Advertisement
  • মু | খো | মু | খি
  • আগস্ট ৬, ২০২১

প্রতিটি ক্যাম্পাসই আমার কাছে একেকটি মন্দির

শিক্ষায় এক ধরনের জরুরি অবস্থা চলছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে।

বাহার উদ্দিন
প্রতিটি ক্যাম্পাসই আমার কাছে একেকটি মন্দির

সত্যম রায় চৌধুরী-র একান্ত সাক্ষাৎকার

৩ আগস্ট। বর্ষণমুখর সন্ধ্যায়, নিজের স্বপ্ন আর পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে কথা বলেছেন সর্বভারতীয় শিক্ষা সংগঠন, ‘টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ’-এর প্রাণপুরুষ ।

সূত্রধর : বাহার উদ্দিন

►স্কুল-কলেজ প্রায় দেড় বছর জুড়ে বন্ধ। পড়ুয়ারা অসহায় বোধ করছে। ড্রপ-আউটদের সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই নাকি মানসিক রোগের শিকার হয়ে পড়ছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা সংগঠন টেকনো ইন্ডিয়া সমস্যাটি নিয়ে কী ভাবছে? অনলাইন পড়াশোনার নামে ‘শিক্ষা? জরুরি অবস্থা’ কাটাতে অবিলম্বে কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ দরকার?

এস আর সি: পড়ুয়াদের অবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফেরাতেই হবে।ছেলেমেয়েরা একে-অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারছে না। স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু তাদের শিক্ষাঙ্গন  নয়, আক্ষরিক অর্থেই মিলনাঙ্গন। যাপন থেকে, প্রতিদিনের অভ্যস থেকে বৃহত্তর ক্যাম্পাসকে বেশি দিন দূরে রাখা ঠিক নয়। এতে ছাত্রদের মুখে মেঘ জমবে,  আবেগে ধোঁয়া জমবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্বাভাবিক অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। বাড়িতে, দমবন্ধ আবহে অনেকেই ঝিমিয়ে পড়ছে। ঠিকই বলেছেন, শিক্ষায় এক ধরনের জরুরি অবস্থা চলছে। অসহনীয়। আর বরদাস্ত করা যাচ্ছে না। দেখুন বাজার, দোকানপাট, শপিংমল, রেস্তোরা সবই ধীরে ধীরে খুলে যাচ্ছে। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। জটিল পরিস্থিতি। ছাত্রদের সঙ্গে ছাত্রদের দেখা হচ্ছে না। শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের আদান-প্রদানের সব দরজা রুদ্ধ। তারা বিরক্ত। ক্ষুদ্ধ। ক্ষোভ অনেক সময় ক্রোধের চেহারা নিচ্ছে। অন লাইনে প্রশ্ন করলে উত্তর দিচ্ছে না। অসামাজিকতা চওড়া হচ্ছে। অবসাদ বাড়ছে।আমাদের, টেকনো ইন্ডিয়ার স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে  যারা পড়ে, তাদের অবস্থা একটু আলাদা। বড়ো অংশই সম্পন্ন পরিবারের সন্তান। বাড়িতে ল্যাব, ফোন, ইন্টারনেট রয়েছে। বিরক্ত হয়েও প্রয়োজনের তাগিদে সহযোগিতা করছে। করার মতো উপকরণ আছে। কিন্তু গ্রামে গঞ্জে ছোট শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার পড়ুয়ার হাতে ডিভাইস কোথায়? ইন্টারনেট, স্মার্টফোন কোথায়? বলতে আর শুনতে হয়তো ভালো লাগে, দারুণ পড়াশোনা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব বড়ো কঠিন। করুণ। সুযোগহীন, দরিদ্র, অনগ্রসর সমাজের পড়ুয়াদের কথা কি আমরা ভাবব না! সমগ্র ভারতে তারা বিপন্ন। অসহায়। আরও কিছুদিন ভার্চুয়াল শিক্ষাব্যবস্থা বজায় থাকলে, সব স্তরে যে-সমস্যা দেখা দেবে, তা আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে, পুরোপুরি।

► আপনারা কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করছেন?

এস আর সি:- অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ব-বিদ্যালয়ও বন্ধ। অনলাইনে পঠন-পাঠন চালু রাখতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে টেকনো ইন্ডিয়ার বাড়তি সুবিধা রয়েছে। অনেক আগেই আমরা ডিজিটাল ইনফ্রাকস্টাকচার গড়ে তুলি। এই পরিকাঠামোকে অতিমারি দুর্যোগে ব্যবহার করছি। তবে এরকম জটিল পরিস্থিতি দেখা দেবে, কোভিডের কবল থেকে পড়ুয়া ও শিক্ষকদের বাঁচাতে বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে—এ ব্যাপারে মানসিকভাবে আমরাও প্রস্তুত ছিলাম না। অতএব, অস্বাভাবিক আবহের রোষ অতিক্রম করতে কিছুটা সময় লাগল। এখন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। ছাত্ররাও সহযোগিতা করছে। তার মানে, অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থার নিগেটিভ সাইডকে অস্বীকার করছি, তা নয়। ক্যাম্পাসহীন পরিবেশ পড়ুয়াদের মধ্যে  ভয়াবহ মেন্টাল ট্রমা তৈরি হচ্ছে। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ওষ্ঠাগত। আরেকটি সমস্যা, অনলাইনে ‘এগজামকে’ সুষ্ঠু করে তোলা অসম্ভব। কে কীভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে, সবসময় এর ওপর নজরদারি চালু রাখা কঠিন। কারচুপি হতেই পারে। অভিভাবকরা বুঝতেই পারছেন না, কী ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ছেলেমেয়েদের ঠেলে দিচ্ছেন!

► অনলাইনে পঠন-পাঠন নিয়ে সরকারের কি নির্দিষ্ট কোনও গাইডলাইন বা পলিসি আছে?

 এস আর সি:- ওয়েল অরগানাইজড পলিসি নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের স্ট্যার্ন্ডাড গাইড লাইন রয়েছে। আমার মনে হয়, প্রথম সারির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কোড অ্যান্ড কনডাক্ট তৈরি করে শিক্ষাদান চালু রেখেছে।

প্রাণচঞ্চল ছাত্রছাত্রীদের দেখতে পাচ্ছি না। তাঁদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার সব পথ রুদ্ধ জটিল অবস্থা! এরকম দুর্বিসহ পরিস্থিতি অতিক্রম করে আমাদের নর্মাল কার্যক্রমে ফিরতেই হবে। 

► অনলাইনে আসার জন্য ড্রপ আউটের হার হঠাৎ কি বেড়ে গেল?

এস আর সি:- গত বছরের পরিসংখ্যান খুবই উদ্বেগজনক। শুধু ভারতে নয়, দুনিয়া জুড়ে। এ বছর কী দাঁড়াবে, জানিনা। আশা করি, পঠন-পাঠনের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে ড্রপ আউটদের সংখ্যা কমবে।

► ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি টেকনো ইন্ডিয়া কী ভাবে সামলাচ্ছে?

এস আর সি:- প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্যাম্পাসকে জাগ্রত রাখতে আমাদের অতিরিক্ত ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। সংগঠনের রিজার্ভ ফান্ড থেকে খরচ জোগাড় করছি। এতে রিস্ক অনেক বেড়ে গেছে। কাউকে চাকরি থেকে অফ করিনি। গাড়ি চালক, বাগানের মালি থেকে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সবাইকে নিয়মিত বেতন দিচ্ছি। যাঁরা চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত, তাঁদেরও কাউকে সরিয়ে দিই নি। আমার নীতি খুবই স্পষ্ট—ক্যাম্পাস আমার কাছে একেকটি মন্দির। কর্মীরা মন্দিরের পুরোহিত। যেমন মন্দিরের, তেমনি তার পূজারীদের ভালো রাখার দায়িত্ব আমাদের। সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে টেকনো গ্রুপের কর্মী সংখ্যা ৬০০০। আরও কয়েক হাজার কনট্রাক্ট বেসিসে নিযুক্ত। হাজার দশেক মানুষ এবং তাঁদের পরিবার আমাদের ওপর নির্ভরশীল।

► টেকনোর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সব সময়  সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞও ছড়িয়ে থাকে। আমাদের ধারনা,  টেকনো ইন্ডিয়ার অঙ্গন শুধু নোলেজ ক্যাম্পাস নয়, বৃহৎ অর্থে কালচারেল ক্যাম্পাসও।

এস আর সি:- পড়ুয়াদের মধ্যে কালচারেল অ্যাক্টিভিটিজ বাড়িয়ে তুললে শিক্ষাঙ্গনের শোভা বাড়ে। ক্যাম্পাসে প্রাণচাঞ্চল্য স্ফূরিত হয়। এই ব্যাপারে আমার ব্যক্তিগত আগ্রহের অভাব নেই। গত কয়েকবছরে টেকনো ইন্ডিয়ার সাংস্কৃতিক  তৎপরতা ক্যাম্পাসের বাইরে, রাজ্য ও দেশের নানাস্থানে, বিদেশেও আমরা নিয়ে গেছি। গত দেড় বছরে এসব থমকে গেছে। অনলাইন অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতির প্রাণের খোঁজ মেলে না। সাংস্কৃতি ঘেঁষা বন্ধুত্বেরও উষ্ণতা টের পাইনা। অন লাইনে আমি প্রোগ্রাম করি না। আই হেট টু ডু ইট। এক্ষেত্রে আরও দশজনের যা এক্সপ্রেশন, আমারও তাই। এখন তো নিয়মিত সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যাচ্ছি। সেক্টর ফাইভের টেকনো ইন্ডিয়া ইউনির্ভাসিটির অফিসেও আসছি। গত একবছরে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। বন্ধুদের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে, শিক্ষকদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ। প্রাণচঞ্চল ছাত্রছাত্রীদের দেখতে পাচ্ছি না। তাঁদের নিয়ে অনুষ্ঠান করার সব পথ রুদ্ধ। জটিল অবস্থা! এরকম দুর্বিসহ পরিস্থিতি অতিক্রম করে আমাদের নর্মাল কার্যক্রমে ফিরতেই হবে।

► মাস কয়েক আগে আপনি আমাকে বলেছিলেন, পরিকল্পনা করে কোনও কাজেই হাত দেন নি; স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে -সুযোগ এসেছে, সে অনুযায়ী নিজের প্রোজেক্ট তৈরি করেছেন। বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করলে ভালো হয়।

এস আর সি:- নিজের শর্তেই আমি কাজ করি। যা ভালো লাগে, তা করি। যে কাজে আনন্দ নেই, প্রাণ নেই, সে কাজ করি না। শুরুতেই দেখে নিই, প্রজেক্টের সোশ্যাল ইম্পাক্ট কী। এতে মানুষের কতটা ফায়দা হবে—ইত্যাদি। শুধু ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করি না। টেকনোর স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়—এরকম যাবতীয় প্রতিষ্ঠান আগে থেকে ভাবনা-চিন্তা করে স্থাপিত হয়নি। প্রস্তাব এসেছে, আমরা তার সম্ভাবনা ও বাস্তবতা খতিয়ে দেখেই নির্মেদ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গাছ যেমন বড়ো হয়, যেমন তার গোড়ায় জল দিতে হয়, আমরাও তেমনি রোপিত চারার যত্ন নিই। গোড়াতে কখনও ভাবি না, এতটুকু যাব, এতটুকু করব।  গড়তে গড়তে প্রতিষ্ঠান হয়ে-ওঠে। যেখানে নির্মাণে সৃষ্টি  নেই,  সেখানে আনন্দ নেই, সামাজিক হিতও থাকতে পারে না। সমাজের যা মঙ্গল, সেটাই করি। পরিকল্পনা করে এসব হয় না।

►  আপনি তো নিয়মিত ছবি কেনেন। ওর্য়াকশপ করেন। আর্টিস্টদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক চমৎকার আর সহজিয়া। ছবি কেনার উদ্যোগের উৎস কী ব্যক্তিগত, না প্রতিষ্ঠানকে চিত্রময় করে তোলা?

এস আর সি:- ব্যক্তিগত শখকে ঘিরে আমি ছবি সংগ্রহ করি, আর্টিস্টদের ক্যাম্প করি। ছবির সঙ্গে বসবাস করতে ভালো লাগে। ছবি দিয়ে, বই দিয়ে দেওয়াল সাজিয়ে রাখার আনন্দই আলাদা। আজকাল পত্রিকার ব্যবস্থাপনায় যোগ দিয়েই দেওয়ালে দেওয়ালে, রিসিপশন কক্ষে ছবি ঝুলিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলাম। রাতারাতি অফিসের লুক বদলে গেল। অতিরিক্ত নান্দনিক হয়ে উঠল পরিবেশের অঙ্গ সোষ্ঠব। টেকনোর আর্ট গ্যালারি আছে। ভবিষ্যতে তার আরও শ্রীবৃদ্ধি হবে।

► আপনি নাকি বিভিন্ন বস্তুর প্রতিচ্ছায়ায় মূর্তিত ছবি দেখতে পান! রহস্য কী?

এস আর সি:- এতে আবার রহস্যের কী আছে? বস্তুর ছায়ায় যে কেউ কল্পনা করলেই মূর্ত বা বিমূর্ত ছবি দেখতে পাবেন। দেখার চোখ চাই। মনও চাই। ধরুন, মার্বেলের জলজ আকার দেখছেন। দৃষ্টিতে তখন ভেসে উঠবে পশু, পাখি বা মানুষের চেহারা। অর্থাৎ আপনি যা ভাবছেন, সেটাই দেখতে পাবেন। এ জন্য আর্টিস্ট হওয়ার দরকার নেই। হ্যাঁ ভেতরে ছবি আর কল্পনা থাকতে হবে, থাকলেই বস্তুর গায়ে ভেসে উঠবে কল্পিত প্রতিমূর্তি।

► স্বপ্ন দেখেন?

এস আর সি:- স্বপ্ন ছাড়া মানুষ কি বাঁচতে পারে? আমি দুভাবে স্বপ্ন দেখি। ঘুমে, ঘুমের বাইরে। ঘুমে নানা রকমের স্বপ্নের সমাবেশ দেখতে পাই। যা পরে বাস্তবেও এসে পড়ে। এসব বিষয় আশয় নিয়ে গল্প-উপন্যাস হতে পারে। ঘুমের বাইরে যা দেখি, যা ভাবি, তা বিচিত্র। শিশুদের কল্পনার মতো সুন্দর। শিশুরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। ছোটবেলা আমি বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাগজের চোঙা বানিয়ে বক্তৃতা দিতাম—আমি অমুক, আমি সত্যম রায় চৌধুরী, আমি কিছু কাজ করতে চাই, ইত্যাদি। এ তো শিশুরই পরিকল্পনাহীন  কল্পনা। আজও আমি তার সঙ্গী। ঈশ্বরের পরম আর্শীবাদ, এ পর্যন্ত কাজের মাঝে মাঝে যে-সব স্বপ্ন দেখেছি, তা স্পর্শ করতে করতে তার চৌহদ্দি অতিক্রম করার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। মানুষের ভালো চাই, নির্বিশেষের বৃহৎ পরিবারকে সুখে রাখার স্বপ্ন দেখি। বটগাছ হব, এই স্বপ্নটাও আমি দেখি।


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!