- দে । শ
- জুন ২০, ২০২৬
বিদ্রোহী সাংসদদের সদস্যপদ খারিজের দাবি, স্পিকারের দ্বারস্থ অভিষেক
রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই প্রাক্তন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙনের স্রোত শুরু হয়েছে। বিধানসভা থেকে লোকসভা-রাজ্যসভায় দল ছেড়ে অথবা ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে কার্যত মমতা-অভিষেকের থেকে দূরে সরে গিয়েছেন বহু বিধায়ক সাংসদরা। পরিষদীয় দলের পর ভেঙেছে সংসদীয় দলও। তৃণমূলের ২০ জন বিদ্রোহী সাংসদ ইতিমধ্যেই এনডিএ শরিক ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-এ যোগদানের দাবি জানিয়েছেন। এহেন বিরল রাজনৈতিক টানাপড়েন শুক্রবার আরও নাটকীয় মোড় নিয়েছে। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে ‘বিদ্রোহী’ ২০ সাংসদের এমপি পদ বাতিলের দাবিতে ‘ডিসকোয়ালিফিকেশন পিটিশন’ জমা দিয়েছেন লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃণমূল সূত্রের খবর, প্রতিটি আবেদনপত্রই ২১ পাতার। বিদ্রোহী সাংসদদের বিরুদ্ধে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের একাধিক ধারা, সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় এবং সাংবিধানিক নজিরের উল্লেখ করে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজের দাবি জানানো হয়েছে। দলীয় ভাঙন নিয়ে তৃণমূলের অবস্থান জানতে শুক্রবার বিকেলে অভিষেককে সংসদ ভবনে ডেকে পাঠিয়েছিলেন লোকসভার স্পিকার। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিকেল ৫টা নাগাদ স্পিকারের দফতরে পৌঁছন তৃণমূলের প্রতিনিধিদল। অভিষেকের সঙ্গে ছিলেন দলের সাংসদ সৌগত রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মহুয়া মৈত্র। সংসদ ভবন চত্বরে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনও। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে স্পিকারের সঙ্গে বৈঠক হয় তৃণমূল প্রতিনিধিদলের।
বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বলেন, ‘এক জন সাংসদ একসঙ্গে দু–টি রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারেন না। সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি, তাঁরা ‘এনসিপিআই’-এ যোগ দিয়েছেন। এ দলের নাম আমি কোনোদিন শুনিনি। কিন্তু অর্থের লোভে কিংবা নিজেদের রক্ষা করার জন্য তাঁরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা তৃণমূল ত্যাগের পরেই কার্যকর হয়েছে। অথচ তাঁরা তৃণমূলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন। তাই সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হওয়া উচিত।’ তাঁর দাবি, ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য, নথি ও আইনি নজির স্পিকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। অভিষেকের দাবি, ‘ওই সাংসদদের আগে সংবিধানের নিয়মকানুন ভালো করে পড়ে দলত্যাগ করা উচিত।’
দলত্যাগের নেপথ্যে আর্থিক প্রলোভন এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার চাপের অভিযোগও তুলেছেন অভিষেক। তাঁর অভিযোগ, ‘এই ২০ জন বাংলার মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। সংবিধানকে অবজ্ঞা করে নিজেদের আত্মসম্মান বিক্রি করেছেন। কেউ ইডির হাত থেকে বাঁচতে চাইছেন, কেউ সিবিআইয়ের চাপ এড়াতে চাইছেন। কাউকে আবার কোটি কোটি টাকার প্রলোভন দেওয়া হয়েছে, কাউকে ভয় দেখানো হয়েছে।’ এখানেই থামেননি তিনি। সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে অভিষেক বলেছেন, ‘আমি প্রমাণ নিয়েই বলছি। যদি কোনো সাংসদের মনে হয়, অর্থের বিনিময়ে তাঁরা দল ছাড়েননি, তা হলে তাঁরা আমার বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারেন। আদালতে আমি আমার বক্তব্য প্রমাণ করতে প্রস্তুত।’ বিদ্রোহী সাংসদদের অনেকেই বর্তমানে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পান বলেও অভিযোগ করেছেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর কটাক্ষ, ‘নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে নিজেদের কেন্দ্রে গিয়ে দেখুন, মানুষ আপনাদের পাশে আছে কি না।’
তবে বিদ্রোহী শিবিরের কোনো নেতার নাম এ দিন প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেননি অভিষেক। যদিও রাজনৈতিক মহলের মতে, কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাংসদদের উদ্দেশ করেই তাঁর এই বার্তা। ওয়াকিবহালদের মতে, তৃণমূলের এই আইনি লড়াইয়ের মূল ভিত্তি সংবিধানের দশম তফসিল। অভিষেকের দাবি, দশম তফসিলের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের (১)(ক) এবং (১)(খ) ধারা অনুযায়ী, কোনো সদস্য স্বেচ্ছায় নিজের রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ ত্যাগ করলে বা দলের নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। অভিষেকের যুক্তি, বিদ্রোহী সাংসদরা প্রকাশ্যে অন্য রাজনৈতিক দলে যোগদানের দাবি করেছেন। তার অর্থ, তাঁরা আর তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য নন। ফলে সংবিধান অনুযায়ী তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হওয়া উচিত।
অন্যদিকে, বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, তাঁরা দলত্যাগ করেননি, বরং তৃণমূলের সংসদীয় দলের একটি বড়ো অংশ এনসিপিআই-এ একীভূত হয়েছে। সে যুক্তি খণ্ডন করতে সংবিধানের দশম তফসিলের চতুর্থ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেছেন অভিষেক। তাঁর বক্তব্য, কোনো রাজনৈতিক দলের একীভবন এবং সংসদীয় দলের একাংশের দলবদল এক বিষয় নয়। বৈধ একীভবনের জন্য শুধু সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন গোটা রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক স্তরে একীভবনের সিদ্ধান্ত। অভিষেকের দাবি, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় কমিটি, রাজ্য কমিটি, বিভিন্ন শাখা সংগঠন ও দলের পদাধিকারীদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ছাড়া কোনো একীভবন বৈধ হতে পারে না। এখানে তেমন কিছু হয়নি। ফলে এনসিপিআইয়ের সঙ্গে একীভবনের দাবি সম্পূর্ণ অসত্য।’
ডায়মন্ড হারবারের সাংসদের আরও দাবি, অতীতে একাধিক ক্ষেত্রে ‘বিদ্রোহী’ সাংসদেরা আলাদা সংসদীয় ব্লক, পৃথক দলনেতা, উপনেতা কিংবা সংসদে পৃথক ঘরের দাবি জানালেও আদালতে সে দাবি খারিজ হয়েছে। এদিন স্পিকারের কাছে সেই সমস্ত মামলার নথিও জমা দিয়েছে তৃণমূল। কিছু নথি সংগ্রহ করেছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বাকিগুলি জোগাড় করেছেন অভিষেক নিজে। অভিষেকের দাবি, ‘আইন তাঁদের পক্ষে নেই। আইন আমাদের পক্ষে। আমরা আশা করি, স্পিকার সম্পূর্ণ আইন মেনেই সিদ্ধান্ত নেবেন।’ সূত্রের খবর, এ দিনের বৈঠকে স্পিকার ‘বিদ্রোহী’ সাংসদদের বক্তব্যও ফের শুনবেন বলে জানিয়েছেন। তার পরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এ মামলার নিষ্পত্তি শুধু ২০ জন সাংসদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, সংসদীয় গণতন্ত্রে দলত্যাগ-বিরোধী আইনের প্রয়োগ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ কোনদিকে যাবে, তারও অগ্নিপরীক্ষা হতে চলেছে। এ দিনের বৈঠকের আর একটি রাজনৈতিক তাৎপর্যও নজর এড়ায়নি। সাম্প্রতিক অতীতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে একাধিক প্রকাশ্য মন্তব্য করেছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আবার মহুয়া মৈত্র ও কল্যাণের সম্পর্কও গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক মহলে আলোচনার বিষয় ছিল। কিন্তু শুক্রবার স্পিকারের দফতরে অভিষেকের পাশে দেখা গেছে দু–জনকেই। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘কল্যাণদা’ বলে সম্বোধন করেন অভিষেক। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, দলের অস্তিত্বের প্রশ্নে আপাতত অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য সরিয়ে ঐক্যের বার্তাই দিতে চাইল তৃণমূল নেতৃত্ব।
❤ Support Us





