- বি। দে । শ
- আগস্ট ২৪, ২০২৬
‘বাসমতি’-তে ভারতের একচেটিয়া অধিপত্য নয়, নির্দেশ অস্ট্রেলিয়ার আদালতের, চাপে পঞ্জাব-হরিয়ানার রপ্তানিকারকরা
ভারতীয় বাসমতি চাল রপ্তানিকারকদের জন্য বিশাল ধাক্কা। অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্ট অস্ট্রেলিয়ায় ‘বাসমতি’ চালের জন্য ভারতের একচেটিয়া সার্টিফিকেশন ট্রেডমার্কের স্বীকৃতি দেওয়ার আবেদন খারিজ করেছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার বাজারে ভারতীয় বাসমতি রপ্তানিকারকদের আর একচেটিয়া অবস্থান থাকছে না এবং পাকিস্তানের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে হবে।
এ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে হরিয়ানা ও পঞ্জাবের বাসমতি শিল্পে। দেশের মোট বাসমতি রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ একাই পঞ্জাব থেকে আসে। হরমুজ হয়ে পণ্য পরিবহণ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে যখন দুই রাজ্যের বাসমতি রপ্তানিকারকরা বিকল্প বিদেশি বাজার খুঁজে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, ঠিক সে সময় অস্ট্রেলিয়ার এই রায় এসেছে। বাসমতি এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি রঞ্জিত সিং জোসান বলেন, এই রায়ের ফলে অস্ট্রেলিয়ার বাজারে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের আর একচেটিয়া সুবিধা থাকবে না। ফলে প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের রপ্তানিকারকদের সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতা করতে হবে। অন্যদিকে, পাকিস্তান এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
ভারতের Agricultural and Processed Food Products Export Development Authority (APEDA) অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্টে যুক্তি দিয়েছিল যে ভারতে উৎপাদিত বাসমতি চাল Geographical Indication (GI) মর্যাদা পেয়েছে। তাই অস্ট্রেলিয়াতেও বাসমতিকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত একটি সার্টিফিকেশন ট্রেডমার্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। কিন্তু আদালত সেই আবেদন গ্রহণ করেনি। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও কানাডায় GI-সংক্রান্ত স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ‘চ্যাম্পেন’-এর মতো নির্দিষ্ট উদাহরণ থাকলেও বাসমতির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষের মতে, সাধারণ ক্রেতারা ‘বাসমতি’ শব্দটিকে কোনও একক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত সার্টিফিকেশন চিহ্ন হিসেবে দেখেন না। বরং তারা বাসমতিকে একটি বিশেষ ধরনের চাল হিসেবে বোঝেন, যা একটি বৃহত্তর ভৌগোলিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১১ আগস্টের রায়ে বিচারপতি ডাওলিং জে উল্লেখ করেন যে, বাসমতি চাল হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমিতে উৎপাদিত হয়, যার মধ্যে উত্তর ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের কিছু এলাকাও রয়েছে। আদালত আরও বলেছে, ‘বাসমতি’ শব্দটি APEDA-অনুমোদিত বা সার্টিফায়েড চাল এবং অন্যান্য বাসমতি চালের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে না। আদালত অস্ট্রেলিয়ার Trade Marks Act 1995-এর Section 177(2)-এর বিধানগুলির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনও certification mark এমন হতে হবে, যা সার্টিফায়েড পণ্যকে অন্যান্য পণ্য থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে সক্ষম। এ ধরনের সার্টিফিকেশনের মানদণ্ডের মধ্যে পণ্যের ভৌগোলিক উৎপত্তি, নির্দিষ্ট গুণমান বা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তবে আদালতের মতে, ‘বাসমতি’ শব্দটি মূলত একটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী বা একটি দেশের পণ্যকে অন্যদের থেকে আলাদা করে না। APEDA ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় বাসমতির certification trademark-এর জন্য আবেদন করেছিল। আবেদনে ভারতে উৎপাদিত বাসমতির দীর্ঘদিনের উপস্থিতি ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে এর বিপুল বিক্রির তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।
১৯৮৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার খুচরো বাজারে ভারতীয় বাসমতি চালের আনুমানিক বিক্রি ছিল ৩,০৬,০৯৫ টন, যার মূল্য প্রায় ৩৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, একই সময়ে পাকিস্তানি বাসমতি চালের বিক্রির পরিমাণের মূল্য ছিল প্রায় ৪৪.১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার ট্রেডমার্ক কর্তৃপক্ষ APEDA-র আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তাদের যুক্তি ছিল, যেহেতু পাকিস্তানেও বাসমতি উৎপাদিত হয়, তাই ভারতকে বাসমতির একমাত্র উৎপাদক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর APEDA ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল কোর্টে যায় এবং de novo, অর্থাৎ নতুন করে সম্পূর্ণ শুনানির আবেদন করে। কিন্তু সেই আইনি লড়াইয়েও ভারত কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পেল না।
বাসমতির একচেটিয়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারত এর আগেও সমস্যার মুখে পড়েছে। নিউজিল্যান্ড ও কেনিয়াতেও APEDA বাসমতির একচেটিয়া স্বীকৃতি পেতে একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে।ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাসমতির GI-সংক্রান্ত স্বীকৃতির জন্য APEDA-র আবেদন ২০১৮ সালের জুলাই থেকে এখনও মুলতুবি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার এ রায় নেপালের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নেপালে উৎপাদিত ও প্যাকেটজাত বাসমতি চাল নিয়ে ভারত ইতিমধ্যেই আপত্তি জানিয়ে আসছে। রায়টি ভারতীয় বাসমতি শিল্পের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করলেও রপ্তানিকারকদের মতে, এখন মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাসমতি চাষিদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করা।
রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, তারা APEDA-র সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা, ভারতীয় বাসমতির ব্র্যান্ডিং উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সুরক্ষা বাড়ানোর মাধ্যমে বাসমতি চাষিদের জন্য ভালো দাম, স্থিতিশীল বাজার এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। মোটকথা, অস্ট্রেলিয়ার আদালতের এই রায় ‘বাসমতি’কে শুধু ভারতের পণ্য হিসেবে একচেটিয়া স্বীকৃতি দেওয়ার পথে বড় বাধা তৈরি করেছে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ার বাজারে ভারতীয় বাসমতি রপ্তানিকারকদের পাকিস্তানি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে আরও তীব্র প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। বিশেষ করে পঞ্জাব ও হরিয়ানার বাসমতি চাষি ও রপ্তানিকারকদের জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
❤ Support Us








