- বি। দে । শ
- জুলাই ১৫, ২০২৬
মহাকাশে ফের ভারতীয় বংশোদ্ভূত! তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নাসার নভোচারী অনিল মেনন
পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের (আইএসএস) দরজা খুলতেই অপেক্ষায় ছিলেন অভিযানের অন্য সদস্যেরা। করমর্দন, আলিঙ্গন আর উচ্ছ্বাসের মধ্যেই শুরু হল নাসার মহাকাশচারী অনিল মেননের জীবনের নতুন অধ্যায়। কল্পনা চাওলা, সুনীতা উইলিয়ামস, রাজা চারির পর আরও এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভোচারীর নাম জুড়ে গেল মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে। মঙ্গলবার কাজাখস্তানের ঐতিহাসিক বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে রাশিয়ার সোয়ুজ এমএস-২৯ মহাকাশযানে চেপে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন নাসার মহাকাশচারী অনিল মাধবন সমইলেঙ্কো মেনন। তিন ঘণ্টারও কিছু বেশি সময়ের সফল অভিযাত্রার শেষে বুধবার ভোরে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছন।
‘রসকসমস’ সংস্থা পরিচালিত ‘এক্সপিডিশন-৭৫’ অভিযানে ক্রু সদস্য এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অনিল। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন রুশ মহাকাশচারী পিওতর দুব্রভ এবং আন্না কিকিনা। দুব্রভ ও কিকিনার এটি দ্বিতীয় মহাকাশ অভিযান হলেও অনিলের কাছে এ যাত্রা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আগামী প্রায় আট মাস আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কাটানোর কথা তাঁদের। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে পৃথিবীতে ফিরবেন তিন নভোচারী। মঙ্গলবার ভারতীয় সময় রাত ৮টা ১৭ মিনিটে বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে উৎক্ষেপিত হয় ‘সোয়ুজ এমএস-২৯’। উৎক্ষেপণের সময় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনটি কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে ওই অঞ্চলের উপর দিয়েই অতিক্রম করছিল। মাত্র আট মিনিটের মধ্যেই মহাকাশযানটি প্রাথমিক কক্ষপথে পৌঁছে যায়। তার পর শুরু হয় আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের দিকে সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশে পরিচালিত দীর্ঘ কক্ষপথীয় যাত্রা। রাত ১১টা ৫২ মিনিট নাগাদ স্টেশনের ‘প্রিচাল’ মডিউলে সফল ভাবে ‘ডক’ করে মহাকাশযানটি।
‘ডকিংয়ে’র পরে নিয়মমাফিক একাধিক প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। মহাকাশযান ও স্টেশনের সমস্ত ব্যবস্থা স্বাভাবিক রয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়ার পর ভারতীয় সময় রাত প্রায় ২টো নাগাদ খোলা হয় ‘হ্যাচ’। সে মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের বাসিন্দা নভোচারীরা নতুন সদস্যদের স্বাগত জানান। যদিও ঐতিহাসিক মুহূর্তে সামান্য প্রযুক্তিগত সমস্যারও সৃষ্টি হয়েছিল। ‘হ্যাচ’ খোলার ঠিক আগে স্টেশন থেকে সরাসরি সম্প্রচার হঠাৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে জানা যায়, ‘ট্র্যাকিং’ এবং ‘ডেটা রিলে’ স্যাটেলাইটের সঙ্গে যোগাযোগ সাময়িক ভাবে হারিয়ে যাওয়ায় ওই সমস্যা হয়েছিল। প্রায় ১২ মিনিট পরে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হলে সম্প্রচারও স্বাভাবিক হয়ে যায়। অনিলের এ যাত্রার সাক্ষী থাকতে বাইকোনুরে উপস্থিত ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা। ছিলেন তাঁর স্ত্রী, মহাকাশচারী আন্না ভিলহেল্ম। ২০২৪ সালে স্পেসএক্স পরিচালিত ব্যক্তিগত মহাকাশ অভিযান ‘পোলারিস ডন’-এ অংশ নিয়ে তিনি মহাকাশে গিয়েছিলেন। নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানও উৎক্ষেপণস্থলে উপস্থিত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে অনিল যোগ দিয়েছেন নাসার জেসিকা মেয়ার, জ্যাক হ্যাথাওয়ে ও ক্রিস উইলিয়ামস, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার নভোচারী সোফি আদেনো ও রসকসমসের সের্গেই কুদ-সভার্চকভ, সের্গেই মিকায়েভ ও আন্দ্রেই ফেদিয়ায়েভের সঙ্গে। নাসার তরফে জানানো হয়েছে, এ অভিযানে অনিল এমন একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় অংশ নেবেন, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নত করা। একই সঙ্গে এ গবেষণার ফল পৃথিবীর চিকিৎসা ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। মহাকাশে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে মানবদেহে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা হবে। বিশেষ করে রক্তপ্রবাহ, শিরার গঠন এবং রক্তের বিভিন্ন উপাদানের উপর মাইক্রোগ্র্যাভিটির প্রভাব খতিয়ে দেখা হবে। চাঁদ বা মঙ্গলের মতো দূরবর্তী গন্তব্যে ভবিষ্যতের মানব অভিযান সফল করতে এসব তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা।
এছাড়াও, মহাকাশ স্টেশনের পানযোগ্য জল ব্যবহার করে শিরায় প্রয়োগযোগ্য তরল বা ইনট্রাভেনাস ফ্লুইড তৈরির প্রযুক্তি পরীক্ষাতেও অংশ নেবেন অনিল। পৃথিবী থেকে বহু দূরে দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে চিকিৎসা সামগ্রী সীমিত থাকলে এ প্রযুক্তি প্রাণরক্ষাকারী হয়ে উঠতে পারে। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ক্রিস্টাল তৈরির গবেষণাও তাঁর দায়িত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞানীদের আশা, মহাকাশের বিশেষ পরিবেশে তৈরি এ ক্রিস্টাল ভবিষ্যতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর প্রযুক্তি ও উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। ‘অগমেন্টেড রিয়্যালিটি’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর ‘আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি’র পরীক্ষাও চালাবেন তিনি। এ গবেষণার উদ্দেশ্য, ভবিষ্যতের মহাকাশচারীরা যাতে পৃথিবী থেকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা ছাড়াই নিজেদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারেন।
অনিল মেননের জীবনপথও কম বৈচিত্র্যময় নয়। আমেরিকার মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে জন্ম তাঁর। বাবা কে. পি. শঙ্করণ মেননের শিকড় কেরালার পালাক্কাড় জেলার ওট্টাপালামে। মা এলিজাবেথ ইউক্রেন থেকে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া অভিবাসী। ভারতীয় ও ইউক্রেনীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করেই বড়ো হয়েছেন তিনি। মিনেসোটার সেন্ট পল অ্যাকাডেমি অ্যান্ড সামিট স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯৫ সালে উচ্চশিক্ষার পথে যাত্রা শুরু করেন অনিল। ১৯৯৯ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউরোবায়োলজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এর পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুল থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৯ সালে জরুরি চিকিৎসাবিজ্ঞানে রেসিডেন্টশিপ সম্পন্ন করার পর ২০১০ সালে ওয়াইল্ডারনেস মেডিসিনে ফেলোশিপ পান।
পেশাগত জীবনে তিনি একাধারে চিকিৎসক, প্রকৌশলী এবং সামরিক আধিকারিক। মার্কিন বিমানবাহিনীতে দীর্ঘ দিন কর্মরত ছিলেন তিনি। আফগানিস্তানে ‘অপারেশন এন্ডিউরিং ফ্রিডম’-এর সময় সম্মুখসারিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে ‘হিমালয়ান রেসকিউ অ্যাসোসিয়েশন’-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে মাউন্ট এভারেস্টে আরোহীদের চিকিৎসাসেবাও দিয়েছেন। ভারতের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক রয়েছে। রোটারি অ্যাম্বাসাডোরিয়াল স্কলার হিসেবে এক বছর ভারতে থেকে পোলিও টিকাকরণ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে নাসায় ফ্লাইট সার্জন হিসেবে যোগ দেন অনিল। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত নভোচারীদের চিকিৎসা-সহায়তার দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি একাধিক ‘সয়ুজ’ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আকাশে এক হাজার ঘণ্টারও বেশি উড্ডয়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
অবশেষে, ২০১৮ সালে তিনি স্পেসএক্সে যোগ দেন। সেখানে সংস্থার চিকিৎসা কর্মসূচি গড়ে তোলেন। প্রথম মানববাহী ‘স্পেসএক্স’ অভিযানের প্রস্তুতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। চাঁদ, মঙ্গল কিংবা আরও দূরের অভিযানের জন্য নির্মিত ‘স্টারশিপ’ প্রকল্পের উন্নয়নেও তিনি ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত ছিলেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নাসার মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর শুরু হয় কঠোর প্রশিক্ষণ। প্রায় পাঁচ বছরের দীর্ঘ প্রস্তুতি আর প্রতীক্ষার পর অবশেষে বাস্তবায়িত হলো তাঁর মহাকাশে উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন। অন্যদিকে, এ অভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারত-রাশিয়া মহাকাশ সহযোগিতারও এক প্রতীকী অধ্যায়। রাশিয়ার আন্তর্জাতিক মানবিক সহযোগিতা সংস্থা ‘রসসত্রুদনিচেস্তভোর’ প্রধান ইয়েলেনা রেমিজোভা জানিয়েছেন, এ অভিযানে ভারতীয় স্কুলপড়ুয়াদের আঁকা কিছু ছবিও মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। ইউরি গ্যাগারিনের ঐতিহাসিক মহাকাশযাত্রার ৬৫ বছর পূর্তি এবং ভারত-রাশিয়া মহাকাশ সহযোগিতাকে স্মরণ করেই আয়োজন করা হয়েছিল ‘ফার্স্ট ফরএভার’ প্রতিযোগিতা। সে প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের আঁকা ছবিগুলিও এখন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে।
❤ Support Us








