- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৭, ২০২৬
মুর্শিদাবাদে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনা! খোলা লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মৃত ৩ স্কুল পড়ুয়া সহ ৪
মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের কর্ণসুবর্ণে শুক্রবার সকালে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক রেল দুর্ঘটনা। খোলা লেভেল ক্রসিং দিয়ে পারাপারের সময় দ্রুতগতির নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল একটি স্কুলভ্যানকে ধাক্কা মারলে তিন স্কুলপড়ুয়া-সহ মোট চার জনের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও চার পড়ুয়া এবং স্কুলভ্যানের চালক। আহতদের বহরমপুরের মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দু-জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সকাল প্রায় ৭টা নাগাদ আজিমগঞ্জ-কাটোয়া শাখার কর্ণসুবর্ণ স্টেশন ও গোবিন্দপুর রেলগেটের মাঝামাঝি এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আপ লাইন দিয়ে হাওড়াগামী নবদ্বীপ এক্সপ্রেস চলে যাওয়ার পর রেলগেট খুলে দেওয়া হয়। গেট খোলা থাকায় স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে একটি পুলকার রেললাইন পার হতে শুরু করে। ঠিক সে সময় ডাউন লাইন দিয়ে দ্রুতগতিতে এসে পড়ে নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল। কোনো সতর্কতা বা বাধা না থাকায় ট্রেনটি সরাসরি স্কুলভ্যানটিকে ধাক্কা মারে। ভয়াবহ সংঘর্ষে দুমড়ে-মুচড়ে যায় গাড়িটি। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তিন স্কুলপড়ুয়া ও এক স্থানীয় বাসিন্দার।
দুর্ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, লেভেল ক্রসিংয়ের গেটম্যান দীর্ঘদিন ধরেই দায়িত্বে চরম গাফিলতি করতেন। তাঁদের দাবি, তিনি প্রায়শই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ডিউটি করতেন, অধিকাংশ দিনই গেট বন্ধ করার পর তা খুলতে ভুলে যেতেন। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রেলগেট বন্ধ থাকত, সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হতো। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনার দিনও গেটম্যান নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেই দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে কারণেই নির্দিষ্ট সময়ে রেলগেট বন্ধ করা হয়নি।
দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা গেটম্যানকে তাঁর কেবিনে আটকে তালাবন্ধ করে রাখে। পরে বহরমপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁকে উদ্ধার করে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারির সময় তাঁর শরীরী ভাষা দেখে তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন বলেও দাবি করেন উপস্থিত বহু মানুষ। তবে এ অভিযোগের সত্যতা এখনো সরকারি ভাবে নিশ্চিত হয়নি। ঘটনার পর রেল কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে গেটম্যান এবং তাঁর সুপারভাইজারকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে ৭ সদস্যের একটি তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশও পৃথকভাবে ঘটনার তদন্ত করছে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছন পুলিশ সুপার-সহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন রেল প্রতিমন্ত্রী অধীররঞ্জন চৌধুরী। তিনি রেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই রেল পরিকাঠামোর উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, গেটম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলি সত্য কি না, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি তিনি জানতে চান, অভিযুক্ত গেটম্যান স্থায়ী সরকারি কর্মী ছিলেন নাকি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছিল, দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি যথাযথ প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
অন্যদিকে, স্কুলভ্যানের চালকের ভাই বলে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, আপ লাইন দিয়ে একটি ট্রেন চলে যাওয়ার পর গেটম্যান রেলগেট খুলে দেন। সে সুযোগে স্কুলভ্যানটি লাইন পার হওয়ার সময় ডাউন লাইন দিয়ে আসা নিমতিতা-কাটোয়া লোকাল সজোরে ধাক্কা মারে। পুলিশ ও রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ, গেটম্যানের ভূমিকা, সিগন্যালিং ব্যবস্থা, নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং রেলগেট পরিচালনায় কোনও ত্রুটি ছিল কি না— সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রশাসন।
❤ Support Us









