- প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
- আগস্ট ৩১, ২০২৬
নেপালে হড়পা বন্যায় মৃত ৯০৩, এখনো নিখোঁজ ৪ হাজারের বেশি, জারি উদ্ধার অভিযান
নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের ষষ্ঠ দিনেও কাটেনি বিপর্যয়ের ভয়াবহতা। একদিকে কাদামাটি, পাথর ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা, অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হচ্ছে একের পর এক দেহ। সোমবার সকালে নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, এখনো পর্যন্ত ৯০৩টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪২৪৭ জন। তাঁদের মধ্যে ৩২০ জন বিদেশি নাগরিক। উদ্ধারকারী দলের আশঙ্কা, কাদামাটির পুরু স্তরের নীচে এখনো বহু দেহ আটকে থাকতে পারে। ফলে উদ্ধারকাজ শেষ হতে আরও সময় লাগবে।
গত বুধবার সকালে নেপালের উত্তরাঞ্চলের রাসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে আচমকাই হড়পা বান নামে। প্রবল জলের স্রোতের সঙ্গে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নদীর দু–পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিও। নদীর প্রবল স্রোতে বহু মানুষ ও দেহ ভেসে যায়। ফলে মূল বিপর্যয়স্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেও দেহ উদ্ধার হচ্ছে। এক জায়গায় বিপর্যয় ঘটলেও তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ এলাকায়। সে কারণেই উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে বার বার সমস্যায় পড়ছেন উদ্ধারকারীরা।
হড়পা বানে নেপালের ৮টি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সে দেশের ‘ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’-র হিসাব অনুযায়ী, চিতোয়ান থেকে ২৭২টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। নওয়ালপারসি পূর্বে উদ্ধার হয়েছে ২০৭টি দেহ এবং নওয়ালপারসি পশ্চিমে ১৫১টি। গোর্খা থেকে পাওয়া গিয়েছে ৬২টি দেহ। এ ছাড়া নুয়াকোটে ৯৫টি, ধাদিঙে ৫৫টি, তানাহুতে ৩৭টি এবং রাসুয়ায় ২৪টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। মৃতের সংখ্যা ৯০৩-এ পৌঁছলেও বিপর্যয়ের প্রকৃত চেহারা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ নিখোঁজের তালিকা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। সরকারি হিসাবে ৪২৪৭ জনের এখনো কোনো সন্ধান নেই। তাঁদের মধ্যে ৩২০ জন বিদেশি নাগরিক। উদ্ধারকারী দলগুলি মনে করছে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা মানুষদের অনেকেরই এ পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া যায়নি।
উদ্ধার হওয়া দেহগুলির পরিচয় শনাক্ত করাও এখন নেপাল প্রশাসনের কাছে বড়ো চ্যালেঞ্জ। বহু দেহ দীর্ঘ সময় ধরে কাদা ও জলের মধ্যে থাকার কারণে এমন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে চেহারা দেখে পরিচয় জানা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উদ্ধার হওয়া দেহগুলির ‘ডিএনএ’ নমুনা সংগ্রহ করে রাখা হচ্ছে, যাতে পরে নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে নমুনা মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। এরই মধ্যে নেপালের মর্গগুলিতেও জায়গার সংকট দেখা দিয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক দেহ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করার মতো পর্যাপ্ত পরিকাঠামো সেখানে নেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে কয়েকটি ভবন অস্থায়ী ভাবে চিহ্নিত করে সেখানে দেহ রাখার ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। কিন্তু সে ব্যবস্থাতেও দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ নেই। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নমুনা সংগ্রহের পরে দেহগুলিকে গণকবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল সরকার। পরবর্তী সময়ে ‘ডিএনএ’ পরীক্ষার মাধ্যমে কোনো পরিবারের দাবি এলে পরিচয় নিশ্চিত করার পথ খোলা রাখা হচ্ছে।
বিপর্যয়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলির একটি হলো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের নিয়ে অনিশ্চয়তা। নেপালের প্রায় ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আনুমানিক ৯৩৩ জন এখনো আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেশির ভাগ প্রকল্পই ভোতেকোশী-ত্রিশূলি নদী করিডরের আশপাশে। রাসুয়া ও পার্শ্ববর্তী নুওয়াকোট জেলার একাধিক প্রকল্পে পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে ৫৭০-রও বেশি জন আপার ত্রিশূলি-১ প্রকল্পের কর্মী। আরও ১২২ জন আপার ত্রিশূলি-৩বি প্রকল্পে কাজ করতেন। রাসুওয়াগঢ়ী, আপার ত্রিশূলি-৩এ এবং লাংটাং খোলা প্রকল্প মিলিয়ে আরও প্রায় ১৮০ জনের কোনো সন্ধান নেই।
তাঁদের অনেকেই সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। বন্যার স্রোতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথর সুড়ঙ্গের মুখে জমে গিয়েছে। কোথাও ধসে পড়েছে সুড়ঙ্গের অংশ। কোথাও আবার এত পুরু স্তরে ধ্বংসাবশেষ জমেছে যে ভারী যন্ত্র দিয়েও তা সরাতে সময় লাগছে। উদ্ধারকারী দলগুলি সুড়ঙ্গের মুখ চিহ্নিত করে একের পর এক পথ খোলার চেষ্টা করছে।নেপাল সেনার পাশাপাশি ভারত ও চিনের বিশেষজ্ঞরাও উদ্ধার অভিযানে সহযোগিতা করছেন। নেপালি সেনার মুখপাত্র রাজা রাম বসনেট জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারকাজের সামনে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের মূল লক্ষ্য এখন সুড়ঙ্গগুলির মুখ খুলে ভিতরে পৌঁছনো। তবে সুড়ঙ্গের ভিতরে থাকা শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। একাধিক জায়গায় এখনও কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে সময় যত গড়াচ্ছে, তাঁদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ তত বাড়ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ এই পরিস্থিতিকে ‘অকল্পনীয় এবং হৃদয়বিদারক’ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, রাসুয়ায় ভোতে কোশি নদীর ভয়াবহ বন্যার কারণে প্রাণহানি, সম্পত্তি এবং পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব তৈরি করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড আর নতুন করে বিপদের আশঙ্কার মধ্যেই উদ্ধারকাজ চালাতে হচ্ছে। রাস্তা ও সেতুর বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ফলে কোথাও স্থলপথে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছে না। হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গম এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে আনা হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মীকেও উদ্ধার অভিযানে নামানো হয়েছে। বলেন্দ্র শাহ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হলেও নাগরিকদের জীবন রক্ষায় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালিয়ে যাবে সরকার।
নেপালের পাশাপাশি সীমান্তের ওপারে চিনের তিব্বতেও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। বুধবার সেখানে হড়পা বানের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। চিনের তরফে জানানো হয়েছে, তিব্বতে এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৭ জন নিখোঁজ। রবিবার বেজিং জানিয়েছিল, নিখোঁজদের মধ্যে ৪৯ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। সোমবার তামিলনাড়ুর একটি ভ্রমণ সংস্থা দাবি করেছে, ওই ৪৯ জনই তামিলনাড়ুর বাসিন্দা বলে মনে করা হচ্ছে। সংস্থাটির মাধ্যমে ৪৯ জনের একটি পর্যটকদল কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনে গিয়েছিল। বুধবার বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁদের কারও সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের পরিবারগুলির উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। নিখোঁজ পর্যটকদের সন্ধানে চিনা কর্তৃপক্ষের উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে দুর্গম ভূপ্রকৃতি, ধ্বংসস্তূপ আর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তল্লাশিতে বাধা তৈরি হচ্ছে।
নেপালের বন্যায় কলকাতার একটি পর্যটকদলেরও কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওই দলে ছিলেন ৩২ জন। তাঁদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মোট ৩৭ জনের এখনও সন্ধান মেলেনি। তবে নিখোঁজ ভারতীয়দের প্রত্যেকেই যে পর্যটক, তা নয়। নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদেরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন। বিপর্যয়ের পর থেকে নেপালের বহু সেনা জওয়ান ও পুলিশ আধিকারিকেরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প, প্রত্যন্ত এলাকা এবং নদীর গতিপথ ধরে নতুন করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা মনে করছেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হলে নিখোঁজের সংখ্যা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়া যেতে পারে। নিখোঁজদের সন্ধানে নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালেও ভিড় বাড়ছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন প্রিয়জনের খোঁজে হাসপাতালে এসে জড়ো হচ্ছেন। কেউ নিখোঁজ আত্মীয়ের ছবি হাতে অপেক্ষা করছেন, কেউ উদ্ধার হওয়া দেহগুলির মধ্যে পরিচিত মুখ খুঁজছেন। মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করা, নিখোঁজদের তালিকা তৈরি করা এবং পরিবারগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা—সব মিলিয়ে নেপাল প্রশাসনের উপর প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে।
ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত। উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য ভারত থেকে বিশেষ দল নেপালে পৌঁছেছে। ওই দলের মধ্যে চিকিৎসাকর্মী এবং সুড়ঙ্গ উদ্ধারে বিশেষজ্ঞরাও রয়েছেন। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধান এবং মৃতদেহ শনাক্তকরণেও সহায়তা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়াও নেপালের জন্য ১০ লক্ষ ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং একটি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে। আমেরিকা সহ অন্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও মানবিক সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এসেছে। তবে, হড়পা বানের ষষ্ঠ দিনেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। সময় গড়াচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে উদ্বেগ। উদ্ধারকারীদের সামনে এখন একটাই লক্ষ্য— যত দ্রুত সম্ভব সুড়ঙ্গ, কাদা এবং ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের কাছে পৌঁছনো এবং নিখোঁজদের সন্ধান করা। কিন্তু নেপালের দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও বিপর্যস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা সে লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
❤ Support Us







