Advertisement
  • প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
  • ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫

ঢাকায় গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির মৃত্যু, রাতভর অগ্নিগর্ভ বাংলাদেশ। সংবাদপত্রের অফিসে আগুন, আওয়ামী লীগের কার্যালয়, ছায়ানটে ভাঙচুর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ঢাকায় গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির মৃত্যু, রাতভর অগ্নিগর্ভ  বাংলাদেশ। সংবাদপত্রের অফিসে আগুন, আওয়ামী লীগের কার্যালয়, ছায়ানটে ভাঙচুর

ঢাকার রাজপথে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শেষ পর্যন্ত থামল সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টা নাগাদ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা শরিফ ওসমান হাদি। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাতভর অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। ঢাকার শাহবাগ থেকে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা— সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ।

সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হাদি। গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগের এক কর্মী তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। গুরুতর অবস্থায় তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো যায়নি। হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই বৃহস্পতিবার রাত থেকেই ঢাকার শাহবাগ চত্বরে জমায়েত শুরু হয়। কয়েক হাজার মানুষ সেখানে জড়ো হন। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে এলাকা। এর পরেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঢাকার কারওয়ান বাজারে দেশের দুই শীর্ষ সংবাদপত্র— ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেলি স্টার’-এর দফতরে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। ভিতরে আটকে পড়েন বহু সাংবাদিক। দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর তাঁদের উদ্ধার করা হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে শুক্রবার এই দুই সংবাদপত্রের মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশিত হচ্ছে না।

বিক্ষোভকারীদের রোষ থেকে রেহাই পায়নি দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। বিক্ষোভের রোষ গিয়ে পড়ে দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপরেও। ধানমন্ডিতে প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সাততলা ভবনে রাতভর তাণ্ডব চালানো হয়। চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ থেকে শুরু করে হারমোনিয়াম— যা সামনে এসেছে, সবই ভাঙচুর করা হয়েছে। একাধিক কক্ষে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সন্‌জীদা খাতুন ও লালনের ছবি ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। পরে সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনির্দিষ্ট কালের জন্য সব কার্যক্রম স্থগিত রাখা হচ্ছে। ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতেও ফের ভাঙচুর চালানো হয়। রাজধানীর বাইরেও একই ছবি। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের পার্টি অফিসে বুলডোজার চালানোর অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রামে ভারতের উপদূতাবাস লক্ষ্য করে ঢিল-পাটকেল ছোড়ার খবর মিলেছে। রাত থেকেই সেখানে অবস্থান বিক্ষোভ শুরু করেন ছাত্র-যুবদের একাংশ।

পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিতে উদ্বিগ্ন অন্তর্বর্তী সরকার। গভীর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। দেশবাসীকে ‘ধৈর্য ও সংযম’ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হাদিকে হত্যা করে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা যাবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘‌হাদি পরাজিত ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসী শক্তির শত্রু ছিলেন। যারা তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার এবং বিপ্লবীদের মধ্যে ভয় সঞ্চার করার চেষ্টা করেছিল, আমরা আবার তাদের পরাজিত করব।’‌ হাদির মৃত্যুকে ‘শহিদের মৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করে ইউনূস জানান, আগামী শনিবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হবে। ওই দিন জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। শুক্রবার বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি হাদির স্ত্রী ও সন্তানের দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি। ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি। পাশাপাশি, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদপত্রের অফিসে হামলার নিন্দা করে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীও দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে ভাঙচুরের ভিডিও পোস্ট করে বর্তমান পরিস্থিতির দায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চাপানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ওসমান হাদি। ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারের সময় অজ্ঞাতপরিচয় আততায়ীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হন। গুলিতে কানের কাছে গুরুতর আঘাত পান তিনি। এরপর তাঁকে চিকিৎসার জন্য সোমবার সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘‌চিকিৎসকদের সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও হাদি আঘাতের কারণে মারা গেছেন।’ হাদি। নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার ঠিক পরদিনই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগের এক কর্মী এই হামলায় যুক্ত। গত নভেম্বরে সমাজমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, তাঁকে একাধিক নম্বর থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। সেই সময়ই ইনকিলাব মঞ্চের তরফে ঘোষণা করা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রার্থী হবেন তিনি। তাঁর অকাল মৃত্যুতে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ইনকিলাব মঞ্চ এবং এনসিপি। বিদ্রোহের মূল সংগঠক হাদিকে রক্ষা করতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলছেন তাঁরা। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যায় হাদির দেহ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে। তাঁর দেহ দেশে ফিরলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। সাধারণ নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে এই লাগাতার অশান্তি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গভীর সংকটের সামনে দাঁড় করিয়েছে। ধৈর্যের আহ্বান উপেক্ষা করেই রাতভর যে ছবি দেশ দেখল, তা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, পরিস্থিতি আদৌ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে তো ?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!