Advertisement
  • খাস-কলম
  • মার্চ ১৪, ২০২৬

যুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থা ও ভারতের বিদেশনীতি

হিলাল উদ্দিন লস্কর
যুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থা ও ভারতের বিদেশনীতি

সময়ের বিবর্তনে যুদ্ধের রণকৌশল আমূল বদলে যায়। পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংঘাত বিশ্ববাসীকে সে কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে। এই সংঘর্ষ একটি রূঢ় সত্য প্রমাণ করেছে: ক্ষমতার কোনো কেন্দ্রই আজ আর নিরঙ্কুশ নয়। শক্তির চরম অসমতা সত্ত্বেও ইরান যেভাবে প্রতিকূলতা জয় করে টিকে আছে, তা সমর-বিশেষজ্ঞদের সকল গাণিতিক হিসাব উল্টে দিয়েছে। আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত আমেরিকা ও ইজরায়েলের সম্মিলিত শক্তিকে ইরান যেভাবে ভিন্নধর্মী কৌশলে পর্যুদস্ত করেছে, তাতে এ যুদ্ধের শেষ পরিণতি পশ্চিমা শক্তির অনুকূলে যাবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। এমন এক সন্ধিক্ষণে ভারতের বিদেশনীতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে তীব্র পর্যালোচনার সম্মুখীন। যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল এবং তা থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক মেরুকরণে ভারতের অবস্থান ঠিক কী হবে— তা আজ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

নিরাপত্তার স্বার্থেই হোক কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ‘আদর্শিক বিচ্যুতি’র কারণেই হোক, ভারতের বর্তমান নীতিনির্ধারকদের ইজরায়েল ও আমেরিকার প্রতি বিশেষ পক্ষপাত এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। ভারতের এই কৌশলগত রূপান্তরের কারণগুলো অনুধাবন করাও দুঃসাধ্য নয়। একদিকে ইজরায়েল আমাদের উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি দিয়ে সহযোগিতা করছে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ চিনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ভারতকে নতুন সমীকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে উদ্বেগের গভীরে রয়েছে অন্য এক কারণ, ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর সমর্থকদের এক বিশেষ আদর্শিক রসায়ন। সমর্থকদের একটি বড়ো অংশ মনে করেন, ইজরায়েল একটি কট্টর ইসলামবিদ্বেষী রাষ্ট্র বলেই তা ভারতের স্বাভাবিক মিত্র; যা এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কেবল কূটনীতির ঊর্ধ্বে তুলে এক আবেগীয় স্তরে নিয়ে গেছে। বিষয়টি সর্বসমক্ষে স্পষ্ট হয় যখন যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল সফরে গিয়ে দেশটিকে ‘পিতৃভূমি’ ও ভারতকে ‘মাতৃভূমি’ হিসেবে সম্বোধন করেন এবং ইজরায়েলের পাশে থাকার নিঃশর্ত প্রতিশ্রুতি দেন। বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের এই প্রকাশ্য অবস্থান ছিল অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ।

অধিকাংশের ধারণা ছিল, শক্তির চরম ভারসাম্যহীনতায় ইরান হয়তো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু ইরান যেভাবে প্রত্যাঘাত করেছে এবং সুদৃঢ় মনোবল নিয়ে ময়দানে টিকে আছে, তা বিশ্ব রাজনীতির চেনা ছক বদলে দিয়েছে। সামরিক সক্ষমতা যা-ই হোক, আত্মসমর্পণ না করে মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করার যে নৈতিক সাহস তারা দেখিয়েছে, তা বিশ্বজুড়ে অগণিত সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন কুড়িয়েছে। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ মার্কিন আধিপত্যবাদী দর্শনের সীমাবদ্ধতাকেও জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে। ফলে বিশ্বজনমত এখন অনেকটাই ইরানের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে; এমনকি যারা একসময় ইরানের ঘোর সমালোচক ছিলেন, পরিবর্তিত বাস্তবতায় তাঁরাও আজ নীরব। এমতাবস্থায় প্রশ্ন জাগে, এ যুদ্ধ কি আন্তর্জাতিক সমীকরণে উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে ? বিশ্বমঞ্চে এখন এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জোরালো।


অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার ‘অজেয়’ ভাবমূর্তি আজ বড়ো ধাক্কার মুখে। একই সঙ্গে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নতুন করে প্রমাণ করছে, বৈশ্বিক শক্তিসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে আর সেই পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে ভারতও মুক্ত নয়


সম্ভাব্য বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কায় যুদ্ধ হয়তো দীর্ঘস্থায়ী হবে না, তবে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত এখন স্পষ্ট। অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার যে ‘অজেয়’ ভাবমূর্তি ছিল, তাতে আজ বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। আমেরিকার একপাক্ষিক খবরদারি ও অন্যায় হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে আজ বহু রাষ্ট্র ইরানের সুরে সুর মেলাতে শুরু করেছে। আমেরিকার অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ইজরায়েলি প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব আজ যেমন প্রশ্নের মুখে, তেমনি তাদের
অতি-আগ্রাসনকে খোদ ন্যাটো মিত্ররাও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে না। অতীত সংঘাতগুলোতে মিত্ররা যেভাবে আমেরিকার পাশে দাঁড়িয়েছিল, এবার সেই সংহতির অভাব প্রকট।

এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া-সহ বিশ্বের বহু রাষ্ট্র, যারা এতদিন নিরাপত্তার জন্য এই দুই পরাশক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন বিকল্প আশ্রয়ের সন্ধানে। সাধারণ মানুষের মনে ইজরায়েলি আগ্রাসন ও মার্কিন দাদাগিরির বিরুদ্ধে এক নিরবচ্ছিন্ন ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এ সুযোগে বিশ্ব রাজনীতিতে চিন ও রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের আধিপত্য নতুন মাত্রা পেতে পারে। অনেক মুসলিম রাষ্ট্র এখন নিজেদের আত্মরক্ষা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তাদের বর্তমান জোটগুলোকে পুনর্বিন্যাস করতে সচেষ্ট হবে।


রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় কেবল তার সামরিক শক্তিতে নয়। বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ , মহাত্মা গান্ধী এবং নেহরু বিশ্বমঞ্চে ভারতবর্ষের যে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তা ছিল উচ্চতর আদর্শিক ও মানবিক। ঐতিহ্যের সঙ্গে সংগতি রেখেই স্বাধীন ভারত জোটনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও মানবিকতার পক্ষে সোচ্চার থেকেছে। শুধু তাই নয়, বহুবিচিত্র জনতাকে নিয়ে কীভাবে একটি রাষ্ট্রে সহাবস্থান করা যায়, ভারত তার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল।


অন্যদিকে, এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও ইজরায়েলের দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও শৈথিল্য আসার সম্ভাবনা। ফলে যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy) শব্দটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার সম্পদশালী দেশগুলো উপলব্ধি করছে যে, আমেরিকার সুরক্ষাবলয়ে থেকেও তারা পুরোপুরি নিরাপদ নয়। তাই প্রক্সি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবে। চিন ও রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ইরান ও সৌদি আরবের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর কাছাকাছি আসার প্রচেষ্টা ওই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবকে অনেকটাই ম্লান করে দেবে।

এমতাবস্থায় ভারতের বিদেশনীতি এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র এবং ‘আত্মনির্ভর’ দেশ হিসেবে ভারতের যে বিশ্বজনীন মর্যাদা ছিল, বিশ্লেষকদের মতে তাতে ইতিমধ্যে কিছুটা স্খলন ঘটেছে। যদি আমেরিকা ও ইজরায়েল আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তবে ভারতকে তার একপাক্ষিক ‘ইজরায়েল-ঘনিষ্ঠ’ নীতি অবশ্যই পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ‘ব্রিকস’ (BRICS) বা ‘এসসিও’ (SCO)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে রাশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান শক্তির সাথে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে ভারতের জন্য আগামীর প্রধান চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘রিয়ালিস্ট’ বা বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি বলে—নিরাপত্তা যখন বিঘ্নিত হয়, তখন স্বার্থের প্রয়োজনে পুরনো জোট ভেঙে নতুন অক্ষ তৈরি হয়। আমেরিকা ও ইজরায়েলের ভাবমূর্তি ধাক্কা খাওয়ায় আমরা এক নতুন বহুমেরু বিশিষ্ট (Multipolar) বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। চিন এই নতুন অক্ষবলয় তৈরিতে একটি প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করার প্রবল সম্ভাবনা রাখে; কারণ তাদের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি গড়ার চেষ্টা অনেক রাষ্ট্রকেই আমেরিকার বিকল্প খুঁজতে উৎসাহিত করছে।


বিশ্ব যখন ধীরে ধীরে বহুমেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখন ভারতের সামনে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ—আবেগ নয়, বাস্তব কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে নিজের কৌশলগত স্বার্থ ও ঐতিহাসিক ভাবমূর্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা


কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিচয় কেবল তার সামরিক শক্তিতে নয়। স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্বমঞ্চে ভারতবর্ষের যে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, তা ছিল উচ্চতর আদর্শিক ও মানবিক। ঐতিহ্যের সঙ্গে সংগতি রেখেই স্বাধীন ভারত জোটনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও মানবিকতার পক্ষে সোচ্চার থেকেছে। শুধু তাই নয়, বহুবিচিত্র জনতাকে নিয়ে কীভাবে একটি রাষ্ট্রে সহাবস্থান করা যায়, ভারত তার অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল। ফলে ক্ষমতার নিরিখে অবস্থান যা-ই হোক, বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা ছিল এক অভিভাবকতুল্য। আজ সেই নৈতিক উচ্চতা অটুট আছে কি না, সেই প্রশ্নটিই এখন বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে। ভারতের সেই সুমহান ভাবমূর্তিকে অক্ষত রেখেই এই বিবর্তিত বাস্তবতার নিরিখে নির্ধারিত হোক আমাদের আগামীর বিদেশনীতি।

সম্পর্কের ভিত্তি মূলত গাণিতিক—স্বার্থের ঊর্ধ্বে এখানে চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কেউ নেই। কিন্তু অন্ধ ভক্তি অনেক সময় যৌক্তিক বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, যার ফলে ঐতিহাসিক বৈপরীত্যগুলো আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। রাজনীতির এই জটিল আবর্তের ঊর্ধ্বে উঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানবিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের কথা বলেছিলেন। মহাত্মা গান্ধি এবং স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ধর্মীয় মহাসম্মেলনের বার্তায় সেই একই শাশ্বত সত্য ফুটে উঠেছিল। আমরা কি তাঁদের সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে সেই মানবিক মূল্যবোধগুলো ধরে রাখতে পারছি? না কি কেবল গাণিতিক স্বার্থ আর সাময়িক আবেগের কাছে আমাদের সেই চিরন্তন আদর্শকে সমর্পণ করছি—সেই আত্মজিজ্ঞাসার সময় আজ সমাগত।

♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!