- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- আগস্ট ১৬, ২০২৬
বহুমাত্রিকের ধর্ম আর কর্ম
‘It is a strange amalgam of a book — an “autobiography,” almost a “self-obituary,” also a travelogue, a confession…’
– P. Lal, Lessons: The Testament of a Survivor
দারাশিকোর উপলব্ধির প্রায় তিনশো বছর পর মহাত্মা গান্ধিকেও আমরা দেখি তাঁর ‘হিন্দ স্বরাজ’ গ্রন্থে প্রায় একই মনোভাবের কথা লিখেছেন । দারাশিকোকে প্রাণ দিতে হয়েছিল নিজের ভাই আওরঙ্গজেবের হাতে। গান্ধিজীও প্রাণ দিয়েছিলেন এক উগ্র মৌলবাদীর হাতে। দুটি ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, উগ্রবাদীদের কাছে কোনও দেশ বা জাতি অথবা দেশ বা জাতীয় সংস্কৃতির কোনও অর্থ নেই — তাদের হিংসা বহুত্বের বিরুদ্ধে, একরৈখিকতার পক্ষে। ভারতবর্ষের মতো একটা বিশাল দেশের জাতি বা সংস্কৃতিকে বুঝতে গেলে তার পরিধি বা তার বৃত্ত থেকে তাকে না দেখলে, ভারতাত্মার কার্যকারিতার কেন্দ্রকে বোঝা যায় না। কবি রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর ভাষাকে একটু ঘুরিয়ে ইংল্যান্ডের বদলে ইন্ডিয়া বসিয়ে বলা যায় — ‘He knows not India who only India knows’, অর্থাৎ যে শুধু ভারতবর্ষকে জানে সে সত্যকার ভারতবর্ষকে জানে না।
দিল্লিতে, সুফি সাধক নিজামুদ্দিনের দরগা থেকে একটু দূরে, হুমায়ূনের সমাধির পাশে বসে বসে, কতকিছু ভাবছি। দেখছি মহা-ভারতের অতীতকে, বর্তমানকেও । সূর্য অস্তাচলের পথে, নৈঃশব্দ আঁধার বুনতে শুরু করেছে, পারিপার্শ্বিকের হৈচৈ-এর মধ্যে বিরাজমান অপার শান্তি । হঠাৎ কানে বাজল সুমধুর মূর্ছনা – দরগা থেকে ভেসে আসছে একী বিস্ময়, “ইয়ে জমিন জব না থি, ইয়ে জাহান জব না থা/ চাঁদ সূরয না থে, আসমান জব না থা,/ রাজ এ হক ভি কিসি পর আয়া জব না থা/ তব না থা কুচ ইয়াহাঁ, থা মাগর তু হি তু…”
দূর থেকে মনে হচ্ছিল, দরগার ভেতরে, লন্ঠনের নরম আলোয় মোমবাতির শিখাগুলিও আজানের সুরের সঙ্গে মাথা দোলাচ্ছে। আমি যেখানে বসে আছি, তারই আশপাশে শুয়ে আছেন সুফি পরস্ত ভারতীয় সাধক শাহজাদা দারা শিকো। এক আশ্চর্য প্রতিভা, তাঁর প্রথম আর শেষ ভালোবাসার নাম ভারত-ইরানি আধ্যাত্মিক চিন্তার সাদৃশ্যের আবিষ্কার। তিনি বিশ্বাস করতেন, যা ব্রক্ষ্ম, তাই দ্যুতিমান আলো (নুর)। বিস্মিত হতে হয়,গীতা আর উপনিষদের ফারসি তরজমা করেছিলেন তিনি। ‘সির্র-ই-আকবর’ নামে পঞ্চাশটিরও বেশি উপনিষদের সেই ফার্সি অনুবাদ (১৬৫৭) — এবং দারাশিকোর এই অনুবাদই সর্বপ্রথম ইউরোপে প্রবেশ করেছিল, আঁকেতিল দ্যুপেরোঁর লাতিন সংস্করণের হাত ধরে। সে সূত্রকে ঘিরে ভারতীয় দর্শন চিন্তার কালজয়ী দুই স্তম্ভকে নিয়েই ইউরোপের ভারতত্ত্বের সূত্রপাত হয়, শোপেনহাওয়ারও দারাশিকোর প্রভাবে আলোকিত হয়েছিলেন, দারাশিকো তাঁর চিন্তা-ভাবনায় খুঁজে পেয়েছিলেন দুই সমুদ্রের মহামিলনকে ( মজমু-আল-বাহরাইন), বুঝতে পেরেছিলেন একরৈখিকতা নয়, বহু মত, বহু পথই ভারতীয় সাধনার কাঙ্খিত গন্তব্য ।
সাম্প্রদায়িকতা শুধুমাত্র জাগতিক সুযোগসুবিধা লাভের চেষ্টা করে না, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করারও প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। একথা আমাদের স্পষ্ট বুঝে রাখা দরকার যে সাম্প্রদায়িক বৈরি স্থিতিশীল বা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আমরা আশ্চর্য হয়েই লক্ষ করি, একই মানুষ একসময় সাম্প্রদায়িক, আবার অন্যসময় তীব্র সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং শ্রেণিসংগ্রামের এ প্রবণতা থেকে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের মূল চালিকা শক্তি তার শ্রেণিচেতনা
এখন যে প্রশ্নটি সবার আগে আমাদের মনে উঁকি-ঝুঁকি দিতে শুরু করেছে, সেটি হল, সত্যকার ভারতবর্ষকে কী করে জানব ? জওহরলাল নেহরু, ব্রিটিশ কারাগারের নির্জনতায় বসে যখন লিখছেন তাঁর ‘দ্য ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ (১৯৪৬), তখন তিনিও এই একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর ভাবনাচিন্তায় ভারতবর্ষ যেন এক প্রাচীন ‘পালিম্পসেস্ট’ — এমন এক পুরনো পুঁথি, যার উপর যুগে যুগে নতুন লেখা চাপানো হয়েছে, অথচ আগের লেখাটি সম্পূর্ণ মুছে যায়নি; বরং স্তরে স্তরে জমে থেকে তৈরি হয়েছে জটিল, অবিচ্ছিন্ন সভ্যতা, যার বৈচিত্র্যের নিচে বহমান একটি গভীর ঐক্যসূত্র। এই সমন্বয়ধর্মী চেতনারই লোকজ নাম — গঙ্গা-যমুনি তহজিব — যার জন্ম উত্তর ভারতের দোয়াব অঞ্চলে, প্রায় সহস্র বছরের সামাজিক সহাবস্থান আর পারস্পরিক আদানপ্রদানের ভিতর দিয়ে।
বহুদিন আগে সঈদ নকভির ‘বিয়িং দি আদার’ (২০১৬) বইটি পড়েছিলাম। লেখক নিজের ছোটবেলার স্মৃতিকে দিয়ে বইটা শুরু করেছিলেন । উত্তরপ্রদেশের অবধ অঞ্চলে রায়বরেলির কাছে মুস্তাফাবাদে থাকতেন তাঁরা। আত্মীয়-পরিজন নিয়ে যৌথ জীবনের এক অদ্ভুত বন্ধনে। সেই বিস্তীর্ণ কসবায় কোনও বধূ অন্তঃসত্ত্বা হলে খবর পেতেন সবাই। খবর চলে যেত সোহর-গায়িকাদের কাছেও। সোহর হল সম্ভাব্য সন্তানের মঙ্গলকামনায় গাওয়া লোকগান। প্রসূতি সাত মাসে পা দিলে সোহর-গায়িকারা আসতেন বাড়িতে, গান গাইতেন ভাবী জননীর সামনে। নকভি লিখছেন, তাঁর মায়ের প্রিয় একটি সোহরের মূল কথা ছিল — ‘আল্লামিয়া হামরে ভাইয়াকো দিয়ো নন্দলাল’। এই হল আমার ভারতবর্ষ, আমাদের ভারতবর্ষ, যেখানে যে কোনও পল্লিতে বধূ অন্তঃসত্ত্বা হলে গায়িকা গান গেয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন, ‘আমার ভাইয়ের ঘরে কৃষ্ণ এনে দিয়ো’। আমার ভারতবর্ষ, আমাদের ভারতবর্ষ — নানা জাতি, নানা ভাষা, নানা সাংস্কৃতিক চেতনায় উজ্জ্বল এক বহুকৌণিক হীরকখণ্ড। একে বুঝতে গেলে এই হীরকখণ্ড থেকে ঠিকরে আসা অসংখ্য দ্যুতির একক সত্তাটিকে বুঝতে হবে, এবং একমাত্র তখনই আমরা বুঝব, একটি রংধনুর একক চোখের একাধিক দিকগুলিকেও। অমর্ত্য সেন তাঁর ‘দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’ (২০০৫) গ্রন্থে ঠিক এই বহুস্বরতাকেই ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীনতম ও সবচেয়ে স্থায়ী বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করেছেন — যুক্তি-তর্ক ও ভিন্নমতের এক দীর্ঘ পরম্পরা, যা বহমান ছিল বেদান্তের বিতর্ক-সভা থেকে শুরু করে আকবরের ইবাদতখানা পর্যন্ত ।
ইতিহাস সাক্ষ্ণী, ভারতীয় সভ্যতা একমাত্রিক সভ্যতা নয়। ভারতীয় সংস্কৃতি একমুখী সংস্কৃতি নয়। বহু ধারার সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে ভারতীয়ত্তার বুনিয়াদ, যা যুগ যুগ ধরে গ্রহন করেছে বহু বিচিত্র স্রোত থেকে আসা মানুষের সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনচর্যাকে। উপনিষদ বলেছে, ‘একই অগ্নি যেমন ভুবনে প্রবেশ করে, রূপে রূপে আলাদা আকার পায়… তেমনই এক সর্বভূতান্তরাত্মা রূপে রূপে বিরাজমান, অথচ তাদের বাইরে আপন আপন অবিকৃত সত্তায় বিরাজমান।’ এ কথা মানুষ সম্বন্ধেও সত্য। মানুষ সর্বাগ্রে মানুষ। তারপর অন্য সবকিছু — তাঁর কর্মপরিচয়, তাঁর ভাষিক আত্মীয়তা, তাঁর ভৌগোলিক সংযোগ বা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠিবদ্ধতা। আম্বেদকর স্বীকৃতি দিতে চেয়েছিলেন সংবিধানের মাধ্যমে মানুষের প্রাথমিক সত্তাটিকে। সংবিধান সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, এটি বস্তুত এক মহান জীবনচর্যা যা স্বাধিকার, সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বকে জীবনের নীতি হিসেবে চিহ্নিত করে, এবং এই ত্রিনীতির কোনওটিকেই একে অন্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পশ্চিম ভারতে যে পারসি অভিযান হয়েছিল, তা রং ঢেলেছে মৌর্যযুগীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যে, এবং তারই ফসল সমৃদ্ধ করেছে আমদের ‘গান্ধার শিল্পকলা’, যা হেলেনীয় বৈশিষ্ট্যে পূর্ণ। বহু বিদেশি আক্রমণকারী গ্রহণ করেছে এ দেশের ধর্ম — ব্যাক্ট্রীয় গ্রিকরা গ্রহণ করেছে ভাগবত ধর্ম, শকেরা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম, আর কুষাণরা বৌদ্ধধর্ম। মধ্যযুগে এই মিলনধর্মী ঐতিহ্যের মূল স্রোতে যুক্ত হয়েছে মুসলিমরা, তাঁদের সাংস্কৃতিক ধারাকে সঙ্গে নিয়ে। হিন্দু ও তুর্কি-ইরানীয় ধারার সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় ইন্দো-ইসলামি স্থাপত্য। জৈন ঐতিহ্য ও ইসলামি সংস্কৃতির মিশ্রণে সৃষ্টি হয় রাজস্থানি চিত্রকলা, আর বৌদ্ধ, বৈদান্তিক ও ইসলামি চিন্তাধারার সংমিশ্রণে জন্ম নেয় সুফি চিন্তাধারা। সমন্বয়ের এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপও আমরা দেখি সম্রাট আকবরের আমলে — ১৫৭৫ সালে ফতেপুর সিক্রিতে গড়ে ওঠা ইবাদতখানায়, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, জৈন, পার্সি ও পর্তুগিজ জেসুইট পাদ্রিরা এক টেবিলে বসে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তর্ক করতেন, পরবর্তীকালে যার পরিণতিতে জন্ম নেয় ‘দীন-ই-ইলাহি’ — এক সারসংকলিত ধর্মচেতনা, যা রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বহুত্ববাদকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার এক প্রাচীনতম দৃষ্টান্ত। সর্বোপরি বলতে হয় বৈষ্ণব আন্দোলনের কথা, যার প্রেম ও ভক্তির জারিত রস সমস্তকিছুর মিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি করে নানা জাতি ও সম্প্রদায়ের এক মহামিলনক্ষেত্র।
এটা বলা ভুল হবে না যে মুসলিমরা ভারতবর্ষে পারসিক ভাষার সূচনা করে। পাশাপাশি তাদেরই উৎসাহ আর পৃষ্ঠপোষকতায় বিকাশ ঘটে সংস্কৃত ভাষার। দিল্লির সুলতানি আমলে রামানুজ, মাধব ও বল্লভের সুবিখ্যাত রচনাগুলি জন্ম নেয়। সংগীতে প্রাচীন ধারার সঙ্গে ইরানি ও আরবি ধারার সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় সারেঙ্গি, তবলা প্রভৃতি অনবদ্য সব বাদ্যযন্ত্রের — এবং এরই ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় খেয়াল ও কাওয়ালির মতো গায়নরীতি, যার প্রবর্তক আমির খসরু, যিনি নিজে ছিলেন তুর্কি-ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং তাঁরই হিন্দাভি ও ফার্সি মিলেমিশে তৈরি হয়েছিল নতুন কাব্যভাষা।
মনীষী আলবেরুণির পর পাঠান ও মুঘলদের সময় সংস্কৃতির নানারূপের সমন্বয় আমরা লক্ষ করি। নানক, কবীর, রামানুজ, চৈতন্যের মতো সাধকগণ ধর্মের ভিত্তিতে সমন্বয়ের প্রয়াসী ছিলেন। আকবর, দারাশিকো সাহিত্যিক সমন্বয়ের ধারা উন্মুক্ত রেখেছিলেন। যে কয়েকটি চিহ্নিত পথে মহামানবিক সমন্বয় ঘটেছিল, সেগুলি প্রথমত মননে, দ্বিতীয়ত সাধারণের দৈনন্দিন জীবনযাপনে, তৃতীয়ত সাধকদের প্রচার, বাণী ও উদার আদর্শের প্রচারে, চতুর্থত শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার সমন্বয়ে ।
আজ এই নির্বাপনের উৎসমুখে দাঁড়িয়ে পুরনো রাত ছুঁতে চায় প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত সংহতির সে শক্তি, সেই সহনশীলতাকে, যার জাদুস্পর্শ মানুষকে ফিরিয়ে দিতে পারে ভিন্ন ভিন্ন উৎস স্বাতন্ত্র্যের ভিতের ওপর দাঁড়িয়েই, সে তার আদর্শ, তার আকাঙ্ক্ষার আশ্চর্য শক্তির পুনরুদ্ধার তাঁকে আরো বলবান, আরো সংহত এবং সহজের পরমাত্মীয় করে তুলবে, এটাই ভাগ্য বিধাতার একান্ত ইচ্ছা ।
ভারতবর্ষের ইতিহাস আজও সাক্ষ্য দেয় যে, বিভিন্ন সময়ে সঙ্ঘটিত আর সংগঠিত দ্বন্দ্ব তার আবহমান ইতিহাসের প্রকৃত ধর্ম নয় – বরং তা ছিল মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ভূখণ্ডের লড়াই, যাতে ধর্ম আনুষঙ্গিক পরিচয়মাত্র। ইতিহাসবেত্তা রোমিলা থাপার, বিপান চন্দ্র ও হরবংশ মুখিয়া তাঁদের যৌথ সঙ্কলন ‘কমিউনালিজম অ্যান্ড দ্য রাইটিং অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি’ (১৯৬৯)-তে ঠিক এই সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চারই সমালোচনা করেছিলেন — দেখিয়েছিলেন, কীভাবে ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা ভারতের অতীতকে হিন্দু ও মুসলিম যুগে বিভক্ত করে, প্রতিটি যুগকে একরৈখিক ধর্মীয় সংঘাতের বয়ান দিয়ে পড়তে শিখিয়েছিলেন — এমন এক পাঠ, যা প্রকৃত ইতিহাসের বহুস্তরীয় জটিলতাকে আড়াল করে দেয়। এই সাম্প্রদায়িক সত্তার প্রতি আনুগত্য আর আজকের সাম্প্রদায়িকতা এক জিনিস নয়। এখনকার সাম্প্রদায়িকতার উৎস প্রধানত রাজনীতিকে কেন্দ্রে রেখে, এবং তার উৎস খুঁজতে হবে ব্রিটিশ আমলে, ঔপনিবেশিক আর প্রশাসনিক কৌশলে, যা জনগণনা ও পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক গণনার একক-এ রূপান্তরিত করেছিল। সাম্প্রদায়িকতা শুধুমাত্র জাগতিক সুযোগসুবিধা লাভের চেষ্টা করে না, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করারও প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে। একথা আমাদের স্পষ্ট বুঝে রাখা দরকার যে সাম্প্রদায়িক বৈরি স্থিতিশীল বা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আমরা আশ্চর্য হয়েই লক্ষ করি, একই মানুষ একসময় সাম্প্রদায়িক, আবার অন্যসময় তীব্র সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং শ্রেণিসংগ্রামের এ প্রবণতা থেকে আমরা বুঝতে পারি, মানুষের মূল চালিকা শক্তি তার শ্রেণিচেতনা।
আমরা বিশ্বাস করি, যে কোনও মৌলবাদ সামাজিকতার পরিপন্থী এবং নিন্দনীয়। কিছুকাল ধরে আমরা লক্ষ করছি, কিছু মৌলবাদী সংগঠনের রাজনৈতিক এজেন্ডা ক্রমশ বাড়ছে । দেশভাগ ও স্বাধীনতার পর যে সব মঙ্গলকামী জনগোষ্ঠী ভারতবর্ষের সংবিধানকে মান্যতা দিয়ে, তার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে, চাপের মুখেও দেশ ছাড়তে চাননি, তাঁদের সর্বতোভাবে রক্ষা করা সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক দায়িত্ব । সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে যেকোনও মূল্যে আমাদের সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে, এবং এর জন্য গড়ে তুলতে হবে সুস্থ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য হবে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রকৃত বৈচিত্র্যময় রূপটিকে তুলে ধরা — অর্থাৎ এমন বৈচিত্র্য, যা শুধু ধর্মভিত্তিক নয়, যা গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করে। একই সঙ্গে সাংবিধানিক ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তন এবং অসম আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কার জরুরি।
এই আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের চিত্রটি পরিসংখ্যানেও স্পষ্ট। বিচারপতি রাজিন্দর সাচারের নেতৃত্বে গঠিত সাচার কমিটি, ২০০৬ সালের রিপোর্টে দেখিয়েছিল, মুসলিমদের সাক্ষরতার হার জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক অনেক কম, সরকারি চাকরিতে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার অনুপাতের তুলনায় সামান্য অংশমাত্র। এই রিপোর্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নটি নিছক সাংস্কৃতিক নস্টালজিয়া নয় — একইসঙ্গে ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব ও সুযোগের প্রশ্নও বটে, যা ছাড়া কোনও ‘মহামিলন’-এর বয়ান সম্পূর্ণ হবে না ।
আমরা লক্ষ করেছি, বহিরাগত উন্নয়ন তছনছ করে দিচ্ছে পুরনো জীবনকে । পুরনো দারিদ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন রিক্ততা। বড়ো পুঁজি আর বড়ো রাজনীতির দাপটে অসহায় গ্রামবাসী ক্রমাগত প্রান্তে নিক্ষিপ্ত হচ্ছেন । তাঁদের কথা আমরা শুনতে চাই না। মৃত পাথরের বুকে যে কান্না বাজে, তা আমরা শুনতে পাই না আমাদের সীমাহীন কাজের ভিড়ে। আমাদের এই শুনতে-না-চাওয়ার অক্ষমতা কিংবা অশ্রদ্ধা সমস্ত উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে তুলছে। ভুলে গেলে চলবে না, ওই প্রান্তিক, অসহায়, ক্ষমতাহীন কোটি কোটি মানুষের উন্নতি ছাড়া ভারতবর্ষের উন্নতি স্বপ্নেরও অতীত, কারণ ওই কোটি কোটি মানুষের মধ্যেই বাস করে আমার ভারতবর্ষ, আমাদের ভারতবর্ষ। এজন্যই অসম আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন, যাতে নিম্নবর্গের মানুষের অর্থনৈতিক হতাশা দূর হয় এবং তাঁরা সাম্প্রদায়িক শক্তির সহজ শিকার না হন। রাজনীতি বিজ্ঞানী সুনীল খিলনানি তাঁর ‘দি আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ তে (১৯৯৭) বলেছিলেন, ভারতবর্ষ কোনও সমাপ্ত সত্য নয়, একটি নিরন্তর নির্মীয়মাণ ধারণা, যাকে প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে কল্পনা করে নিতে হয়, নতুন করে অর্জন করতে হয়। আমরা জানি, আমাদের সমস্ত বৈচিত্র্যের মধ্যে সেই সুরটি আজও অক্ষয় হয়ে আছে। যে কোনও অবসরে, প্রহর থেকে প্রহরে, বুঝতে হবে, শুনতে হবে যে — ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা, সুর বনে হামারা’।
♦•–•♦•–•♦ ♦•–•♦•–•♦
❤ Support Us







