Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ১২, ২০২৬

আলিপুরের প্রশাসনিক ভবনের রহস্যময় আগুনে পুড়ে ছাই প্রায় ৪ হাজার ইভিএম! নাশকতার ইঙ্গিত দমকল প্রতিমন্ত্রীর, রিপোর্ট তলব কমিশনের 

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
আলিপুরের প্রশাসনিক ভবনের রহস্যময় আগুনে পুড়ে ছাই প্রায় ৪ হাজার ইভিএম! নাশকতার ইঙ্গিত দমকল প্রতিমন্ত্রীর, রিপোর্ট তলব কমিশনের 

আলিপুরের সরকারি ভবনে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডের পর যত সময় গড়াচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন তথ্য। আর সেসব তথ্য ঘিরে আরও ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের সদর দফতরে ঘটে যাওয়া আগুনে শুধু সরকারি অফিস নয়, ভস্মীভূত হয়েছে কয়েক হাজার ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম), নষ্ট হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি, এমনকি সুন্দরবন এলাকায় সক্রিয় চোরাশিকারি চক্রের তথ্যভাণ্ডারও। ফলে নিছক দুর্ঘটনা না কি এর নেপথ্যে রয়েছে সুপরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র? এসব প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে।

বুধবার সকালে আলিপুরের বেকার রোডে অবস্থিত দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের বহুতল ভবনে আচমকা আগুন লাগে। প্রথমে নীচের কয়েকটি তলায় আগুন দেখা গেলেও পরে তা দ্রুত উপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় এক দিন ধরে চলা উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ অভিযানের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু আগুন নেভার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে আসে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, ভবনের শীর্ষ তলাগুলিতে সংরক্ষিত ছিল বিপুল সংখ্যক ইভিএম। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪ হাজার ব্যালট ইউনিট, ৪ হাজার কন্ট্রোল ইউনিট এবং ৪ হাজার ভিভিপ্যাট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ইভিএমগুলি মূলত কসবা, যাদবপুর, বেহালা পূর্ব, বেহালা পশ্চিম, মেটিয়াবুরুজ, সাতগাছিয়া-সহ ডায়মন্ড হারবার মহকুমার অন্তর্গত একাধিক বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটগ্রহণে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে।

শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক অরিন্দম নিয়োগী। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরাও। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং আগুনের উৎস সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহের পর নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। তবে ইভিএম ধ্বংস হওয়ার ঘটনাই একমাত্র উদ্বেগের কারণ নয়। তদন্তে উঠে এসেছে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য। ভবনের কয়েকটি কক্ষে বনদফতর এবং প্রশাসনের তরফে উদ্ধার করে রাখা হয়েছিল বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেহাংশ। চোরাশিকারিদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করা বাঘের চামড়া, হরিণের চামড়া, কুমিরের দাঁত-সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সেখানে সংরক্ষিত ছিল। আগুনে সেগুলিও সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

শুধু তাই নয়, সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপে সক্রিয় চোরাশিকারি ও পাচারচক্রের বিস্তৃত তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেসও ওই ভবনে সংরক্ষিত ছিল বলে জানা গিয়েছে। সে সমস্ত নথি ও ডিজিটাল তথ্যের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তদন্তকারী মহলের একাংশের প্রশ্ন, এত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার যেখানে ছিল, সে ভবনেই এমন অস্বাভাবিক অগ্নিকাণ্ড কি নিছক কাকতালীয়? প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে আগুনের বিস্তারের ধরন ঘিরে। বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী প্রকাশ্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, চার ও পাঁচ তলায় আগুন লাগার পর তা কীভাবে মাঝের কয়েকটি তলাকে প্রায় অক্ষত রেখে সরাসরি উপরের তলাগুলিতে পৌঁছে গেল, তা সহজে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।

তদন্তকারীদেরও সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে ভবনের ছয়, সাত ও আট তলার অবস্থা। ওই তলাগুলির অধিকাংশ ঘরে আগুনের স্পষ্ট চিহ্ন নেই। অথচ তার উপরের তলাগুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, সিঁড়িঘর ধরে আগুন উপরে উঠে গিয়েছিল। কিন্তু যদি তাই হয়, তা হলে কেন শুধুমাত্র সিঁড়ির অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হল এবং আশপাশের ঘরগুলি প্রায় অক্ষত রয়ে গেল? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে, আগুন নেভানোর কাজেও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছিল কর্মীদের। ভবনের আশপাশে পর্যাপ্ত জলাধার না থাকায় দ্রুত জল সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়। ফলে দমকলকর্মীদের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে পাইপলাইন টেনে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে হয়। ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকলেও এত বড়ো অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না বলেই তদন্তকারীদের জানিয়েছে দমকল।

আগুনে জেলা পরিষদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দফতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অতিরিক্ত জেলাশাসকের অফিসেরও কয়েকটি অংশ পুড়ে গিয়েছে। আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে থাকা দুই তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খান এবং শওকত মোল্লার দফতর-সহ একাধিক কর্মাধ্যক্ষের অফিস। ঘটনাচক্রে, দুই নেতার বিরুদ্ধেই বর্তমানে একাধিক বিষয়ে তদন্ত চলছে। ফলে তাঁদের অফিস পুড়ে যাওয়ার ঘটনাও নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বৃহস্পতিবার ভবনের ভিতরে ঢুকে তদন্তকারীরা লক্ষ্য করেন, আগুনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ভবনের পূর্ব দিকের অংশে। বিপরীতে পশ্চিম দিকে থাকা জেলাশাসকের দফতরের বড়ো অংশ প্রায় অক্ষত রয়েছে। কেন আগুনের ক্ষয়ক্ষতি নির্দিষ্ট অংশেই সীমাবদ্ধ থাকল, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তের স্বার্থে আগুন লাগার সময় ভবনের ভিতরে উপস্থিত কয়েক জন কর্মীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অফিস শুরুর আগেই এসি বন্ধ অবস্থায় চার কর্মীর উপস্থিতি নিয়ে প্রথমে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু পুলিশের দাবি, তাঁদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সন্দেহজনক কিছু মেলেনি। ওই চার জনের মধ্যে একজন ছিলেন রঙের মিস্ত্রি, যিনি পরে ছাদ থেকে দড়ি বেয়ে নেমে প্রাণ বাঁচান। দু-জন ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। অন্যজন সাহাবুদ্দিন মোল্লা নামে ভবনের এক কর্মী, যিনি সাত তলায় আটকে পড়ে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। দায়িত্বে থাকা দমকল আধিকারিকের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের প্রশ্ন, চার ও পাঁচ তলার আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যম এবং পুলিশকে আশ্বস্ত করার কিছুক্ষণের মধ্যেই কীভাবে ভবনের উপরের তলাগুলিতে নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ল? সেখানে কোনো গাফিলতি ছিল, না কি অন্য কোনো কারণ, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতেই ফরেন্সিক দল বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল। কিন্তু ভিতরে তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকায় সেদিন পর্যাপ্ত নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। শুক্রবার ফের ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়েছে। সেগুলি পরীক্ষাগারে পাঠিয়ে আগুনের উৎস এবং বিস্তারের প্রকৃতি সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত তৈরি করা হবে। পুলিশের বক্তব্য, ফরেন্সিক রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও আধিকারিকদের নোটিস পাঠিয়ে আরও বিশদ জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আপাতত আলিপুরের এই অগ্নিকাণ্ডকে ঘিরে যত তথ্য সামনে আসছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে তদন্তের সমীকরণ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!