Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • আগস্ট ২৫, ২০২৫

অবৈধ উত্তোলন, অ্যাম্বুলেন্স, ই-রিকশায় খনিজ পরিবহন! — সিএজি রিপোর্টে যোগী শাসনের দুর্নীতির খতিয়ান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অবৈধ উত্তোলন, অ্যাম্বুলেন্স, ই-রিকশায় খনিজ পরিবহন! — সিএজি রিপোর্টে যোগী শাসনের দুর্নীতির খতিয়ান

অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে, তবে হাসপাতালের দিকে নয়, ‘অবৈধভাবে উত্তোলিত’ খনিজ যাচ্ছে খনির পথ ধরে। শববাহী গাড়ি বহন করছে বালি। কাগজে-কলমে ই-রিকশা, বাস, এমনকি বুলডোজারেও খনিজ পরিবহণ! উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রথম মেয়াদে (২০১৭-২০২২) খনিজ খননে যে বিপুল অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে, সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভায় উপস্থাপিত ভারতের নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাব পরিদর্শক (ক্যাগ)-এর রিপোর্টে উঠে এল এমনই বিস্ফোরক তথ্য।

সিএজি জানিয়েছে, অন্তত ১৭টি জেলায় ৮৫,৯২৮টি ‘অনুপযুক্ত’ এবং ‘ভুয়ো’ রেজিস্ট্রেশন নম্বরযুক্ত যানবাহন খনিজ পরিবহণে ব্যবহৃত হয়েছে বলে সরকারি নথিতে দাবি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ছিল ৪০৭টি অ্যাম্বুলেন্স, ৯টি হিয়ার্স ভ্যান, ২৯,৫২৫টি ই-রিকশা, ৩,৬২৫টি বাস, ১,৬২১টি বুলডোজার এবং ১২,৭৬৩টি ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি। সব মিলিয়ে প্রায় ২৪.৫১ লক্ষ ঘনমিটার খনিজ পরিবহণ করা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। অথচ বাস্তব ছবিটা একেবারেই ভিন্ন। সিএজি রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ‘ওই গাড়িগুলির খনিজ পরিবহণে একবারেই উপযুক্ত নয় । অধিকাংশের রেজিস্ট্রেশন নম্বরই মিথ্যা বা অস্তিত্বহীন। ‘বাহন’ পোর্টালে নেই এমন ৮১,২৮০টি যানবাহনের নাম রয়েছে খনিজ পরিবহণের তালিকায়।’ উদ্দেশ্য একটাই—অতিরিক্ত খননের কাগজপত্রে বৈধতা আনা।

তথ্য বলছে, ওই ৫ বছরে অন্তত ৪৪,৮৬৩৭টি ই-ট্রানজিট পাস জারি করা হয়েছিল এই ‘ভুয়ো’ গাড়িগুলির নামে। এর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল খনিজ উত্তোলনের মাত্রা এবং পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানো, যাতে প্রকৃত খননের থেকে অনেক বেশি উপার্জন সম্ভব হয়, অথচ কর বা রয়্যালটির খাতায় তার প্রতিফলন না থাকে। রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, একই ট্রানজিট পাস একাধিক বার ব্যবহার হয়েছে বিভিন্ন গাড়িতে। পাসে লেখা গাড়ির ক্ষমতা দিনের বেলায় একরকম, রাতে আরেকরকম। কোথাও কোথাও গাড়ির নম্বর ৭ সংখ্যার কম, আবার কোথাও কেবল ১ অঙ্কের নম্বর! এক কথায়, গোটা ব্যবস্থাই ছিল জালিয়াতির চূড়ান্ত উদাহরণ । জানা যাচ্ছে, ৪৫টি খনি লিজপ্রাপ্ত ব্যক্তি মিলে ২৬৮.৯১ হেক্টর জমিতে খনিজ উত্তোলন করেছে অনুমোদিত এলাকার বাইরে গিয়ে। এতে রাজ্য সরকারের আনুমানিক ক্ষতি হয়েছে ৪০৮.৬৮ কোটি। এই ‘অবৈধ খনন’-এর উদাহরণ প্রয়াগরাজের ‘মেজা থার্মাল পাওয়ার প্রোজেক্ট’, যারা ৫৩.৮৮ লক্ষ ঘনমিটার বোল্ডার ও বলাস্ট উত্তোলন করেছে কোনোরকম অনুমতিপত্র ছাড়াই। প্রশাসনের তরফে ৩২২.৬২ কোটির রয়্যালটি দাবি করা হলেও, জমা পড়েছে মাত্র ৮১.৭৭ লক্ষ টাকা।

প্রকাশিত রিপোর্টে সিএজি-এর অভিযোগ, গোটা প্রক্রিয়ায় নজরদারির অভাব ছিল প্রকট। রাজ্যের ভূ-তত্ত্ব ও খনিজ বিভাগ ‘ইউনিয়ন মিনিস্ট্রি অফ মাইনস’-এর নজরদায়ী সিস্টেম ব্যবহারই করেনি। জেলা স্তরেও খনিজ আধিকারিকরা কোনো প্রযুক্তিনির্ভর পরিকাঠামো ব্যবহার করেননি অবৈধ খনন ধরার জন্য। ছবি আরও ধোঁয়াশা করেছে ৬১৩টি স্টোন-ক্রাশার, যারা লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর নিজেদের ‘কাজ ‘ চালিয়েছে। কোথাও খনির পাশে সেতুর খুব কাছে খননের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কোথাও বা ইকো-সেন্সিটিভ জোন, বিদ্যালয়, জনবসতির গা ঘেঁষে তৈরি হয়েছে ইটভাটা। পরিবেশ রক্ষার দিকেও নজর দেওয়া হয়নি। ৬,৮২৪ একর জমিতে ১৩,৬৪,৮০০টি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। ৫৪টি লিজগ্রহীতার কাছ থেকে খনির বন্ধ হওয়ার পরের পরিকাঠামো ও পরিবেশ পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক গ্যারান্টিও নেওয়া হয়নি।

চাপের মুখে উত্তরপ্রদেশ প্রশাসন এখন সুর পাল্টেছে। রাজ্যের ভূ-তত্ত্ব ও খনিজ দফতর জানিয়েছে, অবৈধ খনন রুখতে রাজ্যজুড়ে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই ২১,৪৭৭টি গাড়িকে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়েছে। বসানো হয়েছে ৫৭টি এআই, ড্রোন নিয়ন্ত্রিত চেকপোস্ট। চালু হয়েছে ওয়েই-ইন-মোশন প্রযুক্তি, রুট ডিভিয়েশন অ্যালার্টসহ জিপিএস ট্র্যাকিং সিস্টেম। ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে খননের পরিমাণ নির্ধারণ, অনুমোদনহীন খনির চিহ্নিতকরণ, এমনকি ভাণ্ডারজাত খনিজের উপরেও চলছে নজরদারি। তবে, সিএজি রিপোর্ট বলছে, যোগী সরকারের ‘শূন্য সহনশীলতা’র দাবি আর বাস্তবের মধ্যে বিস্তর ফারাক। যোগীর প্রশাসনে খনিজ খাতে দুর্নীতি, ভূ-অভ্যন্তরের খনিজ স্তরের থেকেও অনেক বেশি গভীর।

অন্যদিকে, অবৈধ খননের অভিযোগ উঠেছে দিল্লিতেও। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত সম্প্রতি যোগী আদিত্যনাথকে চিঠি দিয়ে যমুনা নদীর মাঝদ্বীপে অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধে যৌথ পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। এনজিটি-তে দায়ের করা হলফনামায় জানানো হয়েছে, দ্বীপগুলিতে প্রশাসনিক সীমার বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে চলছে খনন। দিল্লি বলছে, তারা সক্রিয় পদক্ষেপ নিচ্ছে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দরকার নদীসীমার সুস্পষ্ট চিহ্নিতকরণ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!