Advertisement
  • মু | খো | মু | খি
  • নভেম্বর ২১, ২০২১

‘বিভাজকরা মানুষ নয়, অমানুষ, এদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়ে যাব আমি’।

ভাষাকে কখনো চ্যালেঞ্জ বা থ্রেট হিসেবে দেখা উচিত নয়। কেউ যদি আমার সাথে ভালো ব্যবহার না করে, তবে তার ভাষা ছেড়ে দেব একথাও বলা ঠিক নয়

লালন বাহার
‘বিভাজকরা মানুষ নয়, অমানুষ, এদের বিরুদ্ধে আমৃত্যু লড়ে যাব আমি’।

বাম আমলে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থেকে নির্বাচিত তিন বারের লোকসভার সদস্য লক্ষ্ণণ শেঠ—আর, আসামের বড়পেটার এখনকার কংগ্রেস সাংসদ আব্দুল খালেক পরপর, একান্ত সাক্ষাৎকারে বললেন, নির্ভীক চিত্তে বিভাজনের শক্তিকে রুখতে হবে। সব দলকে লড়তে হবে। এক হয়ে দ্বিতীয়ত, তুখোড় তীক্ষ্ণ ভাষায় সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মীয় ভণ্ডামীর বিরুদ্ধে তাঁদের সামাজিক অবস্থানটাও ঘোষণা করলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের অগ্রজ-অনুজ দুই রাজনীতিক।সমান্তরাল চিন্তার এ এক অকপট দৃষ্টান্ত। আলাপচারিতায়, লালন বাহার

মু|খো|মু|খি: আব্দুল খালেক

►আপনার রাজনীতির সূচনা কবে থেকে?

♦ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি আমাকে আকৃষ্ট করত। ছোটবেলায়, যখন গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন থেকেই নেতৃত্ব দেওয়ার একটা প্রবণতা আমার মধ্যে তৈরি হয়। প্রাইমারি স্কুলে আমি প্রধানমন্ত্রী ছিলাম।

►কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?

♦ না, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, মজাদার পদ। সেইসময়ে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে মন্ত্রীসভা থাকত। পরে হাইস্কুলে অ্যাসিটেন্ট জেনারেল সেক্রেটারি এবং বঙ্গাইগাও কলেজে ম্যানেজিং এডিটর হয়েছিলাম। ১৯৯৩-৯৪ সালে,  গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পিজিএসইউ এর বয়েজ কমনরুম সেক্রেটারি হয়েছি।
পড়াশুনা শেষে সাংবাদিকতা শুরু করি। হোমেন বড়গোহাঁইয়ের তত্ত্বাবধানে কর্মজীবন শুরু হয়। প্ৰথম একবছর ফ্রিল্যান্সিং সাংবাদিকতা, পরে ‘আমার অসমে’ স্টাফার হিসেবে প্রায় চারবছর কাজ করি। ২০০০ সালের ডিসেম্বরে প্রদেশ যুব কংগ্রেসে যোগ দিই।

►আপনি আমসু কিংবা আসু করেননি?

♦ ২০০০ সালে আমি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হই। সেইবছরই আমি প্রদেশ যুব কংগ্রসের মুখপাত্র হই,  তখন বিধানসভা নির্বাচনে দাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম দলের কাছে, টিকিট পাইনি। ২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও লড়ার সুযোগ হয়নি। ২০০৬ সালে পার্টি আমাকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করে। ইরশাদ আলি তখন ওখানকার সিটিং এমএলএ। তাঁর জায়গায় আমি স্থলাভিষিক্ত হলাম।
২০০৫, উদ্যোগপতি বদরুদ্দিন আজমল  নতুন দল ইউডিএফ তৈরি করলেন। আমার প্রধান বিরোধী তাঁরাই। কঠিন নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতায় কংগ্রেসের হয়ে আমি জিতলাম। জয়ের ব্যবধান মাত্র ৯২ ভোট। ২০০৬ এর চতুর্মুখী লড়াইয়ে ইউডিএফ হল দ্বিতীয়। তৃতীয় স্থানে সিপিএম। আমার বিপক্ষে সমাজবাদী পার্টিরও একজন দাড়িয়ে ছিলেন, উনি ছিলেন আঞ্চলিক সমাজকর্মী। চতুর্থ হয়েছিলেন। এরপর ২০১১। সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বদরুদ্দিন সাহেবের দল।  পাঁচ বছর আগেকার ফলাফলের থেকে আমার পক্ষে অনেক ভোট বাড়লেও পরাজিত হলাম। বিজয়ীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ১৫হাজার।
২০১২,  মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের প্রেস সচিব হিসেবে নিযুক্ত হলাম। কিন্তু বছর পূরণ হওয়ার আগেই সেকাজ থেকে অব্যহতি নিলাম। দীর্ঘ সাত বছর আমি আসামের ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলাম। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় সে পদ থেকেও ইস্তফা দিলাম। দুবছর পরে, বিধানসভায় আবার বিপুল জনসমর্থনে নির্বাচিত হলাম। পার্টির নির্দেশে ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করলাম। সাংসদ হিসেব নির্বাচিত হলাম।

►পরিবারের কেউ কি কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল?

♦ কোনদিনও নয়। এমকি কী, পঞ্চায়েতের মেম্বারও কেউ কোনদিন হয়নি। বাবা ছিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম। আমাদের গ্রামের নাম বড়তারি। আসমের বরপেটা জেলায়, অভয়াপুরির কাছে।
আমরা চার ভাই বোন। সাংসারিক উপর্জনের একমাত্র উৎস ছিলেন বাবা। উৎপাদিত ফসলের একটা অংশ ইমামকে ফি হিসেবে সেই সময়ে দেওয়া হত। আসামে দুফসলি জমি। অর্থাৎ বছরে দুবার সেই ফসল পেতেন বাবা। তাই দিয়েই আমাদের সংসার চলত। আমার দুই দিদি। বাড়ির পাশের গ্রামেই ওদের বিয়ে হয়েছে।একমাত্র ছোটভাই, উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের প্ৰধান শিক্ষক।

►প্রায়ই শোনা যায়, আসামের বাঙালি কৃষিজীবিরা, মূলত যাঁদের বসবাস গ্রামে (ধর্মের ভিত্তিতে বলছি না), তারা সেচ্ছ্বায় বা অস্তিত্বের সংকট এড়াতে, রাজনৈতিক চাপে নিজেদের অসমিয়া বলে পরিচয় দেন? এবিষয়ে আপনার মতামত জানতে পারি?

♦ প্রথমত, কোন শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে কেউ নিজেকে অসমিয়া বলেন, এই তত্ত্বে আমি বিশ্বাস করি না। এটা কোনভাবেই বলপূর্বক প্রয়াস নয়। আমি নিজেকে, জন্মসূত্রে বাঙালি মুসলমান বলি। আমাদের পূর্বপুরুষরা সেচ্ছ্বায় নিজেদের পরিচয়ে অসমিয়া লিখেছিলেন। যতদূর জানি, ১৯৪১ এর জনগণনায় এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। মৌলনা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি ঘোষণা করেছিলেন, বক্ষ্রপুত্র উপত্যকার বাঙালি আত্মপরিচয়ে অসমিয়া লিখবেন। এর পেছনে কী কারণ ছিল, জানি না। কিন্তু ওঁর আহ্ববানে অনেকেই সাড়া দিয়েছিলেন। মৌলানা ভাসানি অবিভক্ত আসামের গোয়ালপাড়ায় অনেক অসমিয়া মাধ্যমের স্কুলও গড়েছিলেন।

আসামের রাজ্যভাষা অসমিয়াই থাকা উচিত, এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।ভাষাকে কখনো চ্যালেঞ্জ বা থ্রেট হিসেবে দেখা উচিত নয়। কেউ যদি আমার সাথে ভালো ব্যবহার না করে, তবে তার ভাষা ছেড়ে দেব একথাও বলা ঠিক নয়।

►অথচ শিলং-এ বিধানসভায় উনি তো ভাষণ দিতেন বাংলায়!

♦ দেখুন বক্তৃতা দেওয়াটা আলাদা বিষয়, যেমন গোলম উসমানি সাহেব বরপেটার সাংসদ ছিলেন, কোনদিন উনি অসমিয়ায় বক্তৃতা দিতেন না। একটানা তিনবার ব্রক্ষ্মপুত্র উপত্যকার সাংসদ ছিলেন।

►তিনি কি অসমিয়া জানতেন?

♦ উনি জানতেন না, এটা আমি মনে করি না। দেখুন, গোলম উসমানি সাহেবের  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  এবং জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা দুজনের সম্পর্কেই অগাধ জ্ঞান ছিল। আসামের মন্ত্রী চদ্রমোহন, একসময় বিরোধী দলনেতা ছিলেন। অনরেকর্ড বলছি, উনিও আমাকে বলেছেন, গোলাম উসমানি অসমিয়া জানতেন কিন্তু অসমিয়া বলতে স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন না। অসমিয় ভাষা, সংস্কৃতি বিষয়ে ওঁর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল।কিন্তু কোনদিনও এই ভাষায় জনসভায় ভাষণ দেন নি।

►আচ্ছা, আসামের সমস্ত বাঙালি, যাঁরা অসমিয়া ভাষা গ্রহণ করেছেন, তাঁরা যদি নিজেদের আত্মপরিচয়ে বাঙালি লিখতেন, তবে কী অসমিয়াদের অস্তিত্ব বিপন্ন হত না?

♦ এটা ঠিক যে আসামের সব বাঙালি যদি নিজেদের মাতৃভাষা বাংলা, এ কথাটা লিখতেন, তবে বাঙলাভাষাই আসামে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা হত। কিন্তু, একথা মানতে হবে রাজ্যটার নাম আসাম আর সরকারি কাজকর্মের প্ৰধান ভাষা অসমিয়া।

►শুধু অসমিয়াদের রাজ্য? কত জনজাতিও তো এখানে বহুকাল ধরে রয়েছে?

♦ আমি অসমিয়াদের রাজ্য বলতে এখানে বসবাসকারী সমস্ত মানুষের কথাই বলছি।

►হোমেন বরগোঁহাই যেভাবে বলতেন বৃহত্তর অসম?

♦ হ্যাঁ, যেমন মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রে মার্কিনি বলে কেউ নেই, সবাই মিলেই সেখানে থাকে।তেমনি আসামে অসমিয়া বলতে আমরা সবাইকে বুঝি, ট্রাইবেল, সিডিউলকাস্ট, মাইগ্রেন্ট কমিউনিটি, সবাই। অভিবাসীদের মধ্যে আহমরাও আছেন, যারা ১২২৬ সালে আসামে এসেছিলেন। চা বাগানের শ্রমিকরাও আছেল, তাঁরাও নিজেদের মাতৃভাষা অসমিয়া লেখেন, তেমনি অনেক বাঙালি নিজেদের অসমিয়া ভাষী হিসেবে পরিচয় দেন। তাই অসমিয়া মানে সবাই।
আসামের রাজ্যভাষা অসমিয়াই থাকা উচিত, এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।ভাষাকে কখনো চ্যালেঞ্জ বা থ্রেট হিসেবে দেখা উচিত নয়। কেউ যদি আমার সাথে ভালো ব্যবহার না করে, তবে তার ভাষা ছেড়ে দেব একথাও বলা ঠিক নয়। যে কোন কারণেই হোক আমার পূর্বপুরুষরা তাঁদের মাতৃভাষা অসমিয়া, একথা লিখেছিলেন। একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তাঁরা গিয়েছিলেন। আমরা এখন যে ভাষায় কথা বলি তা বাংলা উপভাষা। তারমধ্যে অনেক অসমিয়া শব্দও আছে।কিন্তু আমাদের পরিচিতি, আমরা অসমিয়া। আমি মনে করিনা এটা ছাড়া উচিত।

►মাইগ্রেশনের প্রবলেমটাকে কীভাবে অ্যাড্রেস করবেন?

♦ দেখুন, মাইগ্রেশন হবেই, এটাই সভ্যতার নিয়ম। অনুপ্রবেশকারী আর অভিবাসী এক জিনিস নয়।মানব সভ্যতা গড়ে উঠেছে মাইগ্রেশনের মধ্যে দিয়ে । আহমরা একসময় মিয়ানমার, থাইল্যান্ড থেকে এসেছে। আজকে আমাদের যিনি মুখ্যমন্ত্রী, ওঁর পূর্বপুরুষ কনৌজ থেকে এসেছিলেন। আমার আদিপুরুষ পূর্ববঙ্গের লোক। এখন সেটা আলাদা দেশ, একটা জাতি রাষ্ট্র।কিন্তু আমার প্রজন্ম তো দূরের কথা, আমার আগের তিনটি প্রজন্মের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের কোন যোগাযোগ ছিল না। আমাদের পরিবারের আদিপুরুষরা যখন এখানে এসেছেন তখন অবিভক্ত ভারতবর্ষ। আজ যা প্রতিবেশী বাংলাদেশের অঙ্গ, তখন সেই জায়গা ছিল কামরূপের অন্তর্ভূক্ত।  সেখানে তখন রাজা আধিমত্ত, রাজা দূর্লভ নারায়ণ, নীলাম্বর সেনদের শাসনকাল। তো সে অর্থে আমার আদিপুরুষতো  আসামেরই লোক। এসব নিয়ে  অনেক বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু কাউকে এভাবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। শব্দটায় আমার আপত্তি আছে। কিন্তু মাইগ্রেশন তো হয়েছিলই।

►অনুপ্রবেশ কী সত্যি হয়েছিল বা হয়েছে?

♦অবৈধ অনুপ্রবেশ যদি বলেন, আমি মনে করিনা যে একাত্তর সালের পরে বাংলাদেশ থেকে অনেক লোক আসামে এসেছেন।

►১৯৭১ সালের আগে কী এসেছে?

♦ ৭১ সালের আগে লোকতো এসেছেন, এদের মধ্যে খুব কম অংশ মুসলিম। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রচুর হিন্দু আসামে প্রবেশ করেছেন। সেই সময় পূর্ব পাকিস্তানে যে অত্যাচার হয়েছে, তাতে ঢোকাটাই স্বাভাবিক।আর আমি এটাও বলে রাখি, আমি জন্ম এবং বিশ্বাস সূত্রে মুসলমান।আমি চাই যে বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে মুসলমান ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবিলম্বীরা যাতে সুরক্ষিত থাকে, তা নিয়ে প্রত্যেক ভারতীয় মুসলমানদের চিন্তা করা উচিত। ভারত সরকার যেমন চিন্তা করবে, তেমনি আমাদেরও ভাবা উচিত।বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতিত হলে,  তখন সঙ্কীর্ণতার সমীকরণবিদরা বিভাজনের অঙ্ক কষতে শুরু করেন। আমাদের দেশের কিছু রাজনৈতিক দল এভাবেই ঘোলাজলের ফায়দা তুলতে চায়।
প্রতিবেশী বাংলাদেশ আমাদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, পারস্পরিক সম্পর্কের বুনিয়াদ সুগভীর। কিন্তু কখনো যদি সে দেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তবে ভারত সরকারের উচিত তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক এবং সহায়তার সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা।প্রথমে সাহায্য বন্ধ করা উচিত, আর সেটাতেও যদি না হয়, তবে অন্য ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
তাই বলে ওখানে হিন্দুদের অত্যাচার চলবে, আর আমরা বর্ডার খুলে দেব, এই রাজনৈতিক বিভাজনের খেলা চলবে না। তাতে দুদেশেরই ক্ষতি। এখানকার ডেমগ্রাফি নষ্ট হবে। বাংলাদেশের বিভাজনকামী মৌলবাদীরাও এতে উৎসাহিত হবে। একদিকে বাংলাদেশের হিন্দু বিতাড়নকে তারা উৎসাহিত করবে, অন্যদিকে এখানে যারা হিন্দুদের এনে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চায়, তারও উল্লসিত হবে। আর এই ধরণের লোক যারা বিভাজন আর বিচ্ছিন্নতার উপাসক, তাদের আমি প্রকৃত মানুষ মনে করি না।
ধর্ম নিরপেক্ষ দেশের নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, বিশ্বের যে কোন প্রান্তে, হিন্দু সহ যেকোন ধর্মাবিলম্বী মানুষের সুরক্ষিত থাকার অধিকার সুনিশ্চিত হওয়া উচিত। সীমান্ত খুলে দিয়ে মেকি উদারতার নীতি, অসমুদ্র হিমাচলের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির পরিপন্থী। এটা ভারতের নীতি হতে পারেনা।

প্রতিবছর নদী ভাঙনের ফলে, কৃষকরা, বাস্তুহারা হয়ে শহরে এসে আশ্রয় নেন। এদেরকেই তখন বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একদিকে অর্থনীতির সমস্যা, আরেকদিকে রাজনীতির সমস্যা। সাংসদ হিসেবে, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে আমি এব্যাপারে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছি। এদের মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হোক। এই সমস্যার কবে সমাধান হবে জানিনা 

►সম্প্রতি বাংলাদেশে, দুর্গা পুজোকে ঘিরে যে ঘটনা ঘটল, তাতে আপনাদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?

♦ আমরা ব্যক্তিগত এবং দলগত স্তরে প্রতিবাদ করেছি। আমরা এবিষয়ে খুশি যে বাংলাদেশ সরকার তাদের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে। দেখুন সবদেশেই বিছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে, অপশক্তি থাকে।তাদের শক্ত হাতে প্রতিহত করা প্রশাসকের দায়িত্ব।

►আপনার কি মনে হয়,  এটা কোন পলিটিক্যাল অভিসন্ধি? এখানকার কেউ, যারা সিএএ, এনআরসি করেছে, সেগুলোকে পলিটিক্যালি এস্টাবলিশ করার জন্য হিন্দু শূন্য একটা বাংলাদেশ তৈরি করার চেষ্টা করছে?

♦ হতে পারে। কিন্তু কোন শুভবুদ্ধি সম্পন্ন হিন্দু এটা চাইতে পারেনা। আজ যদি বাংলাদেশ থেকে সমস্ত হিন্দু চলে আসে, তাহলে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে কে পুজো করবে? আমার মনে হয় ভারত সরকারের উচিত, একজন দায়িত্ববান প্রতিবেশী হিসেবে, বাংলাদেশের হিন্দুদের সুরক্ষা নিশ্চিত প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী, উত্তরপূর্বের রাজ্য ত্রিপুরায় যেটা হল, সেটাও তো ভয়ঙ্কর উদ্বেগের। আমরা সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছি,  বাংলাদেশ সরকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অপচেষ্টাকে কঠোর ভাবে রুখেছে,  কিন্তু ত্রিপুরায় বিপ্লব দেবের সরকার,  নিজের রাজ্যের নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ। আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারও সে বিষয়ে উদাসীন। রাষ্ট্র পরিচালকদের কাজ সমস্ত নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করা, সেটা সেখানে হয়নি।

►একই সময়ে আসামের বরাকেও তো কয়েকটা মিছিলকে কেন্দ্র করে সমস্যা হয়েছিল, রাজ্য সরকার সেখানে ঠিকঠাক ভূমিকা পালন করেছে বলে আপনার মনে হয় না?

♦ ত্রিপুরায় যে ঘটনা ঘটেছে, তার প্রভাব প্রতিবেশী রাজ্য আসামে পরেনি, যেটা ভালো তাকে ভালো বলতে হবে।নিসন্দেহে এজন্য আসামের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।প্রতিবেশীর ছোঁয়াচে বিচ্ছিন্নতার আগুন আসামে তিনি ছড়াতে দেননি।
কিন্তু ওঁর অন্যান্য কার্যকলাপকে ঘিরে আমার আপত্তি আছে।উনি প্রচুর মেরুকরণের রাজনীতি করেন, ঘৃণা ছড়ান। যখন উনি কংগ্রেসে ছিলেন, তখন ভালো কাজ করেছেন, এখন উসকানির রাজনীতি করেন। ওঁর এসব কাজের আমি বিরোধী।

►সম্প্রতি অসম সাহিত্যসভার প্রাক্তন সভাপতি, শইকিয়া বরাককে আসাম থেকে আলাদা করে দেবার কথা বলেছেন?

♦ এ বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে চাই না।উনি বিদগ্ধ মানুষ। এই মুহূর্তে তিনি কোন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন। একজন ব্যক্তির যেকোন কথার প্রতিক্রিয়া রাজনীতিবিদদের করতেই হবে বলে আমি মনে করি না।

►আপনি কী ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, বরাক আলাদা হয়ে গেলে আসামের সুবিধা হবে?

♦ আমি এ বিষয়ে কোন মন্তব্যই করতে চাই না। রাজ্যের শাসকদল বিজেপি একটা কনফিউজড পার্টি। ওরা পশ্চিমবঙ্গকে ভাগ করতে চায়, উত্তরবঙ্গকে আলাদা রাজ্য করতে চায়। আবার কেউ যদি বরাকের কথা বলে, তখন তারা বলে আমরা আসামকে অখণ্ড রাখব। নগেন শইকীয়ার বক্তব্য সম্পর্কে আমার কোন প্রতিক্রিয়া নেই, সেকথা আগেই বলেছি, কিন্তু ছোট ছোট রাজ্যকে কেউ সমর্থন করে, তারা দাবি করতেই পারে।

►বিজেপির একটা পলিসি ছিল ছোট রাজ্য গড়ে তোলা?

♦ কেউ কেউ ভাবেন, বরাকে যদি আলাদা করতে পারি তাতে লাভ হবে, আবার বহু মানুষ আছেন, যাঁরা রাজ্যভাগ চান না।আমারও প্রচুর বন্ধুবান্ধব আছে, যারা রাজ্যভাগের বিরোধী।

►বরাকে ধর্মীয়মেরুকরণটা অসম্ভব স্ট্রং? যখন কোন জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে দাঁড়ান, তখন তাঁর কাজ নয়, ধর্মীয় পরিচয়টাই গুরুত্ব পায় বেশি?

♦ আমি যেটা জানি না, সেই সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে চাই না।

►সম্প্রতি বরাক উপত্যকায় কতগুলো সাইনবোর্ড নজরে এসেছে, সেখানে স্লোগান উঠেছে, সাইবোর্ডে অসমিয়া থাকবে কেন?

♦ আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, যেহেতু বরাক আসামের অঙ্গ, তাই বাংলার পাশাপাশি, অসমিয়া থাকুক হোর্ডিং এ, তাতে কী অসুবিধা আছে।ভাষাকে ঘিরে অসন্তোষ তো ঠিক নয়। বা ব্রক্ষপুত্র উপত্যকায় কেউ যদি কোথাও বাংলা সাইনবোর্ড দেয়, তাতে অসুবিধা কোথায়? আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি আসামের সরকারি কাজের ভাষা অসমিয়া, তাই অন্যভাষার পাশাপাশি অসমিয়াও সাইনবোর্ডে লেখা উচিত।

►সম্প্রতি একটা বিল এসেছে, পঠনপাঠনে অসমিয়া বাধ্যতামূলক করা হবে।

♦ আমি মনে করিনা হেমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারের পক্ষে এরকম সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব। তবে আমি এও মনে করি অসমিয়া ভাষা চর্চায় কোন বিরোধ থাকা উচিত নয়, কিন্তু কোনকিছুই বাধ্যতামূলক হওয়াটা ঠিক নয়। বাধ্যতামূলক হলে তার প্রতিক্রিয়া হয়। একসময় অগপ সরকার বড়ল্যাণ্ডে  অসমিয়া বাধ্যতামূলক করার ফলে আন্দোলন হয়েছিল। আমার মনে হয় সবকিছু উৎসাহমূলক করা ভালো। এনকারেজিং, অসমিয়া পড়লে বাড়তি সুযোগ পাওয়া যাবে… ইত্যাদি। যেমন মাঝে বলা হল, গীতা কম্পালশারি করতে হবে, গীতা পড়ায় ক্ষতি কী? একজন মুসলমান যদি গীতা পড়ে, তাতে তার ধর্ম নষ্ট হয়, আমি তা মনে করি না।কিন্তু বাধ্যতামূলক হলেই প্রশ্ন উঠবে।

►অগপ যে ভুলটা করেছিল, তার আগে শরৎ সিনহার আমলে হয়েছিল, গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়াম অব ইন্সট্রাকশন নিয়ে। বরাক তখন ওভার রিয়্যাকশন করে আবার ১৯৬১ সালে বরাকের রিক্যাশনটা ছিল স্বাভাবিক।

♦  আমি আপনাকে মনে করে দিতে চাই, হাইলাকান্দির ১২জন লোক অসমিয়া ভাষার জন্য শহিদ হয়েছেন।

►অসমিয়া ভাষার জন্য শহিদ হয়েছিল কি? তাঁদের একটা অংশ অসমিয়া ভাষাকে সমর্থন করেছিল। মণিপুরিরা তখন অসমিয়া ভাষার  জন্য মুভমেন্ট করেছে…হাইলাকানন্দিতে ১২জন লোক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মারা গিয়েছিলেন।তখন হায়দার হুসেন ছিলেন আইজি।মুসলিমদের উসকে দিয়েছেলেন নাকি একজন রাজনীতিক। ইতিহাসটা পরিস্কার নয়। বরাকের গ্রামীণ লোকেরা কমিউনালি রিয়্যাক্ট করেছিল।তারা স্লোগান দিয়েছিল, অসমিয়া ভাষা মানতি হবে, বাংলাভাষা মূর্দাবাদ…

♦ দেবশ্বর শর্মা, ১৯৪৬ সালে আসাম প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। মন্ত্রীও হয়েছিলেন । কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিরও মেম্বার ছিলেন। ওঁর আত্মজীবনীতে উনি লিখে গেছেন, অসমিয়া ভাষার জন্য  হাইলাকান্দির ১২জন শহিদ হয়েছিলেন। এটা তাঁর বই থেকে আমি বলছি, দেখুন আমি তো সেই সময় খুব ছোট, আমিও বিষয়টা জানি না। ৬১ তে আমি জন্মাইনি, ৭২ সালে আমার বয়স একবছর।

►এখন আসামে কংগ্রেসের ভোট ব্যাঙ্ক কারা?

♦ দেখুন কংগ্রেস পার্টির সমস্যা তো আছে। আমরা একটানা দুটো বিধানসভা নির্বাচনে পরাজিত হয়েছি।আমাদের এখন সাপোর্ট বেস বলতে… আগে চাবাগান গুলোতে আমাদের ভালো ভোট ছিল, সেটাও দূর্বল হয়েছে। বর্তমানে, সত্যি কথা বলতে, মুসলিমদের মধ্যে আমাদের সাপোর্ট ভিত্তি বেশি।বাকি কমিউনিটির মধ্যেও কিছু কিছু ভোট আমাদের রয়েছে।আমি লোকসভা নির্বাচনে প্রায় দেড় লক্ষ হিন্দু ভোট পেয়েছি। বরপেটা লোকসভায় যখন ফকিরুদ্দিন আলী আহমেদ লড়েছিলেন, তখনও ধর্মপুর, পাটহারকুচিতে জোর লড়াই ছিল।বিধানসভা ইলেকশনে আমাদের প্রার্থীরা যা ভোট পান, লোকসভায় তা আরও কমে যায়।

►কারণটা কী?

♦ কারণ বিধানসভায় দুই প্রার্থীই হিন্দু।  লোকসভায় ১৯৬৭ সাল থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী মুসলিম হয় আর বিরোধী প্রার্থী হিন্দু, কিন্তু আমি লোকসভা নির্বাচনে দেখেছি, দুটি কেন্দ্রেই আমি আমাদের বিধানসভা প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছি। আমি বিধানসভার তুলনায় ভোট বেশি পেয়েছি। যখন রাষ্ট্রব্যাপী প্রচুর মেরুকরণ, তখনও দেড়লক্ষ হিন্দু আমাকে ভোট দিয়েছেন। অসমিয়া হিন্দুও দিয়েছেন, বাঙালি হিন্দুও দিয়েছেন। আমি মনে করি, যদি আমরা প্রচুর খাটি, আমরা যদি মানুষের সমস্যাকে ঠিক ভাবে অ্যাড্রেস করতে পারি, তবে হারানো সাপোর্ট আবার ঘুরিয়ে আনা সম্ভব।

►বরাকে আপনাদের ভোট কেমন?

♦ বরাকে এবার একজন জিতেছে। বরাকে মুসলিম সাপোর্ট আছেই, পাশাপাশি বরাকে আমাদের কার্যকারী সভাপতি কমলাক্ষ্য দে পুরকায়েস্থ ভালো কাজ করছে।ফলে ভালো করে খাটলে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানুষকে আবার আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব।

►কোথাও কি মনে হয় কংগ্রেসর সঙ্গে আসামের সাধারণ মানুষের কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হয়েছে? বিশেষত নতুন প্রজন্মের মধ্যে?

♦ অবশ্যই।সেটার খামতি তো হয়েছে। অন্য নেতারা কী বলেন আমি জানি না। কিন্তু আমি যখন পরপর নির্বাচন লড়ব, তখন মানুষের সঙ্গে জনসংযোগের অভাব ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া আবার ভোটে পড়বে।

►আসামে মেরুকরণের রাজনীতির বাইরে গিয়ে যদি দেখি, নতুন প্রজন্মের চাহিদার সঙ্গে আপনাদের রাজনৈতিক দর্শনের কী কোনও ফারাক তৈরি হচ্ছে?

♦ অবশ্যই কমিউনিকেশন গ্যাপ হয়েছে।এটা পূরণ করতে জন্য খাটতে হবে। মানুষের এজেন্ডা নিয়ে খাটতে হবে।আমি আপনার কথা অস্বীকার করছি না।

►ইউডিএফ কী আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী?

♦ আমি চারটে নির্বাচন লড়েছি। তারমধ্যে তিনটে সরাসরি ইউডিএফের সঙ্গে লড়েছি, দুটোয় জিতেছি। লোকসভায়ও আমি ১৯ এ জিতেছি, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ইউডিএফ এই কেন্দ্রে জিতেছিল। আমি যখন লড়লাম, ইউডিএফ তখন তৃতীয় স্থানে ছিল।আমরা  গত বিধানসভা নির্বাচনে জোট করেছি। ভুল শুদ্ধ যাই হোক আমরা একসঙ্গে লড়েছি।এখন জোট নেই। ইউডিএফ আর বিজেপিকে আমি একই সারিতে বসাতে রাজি নই। বিজেপি অ্যাগ্রেসিভ কমিউনালিজম করে, কিন্তু ইউডিএফ  তা করেনা। তবে তাঁদের কাজকর্ম বিজেপিকে সহায়তা করে। কারণ এক সাম্প্রদায়িকতা আরেক সাম্প্রদায়িকতাকে উসকানি দেয়।কিন্তু আবার বলছি, বিজেপি যে এগ্রেসিভ কমিউনালিজম করে, ইউডিএফ তা করে না। এজন্য ২০১৬ নির্বাচনে যখন জিতেছিলাম তখন বলেছিলাম বিজেপি মুক্ত করতে হলে, আসামকে ইউডিএফ মুক্ত করতে হবে।আবার আমার পার্টিই ইউডিএফের সঙ্গে যখন জোট করেছিল, আমার ব্যক্তিগত মতামত যাই থাক না কেন। এখন জোট নেই,  তবু এবিষয়ে আমি কোন মতামত ব্যক্ত করব না।

বিজেপি অ্যাগ্রেসিভ কমিউনালিজম করে, কিন্তু ইউডিএফ  তা করেনা। তবে তাঁদের কাজকর্ম বিজেপিকে সহায়তা করে। কারণ এক সাম্প্রদায়িকতা আরেক সাম্প্রদায়িকতাকে উসকানি দেয়।

►আসামে ইউডিএফ আর কংগ্রেসের মধ্যে কোন তফাৎ আছে?

♦ আমরা সবাইকে নিয়ে চলতে চাই, ওরাও তাই বলে, কিন্তু মাঝেমাঝে এমন কিছু কথাবার্তা বলে দেয়, যা সমাজিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে চলে যায়।

►ওদের বেসটা কি এখনও জমিয়ত?

♦ দেখুন জমিয়েত, উলেমার যে ঔতিহ্য তার সঙ্গে বদরুদ্দিনের মতাদর্শ মেলে না, জমিয়েত উলেমা সবসময় সম্প্রীতির রাজনীতি করেছে।বদরুদ্দিন আজমল মূলত ব্যবসায়ী।ব্যবসার মুনাফাই তার আসল উদ্দেশ্য। গত উপনির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে উনি বলেছিলেন, রাজ্যের শাসকদল তার আগরের ব্যবসার সমস্ত ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছে।বদরুদ্দিন আজমলের ভাই সিরাজউদ্দিন আজমল বলেছেন, হিমন্ত সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী।আমরা তা ভাবি না। আমরা ভাবি হিমন্ত বিশ্য শর্মা শুধু মেরুকরণের রাজনীতি করছেন, তা নয়। তিনি আসমের জনগণকে অনেক সময় হেয় করেন, যে জনগণ তোমায় মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে, তাকেই তুমি তাচ্ছিল্য করবে! আমি হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করলে বলতাম, উনি একজন ভুয়ো হিন্দু…
জনগণকে হেয় করে বেশীদিন ক্ষমতায় থাকা যায় না, হিমন্ত বিশ্য শর্মার সঙ্গে আমাদের মূল বিরোধটা ওখানেই। আমি তো অবাক হই, সিরাজউদ্দিন আজমল কী করে তাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যিনি আসামের মানুষকে হেয় করেন কথায় কথায়।

►দুটো নির্বাচনে পরপর আপনাদের বিরুদ্ধে জনরায় গেছে, কোথাও কী মনে হয়, শিক্ষা, সাস্থ্য, কর্মসংস্থানের প্রশ্নে যথেষ্ট কাজ না হ‌ওয়ার প্রতিফলন ভোট বাক্সে পড়েছে‍? আসামে এখনও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে কোন স্পষ্ট অভিমুখ তৈরি হয়নি।

♦ শিক্ষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নয়ণ হয়নি, একথা আমি মানি না। তরুণ গগৈই সরকারের আমলে  নতুন তিনটে মেডিকেল কলেজ তৈরি হয়েছে। বরপেটা, জোরহাট, দিসপুর। আর‌ও কিছু প্রস্তাবিত ছিল, কিন্তু কাজ শুরু হয়নি, বা ক্লাস শুরু হয়নি।

►আসামের বেশ কিছু শিক্ষাঙ্গনের অবস্থাতো ভালো নয়?

♦ দেখুন, যেকোন ক্ষেত্রেই ডেভলাপ করতে পর্যায় লাগে। আমরা তো বলছি না শিক্ষার উন্নয়ণের কাজের বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে, তবে অনেকটা এগিয়েছে। প্রফুল্ল মহন্তের সময়, তার সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি করে সমস্ত নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছিল। আমাদের সময় সরকারি ক্ষেত্রে অনেক নতুন নিয়োগ হয়েছে। আসামের অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শিল্পায়ন‌ও হয়েছে।তবে আসামের শিল্পায়ণের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের তুলনা করলে হবে না, আবার গুয়াহাটির নগরায়ন আর কলকাতার নগরায়নের তুলনা ঠিক নয়। অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয়, এটাও আমরা মনে করি।
আর শিল্পায়ণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কিছু সমস্যাও আছে। শিল্পায়নের জন্য জমি প্রয়োজন। আমার কুড়ি বছরের রাজনৈতিক জীবনে দেখেছি, কৃষি জমি কেউ ছাড়তে চায় না, অথচ শিল্পায়ণ চায়। বামফ্রন্টের আমলে, পশ্চিমবঙ্গেও সে সমস্যা হয়েছে।
আসামে আমি যে কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলাম, শিল্পায়ণের কথা উঠলে আমিও পিছিয়ে যেতাম। কারণ জমি সমস্যা। বিধায়ক থাকার সময় উপলব্ধি করেছি, অসহায় গরীব কৃষকরা জমিহারা হলে নিঃস্ব হয়ে যাবে।

২০১৬ সালে আজকের মুখ্যমন্ত্রী, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ব্রক্ষ্যপুত্রের দুই ধারে এক্সপ্রেস হাইওয়ে হবে।যদি সত্যি এক্সপ্রেস হাইওয়ে হতো, তাহলে আসামের অর্থনীতি বদলে যেত। সাংসদ হিসেবে  লোকসভায়  যখন এ নিয়ে প্রশ্ন করি, কেন্দ্রীয় পরিবহন মন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে ওঁকে রাজ্যের তরফে কিছু জানানোই হয়নি

►কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে আসামের ভূমিকা কতটা উল্লেখযোগ্য?

♦ খাদ্যশস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমরা অন্য রাজ্যের মুখাপেক্ষী ছিলাম। এখন আমরা ধান উৎপাদনে সাবলম্বী, উদ্বৃত্ত ফসল বাইরে রপ্তানি করতে পারি । এটা আমাদের সফলতা, কিন্তু শিল্পায়ণের প্রয়োজন আছে। এই সরকারেও শিল্পনীতি সঠিক নয়। গুয়াহাটিতে তারা টুইন টাওয়ার তৈরি করবে বলেছিল, এখনও তার কোন খবর নেই। শিল্পায়ণের থেকেও বড় সমস্যা, নদীর ভাঙন। আমাদের সরকার‌ও তার সমাধান করতে পারেনি। এই সমস্যার যতক্ষন না পর্যন্ত সমাধান করতে পারব, আমাদের কোন নীতি কাজে লাগবে না। আসামের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে, নদীর ভাঙনের সমস্যা মেটাতে হবে। বিদেশি অনুপ্রবেশের যে ইস্যু, তার‌ও সমাধান সম্ভব এই পথেই। প্রতিবছর নদী ভাঙনের ফলে, কৃষকরা, বাস্তুহারা হয়ে শহরে এসে আশ্রয় নেন। এদেরকেই তখন বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একদিকে অর্থনীতির সমস্যা, আরেকদিকে রাজনীতির সমস্যা। সাংসদ হিসেবে, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে আমি এব্যাপারে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছি। এদের মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট ইস্যু করা হোক। এই সমস্যার কবে সমাধান হবে জানিনা, তবে এই মূহূর্তে নদীর ভাঙনে যারা গৃহহারা, তাঁদের মাইগ্রেশন সার্টিফিকেট ইস্যু করলে একটা বড় কাজ হবে।

২০১৬ সালে আমি তখন দ্বিতীয়বারের জন্য বিধায়ক হ‌ই, আজকের মুখ্যমন্ত্রী, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, ব্রক্ষ্যপুত্রের দুই ধারে এক্সপ্রেস হাইওয়ে হবে। আমরা বিরোধী দল হিসেবেও তার এই ঘোষণায় খুশি হয়েছি। যদি সত্যি এক্সপ্রেস হাইওয়ে হতো, তাহলে আসামের অর্থনীতি বদলে যেত।

►কিন্তু শুধু এক্সপ্রেস হাইওয়ে দিয়ে, আসামের সমস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার সমাধান কি সম্ভব?

♦ আমি যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে বলছি না। নদী ভাঙ্গনের কথা বলছি। যদি ব্রক্ষ্যপুত্রের নদীর দুই পারের ভাঙ্গন রুখতে হয় তবে সেটা এক্সপ্রেস হাইওয়ে গড়ে সম্ভব।

►কিন্তু আসামে যাতায়াত ব্যাবস্থার অপ্রতুলতা, তো একটা বড় সমস্যা ?

♦ যাতায়াত ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। আগে বরপেটা থেকে আমার বাড়ি যেতে দেড় ঘন্টা লাগত। এখন চল্লিশ মিনিট লাগে। রাস্তাঘাট ভালো হয়েছে।
অনেক উন্নয়ণের কাজ বাকি। এক্সপ্রেস হাইওয়ে হলে অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক সমস্যা, সবকিছুর সমাধান সম্ভব। কিন্তু গত বিধানসভার অর্থমন্ত্রী আর এখনকার মুখ্যমন্ত্রী এ বিষয়ে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন,তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।  আমি যখন সাংসদ হিসেবে  লোকসভায় প্রশ্ন করেছি, কেন্দ্রীয় পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গডকরিকে, তখন উনি বলেছেন, এ বিষয়ে ওঁকে রাজ্যের তরফে কিছু জানানোই হয়নি।

►পারস্পরিক সংযোগের সমস্যা কী বরাবর ছিল না? এখন নয় আসামে বিজেপির সরকার? কংগ্রেসের কমলেও কি এই সমস্যা ছিল না?

♦ অভ্যন্তরীন কোন একটি ইস্যু, আর রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ণের প্রশ্ন এক নয়।  সরকারি কাজে  কোয়ার্ডিনেশন করতে হবে। রাজ্য সরকার রাজ্যের উন্নতির জন্য যা করতে চায়, সেটাতো কেন্দ্রকে জানাতে হবে। কেন্দ্রীয় বরাদ্দেই তো কাজ হবে।  ডিব্রুগড় থেকে সোদিয়া পর্যন্ত যে রাস্তার কথা হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ২০১৬ সালের বাজেট অধিবেশনে বলেছিলেন, আদতে এ রাস্তা করা সম্ভব কিনা, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী, আজকের মুখ্যমন্ত্রীর সে ঘোষণায় কোন পূর্ব পরিকল্পণা ছিল, না নিতান্ত ক্যারিকেচার ছিল, তা আমি জানি না। তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আসামে একটা বড় কাজ হবে।

►নদী ভাঙ্গন, বিদেশিদের  অনুপ্রবেশ ছাড়াও তো আসামে আরো সমস্যা আছে? নতুন প্রজন্ম ক্রমাগত রাজ্য ছাড়ছে, কর্মসংস্থানের অভাবে?

♦ বলছি তো সমস্যা আছে। কিন্তু নতুন প্রজন্মের সমস্যা মানে তো শহুরে সমস্যা নয়। নদীভাঙ্গনে গ্রামের ছেলেমেয়েরা যে ভাবে বাস্তুহারা হচ্ছে, তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়েছে, বেচে থাকার তাগিদে তারা ভিন রাজ্যে যাচ্ছে।

►আসামের কৃষিপ্রধান অঞ্চল কি নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়ছে…

♦ আমি যে কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলাম, সেটা মূলত কৃষি ভিত্তিক অঞ্চল। তার প্রায় ৯২% মুসলিম, এবং মোট জনসংখ্যার মাত্র তিন শতাংশের মাতৃভাষা অসমিয়া। আপনি সেখানে গিয়ে দেখবেন, সেখানকার মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে স্কুল বা কলেজ যাচ্ছে। ২০ বছর আগে এই চিত্র দেখা যেত না। আমি তখন স্কুলে পড়তাম, তখন ক্লাস সেভেন পর্যন্ত আমার কোন সহপাঠিনী ছিল না। এখন প্রতিটা শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সমানুপাতিক।

►দুর্নীতি আসামের একটা ভয়াবহ সমস্যা নয় কি ?

♦ এটা অনেকটাই কমেছে। বেড়েছে ধর্মান্ধতা। রাজ্যের শাসক গোষ্ঠীই এর উৎসাহদাতা। তারা যখন ধর্মীয় রাজনীতি কে প্রনোদিত করে, তখন ধর্মান্ধতা কমানো কঠিন। তবে ধর্মান্ধতার চেয়েও বড়ো সমস্যা সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আগে রুখে দাড়াতে হবে। একজন লোক ধর্ম ভীরু, এটা তার ব্যক্তিগত বিষয়, কিন্তু লঙপ্যান্ট শার্ট পরে সাম্প্রদায়িকতা করবে, সমাজকে খুবলে খুবলে খাবে, এটা এক গভীর সমস্যা। তাই আমার কাছে সাম্প্রদায়িকতা বড় শত্রু, ধর্মান্ধতা ছোট শত্রু।

►শিক্ষায়, কাজে কর্মে মুসলিমরা কি এগিয়ে আসছে?

♦ হ্যাঁ আসামের মুসলিমদের মধ্যে প্রচুর চেতনার উন্মেষ হচ্ছে। মুসলিমদের মধ্যে যে পরমত সহিষ্ণুতা বেড়েছে তারই প্রতিফলনেই আমি দুবার এমএলএ, একবার এমপি হতে পেরেছি।

►সেটা তো ব্যক্তি আব্দুল খালেকে নির্বাচিত করেছে মানুষ?

♦ দেখুন তিনটে নির্বাচনেই আমার মূল প্রতিপক্ষ ছিল একটি মুসলিম দল। তাহলে তো আমার একটিও ভোট পাওয়া উচিত ছিল না। কিন্তু তবুও আমি জিতেছি। ২০১৬ এবং ১৯ এর নির্বাচনে কোথাও আমি হোলি খেলেছি, কেউ বা আমার মাথায় এসে সাই বাবার তিলক কেটে দিয়েছে। এগুলোকে নিয়ে বিরোধী শক্তি আমার বিরুদ্ধে প্রচার করেছে। তবুও মুসলিমরা আমাকে ভোট দিয়েছেন। এরমানে সাম্প্রদায়িক প্রচারকে তারা পরাস্ত করেছেন। এটা ইন্ডিভিজ্যুয়াল আব্দুল খালেকের জয় বলে আমি মনে করি না। আমার বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক প্রচার করা হয়েছে। আমার স্ত্রী জন্মসূত্রে হিন্দু, সেটাকেও বিরোধীরা ইস্যু বানিয়েছিল। এসবের পরেও আমার প্রতি জনসমর্থনকে টলাতে পারেনি। আমি মনে করি সেক্যুলারদের সংখ্যাও বাড়ছে, কিন্তু আমাকে যদি বলেন ধর্মভীরু, সেটা আলাদা বিষয়। আমি নিজে ইসলামের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাশীল। কারও বিশ্বাস কখনও ধর্মনিরপেক্ষতা, শুভবুদ্ধির শত্রু হতে পারে না।

►সর্বভারতীয় সরকারি পরীক্ষা, সিভিল সার্ভিসে আসামের প্রান্তজনদের সাফল্য কতটা?

♦ খুব ভালো নয়। তবে হচ্ছে। একসময় ছিল। আমার নিজের জেলা বরপেটা থেকে প্রচুর বুরক্রেট তৈরি হয়েছে। এখন কমে গেছে। আবার গত কয়েক বছরে দুজন বাঙালি মুসলিম আইআরএস হয়েছে আসাম থেকে। জনজাতিদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে পড়াশুনার মান উন্নত হয়েছে। তারাও সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছে।

►জনজাতিদের সঙ্গে বাঙালি কৃষিভিত্তিক সমাজের কি বিরোধ আছে?

♦ কয়েকটা জায়গায় আছে, যেমন বড়ল্যান্ড।

►৮৩ সালে নেলির হত্যা কাণ্ড গোহপুরের হত্যা কান্ড, যমুনামুখের সাফাই অভিযান কি পূর্বপরিকল্পিত?

♦ ১৯৮৩ বা ১৯৯২ এ আসামে যত দাঙ্গা হয়েছে, তার জন্য আরএসএস দায়ী। কিছু অশিক্ষিত মানুষকে প্রভাবিত করে, সামাজিক বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে, বহুদিন ধরেই আরএসএস বাহিনী আসামের শান্তি নষ্ট করেছে। ওরা তখন থেকেই শুরু করেছিল। আসাম মুভমেন্টের পেছনেও ওরা ছিল। তখন ওরা পলিটিক্যাল ফায়দা পায়নি, এখন পেয়েছে।

► দিনকয়েক আগেই মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার একটা বক্তব্য সম্প্রতি সংবাদ শিরনামে এসেছিল, যে এরকম চলতে থাকলে বৃহত্তর অসমিয়ারা আর অসমে থাকতে পারবেন না?

♦ উনিতো নিজেই একজন জনজাতি জন প্রতিনিধিকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। আমি তো মনে করিনা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কোন ইডিওলজি আছে। ক্ষমতার জন্য সব কিছু করতে পারেন। অন্যদিকে আজমল সাহেব তো নিজেই বলেছেন, এই সরকার তার আগরের ব্যবসার সব সমস্যার সমাধান করে দিয়েছে। উনি একজন বরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি। সংসদে আমার কলিগ। এমএলএ হয়েছেন একবার। ওঁর থেকে আশা করিনি, যে একটা রাজনৈতিক দলের প্রধানমুখ, যিনি আসামের মুসলিমদের সমস্যা নিয়ে রাজনীতি করেন, তিনি হঠাৎ করে বলে দেবেন, আমরা ব্যবসার সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। উনি বলতে পারতেন ডিভোটারের সমস্যার সমাধান হয়েছে, নদীর ভাঙ্গনের সমস্যার সমাধান হয়েছে, সেজন্য মুখ্যমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। আসলে যে সরকার এখন ক্ষমতায় তারাও জনগণের মূল সমস্যা সমাধানে লক্ষভ্রষ্ট,  আজমল সাহেবও মানুষের সমস্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজের বৈষয়িক বিকাশকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

►জাতপাত ও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার রাজনৈতিক আবহে আপনার অভিমুখ কী হবে?

♦ আমরা তো মানুষের কাজ করি। আমিতো ট্রেডিশনাল রাজনীতিবিদ নই, প্রিন্ট মিডিয়ায় ছিলাম, সেখান থেকে এসেছি। আমি যে এলাকার প্রতিনিধিত্ব করি, সে এলাকা এবং সেখানকার মানুষ অনগ্রসর। এলাকার মানুষের সার্বিক বিকাশের জন্যই রাজনীতিতে এসেছি। আমার মতো আরও অনেকে এই লক্ষ্য নিয়েই রাজনীতিতে এসেছে। রাজনীতি ব্যবসা নয়, সমাজকর্ম। সোশ্যাল সার্ভিস যাঁদের লক্ষ্য নয়, তাঁরা রাজনীতিকে ব্যবসার কাজে প্রয়োগ করেন।

►আপনি যে কমিউনিটি থেকে উঠে এসেছেন, সেখানে কেউ কেউ আছেন, ধর্মের নামে অপপ্রচার করে, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয়। অনেকটাই আফগানিস্তানের তালেবানের মতো?

♦ আমি আগেও বলেছি, আমি ধর্মভীরু মানুষ।  কিন্তু তালিবানের যে সংস্কৃতি তার সঙ্গে আমার ইসলামের কোন সম্পর্ক আছে বলে আমি মনে করি না। বিশেষত প্ৰথম পর্যায় তারা ক্ষমতায় এসেই যেভাবে বামিয়ানের বুদ্ধ মুর্তি গুড়িয়ে দিয়েছে, মহিলা-শিশুদের ওপর অত্যাচার করেছে সেটা লজ্জার। আমাদের ভারতবর্ষেও এরকম কিছু লোক আছেন, যাঁরা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করেন, তারা ভাবাতে চান, ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ হোক আর মুসলিমরা যেসব রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব দেশ অসলামি রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত হোক।
আমি কাজ এবং বিশ্বাসে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে সমর্থন করি, পালনও করি। দেশজুড়ে মুসলিমদের মধ্যেও পরমত সহিষ্ণুতা ক্রমাগত বাড়ছে, এটা আশার লক্ষণ। তাঁরা এটা বুঝেছেন যে,  ভারতে যদি মুসলিমদের, সম অধিকারের সম্মান নিয়ে বাঁচতে হয়, তাহলে আফগানিস্তানেও হিন্দু-বৌদ্ধ-শিখ সবার সমান অধিকারের জন্য আমাকে লড়তে হবে। আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে ভারতবর্ষের সব মানুষের সম অধিকারে জন্য লড়ব আর প্রতিবেশী দেশে হিন্দু হত্যা বা আফগানিস্তানে সংখ্যালঘু হত্যার প্রতিবাদ করব না, এটা সেকুলারিজম নয়, ভণ্ডামি। আমাদের পয়গম্বারে মদিনারাষ্ট্রের প্রস্তাবনা পড়ে দেখুন, সব ধর্মাবলম্বীর সম অধিকারকে কী অসাধারণ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। হজরত চেয়েছিলেন, রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনায় সবার জনপ্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে। বৈষম্য থাকবে না। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর তফাৎ থাকবে না। বিনয়ের সঙ্গে বলছি, আমি ওই মতাদর্শের অনুসারী। এখানে কোনও আপোস করব না। কারও সামনে মাথা নত করব না। এক্ষেত্রে, চির উন্নত মম শির। সেকুলারিজমের জন্য, সবশ্রেণীর, সব ধর্মাবলাম্বীর অধিকারের জন্য আমূত্যু লড়ে যাব। এটাই আমার রাজনৈতিক অভিমুখ।

♦=♦=♦   ♦=♦=♦

আরও পড়ুন: নন্দীগ্রাম ইস্যুতে ভুল করেননি, বিরোধীরা।’বিজেপিকে রুখতে মমতার বিকল্প কোথায়? তাঁকে সামনে রেখেই জোট গড়তে হবে : লক্ষ্ণণ শেঠ


  • Tags:

Read by: 50 views

❤ Support Us
Advertisement
Advertisement
শিবভোলার দেশ শিবখোলা স | ফ | র | না | মা

শিবভোলার দেশ শিবখোলা

শিবখোলা পৌঁছলে শিলিগুড়ির অত কাছের কোন জায়গা বলে মনে হয় না।যেন অন্তবিহীন দূরত্ব পেরিয়ে একান্ত রেহাই পাবার পরিসর মিলে গেছে।

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া স | ফ | র | না | মা

সৌরেনি আর তার সৌন্দর্যের সই টিংলিং চূড়া

সৌরেনির উঁচু শিখর থেকে এক দিকে কার্শিয়াং আর উত্তরবঙ্গের সমতল দেখা যায়। অন্য প্রান্তে মাথা তুলে থাকে নেপালের শৈলমালা, বিশেষ করে অন্তুদারার পরিচিত চূড়া দেখা যায়।

মিরিক,পাইনের লিরিকাল সুমেন্দু সফরনামা
error: Content is protected !!