- বি। দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬
মোদি-পুতিন বৈঠকে কি চূড়ান্ত হবে এসইউ-৫৭ চুক্তি ? তালিকায় ‘সুপার সুখোই’, এস-৪০০ ও পন্টসারও
আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কুর্সিতে দ্বিতীয় বার বসার পরই ভারতকে এফ-৩৫ ‘লাইটনিং-২’ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প । কিন্তু শুল্কযুদ্ধের আবহে ওয়াশিংটনের সেই প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে ছ’দশকের পুরনো সামরিক সহযোগী রাশিয়ার উপরই আস্থা রাখতে পারে নয়াদিল্লি । শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকে মস্কোর প্রস্তাবিত পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান ‘সুখোই এসইউ-৫৭’ যৌথ উদ্যোগে ভারতে তৈরির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে ।
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর, শনি ও রবিবার, দিল্লির ভারত মণ্ডপমে বসতে চলেছে ব্রিক্সের ১৮তম শীর্ষসম্মেলন । তার আগে শুক্রবারই মোদী-পুতিনের বৈঠক হওয়ার কথা । গত ৩১ অগস্ট কিরগিজ়স্তানের রাজধানী বিশকেকে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজ়েশন (এসসিও)-এর ২৬তম শীর্ষসম্মেলনের পার্শ্ববৈঠকে পুতিনকে ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মোদী । সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে শুক্রবার সকালে দিল্লিতে পৌঁছেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ।
মোদি-পুতিন বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে রুশ পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ ফাইটার এসইউ-৫৭ । ‘ফেলন’ নামে পরিচিত এই যুদ্ধবিমানের রফতানি সংস্করণ এসইউ-৫৭ই । গত মার্চে ভারতকে এই যুদ্ধবিমান যৌথ ভাবে উৎপাদনের পাশাপাশি সম্পূর্ণ প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাব দিয়েছিল মস্কো ।
রাশিয়ার প্রস্তাবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি । এমনকি এসইউ-৫৭-এর গুরুত্বপূর্ণ ‘সোর্স কোড’ দেওয়ার ক্ষেত্রেও মস্কো আগ্রহ দেখিয়েছে বলে খবর । ফলে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর নীতির সঙ্গে এই প্রস্তাব কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হতে পারে ।
অন্য দিকে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা সফরের সময় ট্রাম্প ভারতকে এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন । তবে এফ-৩৫ প্রকল্পে প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ সীমিত বলেই সূত্রের দাবি । সেই তুলনায় এসইউ-৫৭-এর ক্ষেত্রে রাশিয়ার যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাব নয়াদিল্লির কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে ।
ভারতীয় বায়ুসেনার রুশ যুদ্ধবিমান ব্যবহারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে । মিগ-২১, মিগ-২৭, মিগ-২৯ এবং সুখোই-৩০-এর মতো রুশ নির্মিত যুদ্ধবিমান দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় বায়ুসেনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ । ফলে রুশ প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের পরিচিতি রয়েছে ।
অন্য দিকে, আমেরিকার তৈরি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী অতীতে ব্যবহার করেনি । এই কারণে নতুন প্ল্যাটফর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিকাঠামো এবং অস্ত্র-সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলিও বিবেচনায় আসতে পারে ।
এর পাশাপাশি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশে উৎপাদনের উপর জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি । সেই দিক থেকে এসইউ-৫৭-এর যৌথ উৎপাদনের প্রস্তাব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ।
রাশিয়ার সুখোই সংস্থার সঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (হ্যাল)-এর দীর্ঘদিনের সহযোগিতাও রয়েছে । দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে ইতিমধ্যেই যুদ্ধবিমান ও প্রশিক্ষণ বিমান উৎপাদনের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে ।
এসইউ-৫৭-এর পাশাপাশি ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে থাকা সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান আধুনিকীকরণের ‘সুপার সুখোই প্রজেক্ট’ নিয়েও মোদী-পুতিন বৈঠকে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে ।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১১০০ কোটি ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা । এর আওতায় সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমানগুলিতে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে ।
প্রকল্পে আংশিক স্টেলথ প্রযুক্তি, উন্নত ‘লো প্রোবাবিলিটি অব ইন্টারসেপ্ট’ (এলপিআই) রাডার, উন্নত নেভিগেশন অ্যান্টেনা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার স্যুট যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে । পাশাপাশি দূরপাল্লার আর-৩৭এম ‘আকাশ থেকে আকাশ’ ক্ষেপণাস্ত্র-সহ বিভিন্ন উন্নত অস্ত্র ও সেন্সর ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে ।
এলপিআই রাডারের বিশেষত্ব হল, তুলনামূলক ভাবে নিজের অবস্থান গোপন রেখে শত্রু বিমানের অবস্থান শনাক্ত ও ট্র্যাক করার সক্ষমতা ।
মোদি-পুতিন আলোচনায় ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেতে পারে । বিশেষ করে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ‘ট্রায়াম্ফ’ সিস্টেমের জন্য আরও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের নেতৃত্বাধীন ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (ডিএসি) রাশিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় ২৮৮টি এস-৪০০ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র কেনার প্রস্তাবে ছাড়পত্র দিয়েছিল । এর মধ্যে ১২০টি স্বল্পপাল্লার এবং ১৬৮টি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে ।
২০২৫ সালের ৭ মে পহেলগাঁও সন্ত্রাসের জবাবে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালায় । ওই বছরের মে মাসে পাকিস্তানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল । সেই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল রুশ এস-৪০০ ।
এর পাশাপাশি এস-৪০০-এর আরও উন্নত সংস্করণ এস-৫০০ ‘প্রমিথিউস’ কেনার বিষয়ে রাশিয়ার প্রস্তাব নিয়েও দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনা হতে পারে বলে খবর ।
আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত-রাশিয়া সহযোগিতার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে ‘পন্টসার’ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম । ভারত ডায়নামিক্স লিমিটেড এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত অস্ত্র রফতানিকারক সংস্থা রোজ়োবোরাএক্সপোর্টের মধ্যে পন্টসার যৌথ ভাবে তৈরির বিষয়ে ইতিমধ্যেই প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছে। পুতিনের ভারত সফরে সেই উদ্যোগ আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।
পন্টসার একটি বহুমুখী, স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা । বিমান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মতো বিভিন্ন ধরনের আকাশপথের হুমকি মোকাবিলার জন্য এতে ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমানবিধ্বংসী কামান — দুই ধরনের অস্ত্র ব্যবস্থার সমন্বয় রয়েছে । উন্নত রাডার ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থার সাহায্যে এটি লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে । প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে তা ধ্বংস করার সক্ষমতা রয়েছে বলে রুশ পণ্যের বিবরণে উল্লেখ করা হয় ।
মোদি-পুতিন বৈঠকের আলোচনার পরিধি শুধু প্রতিরক্ষা সহযোগিতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না । ক্রেমলিনের তরফে জানানো হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে ।
এর মধ্যে রয়েছে ভারতে নতুন রুশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং অসামরিক পরমাণু ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণ । পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যে ডলারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতীয় টাকা ও রুশ রুবলের ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে ।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের উপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপ এবং রুশ তেলের উপর আমেরিকার আরোপিত শুল্ক নিয়েও দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।
সব মিলিয়ে, শুক্রবারের মোদি-পুতিন বৈঠক ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে । এসইউ-৫৭-এর যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, ‘সুপার সুখোই’ আধুনিকীকরণ, এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র, সম্ভাব্য এস-৫০০ ক্রয় এবং পন্টসার যৌথ উৎপাদন — এই একাধিক প্রতিরক্ষা প্রস্তাবের মধ্যে কোনগুলি শেষ পর্যন্ত চুক্তি বা সমঝোতার পর্যায়ে পৌঁছয়, সেদিকেই নজর থাকবে ।
❤ Support Us







