- বি। দে । শ
- অক্টোবর ১০, ২০২৬
যুদ্ধবিরতির এক বছর পড়েও বিধ্বস্ত গাজ়া, চলছে ইজরায়েলি হামলা, ক্ষুধা-অপুষ্টি-চিকিৎসাহীনতায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুমিছিল
খাতায় কলমে যুদ্ধবিরতি চলছে। পণবন্দিরা মুক্তি পেয়েছেন, কমেছে হামাসের আক্রমণ। তবু পুরোপুরি থামেনি ইজ়রায়েলি হামলা, ঘরে ফেরেননি বহু বাস্তুচ্যুতেরা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খাবারের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন, হাসপাতালে ওষুধ-অক্সিজেনের আকাল, চিকিৎসার অপেক্ষায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন রোগীরা। এক বছর আগে যুদ্ধবিরতির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার অধিকাংশই অধরা।
গাজ়ায় যুদ্ধবিরতির এক বছর পূর্ণ হল। কিন্তু যুদ্ধের অবসান, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ, তা এখনো অধরা। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর আশা করা হয়েছিল, দীর্ঘ রক্তক্ষয়ের অবসান ঘটবে, পণবন্দিরা মুক্তি পাবেন, গাজ়ায় ঢুকবে পর্যাপ্ত ত্রাণ, ফের খুলবে হাসপাতালের দরজা, শুরু হবে পুনর্গঠনের কাজ। কিন্তু এক বছর পরেও সেসব প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ত্রাণ সংস্থাগুলির।
বরং যুদ্ধবিরতির এক বছর পর, গাজ়ার আকাশে হামলার আতঙ্ক, মাটিতে ধ্বংসস্তূপ, আর মানুষের জীবনে অনাহার ও অনিশ্চয়তা। একদিকে, ইজ়রায়েলি সেনার হামলায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, অন্য দিকে খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসার সরঞ্জাম আর নির্মাণসামগ্রীর অভাব, ইজরায়েলি ‘সেটলার’দের আক্রমণে বিপর্যস্ত জনজীবন। রাষ্ট্রপুঞ্জের বিভিন্ন সংস্থা, ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রক, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংগঠনগুলির দেওয়া পরিসংখ্যানেও ধরা পড়ছে তীব্র সঙ্কটের ছবি। শুক্রবার শতাধিক মানবিক সহায়তা, মানবাধিকার ও নাগরিক সমাজের সংগঠন এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, গাজ়ায় যুদ্ধবিরতি কার্যত নামেই রয়েছে। ইজ়রায়েলি বাহিনীর হামলায় এখনো প্রতিদিন নিরীহ ফিলিস্তিনিরা নিহত ও আহত হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহিলা ও শিশুরাও। অন্যদিকে, ত্রাণ, চিকিৎসার সরঞ্জাম ও পুনর্গঠনের উপকরণ প্রবেশে বাধা থাকায় বিপর্যস্ত পরিবারগুলির পক্ষে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব হচ্ছে না।
‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’, ‘অক্সফ্যাম’, ‘গ্রিনপিস’, ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ এবং ‘নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল’-এর মতো সংগঠনগুলি এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে। ‘নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল’-এর মহাসচিব ইয়ান এগেলান্ড জানান, যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরের এক বছর পরেও ফিলিস্তিনিদের জীবনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর প্রধান নির্বাহী ইঙ্গার অ্যাশিংয়ের বক্তব্য, শিশুরা যদি এখনো নিহত হতে থাকে, পরিবারগুলি যদি নিজেদের জীবন পুনর্গঠনের সুযোগ না পায়, তা হলে যুদ্ধবিরতির অর্থ কী? ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় অপহৃত জীবিত ২০ জন পণবন্দিকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার তিন দিন পরে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। পণবন্দিদের প্রত্যাবর্তন ছিল ইজ়রায়েলের অন্যতম প্রধান দাবি। তাঁদের পরিণতি নিয়ে দীর্ঘ দিন উদ্বেগে ছিলেন ইজ়রায়েলের সাধারণ মানুষ। যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজ়া সীমান্তে হামাসের তরফে কোনো রকেট হামলা হয়নি বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু পণবন্দি মুক্তি আর রকেট হামলা বন্ধ হওয়াই যে যুদ্ধবিরতির সম্পূর্ণ ছবি নয়, তা স্পষ্ট হয়েছে পরবর্তী এক বছরে। ইজ়রায়েল হামলার মাত্রা কমালেও গাজ়ায় প্রায় প্রতিদিনই সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইজ়রায়েলি হামলায় অন্তত ১,৪৭১ জন ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত এবং ৫,১৮৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩২৭ জন শিশু বলে জানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন। যদিও গাজ়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রক হামাসের অধীনস্থ, রাষ্ট্রপুঞ্জের বিভিন্ন সংস্থা তাদের প্রকাশিত মৃত্যুর পরিসংখ্যানকে সাধারণত নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচনা করে। তবে হাসপাতালের নথি বা সরকারি ভাবে নথিভুক্ত মৃত্যুর হিসাবের বাইরে ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকা এবং নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা থাকায় প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা।
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী, গাজ়ার ৫৩ শতাংশ ভূখণ্ডে ইজ়রায়েলি সেনার থাকার অনুমতি ছিল। কিন্তু বছর ঘুরলেও ইজ়রায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ গাজ়ার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির আওতায় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ সীমারেখাও ইজ়রায়েলি বাহিনী নিজেদের ইচ্ছামতো সরিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ। ইজরায়েল ও অনান্য দেশ থেকে আগত বহু ইহুদি পরিবার ‘সেটলার’ হিসাবে ভূখণ্ড দখল করছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের বসবাসের এলাকা আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অবশ্য ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। হামলার বর্ষপূর্তিতে তাঁর দাবি, হামাসের ৬,০০০ সদস্যের মধ্যে ৪,০০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ফলে, সামরিক অভিযান বন্ধ হওয়া ও সেনা প্রত্যাহারের প্রশ্নে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
গাজ়ার মানবিক বিপর্যয়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক ছবিটি ধরা পড়ছে খাবারের সন্ধানে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের লড়াইয়ে। সেখানে যুদ্ধবিরতির অর্থ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করা। প্রতিদিন কমিউনিটি রান্নাঘরের সামনে ছয় ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় অপেক্ষা। সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বিকেলে সামান্য খাবার নিয়ে ফেরা। সে খাবারেই চলছে বহু ফিলিস্তিনি পরিবারের পেট। মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলির পরিচালিত রান্নাঘর না থাকলে তাঁদের একেবারেই না খেয়ে থাকতে হতো বলেও জানিয়েছেন অনেকে। এই মুহূর্তে লাখ লাখ ফিলিস্তিনের একটাই স্বপ্ন, এক দিন পেট ভরে ফল খাওয়া।
২০২৫ সালের আগস্টে রাষ্ট্রপুঞ্জ-সমর্থিত সংস্থা আইপিসি গাজ়ায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি ঘোষণা করেছিল। ইজ়রায়েল সে ঘোষণাকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করে। পরে ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রপুঞ্জ জানায়, যুদ্ধবিরতির জেরে দু–মাস ধরে পর্যাপ্ত সরবরাহ গাজ়ায় ঢোকায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তাতে খাদ্য সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিনিধি শন হিউজ়ের বক্তব্য, গাজ়ার খাদ্য নিরাপত্তার পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত গুরুতর। জুলাই মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ২১ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১৪ লক্ষ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শিকার। তাঁদের মধ্যে ২ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতির ঠিক এক ধাপ নীচে রয়েছেন।শুধু খাদ্যের পরিমাণ বাড়ালেই যে সঙ্কটের সমাধান হবে না, সেই দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন হিউজ়।
তাঁর বক্তব্য, শুকনো খাবার, গমের আটা ও রুটি খেয়ে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। শিশু, গর্ভবতী মহিলা ও স্তন্যপান করানো মায়েদের জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, তাজা ফল, সব্জি সহ প্রয়োজনীয় অণুপুষ্টি উপাদান অত্যন্ত জরুরি। অথচ গাজ়ায় খাদ্যতালিকার বৈচিত্র্যের অভাব এখন বড়ো স্বাস্থ্যসঙ্কট তৈরি করছে। কিন্তু বার বার তীব্র অপুষ্টির শিকার হলে শিশুদের শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন হিউজ়। তাঁর মতে, শারীরিক বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের বিকাশে যে ক্ষতি হয়, তার প্রভাব পরবর্তী জীবনেও থেকে যেতে পারে। ‘মেদসাঁ দু মঁদ’ নামে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সাম্প্রতিক সমীক্ষাতেও উঠে এসেছে অপুষ্টির ভয়াবহতা। ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বর্ষপূর্তির পরের দিন প্রকাশিত ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, গাজ়ার ৯৩ শতাংশ গর্ভবতী অথবা স্তন্যপান করানো মহিলা রক্তাল্পতার উপসর্গে ভুগছেন। মাত্র ১৭ শতাংশ মহিলা তাঁদের পুষ্টির চাহিদা মেটানোর মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার পাচ্ছেন।
খাদ্য সঙ্কটের পাশাপাশি গাজ়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থাও কার্যত ভেঙে পড়েছে। যুদ্ধবিরতির সময় আশা করা হয়েছিল, নিয়মিত ওষুধ ও চিকিৎসার সরঞ্জাম আসবে, ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালগুলিকে মেরামত করা হবে, বিদেশ থেকে চিকিৎসক ও জরুরি চিকিৎসা দল আসবে এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের গাজ়ার বাইরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো যাবে। কিন্তু চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অভিযোগ, বাস্তবে তার অধিকাংশই হয়নি। ‘মেডিক্যাল এইড ফর প্যালেস্টিনিয়ানস’ (ম্যাপ)-এর সঙ্গে যুক্ত এক চিকিৎসাকর্মীর অভিজ্ঞতায়, নতুন করে আহত রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন এমন অসংখ্য মানুষের দায়িত্বও নিতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। কেউ হাত-পা হারিয়েছেন, কারও প্রয়োজন কৃত্রিম অঙ্গ, কারও আবার একাধিক অস্ত্রোপচার দরকার। কিন্তু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় সে চিকিৎসা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত ওষুধ পাচ্ছেন না। ক্যানসার রোগীদের রেডিয়োথেরাপির ব্যবস্থা নেই। কিডনির রোগীদের নিয়মিত ডায়ালিসিস করানোও অনিশ্চিত। হাসপাতালে শিরায় দেওয়ার তরল, অবেদনকারী ওষুধ আর অস্ত্রোপচারের সরঞ্জামের অভাব রয়েছে। এমনকি অক্সিজেনের সঙ্কটও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
গাজ়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রক আগস্টে জানিয়েছিল, ৩৪টি অক্সিজেন উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে ২২টি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার ভরার ৩০টি যন্ত্রের মধ্যে সচল রয়েছে মাত্র চারটি। যে কেন্দ্রগুলি এখনো কাজ করছে, সেগুলিও যে কোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, মেরামতির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ইজ়রায়েলি কর্তৃপক্ষ আটকে রেখেছে। তাদের যুক্তি, ওই যন্ত্রাংশ সামরিক এবং অসামরিক — উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা সম্ভব। চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবের আরও একটি উদাহরণ, গাজ়ায় কোনও সচল এমআরআই যন্ত্র নেই। প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের জন্য সিটি স্ক্যানার রয়েছে মাত্র একটি বা দু–টি। ফলে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও চিকিৎসকদের ব্যাপক সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না হওয়ায় যে ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়তে পারত, তা জটিল হয়ে উঠছে। যে আঘাত পুনর্বাসনের মাধ্যমে সারানো সম্ভব ছিল, তা স্থায়ী প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজ়ায় ১৫,০০০-এরও বেশি মানুষ চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। সাম্প্রতিক যৌথ বিবৃতিতে এ সংখ্যা ১৮,৫০০-এরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৪,০০০ শিশু। চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় এক হাজারেরও বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে। শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, চিকিৎসার অভাবে প্রাণ হারাচ্ছে সদ্যোজাতরাও। জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি গুরুতর হৃদ্রোগে আক্রান্ত এক নবজাতকের জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু গাজ়ায় সে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা ছিল না। ‘ম্যাপ’-এর সহায়তায় পরিচালিত আসাহাবা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় শিশুটির। চিকিৎসকেরা জানতেন, কী করলে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি তাঁরা।
গাজ়ার বিপর্যয় শুধু প্রাণহানি, ক্ষুধা কিংবা স্বাস্থ্যসঙ্কটেও সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধের অভিঘাতে কার্যত ধ্বংস হয়ে গিয়েছে স্থানীয় অর্থনীতি। রাষ্ট্রপুঞ্জের বাণিজ্য ও উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা ‘ইউএনসিটিএডি’-র সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, গাজ়ার অর্থনীতির পতন নথিভুক্ত ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কট। সংস্থার ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পেদ্রো ম্যানুয়েল মোরেনোর জানিয়েছেন, যুদ্ধ গাজ়ার কয়েক দশকের উন্নয়ন মুছে দিয়েছে, তৈরি হয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কট। রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজ়ার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। মাথাপিছু দৈনিক মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.৫৮ মার্কিন ডলারে। ২০২২ সালের তুলনায় পণ্যের দাম বেড়েছে ২৭৪ শতাংশ। ‘ইউএনসিটিএডি’-র ফিলিস্তিন-সংক্রান্ত সহায়তা কর্মসূচির সমন্বয়কারী মুতাসিম এলাগরার বক্তব্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে গাজ়ার প্রতি তিন জনের দু–জন দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করতেন। এখন সেখানকার প্রত্যেক মানুষই বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের শিকার।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন ৯৪ শতাংশ কমে গিয়েছে। চাষযোগ্য জমির মাত্র ১.৫ শতাংশে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে খাদ্যের জন্য সম্পূর্ণ ভাবে মানবিক সহায়তার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে গাজ়ার মানুষকে। হাজার হাজার অলিভ গাছ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে বোমার আঘাতে। যুদ্ধের ফলে কয়েক লক্ষ কর্মসংস্থান ধ্বংস হয়েছে। কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ বেকার বলে ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। ফলে শুধু বর্তমানে খাদ্য কেনা বা চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাই নয়, ভবিষ্যতে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে ‘ইউএনসিটিএডি’। ইজ়রায়েলি বসতি সম্প্রসারণের কারণে জমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ কমে যাওয়ায় সেখানেও সঙ্কট তীব্র হচ্ছে। ফিলিস্তিন সরকার স্থানীয় ব্যাঙ্কগুলির কাছ থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছে, পেনশন তহবিলের অর্থ ব্যবহার করেছে, বেসরকারি ঠিকাদারদের পাওনাও মেটাতে পারছে না। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের ওই সংস্থা। এর পরিণতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাজনৈতিক, সামাজিক আর মানবিক সঙ্কটকে আরও গভীর করবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
যুদ্ধের আগে যে গাজ়ায় প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের বসবাস ছিল, সেখানে এখন অধিকাংশ মানুষই কোনো না কোনও সময়ে, কোনো না কোনোভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে বহু পরিবার তাঁবুতে দিন কাটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলির দাবি, গাজ়ার প্রায় ৮০ শতাংশ নির্মাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বহু মানুষের কাছে নিজের বাড়িতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী এবং যন্ত্রপাতি প্রবেশে বাধা থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগ। ‘নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল’-এর মহাসচিব এগেলান্ড মতে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, নির্মাণসামগ্রী ছাড়া কোনো সম্প্রদায়ের পক্ষে নতুন করে জীবন শুরু করা সম্ভব নয়। অথচ সে উপকরণ গাজ়ায় পৌঁছতে পারছে না। গাজ়ায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরেও প্রাণহানি অব্যাহত থাকা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভ বাড়ছে। ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’-এর মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের বক্তব্য, ইজ়রায়েলকে দায় নেওয়ার জন্য চাপ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বাধ্যতামূলক নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মাত্রায় নৃশংস অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করছে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের হিসাবে অন্তত ৭৪,২৫৪ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২১,০০০ শিশু। আহত হয়েছেন ১,৭৫,০০০ মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সতর্কতামূলক হিসাব অনুযায়ী, আহতদের প্রায় ২৪ শতাংশের এমন আঘাত রয়েছে, যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রয়োজন। তাঁদের এক-চতুর্থাংশ শিশু। এই পরিসংখ্যানের বাইরেও রয়েছে ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকা নিখোঁজ মানুষের হিসাব, চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা রোগী এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ভবিষ্যৎ। যুদ্ধবিরতির এক বছর পরেও গাজ়ায় তাই জনজীবনের পরিচিত ছবি অধরা। পণবন্দি মুক্তির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটলেও সেনা প্রত্যাহার, নিরাপদে বসবাস, পর্যাপ্ত খাদ্য, চিকিৎসা এবং পুনর্গঠনের মতো মৌলিক শর্তগুলি পূরণ হয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধবিরতি যদি মানুষের প্রাণ বাঁচাতে, শিশুদের নিরাপত্তা দিতে এবং বিধ্বস্ত জনজীবন পুনর্গঠনের পথ খুলে দিতে না পারে, তবে তার কার্যকারিতা কোথায়? গাজ়ার মানুষের কাছে যুদ্ধবিরতির অর্থ নিশ্চিত নিরাপত্তা নয়, বরং পরের দিনটি কী ভাবে কাটবে, সেই অনিশ্চয়তা।
❤ Support Us








