- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ২৯, ২০২৬
অসমে বন্যায় মৃত বেড়ে ৭৫, জল নামলেও কাটেনি দুর্ভোগ। পরিবারপিছু ৯ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসনে জোর হিমন্ত সরকারের
বন্যার জল ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও অসমে বিপর্যয়ের প্রকোপ এখনো কাটেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় শিবসাগর জেলায় আরও ৭ জনের মৃত্যুর পর চলতি বছরের বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা কিছুটা কমে ৩.৩২ লক্ষে নামলেও বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনো হাজার হাজার মানুষ ত্রাণ শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে মৃতদের পরিবারের জন্য এককালীন ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ৪ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে মোট ৯ লক্ষ টাকা করার ঘোষণা করেছে অসম সরকার। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে এককালীন ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা করেছে অসম সরকার।
বুধবার হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, বর্তমানে শিবসাগর, চরাইদেও, গোলাঘাট, জোরহাট, নগাঁও, শোণিতপুর এবং কামরূপ মেট্রোপলিটন — এই ৭টি জেলা এখনো বন্যার কবলে। মোট ২১টি রাজস্ব চক্রের অন্তর্গত ৬২২টি গ্রাম জলমগ্ন অবস্থায় রয়েছে। যদিও সোমবার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছিল ৪.৪৫ লক্ষ, বুধবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩,৩২,৬৩৯-এ। তবুও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে এখনো অনেকটা সময় লাগবে বলেই মনে করছে প্রশাসন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরাইদেও জেলা, যেখানে ১.৪২ লক্ষ মানুষ বন্যার প্রভাবের মধ্যে রয়েছেন। শিবসাগরে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৯৭,০৭৪ এবং জোরহাটে ৫৭,৩৭১। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৪৫,৩৪১.৯৮ হেক্টর কৃষিজমি জলের তলায়। বহু বাড়ি, গোয়ালঘর, স্কুল ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ঘোষণা করেন, বন্যায় মৃত বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের নিয়মে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এতদিন মৃতদের পরিবারের জন্য রাজ্য সরকার ৪ লক্ষ টাকার এককালীন অনুদান দিত। এবার তার সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। ফলে মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৯ লক্ষ টাকা। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার জন্য আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট জমা দিতে হবে না। সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসারের শংসাপত্রই যথেষ্ট বলে জানিয়েছে সরকার। এমনকি কেউ বন্যায় নিখোঁজ হওয়ার এক মাস পরও যদি তাঁর দেহ উদ্ধার না হয়, সেক্ষেত্রেও পরিবারকে একই পরিমাণ অর্থ দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চার জেলা—শিবসাগর, চরাইদেও, জোরহাট এবং গোলাঘাটের গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে অন্তর্বর্তীকালীন সহায়তা হিসেবে ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। আগামী ৪-৫ দিনের মধ্যেই সে অর্থ সরাসরি উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্যায় শিশুদের মানসিক ও শিক্ষাগত ক্ষতি কমাতেও একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে অসম সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ত্রাণ শিবিরে শিশুদের জন্য পড়াশোনা ও খেলাধুলার পৃথক ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে দুর্যোগের প্রভাব তাদের শৈশবকে ব্যাহত না করে। শিবসাগর ও চরাইদেও জেলার স্কুলপড়ুয়াদের জন্য বিনামূল্যে নতুন ইউনিফর্ম ও পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হবে। পাশাপাশি উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়ারা ১,০০০ টাকা, স্নাতক স্তরের শিক্ষার্থীরা ৩,০০০ টাকা এবং স্নাতকোত্তর ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষার্থীরা ৫,০০০ টাকা করে এককালীন আর্থিক সহায়তা পাবেন। এদিকে ‘অসম স্টেট স্কুল এডুকেশন বোর্ড’ (এএসএসইবি) ঘোষণা করেছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের আর ‘ডুপ্লিকেট মার্কশিট’ বা শংসাপত্র পাওয়ার জন্য পুলিশের রিপোর্ট জমা দিতে হবে না। শুধুমাত্র একটি স্ব-ঘোষণাপত্র জমা দিয়েই তাঁরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ‘ডুপ্লিকেট’ নথি সংগ্রহ করতে পারবেন। আবেদন পদ্ধতি আগের মতোই থাকবে, তবে কোনো ফি দিতে হবে না।
এই মুহূর্তে, অসমের বিভিন্ন প্রান্তে ৮১টি ত্রাণ শিবির চালু রয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৩২,৪৭৭ জন বাস্তুচ্যুত মানুষ। এছাড়াও ৩৪টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। তবে, কিছু উপদ্রুত এলাকায় হেলকপ্টার থেকে জলের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী ফেলবার অভিযোগ ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ দেখা গিয়েছে। যদিও, প্রশাসনের তরফে সে সব অঞ্চলে পুনরায় ত্রাণ সামগ্রী পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সেনাবাহিনী, ভারতীয় বায়ুসেনা, এনডিআরএফ, এসডিআরএফ, অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি পরিষেবা বিভাগ এবং অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একযোগে কাজ করছে। বন্যার বিভীষিকা কতটা গভীর, তার এক মর্মান্তিক ছবিও সামনে এসেছে জোরহাটের এলেংমোরা গ্রাম থেকে। ভোগদই নদীর প্লাবনে চারদিক জলমগ্ন হয়ে পড়ায় ১০৬ বছর বয়সি আইতিকৌ তামুলির পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা। পরিবারের সদস্যদের কথায়, কলাগাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ভেলায় মৃতদেহ বহন করে তাঁরা একটি পুকুরপাড়ের ছোট্ট উঁচু জমিতে পৌঁছন। গোটা গ্রাম জলের তলায় থাকায় ওই সামান্য শুকনো জায়গাটিই ছিল শেষ ভরসা। শেষ পর্যন্ত সেখানেই গ্রামবাসীদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় বৃদ্ধার দাহকার্য। বন্যার প্রকোপে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যে কতটা অসহনীয় হয়ে উঠেছে, এ ঘটনাই তার নির্মম প্রমাণ।
এদিকে, অসমের বন্যা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় আন্তঃমন্ত্রক প্রতিনিধি দল বুধবার জোরহাট জেলার একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যুগ্মসচিব এম. রামচন্দ্রুডুর নেতৃত্বাধীন দলটি ভেঙে যাওয়া বাঁধ, নদীভাঙন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, ত্রাণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা সরেজমিনে পর্যালোচনা করে। জোরহাট সার্কিট হাউসে রাজস্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী কেশব মহন্তের উপস্থিতিতে বৈঠকও হয়। সেখানে জেলা প্রশাসন বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে। বৈঠকের পরে প্রতিনিধি দল নির্দেশ দেয়, জল নামার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে বৃহৎ আকারে জীবাণুনাশক ছিটানো এবং ‘স্যানিটেশন’ অভিযান শুরু করতে হবে, যাতে সংক্রামক রোগের প্রকোপ না বাড়ে। এই প্রতিনিধি দলে অর্থ মন্ত্রক, গ্রামীণ উন্নয়ন মন্ত্রক, সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক, ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টার, সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন এবং অসম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। তাঁদের রিপোর্টের ভিত্তিতেই অসমের জন্য কেন্দ্রীয় আর্থিক সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণ হবে। বুধবার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’ও ফোনে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে কথা বলে রাজ্যের বন্যা পরিস্থিতি এবং ত্রাণকার্যের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক মাধ্যমে জানান, অমিত শাহ তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন যে ত্রাণ, পুনর্গঠন এবং পুনর্বাসনের জন্য কেন্দ্রের সমস্ত সংস্থা ও প্রয়োজনীয় সম্পদ অসমের পাশে থাকবে। এর আগে ২৩ জুলাইও অমিত শাহ অসমের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
অসমের বন্যা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা অসমের বন্যাকে ‘জাতীয় বিপর্যয়’ ঘোষণা করে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের দাবি তুলেছে।প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া মুখ্যসচিবের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে দিখৌ নদী অববাহিকায় দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন প্রকল্প, বৈজ্ঞানিক তদন্ত এবং পরিবেশ পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাইজর দলের নেতা অখিল গগৈ সরকারের ঘোষিত ১৫ হাজার টাকার অন্তর্বর্তী সহায়তাকে অপর্যাপ্ত বলে মন্তব্য করে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিও এবার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে, অথচ সরকারি সহায়তা সে তুলনায় যথেষ্ট নয়।
❤ Support Us






