- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জানুয়ারি ৫, ২০২৬
স্বাধীনতা দিবসে ‘মানবিক’ ক্ষমা মায়ানমারে, নির্বাচন বিতর্কে ‘মুখ বাঁচাতেই’ কি ৬ হাজার বন্দিকে মুক্তি দিল জুন্টা সরকার?
স্বাধীনতার ৭৮তম বর্ষপূর্তিতে মায়ানমারে অভূতপূর্ব ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করেছে সামরিক জান্তা সরকার। রবিবার, দেশটির সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইংয়ের নির্দেশে ৬,১৩৪ জন বন্দি নাগরিককে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫২ জন বিদেশি বন্দিকেও মুক্তি দিয়ে দেশছাড়া করা হবে বলে জানানো হয়েছে। জান্তার দাবি, ‘মানবিক ও সহানুভূতিশীল কারণেই’ এ ক্ষমা প্রক্রিয়া। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, সামরিক শাসনের বিরোধিতায় বন্দি হাজার হাজার রাজনৈতিক কয়েদি এ তালিকায় আদৌ রয়েছেন কি না!
মায়ানমারের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন এমআরটিভি জানিয়েছে, জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তে এ ক্ষমা কার্যকর হচ্ছে। যদিও মুক্তিপ্রাপ্তদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা এ পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। জানা গিয়েছে, হত্যা, ধর্ষণ কিংবা বিভিন্ন কঠোর নিরাপত্তা আইনে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে এ ছাড় প্রযোজ্য নয়। যাঁদের সাজা কমানো বা ক্ষমা করা হয়েছে, তাঁদের জন্য কড়া শর্তও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যেমন মুক্তির পর ফের আইনভঙ্গ করলে আগের সাজার অবশিষ্ট অংশের সঙ্গে নতুন সাজাও ভোগ করতে হবে। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত সামনে আসবার পরে, রবিবার সকাল থেকেই রেঙ্গুনের কুখ্যাত ইনসেইন কারাগারের বাইরে ভিড় জমাতে শুরু করেন বন্দিদের আত্মীয়স্বজনেরা। বেলা গড়াতেই একের পর এক বাস কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে। জানালায় মুখ বাড়িয়ে বন্দিদের কেউ কেউ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। কেউ আবার মুক্তি পেয়ে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরেছেন, কেউ কাঁদতে কাঁদতে স্ত্রীর হাতে হাত রাখছেন। ৩৫ বছরের ইয়াজার তুন বললেন, ‘এক বছরের সাজা ছিল। আট মাস কাটানোর পর আজ বাড়ি ফিরছি। পরিবারের কাছে ফিরতে পেরে খুব খুশি।’ বাইরে অপেক্ষমাণ পরিবারের চোখে তখন জল, মুখে স্বস্তি। কারো হাতে প্ল্যাকার্ড, তাতে বন্দি প্রিয়জনের নাম। উল্লেখযোগ্যভাবে মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন এক সময়ের সরকারি মন্ত্রী, জনপ্রিয় মডেল ও প্রাক্তন চিকিৎসক নাং মওয়ে সানও। ২০২২ সালে সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সংস্কৃতি ও মর্যাদা ক্ষুণ্ণ’ করার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি।
তবে এই ক্ষমা প্রক্রিয়ার সময়টাই নতুন করে বিতর্ক উসকে দিচ্ছে। এ মুহূর্তে মায়ানমারে চলছে ৩ ধাপের এক মাসব্যাপী জাতীয় নির্বাচন। যদিও জুন্টা সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আন্তর্জাতিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলি এটিকে কার্যত ‘নাটক’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থানের ৫ বছর পর এই প্রথম ভোট হলেও, বিরোধী রাজনীতির প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি প্রশ্নের মুখে ফেলেছে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে। এমআরটিভি প্রকাশিত প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, সামরিক সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) প্রথম ধাপেই নিরঙ্কুশ আধিপত্য পেয়েছে। ঘোষিত নিম্নকক্ষের আসনের প্রায় ৯০ শতাংশই জিতেছে তারা। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের নেতৃত্বাধীন এ দলকে বহু বিশ্লেষকই সামরিক বাহিনীর ‘বেসামরিক মুখোশ’ বলে মনে করেন। বিপরীতে, অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন জনপ্রিয় ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নির্বাচনের ময়দানেই নেই। দলটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, আর সু চি নিজে এখনো কারাবন্দি। জান্তার দাবি, প্রথম ধাপে ভোটার উপস্থিতি ৫২ শতাংশের বেশি। যদিও ২০২০ ও ২০১৫ সালের নির্বাচনে এ হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে, পশ্চিমা দেশ, রাষ্ট্রসংঘ এবং একাধিক মানবাধিকার সংগঠন শুরু থেকেই এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। সমালোচকদের বক্তব্য, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি না দিয়ে, বিরোধী কণ্ঠ রুদ্ধ করে কোনো নির্বাচনই গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
এ প্রেক্ষাপটেই ক্ষমা ঘোষণার দিনক্ষণের তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির আশঙ্কা, স্বাধীনতা দিবসের এই ‘উদারতা’ আসলে নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সামলানোর কৌশল। মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মায়ানমারের সামরিক সরকারকে অবিলম্বে হিংসা বন্ধ করতে হবে, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং প্রকৃত অর্থে সংলাপের পথে হাঁটতে হবে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে ছুটি বা বৌদ্ধ উৎসব উপলক্ষে হাজার হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার রীতি নতুন নয়। ২০২৪ সালের স্বাধীনতা দিবসেও ৯ হাজারের বেশি বন্দি মুক্তি পেয়েছিলেন। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, এই মুক্তির ঢেউ কি আদৌ সামরিক শাসনের ভিত আলগা করবে, না কি সবটাই থেকে যাবে ‘মানবিকতা’র মোড়কে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই?
❤ Support Us






