Advertisement
  • গ | ল্প
  • ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৬

একটি মজার গোল-পো

পর্ণা চক্রবর্তী
একটি মজার গোল-পো

চিত্রকর্ম : দেব সরকার

দর্জিপাড়া বয়েজ ক্লাবের সেক্রেটারি সুখেন সাহা ক্লাবের অফিস ঘরে বসে বসে মুন্ডুপাত করছিলেন  সিমলা স্ট্রীট ইউথ ক্লাবের সেক্রেটারি সাধন দত্তর।

কদিন বাদে কলকাতার উত্তর জুড়ে পাড়ার ক্লাবগুলির ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হবে।  সে জন্য চারপাশে আবহাওয়া গরম হচ্ছে এমন, যে মাঘমাসেও  লোকজনের কপালে দানা দানা ঘাম জমছে । হালকা করে পাখাও চলছে। সব কটা ক্লাবই  ফাটাফাটি খেলে। কিন্তু আসল হাড্ডাহাড্ডি টা দর্জিপাড়া বনাম সিমলে স্ট্রিটের। গত বছর সিমলে দর্জিপাড়াকে চার গোলে হারিয়েছিল। সেই শোকে সুখেন সাহার একমাসে চার কেজি ওজন কমে গেল। চার মাস মৌন ছিলেন আর চার সংখ্যাটা দেখলেই চারপাশ ওঁর ছারখার করে ফেলতে ইচ্ছে করত। এখন সেটা আরো বেড়েছে কারণ সিমলের দল দর্জিপাড়ার আসে পাশে বড়ো, বড়ো পোস্টার আর ব্যানার লাগিয়েছে, তাতে লেখা,

এবারও  দেবো…
চার আরো চার
মোট তবে আট
সুখের দি এন(n)ড হলে
চড়বে  তুমি বলহরি খাট ।

এই ছড়াটা পড়ার পর থেকে সুখেন বাবু খ্যাপা ষাঁড়ের মতো হয়ে আছেন। যাকে দেখছেন তেড়ে যাচ্ছেন।

প্লেয়ারদের হাল তো কহতব্য নয়। তাদের সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত খালি প্র্যাকটিস করতে হচ্ছে। দিনে আড্ডা নেই, রাতে মোবাইল নেই, কলেজ যেতে পারছে না বলে প্রেম জমছে না গবার চপ বন্ধ, কোষে কষা থেকে মাংস বন্ধ। খাওয়া, দাওয়া সব সুখেন সাহার কন্ট্রোলে। রোজ মুঠো খানেক কাঠ বাদাম,  গোটা ছয়েক ডিম, বাটি ভর্তি মুরগির স্টু, গেলাস গেলাস দুধ ইত্যাদির সাথে রোজ  শীতল ডাক্তারের ইস্পেশাল পাঁচনও খেতে হচ্ছে।  যা খেলে গায়ে দশটা ষাঁড়ের জোর হবে আর সিমলেকে গুঁতো মেরে উড়িয়ে দেবে সুখেন সাহার একটাই কথা,” গোল চাই গোল। ওরা গতবার চারটে বেশি দিয়েছিল, তোরা খান ছয়েক দিলেই হবে। আর যদি দিতে পারিস তবে তোদের কে আমি… “। সে বেজায় লম্বা লিস্ট। এইসব শুনে কেউ কেউ দারুন উৎসাহ পাচ্ছে, হেব্বি প্যাকটিস করছে। রাতের বেলায় তাদের পাশে কেউ শুচ্ছে নাকো। কারণ ঘুমের মধ্যেই  এমন প্যাকটিস করছে , এমন গোল দিচ্ছে যে রোনাল্ডো আর  এমবাপের দল বাপ বাপ বলে উঠবে। ফরোয়ার্ডে খেলে যথাক্রমে লম্বা মানকে আর বেঁটে মেসির বাবা আর ছোট কাকা কিছুদিন হলো নাকি সোজা হয়ে বসতেই পারছে না। কারণ ঘুমের মধ্যে মানকে আর মেসি  সাংঘাতিক খেলছিল। খেলতে খেলতে ফাটিয়ে গোলও দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পাশে শুয়ে থাকা মানকের বাবা ঘরের কোণে রাখা ট্রাঙ্কের ওপর আর মেসির কাকা নাকি সোজা দরজা দিয়ে বেরিয়ে বারান্দায় রাখা লোহার বালতির ওপর সগৌরবে অধিষ্ঠান করছিলেন। সেই থেকে তাদের দেহের পশ্চাতের বর্তুলকার অংশ দুটি বেড়ে দেড়া সাইজ হয়ে গেছে  আর কোমর টা গিয়ে দুজনেই এমন বাঁকা বিহারীর অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন যে বসতে  কিংবা প্রাতঃকৃত করতে তাদেরকে বেজায় বেগ পেতে হচ্ছে।  সেই জন্য মাঝরাতে আসেপাশের লোকজন  নাকি বিকট “গোওওল” চিৎকারের সাথে “ওরে বাবারে, মারের” একটা মিক্স আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছিল। সেই অবধি দর্জিপাড়ার সব খেলুড়ের ঘুমের সময় আশপাশ পুরো ফাঁকা থাকছে।

সিমলে স্ট্রীট কিন্তু পুরো কুল। সাধন দত্তের কোনো চাপ নেই। এরা সব হলো গিয়ে এ কেলাস প্লেয়ার। এক একজন বেকহাম ,এনবাপের মারাত্মক কম্বিনেশন। নেশনের পেস্টিজ ওদেরই হাতে।

মাথাচাঁছা হারিচাঁচা টাইপ বিশে, যার মাথার ওপরে ঝুটিটা সবুজ রঙের,  সেই বিশে ঝুঁটি নাড়িয়ে অদৃশ্য বল ড্রিবল করতে করতে বলল,” কিচ্চু ভাববেন না শাধন দা। আপনার শাধনা আর ধন  বিফলে যেতে দেয় কোন শা…। এবার শিল্ড আমরাই জিতব, ওই আট গোলেই ধরে রাখুন।”  সাধন দত্তের গা জ্বলে গেল নামের উশচারণ শুনে। কিন্তু  ছোকরা খেলে ভালো। এখনই বড় বড় দলগুলো থেকে খেলার ডাক আসছে, তাই চেপে গেলেন। গোলের কথা ভুলে বিশের সবুজ ঝুঁটি দেখতে লাগলেন। সাথে  গপু মারাদোনা, গোলবাজ শ্যামল যে নাকি গোলের সাথে গুলও দেয়  এবং বাকিরা সব  সমস্বরে বলতে লাগল  “খেলা হবে, খেলা হবে।”

বৈঠকখানায় কেত মেরে সাধন দত্ত গড়গড়ায় তামাক খাচ্চিলেন। সুখেন সাহার প্রস্তাব শুনে নলটা মুখ থেকে নামিয়ে খানিক ঠান্ডা চোখে সুখেনকে দেখলেন তারপর পুরো ‘ছবি বিশ্বাস’ হয়ে বলে উঠলেন  “বাঙালদের সাথে আমরা কাজ করিনা। ”  সুখেনবাবু বললেন,” না না কাজ না, বিয়ে,বিয়ে।” ছবি বিশ্বাস একবার কটমট করে  তাকালো তারপর  বিরাট একটা  হুঁ বলে অন্দর মহলে চলে গেল। না চা, না তামুক, না বসতে বলা

আসল খেলাটা চলছিল তলে তলে। খেলছিল সাধন দত্তের মেয়ে বুঁচি ওরফে কমলিকা আর সুখেন সাহার ছেলে বাঁটলো ওরফে  নীলধ্বজ। খেলাচ্ছিলেন যিনি,  তিনি একাধারে কোচ, রেফারি সব। সেই আদি অদ্বিতীয় নাটেরগুরু রাধামাধব। তবে সবটাই বেশ গোপনে ছিল। গন্ডগোল করল বুঁচি। তার বাপ সাধন দত্ত কলেজের পড়া শেষ হতে না হতেই, অনেক হয়েছে, আর পড়তে হবে না বলে পাত্র দেখা শুরু করল। বুঁচি জানে তার বাপকে । সে সোজা সুখেন সাহার কাছে কাকুউ… বলে  তুমুল কেঁদে পড়লো।  সুখেন সাহার তিন ছেলে, নীল ছোট।  সে পড়াশোনায় বেশ ভালো । সরকারি কলেজে লেকচারারের চাকরিটা পেয়ে গেছে। সুখেন এমনিতে লোক ভালো। ওপার বাংলা থেকে আসার পর অনেক কষ্ট করে জীবনে প্রতিষ্ঠত হয়েছেন। গেঞ্জির কারখানা কাপড়ের ব্যবসা ইত্যাদি নানা কিছু করে ভালো পয়সাও করেছেন।

বুঁচির কান্না আর বাঁটলোর দেবদাস ভাব সুখেনবাবুর কোমল হৃদয় বেজায় নাড়া দিল। সে নাড়ার তাড়া খেয়ে সুখেন সাহা, ফুটবল,  চারগোলে হেরে যাওয়া সব ভুলে  একদিন সোজা  সাধন দত্তের বাড়ি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে চলে গেল। সাধন দত্তদের বহুবছরের সোনার ব্যবসা।  শহরে, অন্য জেলায়ও তাদের বড়ো বড়ো দোকান। তারা কলকাতার পুরোনো বড়লোক। বৈঠকখানায় কেত মেরে সাধন দত্ত গড়গড়ায় তামাক খাচ্চিলেন। সুখেন সাহার প্রস্তাব শুনে নলটা মুখ থেকে নামিয়ে খানিক ঠান্ডা চোখে সুখেনকে দেখলেন তারপর পুরো ‘ছবি বিশ্বাস’ হয়ে বলে উঠলেন  “বাঙালদের সাথে আমরা কাজ করিনা। ”  সুখেনবাবু বললেন,” না না কাজ না, বিয়ে,বিয়ে।” ছবি বিশ্বাস একবার কটমট করে  তাকালো তারপর  বিরাট একটা  হুঁ বলে অন্দর মহলে চলে গেল। না চা, না তামুক, না বসতে বলা। সুখেন সাহার অপমানের একশেষ। সাধন দত্তের একটা চামচা বসেছিল, সে সুখেনকে বলল, “ঘটিরা বাঙ্গালদের সাথে বিয়ে দেয় নাকো। তাছাড়া এরা সব বনেদী লোক আপনি অন্য পাত্তর দেখুন গে। আর আমাদের বুঁচি দিদি কি, যে সে মেয়ে ? যে বাড়িতে যাবে এক্কেবারে সতী লক্ষী বউ হয়ে সংসার আলো করে রাকবে।”  সুখেন সাহা দাঁত কিড়মিড় আর চোখদুটোকে ভাঁটার মতো করে লোকটার দিকে তেড়ে গিয়ে বললেন “আমার ছেলেও যে বাড়ি যাবে সত্যনারায়ণ হয়ে পুরো ফ্যামিলিতে  হ্যাজাক জ্বালাবে।” চামচেটা ইয়ের মতো করে সুখেন সাহাকে দেখতে লাগল। অপমানে, রাগে, দুঃখে বাড়ি ফিরে সুখেন সাহা  দুটো প্রতিজ্ঞা করলেন। এক,  দর্জিপাড়া এবার যে ভাবেই হোক সিমলে স্ট্রীটকে হারাবে দুই, বুঁচি আর বাঁটলোর বিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উনি দিয়েই ছাড়বেন।

এই ঘটনার পর সাধন দত্ত গিন্নীকে মেয়ের ওপর কড়া নজর রাখার ফরমান জারি করলেন আর টুর্নামেন্টটা শেষ হলেই বুঁচির বিয়ে দেবেন বলে ঘোষণা করলেন। সেই মত পারিবারিক ঘটক শেখর করকে বলে দেওয়া হলো। ওসব ম্যাট্রিমনিতে দত্তজার বিশেষ ভক্তি নাই। দত্ত গিন্নীর কিন্তু বেশ পছন্দ নীলধ্বজকে। তাছাড়া আজকালকার মেয়ে, বেশি জোর করলে  বিপদ হতে পারে, তাই তলে তলে তিনি মেয়ের পক্ষেই থাকলেন।

টুর্নামেন্ট শুরু হলো। খেলা নয় তো যেন যুদ্ধ। আজ এপাড়ার সাথে ও পাড়ার কাল সে পাড়ার সাথে আরেক পাড়ার সমর্থকদের হাতাহাতি মারামারি হতে লাগল। সেকি উত্তেজনা।  সুখেন সাহা রোজ কল্পনায় নিয়ম করে সাধন দত্তের  সারে তিনমণের নিতম্বটিকে ফুটবল মনে করে এবেলা অবেলা লাথি মারতে লাগলেন আর গোল বলে চিৎকার করতে লাগলেন। এই কল্পনা ওকে বাড়তি এনার্জি দিতে লাগল। সেই এনার্জি ঘুমের মধ্যেও এত প্রবল হলো যে ওনার গিন্নী আজকাল বাধ্য হয়ে অন্য ঘরে শুচ্ছেন।

কোয়ার্টার ফাইন্যালে ঝামা পুকুর ক্লাব হেব্বি খেলেছিল। কিন্তু সেমি ফাইন্যালে ফুটে গেল। গোয়াবাগান বাগবাজার কেউ কম যায় না। গোলের ছড়াছড়ি। সিমলেস্ট্রীট তো পুরো বাঘের বাচ্চা। সিমলে আর দর্জিপাড়া যেদিন দুটো দলই সেমি ফাইন্যালে উঠল সে দিন দুটো পাড়াতেই প্রচুর বাজি ফাটল। দর্জি পাড়া ব্যান্ডপার্টি আনবে ভেবেছিল কিন্তু সুখেন সাহা  রাজি হলেন না।  হিসেব করে দেখতে গেলে সিমলে স্ট্রীট গোল করেছে দর্জিপাড়ার থেকে বেশি আর খেয়েছে কম।  ওঁর  অভিজ্ঞ মন বুঝতে পারল সিমলের প্লেয়ারগুলো সত্যি খেলে ভালো। বিশেষ করে ওদের স্ট্রাটেজি, মাঠে খেলার সময় পারস্পরিক বোঝাপড়া ওঁর টিমের থেকে অনেক ভালো। ফাইন্যালে যদি দুই দল মুখোমুখি হয় তবে সিমলেকে হারাতে দর্জিপাড়ার বেগ পেতে হবে। হার ? সুখেন সাহা যদি আবার হেরে যান সেটা ভাবতেই ওর প্রেসার স্যাট করে ওপরে উঠে গেল আর নীচে নামলই না। সে ভয়ানক লজ্জা  সুখেনের রাতের  ঘুম কেড়ে নিল। শেষে মোক্ষম একটা উপায় বের করলেন। বাঁটলো আর বুঁচিকে বললেন প্রস্তুত থাকতে। যে কোনো মুহূর্তে তাদের শত্রুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হতে পারে। এসব নাটকীয়  ডায়ালগ শুনে দুজন বেজায়  ঘাবড়ে গেল। বুঁচি বলল, “তোমার বাবা পাগল হয়ে গেল নাকি ?  আমি মাঠে নামবে ফুটবল খেলতে ?” বাঁটলো বলল, আর আমি তো জীবনে ফুটবল ছুঁয়েই দেখিনি। বুঁচির স্বপ্নে হাফপ্যান্ট পড়া বুঁচি গামছা পড়া সাধন দত্তের সাথে রোজ ফুটবল খেলতে লাগল আর কোথা থেকে  লুঙ্গি পরা  সুখেন সাহা সেখানে আবির্ভুত হয়ে একটা করে  গোল দিতে লাগল আর লুঙ্গি ড্যান্স লুঙ্গি ড্যান্স বলে বিকট নাচতে লাগল।

চারপাশ একেবারে ঘেঁটে ঘ হয়ে গেল বুঁচির। পাড়ার কাগজগুলো  দর্জি পাড়ার পাশাপাশি  সিমলে স্ট্রিটের প্রশংসাটা একটু বেশি  করতে লাগল। শেষে  বাগবাজার আর হাতিবাগান স্পোর্টিংকে হারিয়ে ফাইন্যালে মুখোমুখি হলো  দর্জিপাড়া আর সিমলে স্ট্রিট।

ফাইনালের দিন দেখা গেল সকাল থেকে সুখেন সাহার পেট কামড়াচ্ছে আর থেকে থেকে তিনি মুক্তকচ্ছ হয়ে দৌড়াচ্ছেন। হাতের জল শুকচ্চে না গোছের। খেলার পনের মিনিটের মাথায় দর্জিপাড়া প্রথম গোলটা দিল। সুখেনের পেট কামড়ানো বন্ধ হলো। তিনি ভাবলেন বাড়ি তবে আর যাবেন না।  কিন্তু হাফ টাইমের আগে অনেকগুলো  গোল হয়ে হলো। দর্জিপাড়া চার গোল আর সিমলে পাঁচ গোল দিয়ে এক গোলে এগিয়ে রইল  দর্জি পাড়ার থেকে।সুখেনের পেট  আবার মোচড় মারতে থাকল। দলের ছেলেদের ডেকে বললেন “চেপে খেল। আর গোল দিতে দিবি না। ” ক্যাপ্টেনকে বললেন  “দেখিস  গোলের ব্যবধান এই একই যেন থাকে।” ক্যাপ্টেন পাবলো চালাক ছেলে। বুঝতেই পারল  সিমলেকে হারানো মুশকিল সুতরাং হারলেও বেশি গোলে তাদের হারলে চলবে না। খেলা যেই শুরু হলো সুখেন আর পারল না বাড়ির দিকে দৌড়োলো। খানিকপর বুঁচিও তার বাড়ি থেকে সকলের চোখ এড়িয়ে একটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বেড়িয়ে গেল। দত্তগিন্নী বললেন,” দুগ্গা দুগ্গা।” সাধন দত্ত তখন মাঠে বসে গলা ফাটিয়ে হাসছেন, চিৎকার করছেন। তিনি কিছুই জানলেন না।

হাফ টাইমের পর ভয়ংকর খেলা শুরু হলো। দর্জিপাড়া পাঁচ গোল দিলে ওদের হলো ছয়। দশ মিনিট পর দর্জি পাড়া সাত, ওরা নয়। ব্যাস দর্জিপাড়া এবার  ছকটা বদলালো। এমন ভাবে ডিফেন্সটা সাজালো যে  সিমলে অনেক চেষ্টা করেও নয় গোলের আর বেশি দিতে পারল না। তার জন্য ওদের গোলকিপার সুভাষের কৃতিত্ব অনেকটাই  ছিল। সে দারুণ দক্ষতায়  আরো দুটো গোল খাওয়ার থেকে দলকে বাঁচালো। খেলা শেষ, বাজি ফাটছে, ড্রাম বাজছে। সিমলে স্ট্রিটের ছেলে বুড়ো রাস্তায় নেমে নাচতে শুরু করল। আবির উড়ছে বাঁশি বাজছে। বিরাট শোভাযাত্রা বেরোলো, তার সামনেই হাত জোড় করে সাধন দত্ত। যদিও এই জেতাটা তার মনমতো হয়নি। মোটে দুই গোল ? কথা ছিল আটখানা গোলের। হাসি মুখে সাধন দত্ত শোভা যাত্রায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলেন  বিশের সবুজ ঝুঁটিটা আগে কাটবেন না  ঝুঁটি  শুদ্ধ মুন্ডুটা।  “শাধন দা  আট গোলই দেব,  বলা  দেকাচ্চি…”

বাড়ি ফিরে সন্ধ্যে বেলা আমচা চামচা আর ক্লাবের লোকজনদের নিয়ে জমিয়ে বসেছেন সাধন দত্ত। ভালোই খানাপিনা চলছে। বিশেও একটু দূরে দূরেই থাকছে।  আস্তে আস্তে  মন ভালো  হচ্ছে সাধনের।

“শালা বাঙাল ,বলে কিনা আমার মেয়ের সাথে ছেলের বে দেবে…সাধন দত্তকে চেনে না।” নেশাটা বেশ জমছে … তাই শুনে চামচেগুলো বলতে লাগল” কি আসপদ্দা,  কি আসপদ্দা !! ভাবা যায় বলে কিনা বে দেবে ?”  তখনই গলির মোড়ে ধাঁই ধাঁই বাজনা বেজে উঠল সাথে বাঁশি। কারা যেন সুর করে বলতে লাগল..

চার চারে আট ?
তুমি কেহে লাটের বাট ?
আহা বেচারা বাপধন
দশ গোল দিয়ে তোকে
করেছি নির্ধন।
এখন শুধু কাঁদন কাঁদন।

শেষের লাইনটা কীর্তনের সুরে গাইতে লাগল কারা সব, তার সাথে কাঁসর ঘন্টা সহযোগে উলুধ্বনিও শোনা গেল। সাধন দত্ত একলাফ মেরে উঠে  চক্ষুদ্বয় পানতুয়ার মতো করে ভেতরে মহলে  ঢুকে হাঁক মারলেন ” বুঁচি …”

বাড়ির পুরোনো ঝি মানদা  চি চি করে বলল, “কেউ বাড়ি নেই কো”। হট্টগোল ততক্ষনে সাধন দত্তের বৈঠক খানায় ঢুকে পড়েছে।  হতভম্ব সাধনের সামনে এসে দাঁড়াল সুখেন সাহা ধুতি পাঞ্জাবি পড়ে । দাঁত খিঁচিয়ে হেসে তিনি বললেন, “আসুন বেয়াই মশাই  কোলাকুলি করি।” সাধন দত্ত ভিরমি খাবেন কিনা ভাবতে ভাবতে এক গা গয়না পরে বেনারসি আর ফুলের মালায় সজ্জিতা বুঁচি এসে  “বাবা”  বলে পেন্নাম ঠুকল। সাধন দত্ত অবাক হয়ে দেখলেন মেয়েটার  সীমন্তের সিঁদুর ওর সারামুখে লাল আভা মাখিয়ে রেখেছে। বরের পোশাকে যে প্রিয়দর্শন যুবকটি তার পা দুটো ছুঁয়ে প্রণাম করল, তিনি খাবি খেয়ে দেখলেন সে সুখেন দত্তর ছেলে নীলধ্বজ। সারা ঘর চুপ, শান্ত । সাধন দত্ত  খুব জোরে চিৎকার করতে গিয়ে হঠাৎ আবিষ্কার করলেন  তাঁর কন্যাটিকে  কনের সাজে  বড় সুন্দর লাগছে। অদ্ভুত ভাবে  তেত্রিশ বছর আগে আরেক সলজ্জ নববধূর মুখ তাঁর মনে পড়ল, যে এখন তার পাশে দাঁড়িয়ে কাতর মুখে তাঁরই দিকে চেয়ে আছে। তিনি  বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলেন ,তাকিয়ে রইলেন আগামী ভবিষ্যতের দিকে। তাঁর চোখে জল এলো।

তারপর  যা হলো, তা হলো।  খানপিনা ,আতস বাজি, হৈচৈ, দর্জিপাড়া আর সিমলে স্ট্রীটের একসাথে গলা জড়িয়ে  টালমাটাল নাচ সব হলো।  খেলাও রইল তবে  ফুটবল ছেড়ে দুই বেয়াই এখন দাবার দিকে বেশি ঝুঁকেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।

♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!