- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ২১, ২০২৬
তৃণমূলে বিভাজনের জেরে তিন মঞ্চে শহিদ স্মরণ, কড়া নিরাপত্তায় শহর। মমতার ২১ এর মঞ্চে ভাঙচুরের অভিযোগ, রিপোর্ট তলব কোর্টের
এবারের একুশে জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন রাজনৈতিক মেরুকরণ । তৃণমূলে বিভাজনের জেরে শহিদ স্মরণকে কেন্দ্র করে একসঙ্গে তিনটি পৃথক কর্মসূচির আয়োজন হয়েছে । একটি সভা করছে কালীঘাট তৃণমূল, দ্বিতীয়টি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল তৃণমূল’ বা বিদ্রোহী শিবির, আর তৃতীয় কর্মসূচির আয়োজন করেছে প্রদেশ কংগ্রেস । ফলে একদিনে তিনটি বড় রাজনৈতিক সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
শহিদ মিনার, গান্ধি মূর্তি এবং বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের সামনে প্রায় এক হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে । তিনটি সভাস্থলেই ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে । দায়িত্বে রয়েছেন সেন্ট্রাল ও সাউথ ডিভিশন-সহ অন্তত পাঁচজন ডেপুটি কমিশনার পদমর্যাদার আধিকারিক । পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে এইচআরএফএস, র্যাফ এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী।
প্রশাসনের তরফে কোনও রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি, তবুও একাধিক এলাকায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে । বিশেষ করে শহিদ মিনারের সভাকে কেন্দ্র করে মেয়ো রোড, রেড রোড, ডাফরিন রোড এবং ক্যাথিড্রাল রোডে যান চলাচল ধীরগতির হতে পারে । ক্যাথিড্রাল রোডে যান নিয়ন্ত্রণের জন্য সময়ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থা করা হয়েছে । দুপুর ১টার আগে হরিশ মুখার্জি রোড থেকে পার্ক স্ট্রিটমুখী যান চলাচল থাকবে, আর দুপুর ১টার পর পার্ক স্ট্রিট দিক থেকে হরিশ মুখার্জি রোডের দিকে যান চলাচল চালু থাকবে । ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনের ক্যাথিড্রাল রোড ক্রসিংয়েও যানবাহনের গতি কমতে পারে বলে আশঙ্কা ।
সোমবার সন্ধ্যায় কালীঘাট তৃণমূলের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে ক্যাথিড্রাল রোডে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে মমতা অভিযোগ করেন, ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভার অনুমতি তাঁদের দেওয়া হয়নি । তিনি বলেন, “বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভার অনুমতি দেওয়া হয়, কিন্তু শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনুমতি দেওয়া হয় না । এটা কেমন রাজনীতি ?” পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, বিদ্রোহী শিবিরের সভা ভরাতে বিজেপি ঝাড়খণ্ড ও বিহার থেকে লোক আনছে । এদিন তিনি দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে বলেন, কোনও মহল থেকে ‘চক্রান্ত’ হতে পারে, তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি একুশে জুলাইকে দলের ‘নতুন করে পথচলার দিন’ বলেও উল্লেখ করেন । তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূলের কর্মীদের সভায় আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং শহিদ পরিবারের সদস্যদেরও পুলিশ ভয় দেখিয়ে সভায় না আসার জন্য চাপ সৃষ্টি করছে ।
মমতার অভিযোগ, চারদিকে তৃণমূলের সভার মঞ্চ ভাঙচুর করা হয়েছে, বিদ্যুৎ ও মাইকের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে । তাঁর দাবি, বিজেপির ৬০ থেকে ৬৫ জনের একটি দল এই ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত এবং তাদের নেতৃত্বে রয়েছেন এক ব্যক্তি, যিনি বর্তমানে আদালতের নির্দেশে জামিনে বাইরে রয়েছেন । একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ ও বিজেপি যৌথভাবে ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ।
ঘটনার পরই আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার ইঙ্গিত দেন মমতা বন্দোপাধ্যায় । সোমবার রাতেই তিনি বলেন, আইন নিয়ে ছেলেখেলা করা হলে পুলিশ ও রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হবে । সেই সময় তিনি তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবিলম্বে মামলা করার নির্দেশ দেন এবং জানান, এই মামলায় তিনি নিজেও পক্ষ হতে চান । মঙ্গলবার আদালতে কালীঘাট তৃণমূলের পক্ষে আইনজীবী অর্ক নাগ জানান, সোমবার রাতেই এই ঘটনার বিষয়ে প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীকে ইমেলের মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে । বিষয়টি শুনে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেলের উদ্দেশে বলেন, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যাতে কোনও অশান্তি বা অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় । সেই নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি ।
বিচারপতি আরও মন্তব্য করেন, আদালতের নির্দেশের পরেও এ ধরনের ঘটনা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা যায় না । তিনি জানান, তৃণমূলের আবেদনের ভিত্তিতে এক ঘণ্টা পর পুনরায় শুনানি হবে এবং তার আগে পুলিশকে জানাতে হবে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে ।
অন্যদিকে, মেয়ো রোডে বিদ্রোহী তৃণমূলের প্রস্তুতি পরিদর্শনে যান বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য ও ফিরহাদ হাকিম। মমতার অভিযোগের পাল্টা জবাবে ঋতব্রত কটাক্ষ করে বলেন, “২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট শুনে উনি তাল রাখতে পারছেন না । ঝাড়গ্রামের মানুষকে ঝাড়খণ্ডের এবং বাঁকুড়ার মানুষকে বিহারের মানুষ বলে ভাবছেন । আজকের সমাবেশ দেখলে উনি আরও দিশেহারা হয়ে যাবেন।”
এদিকে, সোমবারের প্রবল বৃষ্টিতে শহিদ মিনার চত্বর কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় কিছুটা উদ্বেগে কংগ্রেস নেতৃত্ব। তবে তাঁদের দাবি, প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও সভাস্থল উপচে পড়বে। কংগ্রেসের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন অধীর রঞ্জন চৌধুরী, দীপা দাশমুন্সি, ইশা খান চৌধুরী, শুভঙ্কর সরকার-সহ প্রদেশ নেতৃত্ব। দিল্লি থেকে যোগ দিতে পারেন পবন খেড়া এবং প্রকাশ জোশীরাও।
❤ Support Us






