- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ১৫, ২০২৬
আমরণ অনশনের ১৮ দিনেও অটল সোনম ওয়াংচুক। শারীরিক অবস্থার অবনতিতে উদ্বেগ, চিকিৎসার দাবিতে আদালতের হস্তক্ষেপের আর্জি
শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, ওজন কমছে দিন দিন, পেশি ক্ষয়ে যাচ্ছে দ্রুত। চিকিৎসক ও সহযোদ্ধাদের উদ্বেগ বাড়লেও নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও সরতে নারাজ লাদাখের পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক। যন্তর মন্ত্ররের অনশন মঞ্চ থেকেই তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘আমাকে অনশন ভাঙতে বলবেন না। সরকারকে প্রশ্ন করুন, কেন তারা আলোচনাতেও বসতে চাইছে না।’ অন্যদিকে, অবিলম্বে তাঁর চিকিৎসা ও জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে দিল্লি হাই কোর্টে দায়ের হয়েছে জনস্বার্থ মামলা। আদালত জানিয়েছে, বিষয়টির জরুরি গুরুত্ব বিবেচনা করে বৃহস্পতিবারই মামলার শুনানি হবে।
দিল্লির জন্তর মন্তরে নিট-সহ বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষায় কথিত অনিয়ম ও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনের আবহে বুধবার ১৮তম দিনে পা দিল লাদাখের পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের আমরণ অনশন। একই সঙ্গে ২০ জুন শুরু হওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র অবস্থান-বিক্ষোভও পৌঁছে গেল ২৬তম দিনে। আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অভিঘাতের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা। সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে প্রতিদিন সমাজমাধ্যমে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করছেন। তাঁর সর্বশেষ আপডেটে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক ছবি। দিপকের দাবি, অনশন শুরুর পর থেকে ওয়াংচুকের ওজন কমেছে ৮.৪ কেজিরও বেশি। শরীরে পেশির ভর দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। দীর্ঘ অনাহারের ফলে তীব্র শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটছে তাঁর। স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর রক্তচাপ নেমে এসেছে ১০৯/৭০-এ।
দিপকে জানান, তিনি নিজেও ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু শান্ত গলায় ওয়াংচুক তাঁকে বলেন, ‘আমাকে থামতে বলবেন না। সরকারকে জিজ্ঞেস করুন, তারা কেন দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসতে এত ভয় পাচ্ছে ?’ আন্দোলনকারীদের দাবি, এ মন্তব্যই বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতি ওয়াংচুকের মূল বার্তা। গত ২০ জুন নিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলনের শুরু থেকেই ‘সিজেপি’-র পাশে থাকার কথা ঘোষণা করেছিলেন ওয়াংচুক। পরে তিনি কেন্দ্রকে ২৭ জুন পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। সেই সময়ের মধ্যে সরকারের কাছ থেকে কোনো সদর্থক প্রতিক্রিয়া না পাওয়ায় ২৮ জুন থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন তিনি। তারপর কেটে গিয়েছে আঠারো দিন। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এ পর্যন্ত সরকারের তরফে কোনো অর্থবহ সংলাপের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘিরে উদ্বেগ আদালত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর জীবনরক্ষা ও জরুরি চিকিৎসার দাবিতে দিল্লি হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী রাকেশ কুমার সাইনি। আবেদনে তিনি দাবি করেছেন, ওয়াংচুককে অবিলম্বে কোনো সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হোক এবং প্রয়োজনে তরল খাদ্য, পুষ্টি উপাদান, প্রোটিন, ভিটামিন ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সহায়তা জোরপূর্বক প্রদান করা হোক, যাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি রোধ করা যায়। আবেদনকারীর বক্তব্য, একজন নাগরিকের স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতি ঘটলেও রাষ্ট্র যদি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, তা হলে তা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার সামিল। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, অনশন গণতান্ত্রিক অধিকারের অন্তর্গত হলেও কোনো ব্যক্তির জীবন ঝুঁকির মুখে পড়লে তাঁকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে যুক্তিতেই আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
দিল্লি হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডি কে উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার মামলাটি গ্রহণ করে। যদিও হাই কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের কর্মবিরতির কারণে সংশ্লিষ্ট সরকারি পক্ষের প্রতিনিধিরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে শুনানি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মুলতুবি রাখা হয়। আদালত জানায়, বিষয়টির জরুরি গুরুত্ব বিবেচনা করেই দ্রুত শুনানি করা হবে। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ, আদেশের অনুলিপি অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ও দিল্লি সরকারের আইনজীবীর হাতে পৌঁছে দিতে হবে। শুধু আদালত নয়, রাজনৈতিক মহলেও ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘সোনম ওয়াংচুকের জীবন মানবতা, পরিবেশ ও গণতন্ত্রের প্রতি উৎসর্গীকৃত। তাঁর জীবন সমগ্র বিশ্বের কাছে মূল্যবান।’ একই সঙ্গে তিনি বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে দাবি করেন, এ সরকারের কাছে আত্মত্যাগের কোনো মূল্য নেই।
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফোনে ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে ‘সিজেপি’। আন্দোলনের প্রতি সংহতিও প্রকাশ করেছেন তিনি। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘সরকার আপনার কিংবা কোটি কোটি যুবকের জীবন নিয়ে চিন্তিত নয়। কিন্তু আমাদের জন্য আপনার বেঁচে থাকা জরুরি। অনুগ্রহ করে অনশন প্রত্যাহার করুন এবং লড়াই চালিয়ে যান।’ আম আদমি পার্টির জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়ালও ওয়াংচুককে অনশন ভাঙার আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সোনম ওয়াংচুক দেশের সম্পদ। সংগ্রামের আরও অনেক পথ রয়েছে।’ পাশাপাশি তিনি ঘোষণা করেছেন, বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় জন্তর মন্তরে গিয়ে তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করবেন এবং তাঁদের সমর্থন জানাবেন। শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) প্রধান উদ্ধব ঠাকরেও ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং সাংস্কৃতিক জগতের ব্যক্তিত্বরাও ওয়াংচুকের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সোমবার জন্তর মন্তরের অনশন মঞ্চে গিয়ে সংহতি প্রকাশ করেন সাহিত্যিক অরুন্ধতী রায়, অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, অভিনেত্রী রত্না পাঠক শাহ এবং অর্থনীতিবিদ জয়তী ঘোষ। তাঁরা সকলেই ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের আবেদন জানান এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মঙ্গলবার প্রতিবাদস্থলে পৌঁছন অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর। সিজেপি-র পক্ষ থেকে তাঁর উপস্থিতির ছবি প্রকাশ করে বলা হয়, ‘নির্ভীক, স্পষ্টবাদী অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’ প্রবীণ অভিনেত্রী জিনাত আমানও সমাজমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট করে সরকারের উদ্দেশে শান্তিপূর্ণ সংলাপের আহ্বান জানান। তিনি লেখেন, ‘ভারতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের কর্তব্য এই প্রতিবাদকে মর্যাদা দেওয়া এবং আলোচনার পথ খোলা রাখা।’ অভিনেত্রী রুবিনা দিলাইক জিনাতের সেই পোস্ট ভাগ করে নিয়ে ওয়াংচুককে ‘আসল হিরো’ বলে উল্লেখ করেছেন। ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবিতে ‘চতুর’ চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা ওমি বৈদ্যও ওয়াংচুকের শারীরিক অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে, আন্দোলনের মঞ্চে শুধু ওয়াংচুক নন, অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন একাধিক ছাত্র আন্দোলনকারীও। ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (আইসা)-র অন্তত ছয় জন কর্মী প্রথম দিন থেকেই অনশনে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দীপক নামে এক ছাত্রনেতার শারীরিক অবস্থা এতটাই সঙ্কটজনক হয়ে ওঠে যে তাঁকে ‘হাইপোভোলেমিক শক’-এর কারণে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় বলে জানা যাচ্ছে। পরে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলেও অন্য অনশনকারীরা এখনো আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, নিট ইউজি ২০২৬-সহ বিভিন্ন সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সংঘটিত দুর্নীতি ও অনিয়মের দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। পাশাপাশি পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের জেরে মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা করা পরীক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
এদিকে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে সিজেপি। আগামী ২০ জুলাই সংসদের বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার দিন জন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার ডাক দেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, লক্ষাধিক মানুষ ইতিমধ্যেই সেই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব, সমর্থনের বিস্তার কিংবা ভবিষ্যৎ কর্মসূচির থেকেও এ মুহূর্তে বড়ো হয়ে উঠেছে একটাই প্রশ্ন— দ্রুত অবনতিশীল শারীরিক অবস্থার মধ্যেও আর কত দিন অনশন চালিয়ে যেতে পারবেন সোনম ওয়াংচুক? আর তার আগেই কি কেন্দ্র সরকার আলোচনায় বসবে? সে উত্তর খুঁজতেই এখন নজর দিল্লি হাই কোর্টের আসন্ন শুনানি এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।
❤ Support Us





