Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬

ঢাকার মসনদে বসছে বিএনপি, সতর্ক দিল্লি। সীমান্ত অঞ্চলে জামাত-উত্থানে বাড়ছে শঙ্কা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ঢাকার মসনদে বসছে বিএনপি, সতর্ক দিল্লি। সীমান্ত অঞ্চলে জামাত-উত্থানে বাড়ছে শঙ্কা

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ভোট গণনায় স্পষ্ট, দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে ঢাকার মসনদে বসতে চলেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি। ‘বন্ধু’ শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে না থাকায় জটিল সমীকরণের সিঁদুরে মেঘ দেখছিলেন ভারতের দুঁদে রাজনীতিবিদ আর নিরাপত্তা কর্তারা। তবে, জনাদেশে ‘ভারত বিদ্বেষী’ বলে পরিচিত ছাত্রদের এনসিপি বা ‘পাক ঘনিষ্ট’ জামাত ক্ষমতা দখল করতে না পারায়, কিছুটা স্বস্তিতে ছিল দিল্লি ।

কিন্তু ফলাফলের খুঁটিনাটিতে চোখ রাখতেই দেখা গেল, কালো এক ছায়া গাঢ় ক্রমশ হয়ে উঠেছে।  ক্ষমতা দখল করতে না পারলেও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে আসন-সংখ্যার নিরিখে নিজেদের সেরা ফল করেছে শফিকুর রহমানের জামাত। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে। সামনেই পশ্চিমবঙ্গ, অসমে নির্বাচন। এমত অবস্থায় জামাতের উত্থান কি আগামী দিনে ভারতের কূটনৈতিক অঙ্কে নতুন চাপের রেখা টানবে? ফের অস্থিরতা ছড়াবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে? এসব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে দিল্লির ঠাণ্ডাঘরে।

বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের দাবি করেছে বিএনপি। তরুণ ভোটারের ঢেউজুলাই ২০২৪-পরবর্তী অস্থিরতার স্মৃতিনারী ভোটের একাংশের পুনর্বিন্যাস— সব মিলিয়ে পাল্লা ভারী হয়েছে তাদের দিকেই। সংখ্যালঘু ভোটের বড়ো অংশ গিয়েছে বিএনপির ঝুলিতে। আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ভোটারদের একাংশযারা ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিলেনতাঁরা জামায়াতের দিকে না গিয়ে বেছে নিয়েছেন বিএনপিকেই। ফলে আন্দোলন-পরবর্তী গতি সত্ত্বেও জামায়াত বৃহত্তর জনসমর্থনে রূপ দিতে পারেনি— এটাই নির্বাচনী গণিতের সরল পাঠ। তবু রাজনীতির পাঠ কেবল সংখ্যায় থামে না। সংসদীয় উপস্থিতি মানেই আলোচনার টেবিলে আসন। আর সে আসন থেকেই নীতির সুর বদলাতে পারে— এ আশঙ্কাই ভারতীয় কূটনৈতিক মহলে উচ্চারিত হচ্ছে। বিশেষত তিস্তা জলবণ্টনসীমান্ত ব্যবস্থাপনাসন্ত্রাসদমন সহযোগিতাবিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগএই  কোণায় যে স্থিতি গড়ে উঠেছিল গত দশকেতা কতটা অবিচল থাকবেসেটাই চ্যালেঞ্জের।

তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি বহুদিন ধরেই অমীমাংসিত। নতুন সংসদে জামায়াতের কণ্ঠস্বর জোরালো হলে বিষয়টি কি জাতীয়তাবাদী আবেগে নতুন করে উসকে উঠবেরাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ‘ভারতের কাছে নতি’— এ অভিযোগ এড়াতে বিএনপির উপর চাপ বাড়তে পারে তারা। ফলে সংযোগ প্রকল্পট্রানজিট সুবিধাবন্দর-ব্যবহারবিদ্যুৎ আমদানি— সবই সংসদীয় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তবে বিএনপি শিবিরের দাবিতারা সমতা ও পারস্পরিক সম্মান’-এর ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখতে চায়। অর্থাৎ প্রকাশ্যে দূরত্বআড়ালে বাস্তববাদএমন এক দ্বৈত কূটনীতির ইঙ্গিত মিলছে কিদিল্লির এক প্রাক্তন কূটনীতিকের বলেছেন, ‘নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হবে সবচেয়ে কঠিন কাজ।’

জাতীয় ফলাফলের আড়ালে সীমান্ত-ঘেঁষা আসনগুলিতে জামায়াতের সাফল্য আলাদা করে নজর কেড়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণপশ্চিমবঙ্গ লাগোয়া জেলাগুলিতে জামায়াতের উত্থান। দক্ষিণে সাতক্ষীরাঝিনাইদহ—‘পুরনো ঘাঁটি’ থেকে উত্তরে রংপুররাজশাহীঠাকুরগাঁওচাঁপাইনবাবগঞ্জচুয়াডাঙ্গা বহু আসনে এগিয়ে বা জয়ী হয়েছে জামায়াত জোট। সীমান্ত-রাজনীতির অভিঘাত যে কেবল স্থানীয় নয়তা জানে নয়াদিল্লি। ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বড়ো অংশই নদীচরের ভাঙাগড়াগ্রামীণ জনপদে জটিল। অতীতে জেএমবি বা আনসার বাংলা টিমের মতো সংগঠনের এপার বাংলায় তৎপরতা ভারতের নিরাপত্তা মহলকে সতর্ক রেখেছে। ফলে সীমান্ত-ঘেঁষা আসনে জামায়াতের সাফল্য স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। নিরাপত্তা মহলের একাংশের আশঙ্কাড়ো আকারের হামলার নির্দেশ নয়বরং নির্বাচিত অনুপ্রবেশ’— প্রশিক্ষিত মতাদর্শীঅর্থবাহক বা ডিজিটাল সংগঠকের মতো কমসংখ্যক কিন্তু প্রভাবশালী উপাদানমন সব ঝুঁকিই বাড়তে পারে। তবে এ সবই মূল্যায়নকোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। আর কূটনৈতিক সমীকরণ একরৈখিক নয়।

বাংলাদেশে জুলাই ২০২৪-পরবর্তী অস্থিরতার রেশ এখনও কাটেনি। সংখ্যালঘুদের একাংশের মধ্যে অনিশ্চয়তার বাতাবরণ রয়েছে। ভোটার উপস্থিতির পরিসংখ্যানেও তার আভাস। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সীমান্তপারের প্রভাব ফেলতে পারেবিশেষ করে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে। অল্প সংখ্যক শরণার্থী প্রবাহও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠেদুই দেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তাই বলছে। আওয়ামী লীগ-যুগে যে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল— বিশেষত ভারতবিরোধী বিদ্রোহী নেটওয়ার্ক দমনেতার ধারাবাহিকতা কতটা থাকবেশেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও ভারতে অবস্থান ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক স্পর্শকাতরতা বাড়িয়েছে। বিএনপি যদি ভারসাম্য রক্ষার পথে হাঁটেতবে সম্পর্ক কার্যকর কিন্তু দূরত্ব-রক্ষিত’, এমন এক নতুন স্বাভাবিকতা তৈরি হতে পারে।

নরেন্দ্র মোদি থেকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের হবু ক্ষমতাসীন তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানালেও, এ কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে,  মাত্র  বছর আগে২০১৮-র নির্বাচনে দলীয় প্রতীক হারিয়ে বিএনপির ধানের শিষ’ প্রতীকে লড়েছিল জামায়াত। সে সময় খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তে ২২টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের। যে দলকে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনীতিতে দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছেতারাই এ বার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নজির গড়ল। ১৯৯১-এ সর্বাধিক ১৮টি আসন ছিল তাদের ঝুলিতে। এ বার সেই সংখ্যা অনেকাংশ  বেড়েছে, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে যা এক ঐতিহাসিক মোড়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতেআওয়ামী লীগ নির্বাচনী ময়দানে না থাকায় বিরোধী ভোটের একাংশ বিকল্প খুঁজেছে। সেই শূন্যতায় জায়গা করে নিয়েছে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট। আবার এটাও সত্যগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রবণতা বেড়েছেযার প্রতিফলন পড়েছে ব্যালটে।

প্রসঙ্গত, ১৯৪১-এ প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলইতিহাসের সে অধ্যায় এখনও বাঙালি জনমনে দাগ কেটে আছে। পরবর্তী সময়ে নিষেধাজ্ঞাট্রাইব্যুনালনিবন্ধন বাতিল— সব মিলিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই। ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে দলটি ফের মূলস্রোতে ফেরে। প্রকাশ্য ভাষণে শারিয়াহ প্রসঙ্গে সংযমপ্রথম হিন্দু প্রার্থীভাবমূর্তি নরম করার প্রচেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু অতীতের স্মৃতি ভোটারদের মনে রয়ে গেছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অভিঘাতে শেখ হাসিনার ইস্তফা ও ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াত নিষেধাজ্ঞা-পর্ব থেকে বেরিয়ে আসে। ধীরে ধীরে সংগঠন শক্তি বাড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতিতে তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির একাধিক জায়গায় জয়ী হয়। যুবসমাজের একাংশ যে তাদের দিকে ঝুঁকেছেজনমত সমীক্ষায় তার ইঙ্গিত মিলেছিল। রাজনৈতিক কৌশলে বদল এনেছে দলটি। রায়েরবাজার গণহত্যা স্মৃতিসৌধে গিয়ে ১৯৭১-এর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনসংখ্যালঘুদের প্রতি ইতিবাচক বার্তাখুলনা-৩ আসনে হিন্দু প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীকে মনোনয়ন— সবই ভাবমূর্তি পাল্টানোর প্রচেষ্টা। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে২২৩টি আসনে লড়েও এক জন নারী প্রার্থী না দেওয়া কি নতুন ভাবমূর্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় যেখানে নারীর সংখ্যা অর্ধেকের বেশিসেখানে এ অনুপস্থিতি গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সমীকরণও বদলাচ্ছে। ফল ঘোষণার পরেই চিন তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছে। ঢাকায় চিনা দূতাবাস বার্তায় জানিয়েছেদুদেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় লিখবে। শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে ঢাকার কূটনৈতিক অক্ষ যে প্রসারিত হয়েছে বেজিং ও ইসলামাবাদের দিকেতা গোপন নয়। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রংপুরের লালমনিরহাট জেলায় চিনের সহায়তায় সম্ভাব্য বায়ুসেনা ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে জল্পনা ছড়ায়। ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের সেই এলাকা স্বাভাবিক ভাবেই কৌশলগত দৃষ্টিতে সংবেদনশীল। এ প্রেক্ষাপটে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের নাম। উত্তর-পূর্ব ভারতের  রাজ্যকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা এই সরু স্থলভাগ সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গায় প্রায় ২০ কিলোমিটার চওড়া। নেপালভুটান ও বাংলাদেশের সীমানা ঘেঁষা এই করিডর ভারতের নিরাপত্তা-মানচিত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে জঙ্গি অনুপ্রবেশঅস্ত্র ও মাদক পাচারের রুট হিসেবে এ অঞ্চলকে লাগাতার ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতেযুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ করিডরকে নিশানা করা হলে উত্তর-পূর্ব বিচ্ছিন্ন হয়ে  পড়তে পারে। ফলে ঢাকা-বেজিং ঘনিষ্ঠতার যে কোনো ইঙ্গিতই দিল্লির কপালে ভাঁজ ফেলে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভোটের বার্তা দ্বিমুখী। কট্টরপন্থাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে তুলনামূলক উদার বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন বাংলাদেশের আমজনতা— এমন ব্যাখ্যা যেমন আছেতেমনই আছে অন্য যুক্তিও। আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় জামায়াতের বিকল্প জায়গা তৈরি হয়েছে। নয়াদিল্লি তাই স্বস্তি ও সতর্কতা; দুটি পন্থাই সমানভাবে চালাচ্ছে। বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকার কি ভারত-সম্পর্ক মেরামতে অগ্রাধিকার দেবেনা কি সংসদের ভেতর বাড়তে থাকা ইসলামপন্থী কণ্ঠস্বর নীতিকে অন্য দিকে টানবে, এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আগামী দিনের রাজনীতিতে। সময়ই বলবেশফিকুরদের উত্থান কেবল বিরোধী আসনের শক্তিনাকি দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে এক নতুন রাজনীতির সূচনা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!