- গ | ল্প
- মে ১৯, ২০২৬
পরিশিষ্টের মানুষ
কোর্টের বারান্দায় তাঁকে দেখলেই সবাই ফিসফিস করে বলত — ‘ওই যে সাহিত্যিক আসছেন !’
কেউ ঠোঁট বাঁকাত, কেউ মুচকি হাসত । তিনি শুনতেন — না শোনার ভান করতেন ।
ইনি অ্যাডভোকেট হায়দর আলি টাইগার — তাঁর আসল নাম হায়দর আলি । টাইগার তাঁর নিজের সংযোজন । আরবি এবং ইংরেজিতে হাইব্রিড নামের তেমন কোনো বড়ো ইতিহাস নেই । তবু কেন এ নাম তাও পরে বলা যাবে । কোর্টে অনেকে তাকে টাইগার উকিল বলেও চেনে ।
আমাদের কাছে ইনি — টাইগার দাদা ।
তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো বন্ধুরা ঠাট্টা করে ডাকত —‘জ্যাকেল’। আজও তা-ই । তিনি হাসেন — ‘তোমাদের সত্তর বছর বয়সেও সতেরো বছরের স্বভাব আর গেল না ।’
আমরা জোরাজুরি করায় ব্যাঘ্ররহস্যটা খুলেই বললেন একদিন —‘শোনো ভাই, আরবিতে হায়দর শব্দের অর্থ হল সিংহ । ক্লাস নাইনে উঠে ইংলিশ-অ্যারাবিক-পার্সিয়ান এ ট্রাই-লিঙ্গুয়েল ডিকশনারিতে শব্দটি আবিষ্কার করে মনে হলো, কেমন হয় আমার নামটাতে একটা নুতনত্ব আনলে ? আর কিছু না হলেও এটা একটা ইউএসপি, মানে ইউনিক সেলস প্রপজিশন তো হবে ।
মাধ্যমিক পরীক্ষার ফর্ম ফিল-আপ করার সময় কাণ্ডটি ঘটিয়ে দিলাম । বাংলাদেশে দেখনি মসজিদের মিঞাঁ সায়েবের দেওয়া নামের শেষে একটা বাঙালিত্বের লেজুড় লাগিয়ে দেয় ওরা । আর আমার কপালে অবশ্য সাহেবের কৃপা । সিংহ বললে ব্যাপারটা ঠিক জমে না – হায়দর সিংহ । এটা যে না-সর্দারজি, না-মণিপুরি, না-বাঙালি । আমার টাইগারই পছন্দ হয়ে গেল ।
আমি বললাম — সিংহ আর টাইগার কি এক হল দাদা ?
— এইখানেই বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব রে ভাই, হিন্দি বা উর্দুতে এক শের দিয়েই কাজ চালিয়ে দেয় ওরা — বাঘও শের, সিংহও শের । তোমরা প্রশ্ন করায় এতটা তত্ত্ব বের হলো । আমি কিন্তু এত গভীর ভাবে ভাবিনি এ নিয়ে । চলো চা আর গরম গরম সিঙ্গাড়া খাওয়া যাক ।
টাইগার দাদার থলেতে অনেক বিচিত্র গল্প আছে । তাঁর গল্প শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল থেকে ।
গ্রাম কাছাড় থেকে রাজধানী শহরে পা দিয়ে প্রথম দিনেই তিনি বুঝে গেলেন — এ পৃথিবী তাঁর গ্রামের মতো নয় ।
হোস্টেলে নিজের হাতে বয়ে এনেছিলেন তাঁর ছোট্ট সংসার — রঙিন বেডকভার, নরম বালিশ, মশারি । এসব সম্পত্তি একটা বড়ো চাদর দিয়ে বাঁধা পুঁটুলিটি সবে খাটের উপর রেখে রশির বাঁধন আলগা করেছেন, অমনি দরজা খুলে একেবারে আলট্রা-মডার্ন রুমমেট ঢুকলেন । আমার দিকে তাকিয়ে এমন ভাব করলেন যে, কোনো আজিব চিজ দেখছেন । আমরা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলাম — এরপর বুঝলে, এক্কেবারে হিন্দি সিনেমার হিরোর মতো নিঃশব্দে একে একে আমার সব বিছানাপত্র জানালা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলতে লাগল — ‘এই বস্তু ইয়াতে ন চলে !’
টাইগার দাদার অবস্থা ওই যে তাঁর বন্ধুরা ঠাট্টা করে যা বলে ঠিক তাই ।
তারপর কাতর স্বরে বললেন — ‘এই বিস্তারা তো দাদা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছে না, পড়বে এর দরিদ্র মালিক !’
রুমমেট থমকাল ।
তারপর নিজের সুটকেস খুলে চৌকির উপর নতুন চাদর বিছিয়ে দিল, তদুপরি
একটা বিশাল শৌখিন বালিশ আর বিলাসী ব্ল্যাঙ্কেট ছড়িয়ে দিয়ে বলল — ‘ইয়াতে ঘুমাবি, বঙ্গাল !’
টাইগার দাদা মাথা চুলকে বলেছিলেন—‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ফ্রি বিস্তারা দেওয়া হয়, ইতা জানলে কষ্ট করিয়া এইসব আনলাম না নে! ’
এই গল্প আমরা কত বয়ানে কতবার যে শুনেছি, গুনে শেষ করা যাবে না ।
এই সরল মানুষটাই এখন একদিকে কোর্টে মামলা লড়েন, আর ফাঁকে ফাঁকে লেখেন ইতিহাস ।
তিনি বলতেন — ‘মানুষের নাম, কীর্তি দিনে দিনে হারাইয়া যায় । আমি আমার কায়দায় এইসব ধরে রাখি ।’
আমরা হাসতাম । তিনি খাতা খুলে পড়া শুরু করে দেবেন এ ভয়েই তাঁর সহকর্মীরা পালিয়ে যেতেন । আমরা কিন্তু তাঁর সঙ্গ ভালোই উপভোগ করতাম । তবে বলতাম — ‘এইসব লিখে কী হবে ?’
কিন্তু তিনি থামেননি ।
এমনি করে তাঁর গ্রন্থ ‘প্রথম খণ্ড’ বেরোল — নীরবে । সবাই বলতো দ্বিতীয় খণ্ডও আসছে । কাউকে অযথা খরচান্ত করা তাঁর ধাতে নেই। একে ওকে তাকে দেদার কমপ্লিমেন্টারি কপি বিতরণ করেছেন । কেউ পড়েছে, কেউ পড়েনি । তবে তিনি আশা করেছেন পড়ে পাঠক প্রশংসা বা অন্তত নিন্দা করবে । কিন্তু কেউই এ নিয়ে খুব একটা কথাও তো বলেনি । তিনি দমে যাবার পাত্র নন । দুই হাতে লিখে যেতে থাকলেন ।
এরপর বের করলেন দ্বিতীয় খণ্ড । এবার আর নীরবতা নয় । বইটি বেরলো বেশ আলোড়ন তুলেই । সঙ্গে তাঁর একখানা উপন্যাস —‘ধলেশ্বরীর চোখে জল ।’ তাঁর বই না-পড়া সমালোচকেরা নাক উঁচু করে ‘বললেন ইতিহাসের সঙ্গে উপন্যাস ! এমনটি তো কখনোই দেখিনি ।’ তবে সহকর্মী, বন্ধু এবং তাঁর পেছনে পেছনে চলা আমাদের মতো ফচকে ছোঁড়া, মুফতে চা সিঙ্গাড়ার অনুরাগী এবং কতিপয় সাহিত্য যশোপ্রার্থী — যাদের অনেকেই কমপ্লিমেন্টারি কপি লাভে ধন্য, এরা সিদ্ধান্ত নিল বইটি পড়েই মতামত দেবে।
ওপারে একুশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আছে। আমাদের পাঁচ-ছয়জন না—একেবারে এগারোটা শহিদের লাশ ! কিন্তু দেশ-বিদেশে দেখানোর মতো একখান ছেঁড়াখোড়া ইতিহাসও নাই ! আমরা সব বড়ো বড়ো বিপ্লবী, বড়ো বড়ো বিদ্বান। কয়েক বছর হইল নিজেদের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও হইল, কিন্তু এই বিষয়ে গবেষণা কই ?’
চশমা নাকে টেনে উন্নাসিক দেওয়ানি মামলার বাঘা উকিল পকেট থেকে কয়েকখানি নোট বের করে টাইগার দাদার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন তোমার অধ্যাবসায়কে কুর্নিশ জানাই হে ইতিহাবিদ । টাইগারদাদা পকেট থেকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বললেন বইয়ের গায়ে যে মূল্য লেখা এটা তো রিটেল সেলের মূল্য নয় । এর দাম আরও কম । এ ফেরত টাকাটা নিন দয়া করে । তবে দাদা, আপনার মূল্যবান মতামতের অপেক্ষা করব ।
‘ এই তো বড় মুশিবতে ফেললে হে ভ্রাতরঃ । বই পড়া যতটুকু সহজ, বই পড়ে মন্তব্য করা ততটুকুই কঠিন । তোমাকে কুর্নিশ জানাতেই হয় । এত বড় একটা বার লাইব্রেরি । কিন্তু ক’জন আর মি লর্ড, মি লর্ড করা ছাড়া সাহিত্য-কাব্য-ইতিহাস-দর্শন নিয়ে মিড-নাইট ওয়েল ধ্বংস করে ?
কিন্তু আসল বিস্ময় ছিল বইয়ের শেষে — পরিশিষ্টে ।
কী আছে এখানে ? না, তেমন কিছু না — ‘ আমার লিখে রাখা মৃত্যু তালিকা ।’
এ পরিশিষ্ট দুই মলাটের ভেতর কোনও সমাধিক্ষেত্র নয় — এক জীবন্ত মানব মানচিত্র ।
এখানে বড়ো-ছোটো বলে কিছু নেই ।
খ্যাতি-অখ্যাতির কোনও বিভাজন নেই । হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান ইহুদির কোনো বিভাজন নেই । ৮/৬ ইঞ্চির একটি পাতায়ই জায়গা পেয়েছেন — একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মানুষ, কোনো গ্রামের অখ্যাত এক বিজ্ঞান শিক্ষক, একজন কবি, একজন ফুটবল কোচ, একজন অধ্যাপক, একজন রেভারেন্ড । সবাই এখানে কেমন পাশাপাশি আড়াআড়ি ভাবে শুয়ে আছেন । এ যেন এক কসমোপলিটান সিমেটারি ।
আমরা বলতাম — ‘দাদা, এইসব কে পড়বে ?’
তিনি হেসে বলতেন — ‘আমি মরলে বুঝবে ।’
এ টাইগার দাদার আরও একটা রূপ ছিল — যেটাও আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারিনি ।
ভাষা শহিদ দিবস এলে তিনি যেন অন্য মানুষ । চোখে আগুন, গলায় কাঁপন ।
একবার তো সত্যি কি এক উন্মাদনায় পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই চলে গেলেন ঢাকা, একুশের অনুষ্ঠান দেখবেন !
ফিরে এসে আমাদের স্তব্ধ করে দিয়ে বললেন — ‘ বুকুত ভালোবাসা থাকলে পাসপোর্ট-ভিসা কিচ্ছু লাগে না । আমারে তো কেউ আটকায় নাই ।’
আমরা হেসেছি, অবাক হয়েছি, আবার ভয়ও পেয়েছি । বিপদেও তো পড়তে পারতেন । বিভুঁই বিদেশে জেল খাটতেও তো পারতেন ।
এসব তিনি ধর্তব্যের মধ্যে আনেননি । তিনি তখন অন্য মেজাজে । নুতন উন্মাদনায় দেশে ফিরেই বসে গেলেন — উনিশে মে-র কাহিনি লিপিবদ্ধ করতে ।
বললেন — ‘ ওপারে একুশের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস আছে । আমাদের পাঁচ-ছয়জন না — একেবারে এগারোটা শহিদের লাশ ! কিন্তু দেশ-বিদেশে দেখানোর মতো একখান ছেঁড়াখোড়া ইতিহাসও নাই ! আমরা সব বড়ো বড়ো বিপ্লবী, বড়ো বড়ো বিদ্বান । কয়েক বছর হইল নিজেদের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও হইল, কিন্তু এই বিষয়ে গবেষণা কই ?’
টাইগার দাদা ওপার থেকে গুচ্ছের বই নিয়ে এসেছেন গাঁটের কড়ি ফেলে । সেলিনা হোসেন ভালোবেসে দিয়েছেন প্রবন্ধের বই ‘নির্ভর করো হে ।’ এতে সঙ্কলিত ‘তৃতীয় ভুবনের সাহিত্য’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ সবাইকে ডেকে ডেকে পড়ে শুনিয়েছেন — “দেখো আমাদের ভাষা সাহিত্য, ভাষা আন্দোলন নিয়ে এই বেটিয়ে তামাম বিশ্বে কী প্রচার দিয়েছেন । এই তো কয়েক বৎসর আগে বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের অধিবেশনে এসেছিলেন । দেশে গিয়েই লিখে ফেলেছেন আমাদের কথা । এই দেখুন একেবারে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বইটি । বসির আল হেলালের ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ তো একটি মহাকাব্যোপম গ্রন্থ ।” ঝোলা থেকে ৬১২ পৃষ্ঠার বই খোলার উপক্রম করতেই শেয়ানেরা এদিক ওদিক কেটে পড়ল । আমার হাত ধরে আটকে বললেন —‘অতো ভাগাভাগি করিও না । এই পাতাটা জেরক্স করিয়া ছড়াইও সব দিকে ।’ ভেতর থেকে একটা ভাজ করা কপি বের করে দিলেন । হাতে তুলে দেখি ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর একটি বাণী — “ আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালি । মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, ধূতি, লুঙ্গি, মালা-তিলক-টিকি দিয়ে তা ঢাকার জো নেই ।”
কিছুদিন পর দেখা গেল টাইগার দাদা একখানা চটি বই নিয়ে ঘুরছেন — একে ওকে দেখাতেন, পড়ে শোনাতেন — বইটির নাম “যে সবে বঙ্গেতে জন্মে ।” ছোট্ট প্রবন্ধের বইটি আসলে অনেকগুলো তীর্যক বাক্যের সমাহার । তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যও স্পষ্ট, এ অঞ্চলের এক অবিসংবাদী নেতা — যাঁর বিরুদ্ধে তিনি অভিযোগ এনেছেন — ‘ভাষা আন্দোলনকে পিছন থেকে ছোরা মেরেছেন ।’ একটু দম নিয়ে দাদা বলেন — ‘ আমরার সম্পূর্ণ জাতর উপরে একটা ইলজাম লাগাইছইন তাইন — আমাদের বিরুদ্ধে একটা মিথ্যা অভিযোগ । কী অভিযোগ ? না, এরা নাকি বাংলাভাষা বিরোধী !’ উত্তেজিত হয়ে তিনি বলতেন উনিশে মে’র বিপরীতে যে উনিশ জুনের লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে বরাকের এক অনুন্নত মহকুমায় এর পেছনে ইঞ্জিনিয়ারিং করেছেন আমাদের এই সুসন্তান । এ জন্য কম লাঞ্ছনা গঞ্জনাও তাঁকে সইতে হয়েছে ? অনেকে বলে একাধিকবার শারীরিক নিগ্রহও সইতে হয়েছে তাঁকে ।
আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে শুরু করে টাইইগার দাদা উত্তেজিত — ‘ যেদিন সারা কংগ্রেসি নেতা হকল পিছ মারলা, সেইদিন হাইলাকান্দির আব্দুর রহমান, ওরফে পটল উকিল নেতৃত্ব না দিলে আন্দোলন শেষ অই গেছিল ! আর তুমরা ওই টাউনর নামটা ডুবাইলায় ।’
তাঁকে আর থামানো যায় না — ‘ শিলচরের কথা যত কম কওয়া যায় ততই ভালো — কেউ অগ্রসর হয় না দেখিয়া পরিতোষ পালচৌধুরী খাড়া হইলা । মিটিং করিয়া কমিটি বানানির আর অবকাশ নাই — ‘ বাবা পরিতোষ, তুমিই আমরার ডিকটেটর, আন্দোলনটা চালাইয়া যাও।’ এই ছিল অবস্থা । এখন আবার তার ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশনে লেগেছেন আমরার কতিপয় শিষ্ঠজনেরা !’
আমরা চুপ করে শুনতাম ।
তিনি বলতেন — ‘ গোলাগুলির পরের ইতিহাস ঘাটলেই বোঝা যাইব — কার ভাষাপ্রেম কতটুকু ।’ বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলত — ‘ মুজিবরের দেশ তাকি নতুন স্পিরিট লইয়া আইছ !’ তিনি রাগ করতেন না ।
আরও জোরে বলতেন — ‘ আমরার আলিগড়ি মন্ত্রী — হিস্ট্রিতে ফার্স্ট কেলাস ফার্স্ট ! কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সুনীতিবাবু, সামসুর রহমান, নীহাররঞ্জন, গোলাম মুরসিদ, হুমায়ুন আজাদ — এইসব কিছুই তাঁর পাঠ্যসূচিতে নাই । আই অ্যাম শিয়র তিনি কান পাতিয়া ‘আমার সোনার বাংলাটা’ও শুনছইন না !’
একটু থেমে — ‘ নাইলে একষট্টির আন্দোলনটা ঠিক পথে আনিয়া কাছাড়ের একটা গতি করতে পারতেন । এই ক্ষমতা তাঁর ছিল ।’
এইসব বলতে বলতেই একদিন বইখানা লিখে ফেললেন ।
এই বই বেরোনোর পর — যারা এতদিন তাঁকে নিয়ে পরিহাস করত, তারা চুপসে গেল । যে কথাটা বিপ্লবী অতিবিপ্লবীও বলতে সাহস পান না, এসব কথা অবলীলাক্রমে এ বইতে তিনি লিখে ফেললে নিন্দুকেরা বলে বইটি নাকি একেবারে অগোছালো । Biurb, ISBN এসবের বালাই নেই, স্পেলিং এক পাতায় একএক রকম, আর ভাষাটা বড্ড গ্রাম্য, আঞ্চলিক শব্দে ঠাঁসা । তিনি টান টান জবাব দেন —‘আমি কি এই কিতাব নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির দরখাস্ত দিব ? এটা একটা সামাজিক কর্তব্য, আমি বই লিখেছি; তোমরা পড়লে পড়ো, না পড়লে সরো, আমি তো মূল্যের জন্য কারও কাছে হাত পাতি না, কত কপি যে লিল্লা দিলাম তার ইয়ত্তা নাই । হ্যাঁ, যারা এসবের মূল্য বুঝেন এদের কেউ কেউ স্বতোঃপ্রণোদিত হয়ে মুদ্রণের জন্য, অথবা কাগজের মূল্য বাবৎ কিঞ্চিৎ সাহায্যের হাত বাড়ান ।’
আমাদের প্রত্যেকের মনের ভিতর এক একটা মৌলবাদী শয়তান আছে, এর বিরুদ্ধে লড়তে হলে সামাজিক প্রেক্ষিতটা এর অনুকূলে আনতে হবে। এ জন্যই আমি প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে আছি ভাষা আন্দোলনকে
এই নিয়ে টাইগার দাদা তিনটি দশকে নিজের চুল পাকিয়ে ফেললেন । যা রোজগারপাতি হয়েছে এ দিয়ে একটি গাড়িও খরিদ করে ফেললেন । এতে নিজ পরিবারের কতটুকু ভালো হল কে জানে, তবে ইতিহাসের খোঁজে এ শহর থেকে অন্য শহরে, শহরতলি, গ্রাম, বস্তি সর্বত্র বিচরণে তাঁর খুবই সুবিধা হল । আর ঘরে বিপুল পরিমাণ কাগজের পাহাড় জমে উঠলো ।
আমরা যারা তাঁর সঙ্গে আছি আবার সঙ্গে নেইও, এদের সঙ্গেই তাঁর সব পরিকল্পনা — ‘ আমাদের প্রত্যেকের মনের ভিতর এক একটা মৌলবাদী শয়তান আছে, এর বিরুদ্ধে লড়তে হলে সামাজিক প্রেক্ষিতটা এর অনুকূলে আনতে হবে । এ জন্যই আমি প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে আছি ভাষা আন্দোলনকে ।’
ইতিমধ্যে তাঁর দ্বিতীয় খণ্ড বেরোল । প্রথমটার মতো এত আগোছালো নয়, তবে খুব গোছালোও বলা যাবে না ।
‘ দেখলে তো ভাই, যত মেটেরিয়েলস জোগাড় করেছি এসব দুই মলাটের ভেতর না ধরে রাখলে সামাজিক ক্রাইম হবে । ইতিহাসের কাছে আমরা অপরাধী হয়ে থাকব ।’
শুরু হলো আবার নতুন তাড়াহুড়ো । ব্রিফকেস ভর্তি কাগজ নিয়ে বিচরণ । আর আমাদের উপর নানা ধরনের বায়না —
‘এইটা প্রেসকপি করে দাও । সূচিপত্র ঠিক করে দাও । ফটোর নিচে ক্যাপশন কী হবে ঠিক করো…’
‘ এইগুলো শেষ করে তোমাদের কারও সম্পাদনায়ই বেরোতে পারে । সব যে তোমাদের এই দাদার নামেই যেতে হবে এর কোনো মানে নেই । টাকা লাগলে আমি দেব । প্রকাশক সম্পূর্ণ ইনভেস্টমেন্ট করবে এমন বায়না আমি করব না । আমি আর কতদিন ।’
এসব করতে করতে তিনি রেডি করে ফেলেছেন তৃতীয় খণ্ড ।
প্রুফশিট দু টুকরো করে ছিঁড়ে দিলেন দুজনার হাতে — ‘ তাড়াতাড়ি দেখে দাও’— কী এক অদ্ভুত তাড়না তাঁর ।
শোনা গেল সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি হচ্ছেন তিনি । কিন্তু এখানেও নানা ধরনের প্যাঁচ । এসবের জট ছাড়ানো তাঁর কর্ম নয় ।
প্রতিনিধি সম্মেলনে আগ্রহ ভরে নিজের আসনে বসলেন । হাজার ধরনের কথা, বাক্ বিতণ্ডা, দলাদলি, উচ্চবাচ্যও হল । আমাদের টাইগার দাদা হবু সভাপতির ভঙ্গিতে মোটামুটি নীরবতা পালন করে দীর্ঘ আলোচনা শুনেই গেলেন, যা তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ । কিন্তু যথাসময়ে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর নামই প্রস্তাব হল । প্রিসাইডিং অফিসারের চেয়ার থেকে শুষ্ককণ্ঠে আরেকটি নামের প্রস্তাব আহ্বানও হল, কিন্তু এদিক ওদিক কোনো দিক থেকেই কোনো নড়নচড়ন নেই । টাইগার দাদা যা বোঝার বুঝে নিলেন । তবে তাঁর কোনো ভাবান্তর নেই । সভা শেষ হলে প্রথমেই তিনি নির্বাচিত সভাপতিকে অভিনন্দিত করতে এগিয়ে গেলেন ।
পরদিন প্রকাশ্য অধিবেশনে টাইগার দাদা নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি পরে, কাঁধে সাদা শাল ঝুলিয়ে দর্শকাসনে বসে, সময়ে সময়ে খুব হাততালি দিলেন ।
আমরা লজ্জায় পড়লাম । টাইগার দাদা যে নতুন পোশাক স্যুটকেসে লুকিয়ে এনেছিলেন এটা তাঁর স্ত্রীও জানতেন না । তবে অধিবেশন সমাপ্তির জমজমাট সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় দাদা আগ্রহ ভরে কলকাতা থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীর কণ্ঠে পুরনো দিনের আধুনিক গান শুনে চোখের জলে ভাসলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা শিল্পীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত শুনলেন চোখ বুজে । এরপর এপার ওপারের লোকসংগীত শিল্পীরা যখন নাচতে নাচতে গাওয়া শুরু করলেন, তিনি প্রথম সারিতে বসে অনেকের সঙ্গে উচ্চ রবে কণ্ঠ দিলেন, ‘গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু মুসলমান / মিলিয়া একসাথে বাংলা গান গাইতাম / আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম ।’
গত অধিবেশনের পর টাইগার দাদার প্রস্তাবে আঞ্চলিক শাখার সভাপতির আসনে এ অর্বাচীনকেই বসানো হল কেন কে জানে ! এ দায়িত্ব নিয়ে আমি মনে মনে ঠিক করলাম মনে প্রাণে ষোলআনা বাঙালি এ সহজ মানুষটাকে তাঁর যথাযোগ্য সম্মান দেব । কিন্তু কী ভাবে তা তো বুঝতে পারছি না ।
একটা সুযোগ এসে গেল । আমাদের সম্মেলনের প্রতিষ্ঠা দিবস আসছে সামনেই ।
আমি তাঁকে বললাম — ‘দাদা, আপনি আমার হয়ে পতাকা তুলবেন ?’
তিনি হেসে বললেন — ‘ এই কাজটা আমায় দিলি ?’
তিনি করলেন । অতি সংক্ষেপে অসাধারণ বক্তৃতাও করলেন । পরদিনই, তিনি চলে গেলেন ।
তাঁর তৃতীয় খণ্ড বেরোল কয়েক মাস পরে ।
আমি বই খুললাম ।
আবার সেই পরিশিষ্ট !
আর সেখানে — বিজয়বাবু । তাঁর সবচেয়ে রুঢ় সমালোচক, তাঁর নামও আছে — সম্মানের সঙ্গে ।
সেদিন বুঝলাম — টাইগার দাদা শুধু ইতিহাস লেখেননি । তিনি মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথাও লিখতে পারেন । মানুষকে ভালোবাসতেও পারেন ।
আর সেই ভালোবাসাটা একেবারে নিখাদ । এমন-কি যে ব্যক্তি তাঁর সাহিত্যকৃতি নিয়ে এত কটাক্ষ করে গেছেন, বাক্চাতুর্য দিয়ে তাঁকে নানা সময়ে অপদস্ত করেছেন, তাঁর প্রয়াণ কথাও লিখে গেছেন শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা মিশিয়ে ।
আজ এটাই মনে হয় — বিশাল পরিশিষ্টের কোথাও, নিশ্চয়ই লেখা আছে — হায়দর আলি টাইগার (টাইগার দাদা) ।
যিনি সকলের নাম মনে রেখেছিলেন, এমনকি তাদেরও, যারা তাঁকে ভুলে যেতে চেয়েছিল ।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
❤ Support Us








