- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৫, ২০২৬
মধ্যপ্রদেশে জল-জঙ্গল-জমি বাঁচানোর লড়াই ! বারানা নদীর তীরে চিতায় শুয়ে গ্রামবাসীদের প্রতিবাদ
বর্ষার জলে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে বারানা নদী। নদীর উপরে কংক্রিটের সেতু। আর তার নীচেই তৈরি হয়েছে বিরল প্রতিবাদ মঞ্চ। শুকনো কাঠ জড়ো করে বানানো প্রতীকী চিতার উপর নিথর হয়ে শুয়ে রয়েছেন বহু মূলনিবাসী মানুষ। মহিলাদের কারও কোলে শিশু, কেউ আবার চোখ বুজে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা মানুষের মতো নিশ্চুপ। একটু দূরেই নদীর জলে কোমরসমান ডুবে ‘জল সত্যাগ্রহ’-এ সামিল অনেকে। গত কয়েক দিনে আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে আন্দোলন, কয়েক জনের গলায় ঝুলছে প্রতীকী ফাঁস।
মধ্যপ্রদেশের ছতরপুর ও পান্না জেলার সীমানায় কুপি গ্রামের কাছে বারানা নদীর তীরে টানা ১১ দিন ধরে চলছে ‘চিতা আন্দোলন’। আন্দোলনকারীদের অধিকাংশই গন্ড ও কোল আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। তাঁদের দাবি, কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের জন্য উচ্ছেদের মুখে পড়লেও সরকার প্রতিশ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেনি। ফলে ঘরবাড়ি, জমিজমা, বনজীবিকা— সব হারিয়ে আজ তাঁরা অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নেমেছেন। ‘হয় আমাদের ন্যায়বিচার দাও, না হলে মৃত্যু দাও’— আন্দোলনস্থলে প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হচ্ছে এ স্লোগান। আন্দোলনকারীদের দাবি, এটি নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং প্রশাসনের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা হারানোর প্রতীক।
এ আন্দোলনের সূত্রপাত অবশ্য নতুন নয়। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিল মাসেও কেন-বেতওয়া প্রকল্পের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ হয়েছিল। সে সময় প্রশাসনের তরফে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলে আন্দোলন সাময়িক ভাবে প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু অভিযোগ, বর্ষা নামতেই প্রতিশ্রুতি ভেঙে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। বহু পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। এক গ্রামবাসীর অভিযোগ, ‘গত বারও আমাদের আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন তুলে নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু পরে কেউ কথা রাখেনি। বর্ষার মধ্যে ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। এ বার দাবি না মানলে আমরা সেতু থেকেই ঝাঁপ দেব, না হলে ফাঁসিতে ঝুলব।’ আন্দোলনের অন্যতম মুখ সমাজকর্মী অমিত ভাটনাগরের অভিযোগ আরও তীব্র। তাঁর দাবি, ‘প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত ও একতরফা মনোভাবের জেরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার মুখে। শুধু জমি নয়, তাঁদের জল, জঙ্গল, জীবিকা ও সংস্কৃতির অধিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’
তীব্র এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে দেশের প্রথম বৃহৎ নদী সংযোগ প্রকল্প— ‘কেন-বেতওয়া লিঙ্ক প্রকল্প’। কেন্দ্র ও দুই রাজ্যের যৌথ উদ্যোগে প্রায় ৪৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার এ প্রকল্পের লক্ষ্য বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী জলসংকট দূর করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেন নদীর উপর ৭৭ মিটার উঁচু দৌধন বাঁধ তৈরি হবে। সেখান থেকে ২২১ কিলোমিটার দীর্ঘ খালের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়া হবে বেতওয়া নদীতে। সরকারি হিসাব বলছে, এর মাধ্যমে ৮ লক্ষেরও বেশি হেক্টর জমিতে সেচের সুবিধা পৌঁছবে। পানীয় জল পাবে প্রায় ৬৫ লক্ষ মানুষ। উৎপন্ন হবে ১০৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ এবং ২৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। একই সঙ্গে চন্দেলা যুগের ৪২টি ঐতিহাসিক জলাধার পুনরুজ্জীবিত করে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের স্বপ্নের বিপরীতে উঠে আসছে উচ্ছেদ ও পরিবেশ ধ্বংসের আশঙ্কা।
সরকারি নথি অনুযায়ী, দৌধন বাঁধ নির্মাণের ফলে অন্তত ১০টি মূলনিবাসী গ্রাম সম্পূর্ণ জলমগ্ন হবে। বাস্তুচ্যুত হবেন প্রায় ৬,৭০০ পরিবার। পাশাপাশি পান্না টাইগার রিজার্ভের বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যাবে জলের তলায়। পান্না জেলায় উচ্ছেদ হতে হবে আরও ১,৪০০ পরিবারকে। অর্থাৎ প্রায় সাত হাজার পরিবারের জীবনযাত্রা আমূল বদলে যাবে। কাটা পড়তে পারে প্রায় ৪৬ লক্ষ গাছ। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এতে বাঘ, ঘড়িয়াল, শকুনসহ বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল বিপন্ন হবে। পরিবেশগত মূল্যায়ন রিপোর্টে বলা হয়েছে, রিজার্ভের মূল আবাসভূমির ১০ শতাংশেরও বেশি অংশ সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে। গবেষকদের মতে, শকুনের প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সরকারি যুক্তি অনুযায়ী, কেন নদী অববাহিকায় জল উদ্বৃত্ত এবং বেতওয়া অববাহিকায় ঘাটতি রয়েছে। সে কারণেই বছরে ১,০২০ মিলিয়ন ঘনমিটার জল কেন থেকে বেতওয়ায় স্থানান্তর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু জলবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, দুই নদীই একই ভৌগোলিক অঞ্চল ও একই বর্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। ফলে খরার বছরে দুই নদীতেই সমান ভাবে জলপ্রবাহ কমে যায়। সে ক্ষেত্রে ‘উদ্বৃত্ত’ জলের ধারণাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সমালোচকদের আরও দাবি, প্রকল্পের জল সরাসরি বুন্দেলখণ্ডের সবচেয়ে খরাপ্রবণ অঞ্চলে পৌঁছবে না। বরং তা বেতওয়া অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে পৌঁছে অন্যত্র জল সরবরাহের সুযোগ করে দেবে। ফলে যে অঞ্চল থেকে জল নেওয়া হচ্ছে, সেই পান্না জেলার মতো এলাকাগুলিই তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, আগামী দশকগুলিতে কেন নদীর বার্ষিক জলপ্রবাহ ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। অনিয়মিত বর্ষা, দীর্ঘ শুষ্ক সময় এবং হঠাৎ অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাঁধে জল সংরক্ষণের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে দৌধন বাঁধ নির্মাণের ফলে কেন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহচক্র ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার বন্যা নদীর তলদেশ পরিষ্কার রাখে এবং ঘড়িয়াল ও বিভিন্ন জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। বাঁধের কারণে প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে কেন ঘড়িয়াল অভয়ারণ্যের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
উত্তেজনা প্রশমিত করতে মধ্যপ্রদেশ সরকার সম্প্রতি পুনর্বাসন প্যাকেজ বাড়িয়ে পরিবারপিছু ১২.৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের ঘোষণা করেছে। কিন্তু সে প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, নগদ অর্থ দিয়ে মূলনিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতির ক্ষতিপূরণ সম্ভব নয়। তাঁরা জমির বদলে জমি চান। আন্দোলনকারীদের দাবি, ২০১৩ সালের ‘ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও পুনঃস্থাপন সংক্রান্ত আইন’-এ মূলনিবাসীদের ক্ষেত্রে ‘ল্যান্ড ফর ল্যান্ড’ বা জমির বদলে জমি দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ রয়েছে। অথচ বাস্তবে তাঁদের হাতে কেবল নগদ অর্থ তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেকের অভিযোগ, বাজারদরের তুলনায় এ ক্ষতিপূরণও অপ্রতুল। ক্ষতিপূরণের যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়ম ঘিরেও বিতর্ক রয়েছে। আইনে ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রত্যেককে পৃথক পরিবার হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হলেও প্রশাসন ২০২৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারিকে ‘কাট-অফ’ তারিখ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ফলে ওই তারিখের পরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া বহু যুবক-যুবতী পুনর্বাসনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ।
আরও অভিযোগ উঠেছে গ্রামসভার সম্মতি নিয়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রকল্পের প্রকৃত চেহারা সম্পর্কে কিছু না জানিয়েই বহু বছর আগে তাঁদের কাছ থেকে সম্মতি নেওয়া হয়েছিল। ফলে সে সম্মতি আদৌ বৈধ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চলতি আন্দোলন ঘিরে প্রশাসনের ভূমিকাও সমালোচনার মুখে। মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, আন্দোলনস্থলের আশপাশে ১৬৩ ধারা জারি করে সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশে কার্যত বাধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি খাদ্য ও পানীয় জল সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। যদিও জেলা প্রশাসনের বক্তব্য ভিন্ন। ছতরপুরের জেলা প্রশাসনের দাবি, অধিকাংশ প্রকল্প-প্রভাবিত পরিবারের দাবি ইতিমধ্যেই মেনে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই কেন-বেতওয়া প্রকল্পের প্রত্যক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত নন, বরং অন্য ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত।
১৯৮০ সালে জাতীয় নদী সংযোগ পরিকল্পনার ধারণা থেকে শুরু করে ২০০৫ সালের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি, ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার অনুমোদন এবং ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শিলান্যাস— চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এগিয়েছে কেন-বেতওয়া প্রকল্পের প্রশাসনিক যাত্রাপথ। কিন্তু এ মুহূর্তে বারানা নদীর তীরে দাঁড়ালে সরকারি যুক্তি ও আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের মধ্যে দূরত্বটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্ষার মেঘলা আকাশের নীচে চিতার কাঠের উপর শুয়ে থাকা মুখগুলি একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে— উন্নয়নের মূল্য কি শুধুই সংখ্যার হিসাব ? না কি তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের স্মৃতি–সংস্কৃতি–পরিচয় আর অস্তিত্বের অধিকারও? সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অধরাই। আর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ‘চিতা আন্দোলন’-এর আগুন যে নিভবে না, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।
❤ Support Us







