- বি। দে । শ
- জুলাই ৩০, ২০২৬
জাপানে ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩০, ধ্বংসস্তূপে এখনো চলছে উদ্ধারকাজ। আশ্রয়শিবিরে কয়েক হাজার বিপর্যস্ত
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের দু–দিন পরেও থামেনি উদ্ধার অভিযান। ধসে পড়া বহুতল শপিং মলের কংক্রিট, ইস্পাত আর ছিন্নভিন্ন তারের স্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খোঁজে বৃহস্পতিবারও নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারী দল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। বৃহস্পতিবার সে দেশের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০। একই সঙ্গে তীব্র দাবদাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার দুর্গত মানুষ। বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবারের ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কুমামোতো প্রদেশ। ভূমিকম্পের পরই সেখানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ছবি সামনে আসে। অসংখ্য বাড়িঘর মাটিতে মিশে যায়, একাধিক সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিভিন্ন এলাকায় আগুন লাগে। বহু জায়গায় বিদ্যুৎ ও জল সরবরাহ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, সপ্তাহান্তে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ফলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি তাপপ্রবাহও এখন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে কুমামোতোর এইওন শপিং মলে। ভূমিকম্পের পর নিরাপত্তার স্বার্থে মলটি খালি করে দেওয়া হলেও প্রায় ৫০ মিনিট পরে সেখানে প্রবল বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, গ্যাস লিক থেকেই এই বিস্ফোরণ হয়েছে। বিস্ফোরণের সময় কত জন কর্মী ভবনের ভিতরে ছিলেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কুমামোতো প্রশাসন জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপ থেকে ইতিমধ্যে চারটি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দফতরের এক আধিকারিক জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনো পর্যন্ত ১০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও এক জনের শরীরে প্রাণের কোনো লক্ষণ মেলেনি। পাঁচ জন আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা গুরুতর।
উদ্ধারকাজের একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, কমলা রঙের পোশাক ও সাদা হেলমেট পরা উদ্ধারকর্মীরা ভেঙে পড়া ইস্পাতের বিম, ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক তার এবং ছাদের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন। ভারী যন্ত্রপাতির পাশাপাশি হাতে-কলমেও চলছে অনুসন্ধান। ধ্বংসস্তূপের নীচে কেউ জীবিত অবস্থায় আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন উদ্ধারকারীরা।ভূমিকম্পের জেরে শুধু শপিং মলই নয়, জাপানের শিল্পাঞ্চলেও বড়ো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইয়াতসুশিরো শহরের ‘নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ’ কারখানায় একটি লাল-সাদা ধোঁয়ার চিমনির অংশ ভেঙে পড়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই দুর্ঘটনায় পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও চার জনের কোনো খোঁজ এ পর্যন্ত মেলেনি।
তীব্র ভূমিকম্পের পর জাপানের সামনে এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে তীব্র গরম। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ২২ হাজার ৬৭০টি পরিবার ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় ছিল। বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৮৪ হাজার বাড়িতে পানীয় জল সরবরাহ বন্ধ ছিল। ফলে বহু মানুষ বাধ্য হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। উকি শহরের একটি ত্রাণশিবিরে দেখা গিয়েছে, শত শত প্রবীণ মানুষ মাদুর পেতে মেঝেতেই রাত কাটাচ্ছেন। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রবীণ জনসংখ্যার দেশ জাপানে এ বিপর্যয়ে বয়স্ক মানুষের দুর্ভোগ বিশেষভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে। কেউ চেয়ারের পাশে, কেউ বা টেবিলের ফাঁকে ঘুমোচ্ছেন। অনেকে জানান, প্রথমে তাঁরা বাড়িতেই থাকার চেষ্টা করেছিলেন। পরে গাড়ির ভিতরে রাত কাটানোরও চেষ্টা করেন। কিন্তু অসহনীয় গরম ও মশার উপদ্রবে শেষ পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রেই আসতে হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে শত শত এয়ার কন্ডিশনার পাঠিয়েছে জাপান সরকার। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গিয়েছে, পেট্রল ও পানীয় জলের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। জাপান আবহাওয়া সংস্থার হিসাবে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.১। যদিও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ভূমিকম্পের মাত্রা ৬.৮ বলে জানিয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার‘-এর উপর অবস্থিত হওয়ায় জাপান পৃথিবীর অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় দেশটিতে প্রতি বছরই শত শত ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিশ্বের মোট ভূমিকম্পের প্রায় ১৮ শতাংশই জাপানে ঘটে।
কুমামোতোও এই প্রথম এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়েনি। ২০১৬ সালেও সেখানে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ২৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন ২,৮০০-রও বেশি মানুষ। তারও আগে ২০১১ সালের ৯.০ মাত্রার বিধ্বংসী সমুদ্রতলীয় ভূমিকম্প ও তার পরবর্তী সুনামি জাপানের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত। সে ঘটনায় প্রায় ১৮,৫০০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার পাশাপাশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও। আবারও সে স্মৃতি ফিরে এসেছে বহু জাপানির মনে।
❤ Support Us







