Advertisement
  • দে । শ
  • জুলাই ৩০, ২০২৬

জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্তিতে কড়া অবস্থান কেন্দ্রের, লোকসভায় পেশ নয়া সংশোধনী বিল

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জন্ম-মৃত্যু নথিভুক্তিতে কড়া অবস্থান কেন্দ্রের, লোকসভায় পেশ নয়া সংশোধনী বিল

জন্ম বা মৃত্যু নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে নিয়ম আরও কঠোর করতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্র। সে লক্ষ্যেই বুধবার লোকসভায় পেশ করা হল রেজিস্ট্রেশন অফ বার্থস অ্যান্ড ডেথস (সংশোধনী) বিল২০২৬। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ীজন্ম বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটার দুবছরেরও বেশি সময় পরে তা নথিভুক্ত করতে চাইলে আর শুধুমাত্র জেলা প্রশাসনের অনুমতি যথেষ্ট হবে না। সে ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ভাবে প্রথম শ্রেণির বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ নিতে হবে। কেন্দ্রের দাবিসময়মতো জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করতে নাগরিকদের উৎসাহিত করা এবং বিলম্বিত নথিভুক্তির ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করাই এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য।

বুধবার লোকসভায় বিলটি পেশ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী স্পিকার ওম বিড়লা বিরোধী সদস্যদের বিলটি উপস্থাপনের বিরোধিতা করার সুযোগ দিলেও কেউ আপত্তি জানাননি। এরপরই বিলটি আনুষ্ঠানিক ভাবে পেশ করা হয়। গত ২০ জুলাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এই সংশোধনী বিলে অনুমোদন দিয়েছিল। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালে সংশোধিত রেজিস্ট্রেশন অফ বার্থস অ্যান্ড ডেথস আইন১৯৬৯এর ১৩(৩) ধারায় ফের পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।

বর্তমানে প্রচলিত আইন অনুযায়ীজন্ম বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটার ২১ দিনের মধ্যে তা স্থানীয় রেজিস্ট্রারের কাছে নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করলেও নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পরে নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। আবার এক বছরের বেশি দেরি হলে জেলা শাসক (ডিএম)মহকুমাশাসক (এসডিএম) অথবা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে সেই নথিভুক্তি করা যায়। নতুন সংশোধনীতে সেই ব্যবস্থাকেই আরও কঠোর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। জন্ম বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটার এক বছর থেকে দুবছরের মধ্যে নথিভুক্তির ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থাই বহাল থাকবে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলা শাসকমহকুমাশাসক অথবা ম্যাজিস্ট্রেট আবেদন যাচাই করে অনুমতি দিতে পারবেন। কিন্তু দুবছরের বেশি বিলম্বে নথিভুক্তির আবেদন এলে আর নির্বাহী প্রশাসনের অনুমতি যথেষ্ট হবে না। সে ক্ষেত্রে আবেদনকারীর নথি বিচার করে কেবলমাত্র প্রথম শ্রেণির বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশেই নিবন্ধনের অনুমতি মিলবে। অর্থাৎ এতদিন যে ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে ছিলতা এই শ্রেণির আবেদনের ক্ষেত্রে বিচারবিভাগের হাতে ন্যস্ত হবে।

খসড়া প্রস্তাবে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছেনির্ধারিত সময়ের অনেক পরে নথিভুক্তির আবেদন করলে কেবল অনুমোদনের স্তরই বাড়বে নাআবেদনকারীকে অতিরিক্ত নথিপত্রও জমা দিতে হতে পারে। বিলম্ব ফি-র পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের মতেদীর্ঘ সময় ধরে নথিভুক্তি না হওয়ার প্রবণতা কমাতেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে বহু বছর পরে জন্ম বা মৃত্যুর শংসাপত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ এবং কঠোর যাচাইয়ের আওতায় আসবে। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় কেন্দ্র জানিয়েছেজন্ম ও মৃত্যুর ঘটনা যথাসময়ে নথিভুক্ত না হলে সরকারি জনসংখ্যা-তথ্যভান্ডারে অসঙ্গতি তৈরি হয়। তার প্রভাব পড়ে স্বাস্থ্যশিক্ষাসামাজিক সুরক্ষাজনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং পরিকাঠামো পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে। পাশাপাশি মৃত ব্যক্তিদের পরিচয়পত্রআধার বা অন্যান্য সরকারি নথির অপব্যবহারের অভিযোগও সময়ে সময়ে সামনে এসেছে। সরকারের মতেকঠোর নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে তথ্যভান্ডারের নির্ভুলতা যেমন বাড়বেতেমনই জালিয়াতি ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও অনেকাংশে কমবে। কেন্দ্রের বক্তব্যএই সংশোধনের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যুর ঘটনা দ্রুত নথিভুক্ত করার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই লক্ষ্য।

তবে এই সংশোধনী ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের মতেবিলটি এমন এক সময়ে আনা হচ্ছে, যখন ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কর্মসূচি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক চলছে। তাঁদের দাবি, ‘এসআইআর চলাকালীন বহু ব্যক্তি স্থানীয় পঞ্চায়েত বা পুরসভার মাধ্যমে বিলম্বিত জন্ম শংসাপত্র সংগ্রহ করে তা পরিচয়পত্র হিসেবে জমা দিয়েছিলেন। সে অভিজ্ঞতার পরই কেন্দ্র বিলম্বিত জন্ম ও মৃত্যুর নথিভুক্তির নিয়ম আরও কঠোর করতে চাইছে বলে বিরোধীদের অভিযোগ।অন্যদিকে, বিজেপি সূত্রের বক্তব্য ভিন্ন। দলের দাবি, ‘এসআইআর চলাকালীন এমন বহু আবেদন সামনে এসেছেযেখানে জন্মের সময়কার মূল শংসাপত্র না থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে নতুন করে জন্মের শংসাপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। বিজেপির অভিযোগএ ধরনের আবেদনকারীদের একাংশের নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সে কারণেই ভবিষ্যতে যথাযথ প্রমাণ ছাড়া বিলম্বিত জন্ম বা মৃত্যুর শংসাপত্র ইস্যুর পথ বন্ধ করতেই সংশোধনী আনা হয়েছে। লোকসভায় বিজেপির বক্তব্য, ‘যথাযথ প্রমাণ ছাড়া যাতে জন্মের শংসাপত্র দেওয়া না হয়তা নিশ্চিত করতেই এই সংশোধন। এতে ভুয়ো নথি তৈরির প্রবণতা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে।

বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছে, ‘এসআইআর-পরবর্তী সময়ে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছেতাঁদের একাংশ ভবিষ্যতে ফের ভোটার তালিকায় নাম তোলার চেষ্টা করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে জন্মের শংসাপত্রকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সে কারণেই বিলম্বিত নথিভুক্তির ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যবেক্ষণকে বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি। বুধবার, বিলটি পেশের সময় লোকসভায় বিরোধীদের বিক্ষোভও চলছিল। বিরোধী দলগুলি প্রশ্নপত্র ফাঁস সংক্রান্ত বিল নিয়ে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতির দাবি জানায়। পাশাপাশি যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের পদক্ষেপ নিয়েও প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য দাবি করে বিরোধীরা। সেই উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহেই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সংক্রান্ত সংশোধনী বিলটি পেশ করা হয়।

অন্যদিকে, দিকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারও সম্প্রতি একাধিক নতুন বিধি কার্যকর করেছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশিকায় আবেদনপত্রে পূর্ণাঙ্গ নামনির্দিষ্ট ঠিকানা এবং নির্ধারিত বিন্যাসে তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিলম্বিত নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে উচ্চতর প্রশাসনিক অনুমোদনের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী৩০ দিনের পরে কিন্তু এক বছরের মধ্যে আবেদন করলে জেলা রেজিস্ট্রারের অনুমতিস্বঘোষণাপত্র  প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হবে। এক বছরের বেশি কিন্তু দুবছরের মধ্যে আবেদন করলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। আর দুবছরের বেশি বিলম্বে জন্ম বা মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করতে হলে বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সংসদে বিল পাশের আগেই বাংলায় কার্যত বিলের বহু নিয়ম ইতিমধ্যেই কার্যকর হচ্ছে।

নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছেবিলম্বিত নিবন্ধনের প্রতিটি আবেদনেই নথির সত্যতা খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে সরেজমিন তদন্তও করা হতে পারে। কোনও তথ্য ভুয়ো বা বিভ্রান্তিকর বলে প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিল করার ক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে থাকবে। সরকারি মহলের মতেজন্ম ও মৃত্যুর তথ্যের নির্ভুল নথিভুক্তি শুধু প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য নয়জাতীয় নিরাপত্তানাগরিক তথ্যব্যবস্থার স্বচ্ছতা, সরকারি পরিষেবার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই আগামী দিনে এই ক্ষেত্রের নিয়মকানুন আরও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!