Advertisement
  • বৈষয়িক
  • জুলাই ৯, ২০২৪

বন্ধন ব্যাঙ্ক থেকে স্বেচ্ছাবসর । বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চন্দ্রশেখর ঘোষ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বন্ধন ব্যাঙ্ক থেকে স্বেচ্ছাবসর । বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্ব পালনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ চন্দ্রশেখর ঘোষ

বাঙালির দ্বারা ব্যবসা হয়না, এই প্রবাদ যিনি মিথ্যা প্রমাণ করেছেন তিনি আজ চললেন স্বেচ্ছাবসরের পথে। তিনি চন্দ্রশেখর ঘোষ, বন্ধন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা।
১৭৭০ সালে কোম্পানি শাসিত ভারতের রাজধানী কলকাতায় ব্যাঙ্ক অফ হিন্দুস্তান প্রথম প্রতিষ্ঠা হয় । পরে তা উঠে যায় । ১৮২৮ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। সে সংস্থাও এক প্রকার প্রতিষ্ঠাতার গাফিলতিতেই দেউলিয়া হয়ে যায়। অনেক পরে প্রতিষ্ঠা হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। তার সদর দফতর ছিল এই কলকাতা। ১৯৩৭ সালে তা সোজা আরবসাগরের পাড়ে চলে যায়। পূর্বতন ব্যাঙ্ক অফ কলকাতা অধুনা স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার জন্ম এই শহরেই । সেও এখন বাণিজ্য নগরী মুম্বইয়ে অবস্থিত। ১৯৯৩ সালে মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বেসরকারি ব্যাংকের অনুমোদনের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে অনেক বেসরকারি ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা হয় যার অনেকগুলিই আর টিকে নেই। কয়েকটি মিলেছে অন্য ব্যাংকের সঙ্গে। ২০১০ সালে বাঙালি অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় তাঁর পূর্বসূরির
পদাঙ্ক অনুসরণ করে বেসরকারি ব্যঙ্কের দরজা খুলে দেন। সে থেকেই জন্ম নেয় একটি সুপ্ত বাসনার, যার নাম ‘বন্ধন ব্যাঙ্ক।’ যদিও নতুন ব্যাঙ্ক গড়ার ২৭ টি আবেদন জমা পড়ে রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে। প্রতিযোগিতায় আম্বানি, বিড়লা, বাজাজ ফিনান্সের মতো বড় সংস্থাও ছিল। তবে শেষ হাসি হেসেছে মাত্র দুটি ব্যাঙ্ক , যার একটি বন্ধন ব্যাঙ্ক। মাত্র ন বছরে ছোট সংস্থা থেকে বৃহৎ সংস্থায় পরিণত হয়েছে এটি, যার মূল কাণ্ডারি একজন , তিনি চন্দ্রশেখর ঘোষ।
শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্পে বাঙালি একমেবাদ্বিতিয়ম । ক্রীড়া ক্ষেত্রেও তার সাফল্যের নজিরের শেষ নেই। রাজনীতি থেকে শুরু করে মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য। তবে ব্যতিক্রম একমাত্র ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। যদিও মঙ্গলকাব্যে বাঙালির বানিজ্যের কাহিনীর উল্লেখ থাকলেও তার বাস্তব প্রতিফলন দেখার থেকে বহুদিন বঞ্চিত ছিল বাঙালি। বাঙালিকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করলেন চন্দ্রশেখর।
তবে ব্যবসা তাঁর রক্তে। প্রথম জীবনে ত্রিপুরায় বাবার মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন তিনি। সে কাজ ছেড়ে বাংলাদেশে চাকরি করতে গেলেন তিনি। একসময় নিজের স্বপ্নের ডানায় ভর করে তাকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য সে চাকরিও ছাড়লেন চন্দ্রশেখর।
২০১৫ সালে ২৩ অগাস্ট জন্ম নিল একটি অঙ্কুর। তার নাম বন্ধন ব্যাঙ্ক। ন বছর পরে সে এখন একটি মহীরুহ। চন্দ্রশেখর যুদ্ধ জয়ের পরে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তাঁর কাছে মন অনেক ব্যাংকের শুভেচ্ছাবার্তা এসে পৌঁছায় যারা তাঁর লড়াইয়ের সময় তাঁকে অ্যাকাউন্ট খুলতে দেয়নি । বন্ধন ব্যাঙ্কই পূর্ব ভারতের প্রথম বেসরকারি ব্যাঙ্ক। পরবর্তীকালে নন ব্যাঙ্কিং আর্থিক সংস্থা রূপে আত্মপ্রকাশকারী প্রথম সংস্থা বন্ধন ব্যাঙ্ক। মাত্র তিনজন কর্মী নিয়ে পথচলা শুরু করলেও বর্তমানে এই সংস্থার প্রায় ৭৫ হাজারের বেশি কর্মীর অন্নসংস্থান করছে সংস্থাটি। গ্রাহক সংখ্যা ৩.৩৬ কোটি। জমা থাকা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বন্ধন ঋণ দিয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। গোটা দেশে সংস্থার শাখার সংখ্যা ৬,২৯৭ ।
স্বেচ্ছাবসর নেওয়া ৬৩ বছরের ‘তরুণ’ চন্দ্রশেখর নিজের ইস্তফাপত্রে জানিয়েছেন, ‘ প্রায় এক দশক ব্যাঙ্কের এমডি এবং সিইও হিসাবে দায়িত্ব পালন করার পর এখন মনে হচ্ছে, আরও বৃহত্তর দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে। বন্ধন গোষ্ঠীর নীতি ও কৌশল নির্ধারণকারীর ভূমিকায় কাজ করার সময় এসেছে। তাই ৯ জুলাই, ২০২৪ আমার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
বন্ধনের এমন এক সময়ে উত্থান যখন ‘চিট ফাণ্ড’ ইস্যু রাজ্যের একটি জ্বলন্ত সমস্যা। প্রতারকের ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন বহু মানুষ। এই মানুষেরা ব্যাঙ্কে আর্থিক লেনদেনের কথা ভাবতেই পারতেন না। সে শূন্যস্থানকে পূর্ণ করতে এলো বন্ধন। তবে শুধু সমাজের অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষের ব্যাঙ্ক হয়ে থাকলো না সে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মানুষকেও তার গ্রাহক বানাল বন্ধন। কারণ পোড় খাওয়া চন্দ্রশেখর বুঝেছিলেন, ব্যবসা বৃদ্ধি করতে গেলে অর্থের যথেষ্ট জোগান থাকা প্রয়োজন। নিম্নবিত্ত মানুষের সামান্য পুঁজিতে সে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো এক প্রকার অসম্ভব। তাই শুরুর পর থেকেই অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ দিতে আরম্ভ করে বন্ধন।
রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় বন্ধনের প্রথম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘বন্ধন ব্যাঙ্কের মতো প্রতিষ্ঠান আধুনিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটা শুধু ধনী নয়, সেই শ্রেণিকেও উপকৃত করবে, যাঁরা উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখেন।’ বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি উদ্বোধনের দিন বলেছিলেন, ‘‘একটি মহৎ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে বাংলায়। বন্ধন ব্যাঙ্কের সূচনা শুধু বাংলার শিল্পের উন্নতিতেই কাজ করবে তা নয়, বাংলায় শিল্প ফিরিয়ে আনার কাজও করবে।’ বাংলার তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র বলেছিলেন, ‘বন্ধন নারী সশক্তিকরণ এবং দারিদ্র দূরীকরণের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। সেই লক্ষ্যে এই প্রতিষ্ঠান সফল।’
তবে পিতা যেমন সন্তানকে ছেড়ে থাকতে পারেননা , তেমনই ‘বন্ধনে’র সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করবেন না চন্দ্রশেখর। টাটা গোষ্ঠীতে যেমন অশীতিপর রতন টাটা এখনো সংস্থার ‘পোস্টার বয় ‘ , তেমনই থেকে যাবেন বাঙালি ব্যবসায়ী চন্দ্রশেখর। এখনো যে বাঙালিকে স্বপ্ন দেখানো বাকি তাঁর।


  • Tags:
❤ Support Us
ভেসে যায় নধরের ভেলা, ভেসে যায় বেহুলা পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
ঈশানবঙ্গের শক্তি পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
error: Content is protected !!