- দে । শ ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- মার্চ ২৪, ২০২৬
জাদুঘর সংস্কার, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে দ্বিমুখী উদ্যোগ
ইতিহাস আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে নতুন দৃষ্টান্ত গড়তে চলেছে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ। একদিকে নতুন করে সংস্কার করা জাদুঘরে স্থান পাচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের হাতে লেখা বিবাহের নিমন্ত্রণপত্র, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যবহৃত খনন-সরঞ্জাম কিংবা ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এর অমূল্য পাণ্ডুলিপি, অন্যদিকে তেমনই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে এগিয়ে এসে পরিষদের ঐতিহ্যবাহী ভবনের ছাদে বসানো হচ্ছে রুফটপ সোলার প্যানেল।
১৩৩ বছরের প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠান, যা একসময় ‘দ্য বেঙ্গল অ্যাকাডেমি অফ লিটারেচার’ নামে পরিচিত ছিল, ব্রিটিশ আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে পথচলা শুরু। প্রথম সভাপতি ছিলেন রমেশচন্দ্র দত্ত, আর সহ-সভাপতির আসনে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নবীনচন্দ্র সেন। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজও পরিষদটি বাংলা সাহিত্যচর্চা ও গবেষণার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে নিজস্ব মর্যাদা ধরে রেখেছে। অল্প কিছু দান করা বই দিয়ে শুরু হলেও আজ পরিষদের সংগ্রহে রয়েছে এক লক্ষেরও বেশি বই এবং সতেরো হাজারের বেশি সাময়িক পত্রিকা। উনিশ শতকের বিরল বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকার পাশাপাশি সংস্কৃত, ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার বইয়েরও সমৃদ্ধ ভাণ্ডার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ।
সম্প্রতি, পূর্ত দফতরের সহায়তায় পরিষদের প্রথম তলার জাদুঘর এবং গ্রন্থাগারের ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। ফলে, আরও বড়ো পরিসরে প্রদর্শিত হবে বাংলার সাহিত্য-ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত দুর্লভ দলিল, পাণ্ডুলিপি ও নিদর্শন। পরিষদের সম্পাদক রমেন কুমার সর জানান, ‘আগে জাদুঘর থাকলেও তা ছিল অপ্রতুল ও জরাজীর্ণ। এখন আমরা অনেক উন্নত পরিকাঠামোয় দর্শকদের সামনে আমাদের অমূল্য সংগ্রহ তুলে ধরতে পারব।’ তাঁর কথায়, এ সংগ্রহ কেবল ইতিহাস নয়, বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
এই আধুনিকীকরণের ধারাতেই যুক্ত হয়েছে নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার। পরিষদের ঐতিহ্যবাহী ভবনের ছাদে বসানো হচ্ছে রুফটপ সোলার প্যানেল, যার কাজ ইতিমধ্যেই শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে মাসিক বিদ্যুৎ খরচ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমে আসতে পারে বলে মনে করছে পরিষদ। শুধু তাই নয়, অতিরিক্ত উৎপাদিত বিদ্যুৎ যদি গ্রিডে সরবরাহ করা যায়, তা হলে সেখান থেকেও ভবিষ্যতে আর্থিক লাভের সম্ভাবনা তৈরি হবে। পরিষদের সম্পাদক জানান, এই উদ্যোগে কেবল ব্যয় সঙ্কোচন হবে তাই না, বরং প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক স্বনির্ভরতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সময়ের দাবি মেনে চলার একটি সচেতন প্রয়াস বলেও মনে করা হচ্ছে এই উদ্যোগকে। পরিষদ সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী বছরে ভবনের দ্বিতীয় তলার সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে, যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে সংগীত সংক্রান্ত বিরল রেকর্ডের এক উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ।
পাশাপাশি, ভবনে লিফট বসানোর কাজও শুরু হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল—বিশেষ করে পরিষদের প্রায় ১,২০০ সদস্যের অনেকেই প্রবীণ হওয়ায়। পূর্ত দফতর জানিয়েছে, মার্চের মধ্যেই এই কাজ সম্পূর্ণ হবে এবং ভবনের চারপাশের সৌন্দর্যায়নও করা হবে। তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে তৈরি হয়েছে ১৫ মিনিটের একটি অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা, যেখানে পরিষদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংগ্রহের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। সম্মেলন কক্ষে যুক্ত হয়েছে আধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। গ্রন্থাগারেও এসেছে ডিজিটাল পরিবর্তন— মাত্র ৫০ টাকায় তিন মাসের রিডার কার্ড চালু করে পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে নানা পরিষেবা। বর্তমানে প্রতিদিনই কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী গবেষণার উদ্দেশ্যে এখানে আসছেন। জানা যাচ্ছে, নব সংস্কার করা জাদুঘরের উদ্বোধনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। নবান্ন সূত্রে ইঙ্গিত, শীঘ্রই সেখানে যেতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী।
❤ Support Us






