- দে । শ
- জুলাই ১৫, ২০২৬
ফিরছে দুঃস্বপ্নের ‘করোনাকাল’ ? অন্ধ্রপ্রদেশ-তামিলনাড়ুতে সংক্রমণে মৃত ৫, আক্রান্ত অন্তত ৮। ওড়িশায় সতর্কতা জারি
কয়েক বছর আগে যে ভাইরাস গোটা পৃথিবীকে কার্যত স্তব্ধ করে দিয়েছিল, তার নাম আবারও শিরোনামে। যদিও পরিস্থিতি এখন অনেকটাই আলাদা, তবু অন্ধ্রপ্রদেশ-তামিলনাড়ুতে মোট ৫ জনের মৃত্যু এবং আট জনের কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার খবর প্রশাসনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে অন্ধ্রের কড়পা জেলায় পরপর কয়েকটি সংক্রমণ ধরা পড়ার পর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্তারা অবশ্য আশ্বস্ত করছেন, আপাতত আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশের স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, গত কয়েক সপ্তাহে কড়পা জেলায় ৮টি সক্রিয় কোভিড সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন এক জন ২৫ বছরের মেডিক্যাল ছাত্রও। বর্তমানে তিনি বাড়িতেই নিভৃতবাসে থেকে চিকিৎসাধীন। কিন্তু দুই আক্রান্তের মৃত্যু পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনায় এনে ফেলেছে। মৃতদের মধ্যে এক জন ৫২ বছর বয়সি ব্যক্তি। রাজমপেট এলাকার ওই বাসিন্দা প্রথমে জ্বর ও কাশির উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন। পরীক্ষায় তাঁর কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ে। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে তামিলনাড়ুর ভেলোরে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্য জন ৪৩ বছর বয়সি। গুরুতর শারীরিক জটিলতা নিয়ে কড়পার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। পরে পরীক্ষায় কোভিড ধরা পড়ে। আইসিইউ-তে চিকিৎসা চলাকালীন তাঁরও মৃত্যু হয়।
দুই মৃত্যুর ঘটনার পর কড়পা জেলায় বিশেষ ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ মোতায়েন করেছে স্বাস্থ্য দফতর। আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ৪০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। তার মধ্যে ১৮ জনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। বাকিদের ফলাফলের অপেক্ষা চলছে। পাশাপাশি ভাইরাসের প্রকৃতি, বর্তমান সংক্রমণের ধরন বোঝার জন্য নমুনা পাঠানো হয়েছে পুণের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি’র পরীক্ষাগারে। সেখানে ‘জিনোম সিকোয়েন্সিং’য়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ‘ভ্যারিয়্যান্ট’ শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে জেলা প্রশাসনকে একাধিক নির্দেশ দিয়েছেন অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী সাভিতা। হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ভিড়পূর্ণ জনপরিসরে মাস্ক ব্যবহারে জোর দিতে বলা হয়েছে। জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে ‘আইসোলেশন’-এর ব্যবস্থার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আক্রান্তদের পরিবারের সদস্যদেরও পরীক্ষা করানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, আক্রান্ত এলাকাগুলিতে স্যানিটাইজেশন এবং জীবাণুনাশক ছড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশে সংক্রমণের খবর সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে প্রতিবেশী ওড়িশা। বিশেষত সীমান্তবর্তী দক্ষিণ ওড়িশার জেলাগুলিতে সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে। মালকানগিরি, কোরাপুট, রায়গড়া, গজপতি, গঞ্জাম এবং নবরঙ্গপুর জেলার প্রশাসনকে বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত ওড়িশায় কোনো কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়েনি, তবু সীমান্ত দিয়ে যাতায়াতকারী মানুষদের উপর নজর রাখা হচ্ছে। জেলা সদর হাসপাতালগুলিতে পর্যাপ্ত পরীক্ষার ‘কিট’ মজুত রাখতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন উপসর্গযুক্ত রোগীদের পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওড়িশার জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধিকর্তা ডা. রবীন্দ্রনাথ মিশ্র জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত রাজ্যে চলা সমস্ত পরীক্ষার ফল ‘নেগেটিভ’ এসেছে। তবু পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। তিনি সাধারণ মানুষকে হাত ধোওয়া, মাস্ক ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
তামিলনাড়ুতেও সাম্প্রতিক কয়েকটি কোভিড-সংক্রান্ত মৃত্যুর খবর ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে সে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছে, বর্তমানে কোনো উচ্চ-ঝুঁকির বা মারাত্মক ‘ভ্যারিয়্যান্ট’ ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মেলেনি। পুণের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি’তে হওয়া ‘জিনোম’ বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, বর্তমানে প্রচলিত ‘স্ট্রেন’ মূলত মৃদু উপসর্গের কারণ হচ্ছে। তামিলনাড়ু রাজ্যের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখনো পর্যন্ত ৩৩৫টি কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ২০২৫ সালে সে সংখ্যা ছিল ১,২৫০, ২০২৪ সালে ৯৯০। স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের উপসর্গ ছিল হালকা। ফলে, হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়েনি। অন্যদিকে, মুম্বই থেকেও সম্প্রতি কোভিড সংক্রমণের একটি খবর সামনে এসেছে। জনপ্রিয় গায়ক কুমার শানুর ছেলে, গায়ক জান কুমার শানু কোভিডে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি নিজেই সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে এ তথ্য জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু সংক্রমণ হওয়াকে করোনার ‘নতুন ঢেউ’য়ের পূর্বাভাস বলে মনে করার কারণ নেই। হায়দ্রাবাদের যশোদা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. দিলীপ গুডের মতে, সাম্প্রতিক দুই মৃত ব্যক্তিরই একাধিক সহ-রোগ ছিল। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস, কিডনি বা লিভারের সমস্যা থাকলে সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণও গুরুতর আকার নিতে পারে। ফলে শুধুমাত্র কোভিড সংক্রমণকেই মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। চিকিৎসকদের বক্তব্য, গত কয়েক বছরে বিপুল সংখ্যক মানুষ টিকা নিয়েছেন। বহু মানুষের শরীরে সংক্রমণ-পরবর্তী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি ২০২০ বা ২০২১ সালের মতো নয়। তবু বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী মহিলা, ডায়াবিটিস, হৃদ্রোগ, কিডনি বা ফুসফুসের অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড এখন অনেকটাই ‘এনডেমিক’ বা স্থায়ী উপস্থিতির রোগে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ মাঝে মাঝে সংক্রমণ বাড়তে পারে, কিছু এলাকায় অল্প প্রাদুর্ভাবও দেখা দিতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, দেশ আবার মহামারির পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছে। বরং প্রয়োজন সতর্কতা, দ্রুত পরীক্ষা, উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সুরক্ষিত রাখা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বার্তা তাই স্পষ্ট— আতঙ্ক নয়, সচেতনতা। কারণ ভাইরাস পুরোপুরি বিদায় নেয়নি, হয়তো নেবেও না কোনোদিন, কিন্তু তাকে মোকাবিলার প্রস্তুতি আর অভিজ্ঞতা দুটিই এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী।
❤ Support Us





