Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
  • জুলাই ১৫, ২০২৬

হরমুজ প্রণালী ঘিরে ফের যুদ্ধের আশঙ্কা, ইরানের জ্বালানি রফতানি বন্ধের হুঁশিয়ারি; মার্কিন অবরোধে তীব্র উত্তেজনা পশ্চিম এশিয়ায়

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হরমুজ প্রণালী ঘিরে ফের যুদ্ধের আশঙ্কা, ইরানের জ্বালানি রফতানি বন্ধের হুঁশিয়ারি; মার্কিন অবরোধে তীব্র উত্তেজনা পশ্চিম এশিয়ায়

ইরানের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় নৌ অবরোধ জারি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে । হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলির উপর ইরানের হামলার অভিযোগ তুলে বুধবার ভোরে ইরানের বন্দরগুলির বিরুদ্ধে ফের অবরোধ কার্যকর করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী ।

এর পরেই মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে এমন কয়েকটি উপসাগরীয় দেশকে লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান । একই সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে হওয়া অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তিও কার্যত ভেঙে পড়ার মুখে ।

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে । গত কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে ফের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ।

 

হরমুজ প্রণালী নিয়ে সংঘাত বাড়ছে

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে প্রথম নৌ অবরোধ জারি করেছিল। পরে জুনের মাঝামাঝি সময়ে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি স্বাক্ষরের পরের দিন সেই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।

ওই চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালী নিয়ে সামরিক সংঘাত বাড়তে থাকায় সেই আলোচনা কার্যত স্থগিত হয়ে পড়েছে।

বুধবার ইরানের আধাসামরিক বাহিনী রেভলিউশনারি গার্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছে, মার্কিন অবরোধ অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমস্ত তেল ও গ্যাস রফতানি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

রেভলিউশনারি গার্ডের বার্তা: “এই অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস রফতানি হবে হয় সকলের জন্য, নয়তো কারও জন্যই নয়।”

 

অবরোধ চালুর সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন-ইরান পাল্টা হামলা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার অবরোধ পুনরায় চালুর ঘোষণা করার সময় জানিয়েছিলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলির উপর ২০ শতাংশ ফি বা শুল্ক আরোপ করা হবে।

তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই পরিকল্পনা বাতিল করেন তিনি। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলির অনুরোধের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প জানান, জাহাজ থেকে ফি নেওয়ার পরিবর্তে অন্য কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অবরোধ কার্যকর হওয়ার পরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, সাত ঘণ্টার অভিযানে ইরানের কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।

 

বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

বুধবার ভোরে বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি করা হয়। এই দুই দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে । গত কয়েক দিন ধরে এই ধরনের হামলা প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে, যা যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। জর্ডান জানিয়েছে, তারা ইরানের ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। যদিও ইরান দাবি করেছে, ওই তিন দেশের উপর তারাই হামলা চালিয়েছে । মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জানিয়েছেন, ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলির উপর কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, “মার্কিন বাহিনী ইরানের অযৌক্তিক আগ্রাসনের জন্য তাদের দায়ী করছে, যা নিরীহ মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ফেলছে ।”

আরব সাগরে বড় আকারে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি

মার্কিন নৌবাহিনীর অন্তত ১৯টি যুদ্ধজাহাজ বর্তমানে আরব সাগরে মোতায়েন রয়েছে । এর মধ্যে রয়েছে, দুটি বিমানবাহী রণতরী, একটি অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট শিপ, ১ হাজারের বেশি মার্কিন মেরিন সেনা । সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শতাধিক মার্কিন সামরিক বিমান অভিযান চালাচ্ছে ।

হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালীর পথ বন্ধ করে দিয়েছিল । ইরানের জাহাজে হামলা ও হুমকির কারণে বিশ্ব বাজারে দ্রুত বেড়ে যায় অপরিশোধিত তেলের দাম, সারের দাম, বিভিন্ন পণ্যের মূল্য । সম্প্রতি ইরান হরমুজ প্রণালীর এমন একটি পথে চলাচলকারী জাহাজগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যা ওমানের কাছাকাছি এবং মার্কিন সামরিক নজরদারির আওতায় রয়েছে ।

ওই পথটি ইরানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হওয়ায় নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে । যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া হবে । তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ কার্যকর করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় সামরিক বহর পাঠাতে হবে । এমনকি কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার স্থলসেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে ।

রাষ্ট্রসংঘে ইরানের অভিযোগ

রাষ্ট্রসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি মার্কিন হামলার তীব্র সমালোচনা করেছেন । রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা IRNA-র খবর অনুযায়ী, রাষ্ট্রসংঘের প্রধানের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রই আগ্রাসনকারী, আক্রান্ত পক্ষ নয় ।”

মঙ্গলবার ট্রাম্প জানান, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের “রাজা ও আমিররা” তাঁকে ফোন করেছিলেন । তাঁরা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের উপর ফি বসানোর পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে ট্রাম্প দাবি করেন । ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “তাঁরা বলেছেন, আমরা অন্যভাবে করতে চাই। আমরা যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চাই ।” ট্রাম্প জানান, তিনি জাহাজ চলাচলের উপর টোল আরোপের পরিবর্তে বিনিয়োগের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন । তাঁর বক্তব্য, “আমি মনে করি না, কেউ এই প্রণালীর জন্য ফি নিতে পারে ।”

তবে এই বিনিয়োগ নতুন প্রতিশ্রুতি কি না, তা স্পষ্ট নয় । গত বছর মধ্যপ্রাচ্য সফরের পর ঘোষিত বিনিয়োগের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও পরিষ্কার হয়নি । মঙ্গলবার রাতে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, আগামী দু’দিনের মধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরও মার্কিন হামলা হতে পারে । তিনি সতর্ক করেন, আলোচনা শুরু না হলে আগামী সপ্তাহে, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো লক্ষ্য করা হতে পারে । এর আগে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত একটি সেতুতে হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে ।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইরানের বিভিন্ন এলাকায় তারা হামলা চালিয়েছে । ইরান হামলার কথা স্বীকার করলেও হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি । মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের পারস্য উপসাগরীয় শহর বুশেহরে অন্তত চারটি জায়গায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায় । এছাড়াও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আহভাজ, দক্ষিণের বন্দর শহর বান্দার আব্বাসে । এই হামলার পর সন্দেহ তৈরি হয়েছে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলি প্রকাশ্যে ঘোষণা না করেই ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে কি না । কুয়েত জানিয়েছে, ইরানের হামলায় তাদের নৌবাহিনীর চার সদস্য আহত হয়েছেন এবং একটি ভবনে আগুন লেগেছে ।

অন্তর্বর্তী চুক্তি অনুযায়ী, ইরান ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিনা ফিতে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিয়েছিল । তবে ৬০ দিনের পর পরিস্থিতি কী হবে, তা চুক্তিতে স্পষ্ট করা হয়নি । ইরানের দাবি, এই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার এবং প্রয়োজনে ফি নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে । যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে ।

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মঙ্গলবার সকালে সাময়িকভাবে ব্যারেল প্রতি ৮৭ ডলারের উপরে উঠে যায় । তবে যুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময় যে দাম প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল, তার তুলনায় এটি এখনও কম । ট্রাম্প অবরোধের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘোষণা করার পর তেলের দাম কমে প্রায় ৭৮ ডলারে নেমে আসে । এদিকে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলি এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ফের আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!