- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৫, ২০২৬
ডার্ক ওয়েবে ফাঁস ভারতের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নথি ! নিরাপত্তা ঘিরে উদ্বেগ
বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ের ভিতরে থাকা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ। তামিলনাড়ুর কুদানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র-সংক্রান্ত হাজার হাজার নথি ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হয়েছে বলে দাবি করেছে একটি আন্তর্জাতিক ‘র্যানসমওয়্যার’ গোষ্ঠী। সে দাবি সত্যি হলে ভারতের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ওয়ার্ল্ড লিকস’ নামে পরিচিত একটি ‘র্যানসমওয়্যার গোষ্ঠী’ ডার্ক ওয়েবে ১৯ হাজারেরও বেশি নথি প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, ওই নথিগুলি কুদানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। আরও দাবি, এ তথ্যভাণ্ডার প্রকল্পের অন্যতম ঠিকাদার অনিল অম্বানির রিলায়েন্স গোষ্ঠী থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত তথ্যের পরিমাণও নেহাত কম নয়। হ্যাকারদের দাবি, মোট ৮ লক্ষ ৫৮ হাজারেরও বেশি ফাইল তাদের হাতে এসেছে, যার মধ্যে কুদানকুলাম প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিগুলিকেই সবচেয়ে সংবেদনশীল বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ওই নথিগুলির সত্যতা স্বাধীন ভাবে যাচাই হয়নি।
ফাঁস হওয়া নথিগুলিতে কী রয়েছে? প্রাথমিক তথ্য বলছে, ইউনিট ৩ এবং ইউনিট ৪-এর বায়ু চলাচল ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রকৌশল নকশা, একটি ‘কমন কন্ট্রোল রুম’-এর সম্পূর্ণ প্ল্যান, যন্ত্রপাতি পরীক্ষার রিপোর্ট, অনুমোদিত সরবরাহকারীদের তালিকা, প্রস্তাবপত্র, বৈঠকের কার্যবিবরণী, এমনকি বীমা সংক্রান্ত নথিও রয়েছে সেখানে। কুদানকুলামের তৃতীয় ও চতুর্থ ইউনিট এখনো নির্মীয়মাণ। ২০২৭ সালের মধ্যে সেগুলি চালু হওয়ার কথা। চালু হলে অতিরিক্ত ২,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হবে প্রকল্পে। তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। প্রকাশিত নথিগুলিতে পরমাণু চুল্লির মূল প্রযুক্তিগত নকশা বা রিঅ্যাক্টরের ‘কোর সিস্টেম’-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গিয়েছে। ওই অংশের প্রযুক্তি রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটম সরবরাহ করে।
তবু উদ্বেগ কাটছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ’-এর ডিরেক্টর নিকোলাস রথের মতে, এ ধরনের তথ্য ফাঁসকে হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্য, নথিগুলি থেকে কোনো সম্ভাব্য শত্রুপক্ষ বুঝে নিতে পারে প্রকল্পে কারা প্রবেশাধিকার পান, কোন কোন ব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে এবং নিরাপত্তা কাঠামোর কোন স্তরে দুর্বলতা থাকতে পারে। সরাসরি ‘রিঅ্যাক্টর’ আক্রান্ত না হলেও সহায়ক পরিকাঠামো, সরবরাহ শৃঙ্খল বা তৃতীয় পক্ষের পরিষেবা প্রদানকারীদের মাধ্যমে আঘাত হানার পথ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। রিলায়েন্স গোষ্ঠীও তথ্য ফাঁসের ঘটনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, তৃতীয় পক্ষ ডেটা সেন্টার পরিষেবা প্রদানকারী ‘ইয়োটা’র একটি সার্ভারে তাদের তথ্যের ‘আংশিক লঙ্ঘন’ ঘটেছে। বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংস্থা। তবে কী ধরনের তথ্য ফাঁস হয়েছে, সে বিষয়ে মুখ খোলেনি তারা।
অন্যদিকে, ‘ইয়োটা’র বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত ২৯ মে ‘রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার’-এর একটি সার্ভারে সন্দেহজনক কার্যকলাপ ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে সে পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হয়। কিন্তু জুনের শেষে রিলায়েন্স তাদের জানায় যে, কিছু হ্যাকার গোষ্ঠী তথ্য চুরির দাবি করেছে। ‘ইয়োটা’ এখনো সেই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বলে জানিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনার পর, তদন্তে নেমেছে ভারতের প্রধান সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম’ বা ‘সিইআরটি-ইন’। সূত্রের খবর, ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া’ও বিষয়টি নিয়ে রিলায়েন্সের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে, কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান রাজেশ বীরারাঘবন, কেন্দ্রীয় পরমাণু শক্তি দফতর কিংবা প্রধানমন্ত্রীর দফতরের তরফে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা আরও একটি কারণে। ২০১৯ সালেও কুদানকুলাম প্রকল্প সাইবার হামলার খবরে শিরোনামে এসেছিল। সে সময় উত্তর কোরিয়ার এক হ্যাকার গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ‘ম্যালওয়্যার’ কেন্দ্রটির প্রশাসনিক নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও তখন নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন দাবি করেছিল, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকরী ব্যবস্থার উপর তার কোনো প্রভাব পড়েনি। নয়া কুদানকুলাম-কাণ্ড সামনে আসতেই ভারতের সামগ্রিক সাইবার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ‘সার্ফশার্ক’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ভারতে ২ কোটি ৮৯ লক্ষেরও বেশি অ্যাকাউন্টের তথ্য ফাঁস হয়েছে। এ নিরিখে বিশ্বে ভারতের স্থান তৃতীয়। অন্য একটি শিল্প সমীক্ষা বলছে, দেশের ৭৩ শতাংশ সংস্থা জানেই না তারা কখনো সাইবার হামলার শিকার হয়েছে কি না। আবার ৫৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সাইবার স্বাস্থ্যবিধিই অনুপস্থিত। বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে সাইবার হামলার প্রবণতা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন কুদানকুলাম-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁসের দাবি ভারতের নিরাপত্তা মহলে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফাঁস হওয়া নথিগুলির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, দেশের কৌশলগত সম্পদ রক্ষায় সাইবার নিরাপত্তার গুরুত্ব যে, আরও এক বার সামনে এল, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
❤ Support Us








