- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ৩০, ২০২৬
দিল্লিতে স্বাস্থ্যসামগ্রী ক্রয়ে ৬৫০ কোটির দুর্নীতি ! গ্রেফতার দুই কর্মকর্তা, চাপে রেখা গুপ্তার সরকার
রাজধানী দিল্লির সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঘিরে সামনে এল একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। সরকারি হাসপাতালের জন্য ওষুধ, চিকিৎসা-সরঞ্জাম ও দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসামগ্রী কেনাকাটায় প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ঘিরে তোলপাড় রাজধানী। ইতিমধ্যেই দিল্লি সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের দুই শীর্ষ আধিকারিক— সেন্ট্রাল প্রোকিউরমেন্ট এজেন্সি (সিপিএ)-র প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক (হেড অব অফিস) ডা. বিজয় কুমার রঙ্গা এবং প্রাক্তন ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (ডিজিএইচএস) ডা. বৎসলা আগরওয়ালকে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশের দুর্নীতি দমন শাখা (এসিবি)। মামলার তদন্তে উঠে এসেছে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে পরিকল্পিত ভাবে দরপত্রে কারচুপি, বাজারদরের বহু গুণ বেশি দামে চিকিৎসা-সরঞ্জাম কেনা এবং সরকারি অর্থ অপব্যবহারের একাধিক অভিযোগ।
দিল্লি সরকারের ভিজিল্যান্স দফতরের অভিযোগ, স্বাস্থ্য দফতরের অধীনস্থ সেন্ট্রাল প্রোকিউরমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে ওষুধ, সার্জিক্যাল সামগ্রী, চিকিৎসা-উপভোগ্য পণ্য, হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং উচ্চমূল্যের চিকিৎসা যন্ত্র কেনার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কয়েকটি সংস্থাকে সুবিধা পাইয়ে দিতে দরপত্রের শর্ত বদলে দেওয়া হয়েছিল। সে অভিযোগের ভিত্তিতেই গত ২ জুন দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করে ‘এসিবি’। তার পর থেকে সরকারি নথি, দরপত্র, অর্থপ্রদানের রেকর্ড এবং ‘ই-প্রকিউরমেন্ট’ সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখা শুরু হয়। তদন্ত যত এগিয়েছে, অভিযোগের পরিধিও তত বেড়েছে। এসিবি-র দাবি, পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন, সি-আর্ম রেডিওলজিক্যাল যন্ত্র, অ্যানাস্থেশিয়া ওয়ার্কস্টেশন, ওআরএস, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, সার্জিক্যাল ড্রেসিং, ক্যানুলা, গ্লাভস, এমনকি হাসপাতালের বিছানার চাদর ও লিনেন কেনার ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক মূল্য ধার্য করা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ক্রয়-সংক্রান্ত ফাইল তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ।
তদন্তে উঠে এসেছে, ওই ফাইলগুলি নিজের ব্যক্তিগত হেফাজতেই রেখেছিলেন ডা. বিজয় কুমার রঙ্গা। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে না পারায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালত তাঁকে চার দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠায়। তদন্তকারীদের মতে, নিখোঁজ নথি উদ্ধার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান, সম্ভাব্য সুবিধাভোগী এবং বৃহত্তর চক্রকে চিহ্নিত করতেই হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। তদন্তকারীদের সামনে যে তথ্য এসেছে, তা আরও বিস্ময়কর। দিল্লি সরকারের অধীনে থাকা বিভিন্ন হাসপাতালের ‘ইনডোর’ বিভাগে মোট শয্যার সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। অথচ সেই হাসপাতালগুলির জন্য প্রায় সাড়ে ১৬ লক্ষ বিছানার চাদর কেনা হয়েছে। সরকারি সূত্রেই প্রশ্ন উঠেছে, মাত্র ১৫ হাজার শয্যার জন্য এত বিপুল সংখ্যক চাদরের প্রয়োজন হল কেন? শুধু সংখ্যাই নয়, দাম নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বাজারে প্রায় ১৫০ টাকায় পাওয়া যায় এমন একটি চাদরের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪০০ টাকা।
একই ছবি দেখা গিয়েছে ওআরএস কেনার ক্ষেত্রেও। বাজারে যেখানে একটি ওআরএস প্যাকেটের দাম ১৫ টাকার কাছাকাছি, সেখানে নিয়মিত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিটি প্যাকেট কেনা হয়েছে ২০৫ টাকা দরে বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, এ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৫০ লক্ষ ওআরএস প্যাকেট কেনা হয়েছিল। দিল্লি জুড়ে তাপপ্রবাহের সময় যে ‘কুলিং জোন’ তৈরি করে বিনামূল্যে ওআরএস বিলি করা হয়েছিল, সেই প্রচারাভিযান নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ওই প্রচারের আড়ালেই বিপুল পরিমাণ ওআরএস কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল। চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও অভিযোগ কম গুরুতর নয়। বাজারে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা দামের একটি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন কেনা হয়েছে ৩৩ লক্ষ টাকায়। তদন্তে জানা গিয়েছে, এ ধরনের মোট ৪৪৮টি যন্ত্র কেনা হয়েছিল। বাজারদর অনুযায়ী যার মোট মূল্য হওয়া উচিত ছিল প্রায় ৪৫ কোটি টাকা, সেখানে সরকারি নথিতে তার জন্য খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা।
একই ভাবে, প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা দামের সি-আর্ম রেডিওলজিক্যাল যন্ত্র কেনা হয়েছে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা দরে। অ্যানাস্থেশিয়া ওয়ার্কস্টেশন, সার্জিক্যাল কনজ়িউমেবল এবং একাধিক জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, অনিয়ম শুধুমাত্র অতিরিক্ত দাম দিয়ে কেনাকাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ, প্রকৃত প্রতিযোগীদের সরিয়ে রাখতে দরপত্রের প্রযুক্তিগত যোগ্যতা এমন ভাবে তৈরি করা হতো, যাতে আগে থেকেই নির্ধারিত কয়েকটি সংস্থাই যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। টার্নওভার, অভিজ্ঞতা এবং পূর্ববর্তী কাজের শর্ত এমন মাত্রায় বেঁধে দেওয়া হতো যে অধিকাংশ সংস্থাই প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ত। পরে নির্বাচিত সংস্থাগুলির দরপত্র দ্রুত অনুমোদন করা হতো। এমনকি সরকারি ‘ই-মার্কেটপ্লেস’ এবং ‘ই-প্রকিউরমেন্ট’ ব্যবস্থার স্বাভাবিক নিয়মও বহু ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ।
তদন্তকারীদের নজরে এসেছে এক প্রভাবশালী ‘লিয়াজোঁকারী’ বা ‘ব্রোকার’-এর ভূমিকাও। অভিযোগ, ওই ব্যক্তি একাধিক শেল কোম্পানি তৈরি করে বিভিন্ন প্রস্তুতকারক সংস্থার সঙ্গে যোগসাজশে দরপত্রের শর্ত তৈরি করতেন। প্রযুক্তিগত স্পেসিফিকেশন থেকে শুরু করে মূল্যায়নের নথি পর্যন্ত তাঁরাই তৈরি করে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের হাতে তুলে দিতেন। এমনকি টেন্ডার কমিটির উপর চাপ সৃষ্টি করে সে শর্ত অনুমোদন করানো হতো বলেও অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, আর্থিক দরপত্র অনেক ক্ষেত্রে একই দিনে গোপনে খোলা হতো, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাতে-কলমে অনুমোদন দিয়ে ক্রয়াদেশ জারি করা হতো। আরও গুরুতর অভিযোগ, সরকারি পোর্টালে বহু দরপত্র, যেখানে কাজ সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছে, অর্থপ্রদানও শেষ হয়েছে, সেগুলিকে ইচ্ছাকৃত ভাবে ‘অ্যাকটিভ’ বা ‘আন্ডার প্রসেস’ হিসেবে দেখানো হতো। এর ফলে অন্য সরবরাহকারী বা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকৃত তথ্য জানা সম্ভব ছিল না। আবার বৈধ সংস্থাগুলির বিল বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হলেও নির্দিষ্ট কয়েকটি সংস্থার বিল এক-দুদিনের মধ্যেই মিটিয়ে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ।
ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, গত ছয় মাসে প্রকৃত চাহিদা ছাড়াই ৬৫০ কোটিরও বেশি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসা-সরঞ্জাম কেনা হয়েছিল। সরকারি হাসপাতালগুলি সেই অতিরিক্ত সরঞ্জাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করলে ইন্দিরা গান্ধী সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল, রাজীব গান্ধী সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল-সহ পাঁচটি বড়ো সরকারি হাসপাতালে আলাদা গুদাম তৈরি করে বিপুল পরিমাণ মালপত্র মজুত রাখা হয়। অভিযোগ, সে সময়ই ডা. রঙ্গা হঠাৎ দীর্ঘ ছুটিতে চলে যান। এ ঘটনার জেরে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার সরকার চাপে পড়েছে। যদিও বিজেপির দাবি, এই অনিয়ম তাদের আমলে ধরা পড়েছে, এতে সরকারের সদিচ্ছাই প্রমাণিত হচ্ছে। সরকারই তদন্তের নির্দেশ দিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। পদ্মশিবিরের বক্তব্য, অতীতে আম আদমি পার্টির সরকার এ ধরনের অভিযোগে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
অন্যদিকে, দিল্লির প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা আম আদমি পার্টির নেতা সৌরভ ভরদ্বাজের অভিযোগ, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরই হাসপাতালগুলির কাছ থেকে চিকিৎসা-সরঞ্জাম কেনার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তা সেন্ট্রাল প্রোকিউরমেন্ট এজেন্সির হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, নিজেদের পছন্দের আধিকারিককে ডিজিএইচএস পদে বসানোর পর থেকেই পরিকল্পিত লুটপাট শুরু হয়। ভরদ্বাজ বলেন, ‘দিল্লির মানুষ হঠাৎ দেখলেন সর্বত্র ওআরএস নিয়ে প্রচার চলছে, কুলিং জোন তৈরি হচ্ছে, বিনামূল্যে ওআরএস বিলি হচ্ছে। এখন বোঝা যাচ্ছে, ওই প্রচারের আড়ালেই ৫০ লক্ষ ওআরএস কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল।’ তাঁর কটাক্ষ, ‘২৭ বছর পরে দিল্লিতে ক্ষমতায় এসে বিজেপি প্রথম ১৬ মাসেই ৬৫০ কোটি টাকার স্বাস্থ্য কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী না কি কিছুই জানতেন না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।’ রাজধানীতে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন এইমস, সফদরজং এবং রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতাল থাকলেও, দিল্লি সরকার ও পুরসভার অধীনে মোট ৪২টি হাসপাতাল রয়েছে। দুই কোটিরও বেশি জনসংখ্যার বড়ো অংশই সরকারি হাসপাতালগুলির উপর নির্ভরশীল। ফলে হাসপাতালগুলির কাছ থেকে স্বাধীন ভাবে চিকিৎসা-সরঞ্জাম কেনার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা।
এদিকে, দিল্লির এমন অভিযোগ সামনে আসার পর বিজেপি-শাসিত আরও কয়েকটি রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের ক্রয়-প্রক্রিয়াও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ছত্তিশগড়ে সরকারি অডিটে ধরা পড়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাজারে সাড়ে ৮ টাকার রক্ত সংগ্রহের ইডিটিএ টিউব ২,৩৫২ টাকা দরে কেনা হয়েছিল। প্রায় ৫ লক্ষ টাকা দামের সম্পূর্ণ রক্তপরীক্ষার (সিবিসি) যন্ত্র কেনা হয়েছিল ১৭ লক্ষ টাকায়। সে ঘটনায় সরকারি কোষাগারের প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ ওঠে। উত্তরপ্রদেশেও সম্প্রতি লখনউয়ের কিং জর্জ’স মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে ক্যানসারের ওষুধ সরবরাহ নিয়ে নতুন বিতর্ক সামনে আসে। তদন্তে অভিযোগ, প্রায় দু–কোটি টাকার ক্যানসারের ওষুধ ও ইনজেকশন অজ্ঞাতপরিচয় রোগীদের নামে বরাদ্দ করা হয়েছিল। একই সঙ্গে একাধিক রোগীর শরীরে সরকারি বিমার খরচে একাধিক বার স্টেন্ট বসানোর ঘটনাও সামনে আসে। যদিও এর আগেই মায়াবতী সরকারের আমলে জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশনের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার বিচার এখনো চলছে।
মহারাষ্ট্রেও শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের রক্তাল্পতা রোধে সরবরাহ করা আয়রন সিরাপ গুণগত মান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র এক মাসের মধ্যেই সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং সংস্থাটি আবার প্রায় ১০০ কোটি টাকার নতুন বরাত পাওয়ার দৌড়ে ফিরে আসে বলে অভিযোগ। ফলে, দিল্লির স্বাস্থ্য-ক্রয় কেলেঙ্কারির তদন্ত এখন কেবল দুই আধিকারিকের ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দুর্নীতির জাল রাজধানী ছাপিয়ে বিজেপি শাসিত বহু রাজ্যেই বিস্তার করেছে বলে দাবি বিরোধীদের।
❤ Support Us








