নৃত্যেও পরমাশ্চর্য এ প্রতিভার কণ্ঠস্বরে যে আনন্দ, যে খরস্রোত বেজে উঠত, তা কালের মাত্রাকে অতিক্রম করে অনন্তের বেদনা হয়ে থাকল।

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!