- দে । শ
- জুলাই ২৯, ২০২৬
বিশ্বের ৭০ শতাংশ বন্য বাঘের আবাস ভারত! ‘আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবস’-এ উচ্ছ্বসিত প্রধানমন্ত্রী, তবু চিন্তার ভাঁজ বিশেষজ্ঞদের কপালে
বিশ্বের মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭০ শতাংশের আবাস এখন ভারত। আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবসে এ সাফল্যকে দেশের মানুষের গর্ব বলে উল্লেখ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি জানান, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ভারতের দীর্ঘ ঐতিহ্য, বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং টেকসই উন্নয়নের সমন্বয়ই দেশের বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচিকে শক্তিশালী করেছে। বনকর্মী, বিজ্ঞানী এবং সংরক্ষণবিদদের নিরলস পরিশ্রমের ভূয়সী প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঘ রক্ষায় তাঁদের নিষ্ঠাই ভারতের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। তবে, একই দিনে সামনে এসেছে ভারতের বাঘ সংরক্ষণের সাফল্যের পাশাপাশি নতুন উদ্বেগের ছবিও— ক্রমবর্ধমান বাঘের সংখ্যা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত নিরাপদ আবাসস্থল, বনাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ রক্ষা, মানুষ-বাঘ সংঘাত এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি আগামী দিনের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রতি বছর ২৯ জুলাই পালিত হয় আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ‘টাইগার সামিট’-এ বিশ্বজুড়ে দ্রুত কমে আসা বাঘের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষিতে এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং বন্য বাঘের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ। সে উপলক্ষেই বুধবার একাধিক বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশের বন্যপ্রাণপ্রেমীদের শুভেচ্ছা জানান। বাঘ সংরক্ষণে ভারতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী লেখেন, বিশ্বের মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭০ শতাংশের আবাসস্থল ভারত— এ তথ্য প্রতিটি ভারতীয়ের কাছে গর্বের। তাঁর মতে, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপন ভারতের বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ এবং সে ঐতিহ্যের সঙ্গে মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তিই দেশের বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচিকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি জানান, বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, জনসম্পৃক্ততা আর টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বাঘ সংরক্ষণকে আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিতে সরকার অটল। পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়কে আরও ক্ষমতায়ন, মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত কমানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বাঘ সংরক্ষণে বনকর্মী, বিজ্ঞানী এবং সংরক্ষণবিদদের ভূমিকার কথাও বিশেষভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, দেশের বনকর্মী, গবেষক ও সংরক্ষণকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার ফলেই ভারতের বাঘ সংরক্ষণ কর্মসূচি আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও তাঁদের অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণকে সঙ্গে নিয়েই সংরক্ষণের পথ এগোবে। উপরাষ্ট্রপতি সি. পি. রাধাকৃষ্ণন জানিয়েছেন, আবাসস্থল সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, চোরাশিকারবিরোধী ব্যবস্থা এবং বনকর্মী, বিজ্ঞানী, সংরক্ষণবিদ ও স্থানীয় মানুষের যৌথ প্রচেষ্টার ফলেই এ সাফল্য এসেছে। কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবও জানান, ভারতের বনাঞ্চলের সুস্বাস্থ্য ও সংরক্ষণের প্রতি সরকারের অগ্রাধিকারই এই সাফল্যের প্রতিফলন। বাঘ সংরক্ষণের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবিকা সুরক্ষার প্রতিও সরকার সমানভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালের পর থেকে ভারতে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘অল ইন্ডিয়া টাইগার এস্টিমেশন ২০২২’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে দেশে ৩,৬৮২টি বন্য বাঘ রয়েছে, যা বিশ্বের মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭০ শতাংশ। এ সমীক্ষায় দেশের ২০টি রাজ্যের ৬.৪১ লক্ষ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা পায়ে হেঁটে ও আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সমীক্ষা করা হয়। সরকারের দাবি, বাঘ সংরক্ষণে ভারতের এ সাফল্য এখন বিশ্বজুড়ে বন্যপ্রাণ পুনরুদ্ধারের অন্যতম সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিবেশ মন্ত্রকের মতে, ভারতের বাঘ সংরক্ষণের সাফল্যের মূল ভিত্তি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিকল্পনা, ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। ‘প্রোজেক্ট টাইগার’, ‘ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি’ (এনটিসিএ) এবং ‘টাইগার কনজারভেশন প্ল্যান’— এই তিন স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়েই দেশের ব্যাঘ্র সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ‘প্রোজেক্ট টাইগার’-এর আওতায় ১৮টি রাজ্যে ৫৮টি টাইগার রিজার্ভের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে। প্রায় ৮৪,৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই সংরক্ষণাঞ্চল ভারতের মোট ভৌগোলিক আয়তনের প্রায় ২.৫৬ শতাংশ। সরকারের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মাথায় রেখে এমন সংযুক্ত ও জলবায়ু-সহনশীল ব্যাঘ্রভূমি গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ ও বন্যপ্রাণ উভয়ের সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তবে এ সাফল্যের মধ্যেই সামনে এসেছে নতুন বাস্তবতা। সংরক্ষণবিদদের মতে, ভারতের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাঘ্র সংরক্ষণাঞ্চল ইতিমধ্যেই তাদের পরিবেশগত ধারণক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গিয়েছে। ফলে পূর্ণবয়স্ক বাঘ নতুন এলাকা খুঁজতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে চলে আসছে। সে পথে তাদের জাতীয় সড়ক, রেলপথ, কৃষিজমি, গ্রাম এবং শহরতলির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এর ফলেই মানুষ-বাঘ সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। ‘ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’-র প্রকল্প বিজ্ঞানী সুপ্রতিম দত্তের মতে, আগামী দশকের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং ইতিমধ্যেই থাকা বাঘদের জন্য পর্যাপ্ত পরিবেশগত ও সামাজিক পরিসর নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, ভারতের অনেক ব্যাঘ্রাঞ্চল অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠলেও পূর্ব মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীশগড়, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা ও তেলঙ্গানার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে এখনো পর্যাপ্ত প্রাণী শিকার বন্ধ, নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং বন্যপ্রাণের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করা গেলে নতুন বাঘের বসবাস সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, এ পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণ করিডর বা সংযুক্ত বনভূমির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর তরুণ বাঘ নিজেদের জন্মস্থান ছেড়ে নতুন এলাকা খুঁজে নেয়, যাতে জিনগত বৈচিত্র্য বজায় থাকে। কিন্তু দ্রুত নগরায়ন, সড়ক, রেলপথ, খনি প্রকল্প এবং শিল্পাঞ্চলের সম্প্রসারণের ফলে বহু প্রাকৃতিক করিডর ভেঙে যাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন ব্যাঘ্র জনসংখ্যা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ‘ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন ট্রাস্ট’-এর কর্মকর্তা অনীশ আন্ধেরিয়ার জানান, করিডর বলতে কোনো সরু বনপথকে বোঝায় না, এটি বিস্তৃত একটি ভূদৃশ্য, যেখানে বাঘ নিরাপদে চলাচল করতে পারে। ভারতের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে উন্নয়নের সঙ্গে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। তবে, জাতীয় সড়ক ৪৪-এ নির্মিত বন্যপ্রাণ পারাপারের অবকাঠামো ইতিমধ্যেই সফল উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছে, ১৮ প্রজাতির বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর পাশাপাশি অন্তত ১১টি পৃথক বাঘ বহুবার ওই আন্ডারপাস ব্যবহার করেছে। চিতাবাঘ, ভালুক এবং বিভিন্ন খুরওয়ালা প্রাণীরও ওই পথ ব্যবহার করার প্রমাণ মিলেছে।
অন্যদিকে, চলতি বছর বাঘের মৃত্যুর সংখ্যাও নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ‘ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি’-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১১৪টি বাঘের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য অংশই ঘটেছে সংরক্ষিত ব্যাঘ্রাঞ্চলের বাইরে। মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং কেরালা-সহ বিভিন্ন রাজ্যে দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, চোরাশিকার, প্রতিশোধমূলক হত্যা, এলাকা দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে বহু বাঘের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আরও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ‘ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাস’ (সিডিভি)-এর সম্ভাব্য সংক্রমণ। সাধারণত গৃহপালিত কুকুরের মধ্যে দেখা যাওয়া এ ভাইরাস বড়ো মাংসাশী প্রাণীর জন্যও মারাত্মক। আফ্রিকার সিংহ, আমুর বাঘের ক্ষেত্রে অতীতে এ ভাইরাস মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়েছে। সে কারণে ভারতের বিভিন্ন ব্যাঘ্রাঞ্চলেও এখন রোগ পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশপাশে থাকা গৃহপালিত কুকুরের উপর নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
আন্তর্জাতিক ব্যাঘ্র দিবসে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারও পূর্বঘাটে বাঘের সংখ্যা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। উপমুখ্যমন্ত্রী তথা বন ও পরিবেশমন্ত্রী পবন কল্যাণ জানান, মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশ থেকে স্ত্রী বাঘ স্থানান্তরের মাধ্যমে জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, পূর্বঘাটে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ বাঘের জনসংখ্যা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নাগার্জুনসাগর-শ্রীশৈলম টাইগার রিজার্ভে ৬৮টি বাঘ এবং ১১টি শাবকের উপস্থিতির কথাও তিনি তুলে ধরেন। চোরাশিকার রোধে ড্রোন, ক্যামেরা ট্র্যাপ, এম-স্ট্রাইপস এবং ‘হনুমান’ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি চেঞ্চু সম্প্রদায়কে সংরক্ষণ কর্মসূচির সক্রিয় অংশীদার করার কথাও জানান তিনি। অন্যদিকে তেলঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ. রেভন্ত রেড্ডি বলেন, বাঘ শুধু অরণ্যের প্রতীক নয়, সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রাণী। তাই বন সংরক্ষণ, অবৈধ শিকার রোধ এবং পরিবেশ রক্ষাকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান তিনি।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে ‘প্রোজেক্ট টাইগার’-এর মাধ্যমে যে সংরক্ষণ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, আজ তার ফলেই ভারত বিশ্বের বাঘ সংরক্ষণের অন্যতম সফল দেশ। কিন্তু সংরক্ষণবিদদের মতে, আগামী দিনের সাফল্য কেবল বাঘের সংখ্যা ৪,০০০ বা ৫,০০০ ছুঁল কি না, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন একটি তরুণ বাঘ নিরাপদে এক সংরক্ষিত বন থেকে অন্য উপযুক্ত আবাসস্থলে পৌঁছতে পারবে, মানুষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে না, সংযুক্ত, নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল বনভূমিতে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে। সে লক্ষ্যেই এখন ভারতের বাঘ সংরক্ষণের পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয়েছে।
❤ Support Us







