- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৩০, ২০২৬
সংগ্রহমূল্যের চেয়ে ৪০% কম দামে ইথানল কারখানায় চাল বিক্রি এফসিআইয়ের, রাজ্যসভায় স্বীকারোক্তি কেন্দ্রের
পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রণ বাধ্যতামূলক করার কেন্দ্রীয় নীতিকে ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে। গাড়ির ইঞ্জিনের ক্ষতি, মাইলেজ কমে যাওয়ার অভিযোগে অসন্তোষ বাড়ছে গ্রাহকদের একাংশের মধ্যে। অন্যদিকে, সেই ইথানল উৎপাদনের জন্য দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসা ‘ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া’ (এফসিআই) মজুত চাল সংগ্রহমূল্যের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে ডিস্টিলারিগুলির হাতে তুলে দিচ্ছে, সংসদে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য স্বীকার করল কেন্দ্র সরকার। গত এক বছরে ১৪,৫৯৬.৭৮ কোটি টাকা মূল্যের ৬৩.৫ লক্ষ টন চাল ইথানল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিকে সরবরাহ করেছে ‘এফসিআই’ বলেও জানিয়েছে কেন্দ্র।
রাজ্যসভায় সাংসদ অশোক সিংয়ের প্রশ্নের লিখিত উত্তরে কেন্দ্রীয় ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন প্রতিমন্ত্রী নিমুবেন জয়ন্তিভাই বাম্ভানিয়া জানান, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে ইথানল উৎপাদনের জন্য ‘এফসিআই’ প্রতি কুইন্টাল চাল ২,২৫০ টাকা থেকে ২,৩২০ টাকা দরে বিক্রি করেছে। অথচ একই সময়ে ওই চাল সংগ্রহ করতে সংস্থার খরচ তার তুলনায় অনেক বেশি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ‘এফসিআই’-এর গড় সংগ্রহমূল্য ছিল প্রতি কুইন্টাল ৩,৭১৯.৭২ টাকা, যা ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সংশোধিত হিসাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৮৮৯.৪৬ টাকা। অর্থাৎ, সংগ্রহমূল্যের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে চাল বিক্রি করা হয়েছে ইথানল প্রস্তুতকারীদের কাছে।
রাজ্যসভায় খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ মাসে ‘এফসিআই’-এর গুদাম থেকে মোট ৬৩.৫ লক্ষ টন চাল ইথানল উৎপাদনকারী ডিস্টিলারিগুলির কাছে পাঠানো হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য ১৪,৫৯৬.৭৮ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি চাল পেয়েছে হরিয়ানা, প্রায় ৮,৪৪,১৪১ টন। তার পরেই রয়েছে উত্তরপ্রদেশ, যেখানে পাঠানো হয়েছে ৮,৩৮,৬৪৫ টন চাল। পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশ মিলিয়ে পেয়েছে ৬,৫৮,৯৫২ টন। পশ্চিমবঙ্গও রয়েছে প্রথম পাঁচ রাজ্যের তালিকায়। এ রাজ্যে পাঠানো হয়েছে ৫,৮৪,৬৭২ টন চাল। মধ্যপ্রদেশ পেয়েছে ৪,৩২,৪৮৫ টন। ‘ওপেন মার্কেট সেল স্কিম’ (ডোমেস্টিক) বা ‘ওএমএসএস’ (ডি)-এর আওতায় ২০২৫ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইথানল শিল্পের জন্য চালের দাম ধার্য ছিল প্রতি কুইন্টাল ২,২৫০ টাকা। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সে মূল্য বাড়িয়ে করা হয় ২,৩২০ টাকা। কেন্দ্র ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত ইথানল ডিস্টিলারিগুলিকে প্রতি কুইন্টাল ২,৩৯০ টাকা দরে চাল দেওয়া হবে। আগামী ইথানল সরবরাহ বছরে (নভেম্বর-অক্টোবর) মোট ৭২ লক্ষ টন চাল বরাদ্দ করার পরিকল্পনাও করেছে কেন্দ্র, যা চলতি বছরের ৫৫ লক্ষ টনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি।
তবে সংগ্রহমূল্যের চেয়ে এত কম দামে চাল বিক্রি করা হলেও সরকার সংসদে দাবি করেছে, ইথানল প্রস্তুতকারীদের কোনো ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের বক্তব্য, নির্ধারিত ‘ওএমএসএস’ (ডি) মূল্যেই চাল বিক্রি করা হচ্ছে। কিন্তু সংগ্রহমূল্য ও বিক্রিমূল্যের মধ্যে যে বিপুল ব্যবধান, তার আর্থিক বোঝা কী ভাবে সামলানো হচ্ছে, সে প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি সরকারি উত্তরে। এ প্রসঙ্গেই কৃষি বিশেষজ্ঞ জি কে সুদ বলেছেন, সরকার ভর্তুকির কথা অস্বীকার করলেও বাস্তবে এটি পরোক্ষ ভর্তুকিরই শামিল। তাঁর বক্তব্য, ২০২৬-২৭ ইথানল সরবরাহ বছরে প্রতি টন চাল প্রায় ২৩,৯০০ টাকায় বিক্রি করার পরিকল্পনা হয়েছে, যেখানে ওই চালের প্রকৃত অর্থনৈতিক ব্যয় প্রায় ৪৩,১০০ টাকা প্রতি টন। অর্থাৎ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, পরিবহণ ও বহনের সমস্ত খরচ ধরলে সরকারের প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি। এ ব্যবধান যদি আলাদা ভাবে বাজেটে দেখানো না হয়, তবে শেষ পর্যন্ত তা খাদ্য ভর্তুকির বিলেই প্রতিফলিত হবে।
জি কে সুদের মতে, উদ্বৃত্ত চালের মজুত কমানোর যুক্তি থাকলেও বৃহত্তর প্রশ্ন অন্য জায়গায়। বিপুল সরকারি সহায়তা, উচ্চ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ও প্রচুর জল ব্যবহার করে উৎপাদিত চাল পরে আবার কম দামে ইথানল তৈরির জন্য বিক্রি করা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে নীতিগত বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, ব্যাঙ্ক অফ বরোদার মুখ্য অর্থনীতিবিদ মদন সাবনাভিসের মতে, তেল বিপণন সংস্থাগুলি ইথানল যে দামে কেনে, সে বাজার কাঠামো মাথায় রেখেই চালের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংসদে দেওয়া জবাবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। গত এক বছরে ইথানল উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ ‘এফসিআই’-এর চাল অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার দুটি ঘটনা ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্ট রাজ্যের খাদ্য দফতর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত দুই ডিস্টিলারির কাছে ভবিষ্যতে আর চাল বরাদ্দ করবে না বলে জানিয়েছে ‘এফসিআই’। তবে বিতর্কিত সেই সংস্থাগুলির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
দেশে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে এবং অপরিশোধিত তেলের আমদানি কমাতে কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই ‘ইথানল ব্লেন্ডেড পেট্রল’ কর্মসূচির উপর জোর দিচ্ছে। সেই কর্মসূচির আওতায় বর্তমানে দেশে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রল বিক্রি বাধ্যতামূলক। সরকার ২০৩০ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালের জুলাই মাসেই সে লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে দাবি করেছে। কেন্দ্রের মতে, এই কর্মসূচির ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমবে, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস পাবে, পাশাপাশি আখচাষিদের আয়ও বাড়বে। পাশাপাশি উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্যের ব্যবহারও সম্ভব হবে। তবে এ নীতিকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়। একাধিক গাড়ির মালিকের অভিযোগ, ই-২০ জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা কমছে, মাইলেজেও প্রভাব পড়ছে। চলতি বছরের ৫ জুলাই প্রকাশিত ‘লোকালসার্কলস’-এর একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, অংশগ্রহণকারী পেট্রলচালিত গাড়ির মালিকদের ৫৩ শতাংশের মতে, ই২০ জ্বালানি চালুর ক্ষেত্রে সরকারের পদক্ষেপ ছিল ‘অকার্যকর’ অথবা ‘অত্যন্ত খারাপ’।
প্রসঙ্গত, ‘এফসিআই’ ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (এমএসপি) উন্মুক্ত সংগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, ছত্তীশগড়-সহ একাধিক রাজ্যের কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে। জনবণ্টন ব্যবস্থা ও বিভিন্ন কল্যাণমূলক প্রকল্পে প্রয়োজন মিটিয়েও বহু বছর ধরেই সংস্থার গুদামে উদ্বৃত্ত চাল মজুত রয়েছে। সেই উদ্বৃত্ত চালেরই একটি বড়ো অংশ এখন ইথানল উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সংগ্রহমূল্যের তুলনায় উল্লেখযোগ্য কম দামে সেই চাল বিক্রির সরকারি স্বীকারোক্তি নতুন করে কেন্দ্রের খাদ্য ও জ্বালানি নীতিকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এনে ফেলেছে।
❤ Support Us








