Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ৫, ২০২৬

সরকারি বন্ডে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগে করমুক্তির ঘোষণা কেন্দ্রের, চাঙ্গা হবে দেশের অর্থনীতি ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সরকারি বন্ডে বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগে করমুক্তির ঘোষণা কেন্দ্রের, চাঙ্গা হবে দেশের অর্থনীতি ?

বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাজ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং বিদেশি বিনিয়োগে মন্থরতার আবহে ভারতের অর্থনীতিতে নতুন করে বিদেশি পুঁজির প্রবাহ বাড়াতে বড়ো পদক্ষেপ করল কেন্দ্র। সরকারি বন্ডে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের (এফপিআই) বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত সুদ এবং মূলধনী লাভের উপর সমস্ত কর তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল সরকার। একই সঙ্গে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই) বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারি ঋণপত্রে বিনিয়োগের একাধিক বিধিনিষেধও শিথিল করেছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতেএই যুগ্ম পদক্ষেপ আগামী কয়েক বছরে কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের বিদেশি মূলধন ভারতে টেনে আনতে পারে রুপির উপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতেও অনেকখানি সক্ষম হবে।

শুক্রবার, রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অনুমোদনের পর একটি অধ্যাদেশ জারি করে কেন্দ্র সরকার জানিয়েছেসরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের অর্জিত সুদ, সরকারি বন্ড বিক্রিবিনিময় বা হস্তান্তরের মাধ্যমে অর্জিত মূলধনী লাভের উপর আর কোনো আয়কর ধার্য হবে না। ৫ জুন প্রকাশিত সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ীএই করছাড় ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে।  এত দিন পর্যন্ত সরকারি বন্ডে বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের উপর ১২.৫ শতাংশ এবং স্বল্পমেয়াদি মূলধনী লাভের উপর ৩০ শতাংশ কর দিতে হতো। পাশাপাশি সরকারি বন্ড থেকে প্রাপ্ত সুদের উপর প্রায় ২০ শতাংশ হারে উইথহোল্ডিং ট্যাক্সও দিতে হতো। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিচারে করহারকে তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি বলেই মনে করতেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ওই কর কাঠামো ভারতের সরকারি ঋণবাজারে বৃহৎ বিদেশি তহবিলের প্রবেশের অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অর্থ মন্ত্রকের বক্তব্যভারতের পুঁজিবাজারকে আরও গভীর ও শক্তিশালী করে তোলাসরকারি ঋণবাজারে বিদেশি অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা আর দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করাই নতুন সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। মন্ত্রকের দাবিএর ফলে শুধু বিদেশি মুদ্রা প্রবাহ বাড়বে নাবরং দেশের সার্বভৌম ঋণবাজারে আরও মসৃণ ইয়েল্ড কার্ভ’ গড়ে উঠবে। বিশেষ করে পেনশন তহবিলবিমা সংস্থা এবং সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় সরকারি বন্ডে আরও বেশি আগ্রহ দেখাতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।

করছাড় ঘোষণার পাশাপাশি আরবিআই-ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধ তুলে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, ‘ফুল্লি অ্যাক্সেসিবল রুট (এফএআর)এর আওতায় এখন থেকে ১৫ বছর৩০ বছর এবং ৪০ বছরের সমস্ত নতুন সরকারি বন্ড অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশিসরকারি সিকিউরিটিজে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগসীমাকনসেন্ট্রেশন লিমিট এবং নির্দিষ্ট সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও সামগ্রিক বিনিয়োগসীমা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে মোট বকেয়া স্টকের ৬ শতাংশ এবং রাজ্য সরকারি সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি বহাল থাকবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে ভারতের বৈদেশিক খাত নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের গতি উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিদেশি  বিনিয়োগকারীদের একাংশ ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকেও অর্থ তুলে নিয়েছেন। এর ফলে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টস বা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের উপর চাপ বেড়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ীবর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা সরকারি বন্ডের পরিমাণ প্রায় ৩.৭৫ লক্ষ কোটি টাকাযা অনুমোদিত বিনিয়োগসীমার মাত্র ৩.৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য এখনো বিপুল পরিসর খোলা রয়েছে। সে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাইছে কেন্দ্র সরকার ও আরবিআই।

বাজার বিশেষজ্ঞদের একাংশের হিসাবকর সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ার ফলে আগামী দুবছরে ভারতীয় সরকারি ঋণবাজারে ৪৫ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নতুন বিদেশি পুঁজি প্রবেশ করতে পারে। এ প্রবাহ বাস্তবায়িত হলে রুপির উপর চাপ কমবেবৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার আরও শক্তিশালী হবে, এমনকি সরকারের ঋণ সংগ্রহের খরচও কমতে পারে। বর্তমানে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশ। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল আমদানির উপর নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের ওঠানামা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে বিদেশি  বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ায় বৈদেশিক খাতে চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতেএ পরিস্থিতিতে সরকারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা ভারতের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

তবে, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী নয়বিদেশে বসবাসকারী ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে কেন্দ্র। বাজেট ২০২৬-২৭-এর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এখন থেকে বিদেশে বসবাসকারী ব্যক্তিরা তালিকাভুক্ত ভারতীয় সংস্থার শেয়ারে পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট স্কিমের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে পারবেন। আগে এ সুবিধা মূলত অনাবাসী ভারতীয় এবং ওসিআইদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। পাশাপাশি কোনো সংস্থায় একক বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগসীমা ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ এবং সব মিলিয়ে মোট সীমা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৪ শতাংশ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিদেশি ঋণ সংগ্রহকেও উৎসাহ দিতে আরবিআই একাধিক বিশেষ ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির বিদেশি বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রে রেয়াতি বৈদেশিক মুদ্রা চালানোর সুবিধা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিদেশি মুদ্রায় সংগৃহীত নির্দিষ্ট মেয়াদের ব্যাঙ্ক আমানতের সম্পূর্ণ হেজিং খরচও সাময়িক ভাবে নিজে বহন করবে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!