Advertisement
  • বি। দে । শ বৈষয়িক
  • মার্চ ৯, ২০২৬

ইরান যুদ্ধের কবলে বিশ্ব-অর্থনীতি, ১০০ ডলার ছাড়াল জ্বালানি তেলের দাম। কপালে ভাঁজ দিল্লির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইরান যুদ্ধের কবলে বিশ্ব-অর্থনীতি, ১০০ ডলার ছাড়াল জ্বালানি তেলের দাম। কপালে ভাঁজ দিল্লির

ইরান বনাম আমেরিকা-ইজরায়েল সংঘাতে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ভয়াবহতা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। ইরান হামলা চালিয়ে গাচ্ছে আমেরিকা সহযোগী দেশগুলোর তেল সংশোধন অঞ্চলে, পাল্টা ইজরায়েল হামলা চালিয়েছে ইরানের অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগারে। ফলে, নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমানা ছাড়িয়ে তার সরাসরি অভিঘাত পড়ছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম একধাক্কায় ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে, ২০২২ সালের পর যা সর্বোচ্চ। পরিস্থিতির জেরে ভারতের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ দেশের মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৮ শতাংশই আমদানিনির্ভর।  

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালী স্তব্ধ। তেলবাহী জাহাজগুলোকে ওই পথ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইরান। কয়েকটি জাহাজে হামলাও করেছে। ফলে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানবীমা কোম্পানি এবং জাহাজ মালিকরা এই উচ্চ ঝুঁকির পরিস্থিতিতে সেখানে যেতে নারাজ। ইরান সংলগ্ন এই সরু জলপথটি বিশ্বের মোট তরল পেট্রোলিয়াম ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের বড়ো অংশ বহন করে। প্রতিদিন প্রায় ১৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। যদিও উপসাগরীয় দেশগুলো কিছু পাইপলাইন তৈরি করেছে যাতে এই পথ এড়ানো যায়কিন্তু সে ক্ষমতা সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতেপ্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় ৯ শতাংশ অর্থাৎ ৯ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন কম পাওয়া যাবে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকপ্রতিদিন প্রায় ২.৫২.৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আনা হয়েছে এ পথ দিয়েই। মূলত ইরাক, সৌদি আরব, ইউএই, কুয়েত থেকেই জোগান আসে। যেহেতু এই মুহূর্তে তেল ট্যাঙ্কারগুলো হরমুজ দিয়ে যেতে পারছে নাতাই কিছু অঞ্চলে তেলের মজুত বেড়ে যাচ্ছে। স্টোরেজ সংকটের কারণে বড়ো বড়ো তেল উৎপাদকরা উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ইতিমধ্যে ইরাক ও কুয়েত উৎপাদন কমানো শুরু করেছেএবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবও শিগগিরই একই পথে হাঁটতে পারে। সূত্রের খবর, তেল বাজারের এই অনিশ্চয়তা মেটাতে বৃহস্পতিবার বৈঠকে বসতে চলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের  তেল ও গ্যাস সরবরাহ সমন্বয়কারী গোষ্ঠীগুলি। সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুখপাত্র জানিয়েছেনসম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলার কৌশল নিয়েই ওই বৈঠকে আলোচনা হবে। ইউনিয়নের নিয়ম অনুযায়ী সদস্য দেশগুলিকে অন্তত ৯০ দিনের ব্যবহারের সমপরিমাণ তেল মজুত রাখতে হয়যা জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আয়াতোল্লাহ খামেনিই-এর পুত্র মুজতবা খামেনেই। এই নিয়োগে ইরানের নেতৃত্বে ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতেইরানের রাজনৈতিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশিযা পশ্চিমি শক্তির সঙ্গে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।

তেলের দামের এ উল্লম্ফনের প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও। এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজারে সোমবার ধস নেমেছে। ভারতে নিফটি-৫০ এবং সেনসেক্স প্রাথমিক লেনদেনেই প্রায় তিন শতাংশ পর্যন্ত পড়ে গিয়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্যও সর্বকালের নিম্নস্থানে রয়েছে। ফলে, ভারতে যে পরোক্ষভাবে যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে, তা মানছেন অনেকেই।  অর্থনীতিবিদদের মতেআন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল এক ডলার বাড়লে ভারতের আমদানি খরচ বছরে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।  সবচেয়ে বড়ো উদ্বেগের কারণ ভারতের মোট তেল আমদানির বেশিরভাগই আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে।

তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই সক্রিয় হয়েছে দিল্লি। সরকারি সূত্রে জানা গেছেভারতীয় রিফাইনারি সংস্থাগুলো এখন হরমুজ প্রণালী বাদ দিয়ে অন্য অঞ্চল থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে তেলের জাহাজ ইতিমধ্যেই রওনা দিয়েছে। পাশাপাশি বৃহৎ তেল ব্যবসায়ী সংস্থা, যেমন ভিটল, ত্রাফিগুরা, এডিএনওসি ট্রেডিং সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে। রাশিয়ার থেকে তেল কেনার ব্যাপারে, ভারতকে ৩০ দিনের বিশেষ ছাড়পত্রও দিয়েছেন ট্রাম্প। কেন্দ্রের দাবিদেশে বর্তমানে প্রায়  থেকে ৮ সপ্তাহের অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির মজুত রয়েছে। নতুন চালান আসতে থাকায় এই মজুত নিয়মিত নবীকরণও করা হচ্ছে।

অন্যদিকে রান্নার গ্যাসে ৬০ টাকা দাম বৃদ্ধিতে দেশজুড়ে চলা ক্ষোভের মুখে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপও নিয়েছে কেন্দ্র। ভারতের মোট এলপিজি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই হরমুজ প্রণালী দিয়ে আসে। তাই অত্যাবশ্যক পণ্য আইন১৯৫৫’-এর আওতায় রিফাইনারিগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ এলপিজি উৎপাদন করতে, যেগুলি শুধুমাত্র গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হবে বলে জানা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতেএই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের অর্থনীতিতে একাধিক চাপ তৈরি হতে পারে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে, আরঅ দুর্বল হতে পারে রুপিআর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, বাড়তে পারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। কৃষিশিল্প এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে স্থায়ী ছাপ পড়তে পারে। তবে, মোদি সরকারের দাবিআপাতত দেশের জ্বালানি সরবরাহে কোনো তাৎক্ষণিক সংকট নেই। পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আপাতত পেট্রোল ও ডিজেলের খুচরা দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা করেনি বলেই জানা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কী দিকে মোড় নেয়তার উপরই এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে। তবে আপাতত এটুকু পরিষ্কারযুদ্ধের আগুন পশ্চিম এশিয়ায় জ্বললেও তার উত্তাপ পৌঁছে গিয়েছে বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি কোনে। ভারত-সহ এশিয়ার বহু দেশের অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলির মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তেলের সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন এবং দামের লাগামছাড়া উত্থানের আশঙ্কায় একের পর এক দেশ জরুরি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। কোথাও কৌশলগত তেল মজুত খোলার প্রস্তুতিকোথাও আবার জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি হস্তক্ষেপসংকট মোকাবিলায় নানা পদক্ষেপের পথে হাঁটছে বিভিন্ন রাষ্ট্র।

পশ্চিম এশিয়া থেকে প্রায় ৭০ শতাংশ তেল আমদানি করা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেনপ্রায় তিন দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো জ্বালানির দামে সীমা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি নাগরিকদের আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত না করার জন্য সতর্ক করেছেন। অন্যদিকে, জাপান সরকার জাতীয় তেল মজুত কেন্দ্রগুলিকে সম্ভাব্য কাঁচা তেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে। কৌশলগত তেল সংরক্ষণাগারও প্রস্তুত করছে তারা। ভিয়েতনাম জ্বালানির উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ৯৫% শক্তি আমদানি নির্ভর।  বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বিএনপি সরকার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা করেছে। ২৫ মার্চের ‘কালো দিবস’-এ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। তেল-গ্যাসের কালোবাজারি রুখতে প্রশাসনকে কঠোর হবার নির্দেশ দিয়েছে ঢাকা। এই অস্থিরতার ঢেউ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছে আফ্রিকাতেও। বহু দেশে জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধিমুদ্রাস্ফীতি এবং মুদ্রার উপর চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চিন তাদের তেল শোধনাগারগুলিকে জ্বালানি রফতানি স্থগিত রাখতে এবং নির্ধারিত চালান বাতিল করার চেষ্টা করতে নির্দেশ দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সোমবার দেশটির অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেট্রোলের দাম বৃদ্ধিকে বড়ো সমস্যা হিসেবে দেখাতে চাননি। শুক্রবারযুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সিনেটের নেতারা কৌশলগত তেল ভান্ডার থেকে তেল বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। রবিবার রাতে সামাজিক মাধ্যমে  ট্রাম্প লিখেছেনইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল হয়ে গেলে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে এবং স্বল্পমেয়াদি এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য সামান্য মূল্য’ মাত্র।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!