- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- আগস্ট ৩১, ২০২৬
বাড়ল মেয়াদ, সাময়িক স্বস্তিতে রাজ্যের ‘যোগ্য’ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীরা । ৯ মাসের মধ্যে নিয়োগের কাজ শেষ করবার নির্দেশ শীর্ষ আদালতের
২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর নিয়োগ বাতিলের জেরে তৈরি হওয়া জটিলতা কাটাতে আরও কিছুটা সময় পেল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। একই সঙ্গে নতুন করে নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক এবং গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি-সহ সংশ্লিষ্ট পদগুলিতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য আগামী বছরের ৩১ মে পর্যন্ত সময়সীমা বাড়িয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। তবে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এ মেয়াদই শেষ। এরপর আর কোনো অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবে না।
২০১৬ সালের স্কুল সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগের মামলায় গত বছর সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের সে নির্দেশের জেরে রাতারাতি চাকরি হারান প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী। তাঁদের মধ্যে ‘চিহ্নিত অযোগ্য’দের বাদ দিয়ে যোগ্যদের জন্য নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছিল আদালত। সে নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। এদিকে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হওয়ায় স্কুলগুলিতে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। পড়াশোনার উপর তার প্রভাব পড়তে পারে, এই পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই আদালত ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ নন এমন শিক্ষকদের অন্তর্বর্তী ভাবে চাকরিতে থাকার সুযোগ দিয়েছিল। গত ১৮ ডিসেম্বরের নির্দেশে বলা হয়েছিল, নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যোগ্য শিক্ষকেরা স্কুলে কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। সোমবারের শুনানিতেও সে ব্যবস্থা বহাল রেখেছে শীর্ষ আদালত।
সোমবার বিচারপতি সঞ্জয় কুমার এবং বিচারপতি সচিন সচদেবার বেঞ্চে এ মামলার শুনানি হয়। রাজ্য সরকার এবং ‘এসএসসি’-র তরফে আদালতের কাছে নির্ধারিত সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছিল। যুক্তি ছিল, একাধিক আইনি জটিলতার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গোটা নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। রাজ্যের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ মিলিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার শূন্যপদ রয়েছে। তার মধ্যে নবম-দশমে প্রায় ২৩ হাজার এবং একাদশ-দ্বাদশে প্রায় ১২ হাজার পদ। এই বিপুল সংখ্যক শূন্যপদে নিয়োগ সম্পূর্ণ করতে আরও অন্তত কয়েক মাস সময় প্রয়োজন বলে আদালতকে জানানো হয়। আগের নির্দেশ অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ আগস্টের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা-সহ একাধিক কারণে সময়সীমার মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করা যায়নি। ফলে মেয়াদ শেষ হওয়ার মুখে ফের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য ও কমিশন। শেষ পর্যন্ত রাজ্যের আবেদন মঞ্জুর করেছে আদালত। ৩১ অগস্টের বদলে নতুন সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে ৩১ মে, ২০২৭। অর্থাৎ, আরও ৯ মাস সময় পেল রাজ্য। সে সময়ের মধ্যেই যাবতীয় নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
সময় বাড়ানোর পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এরপর আর মেয়াদ বাড়বে না। অর্থাৎ আগামী ৩১ মে-র মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা রাজ্য ও ‘এসএসসি’-র কাছে কার্যত শেষ সুযোগ। এদিন, ‘বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থী’দের হয়ে মামলায় সওয়াল করেন আইনজীবী ফিরদৌস শামিম ও গোপা বিশ্বাস। শুনানির পরে ফিরদৌস বলেন, আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, ৩১ মে-র মধ্যে নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশের শিক্ষক এবং গ্রুপ সি ও গ্রুপ ডি শিক্ষাকর্মী পদে নিয়োগ শেষ করতে হবে। তাঁর বক্তব্য, এর আগে দু–বার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এবার আদালত জানিয়ে দিয়েছে, এর পরে আর সময় দেওয়া হবে না। ফলে আগামী কয়েক মাসে ‘এসএসসি’-র উপর চাপ আরও বাড়ল। এক দিকে আইনি জটিলতা কাটানো, অন্যদিকে প্যানেল তৈরি, কাউন্সেলিং ও সুপারিশের মতো একাধিক ধাপ দ্রুত শেষ করতে হবে কমিশনকে।
শীর্ষ আদালতের এই রায়ের ফলে, নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানে স্কুলে কর্মরত ‘যোগ্য’ শিক্ষকদের চাকরিও বহাল থাকছে। আদালতের আগের নির্দেশ অনুযায়ী যে শিক্ষকেরা ‘চিহ্নিত অযোগ্য’ নন, তাঁরা ৩১ মে, ২০২৭ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন। অর্থাৎ, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে স্কুলগুলিতে শিক্ষক ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আপাতত কিছুটা কমল। তবে একই সঙ্গে যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের অপেক্ষার মেয়াদও বাড়ল। চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের একাংশ অবশ্য সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, বিনা দোষে যেন কারও চাকরি না যায়, কাউকে যেন অনাহারের মুখে পড়তে না হয়। এ দাবিতেই, যোগ্যদের চাকরি রক্ষার জন্য তাঁরা আদালতের কাছে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন।
উল্লেখ্য, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের নতুন নিয়োগের লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে হওয়া পরীক্ষায় নবম-দশমের জন্য প্রায় ২ লক্ষ ৯৩ হাজার এবং একাদশ-দ্বাদশের জন্য প্রায় ২ লক্ষ ২৯ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। ‘এসএসসি’ সূত্রে জানা যাচ্ছে, একাদশ-দ্বাদশের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। ৩৩টি বিষয়ের মধ্যে ২১টির কাউন্সেলিং শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৩,৫৮৬ জনকে নিয়োগের জন্য মধ্যশিক্ষা পর্ষদের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। নবম-দশমের ক্ষেত্রেও ইন্টারভিউয়ের তালিকা তৈরি হয়েছে। তবে গোটা প্রক্রিয়ার পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওবিসি সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা। সংরক্ষণ নিয়ে আদালতের বিভিন্ন নির্দেশ ও তার ভিত্তিতে প্যানেল তৈরির প্রক্রিয়ায় সময় লেগেছে। ফলে আদালতের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নিয়োগ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে রাজ্যের দাবি। এখন পুরনো জটিলতা মিটিয়ে নতুন প্যানেল তৈরি এবং পরবর্তী ধাপগুলি দ্রুত শেষ করাই কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে, শিক্ষক নিয়োগ মামলায় সময় বাড়ার পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি দফতরে কর্মী ঘাটতি মেটাতেও সক্রিয় হয়েছে নবান্ন। আগামী এক বছরের মধ্যে যে সব শূন্যপদ পূরণ করা জরুরি, সেগুলি চিহ্নিত করে রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক দফতরগুলিকে। নবান্ন সূত্রে খবর, কোন দফতরে কতগুলি পদ খালি রয়েছে, তার মধ্যে কোনগুলি দ্রুত পূরণ করা প্রয়োজন, আগামী এক বছরে কোন কোন পদে নিয়োগ জরুরি, তার বিস্তারিত হিসাব চাওয়া হয়েছে। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দফতরগুলিকে রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে সব শূন্যপদ একসঙ্গে পূরণ করার পরিকল্পনা নেই বলেই প্রশাসনিক সূত্রের খবর। বরং কাজের প্রয়োজনের নিরিখে পদগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যে পদগুলিতে কর্মী না থাকায় সরকারি পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে, প্রথমে সেগুলিই পূরণের তালিকায় আসতে পারে।
শূন্যপদ সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা পড়বার পর রাজ্যস্তরের ‘ম্যানপাওয়ার র্যাশনালাইজেশন কমিটি’-র বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কোন দফতরে কত কর্মী প্রয়োজন, বর্তমানে কত জন কর্মরত, কতগুলি পদ খালি— সব দিক খতিয়ে দেখার কথা কমিটির। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কর্মী বেশি রয়েছে কি না, আবার কোথাও দীর্ঘদিন ধরে কর্মী ঘাটতি রয়েছে কি না, তা-ও পর্যালোচনা করা হতে পারে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র শূন্যপদ পূরণ নয়, সরকারি দফতরগুলিতে কর্মী বণ্টনের সামগ্রিক ভারসাম্যও খতিয়ে দেখবে প্রশাসন। প্রশাসনের একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগে স্থবিরতার ফলে একাধিক দফতরে কর্মরতদের উপর কাজের চাপ বেড়েছে। তার প্রভাব পড়ছে সরকারি পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রেও। সে পরিস্থিতি বদলাতে জরুরি পদগুলি চিহ্নিত করে ধাপে ধাপে নিয়োগের পথে হাঁটতে চাইছে শুভেন্দু অধিকারী নেতৃত্বাধীন সরকার। তবে শেষ পর্যন্ত কোন দফতরে কত পদে নিয়োগ হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দফতরের রিপোর্ট আর ‘ম্যানপাওয়ার র্যাশনালাইজেশন কমিটি’-র সুপারিশের উপর।
❤ Support Us






