- Uncategorized দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ১, ২০২৬
মধ্যপ্রদেশের উত্তাল নদীতে নৌকাডুবি, মৃত অন্তত ৯, নিখোঁজ বহু। আর্থিক সহায়তার ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে বার্গী ড্যামে মর্মান্তিক ঘটনা। পর্যটকদের প্রিয় শান্ত, মনোরম জলরাশির পরিবেশ এই মুহূর্তে শোক, আতঙ্কে ভারি হয়ে রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলের নৌকাডুবির ঘটনায় শুক্রবার সকাল পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯। তাঁদের মধ্যেই রয়েছেন এক মা ও তাঁর ৪ বছরের সন্তান।
উদ্ধারকর্মীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের ছবি। একটি মাত্র লাইফ জ্যাকেটের ভিতরে নিজের শিশুকে ঢুকিয়ে, তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন এক মা। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও আলগা হয়নি তাঁর আঁকড়ে ধরা হাত। জল থেকে দেহ তোলার সময়ও দেখা যায়, সন্তানকে ঠিক সেভাবেই আগলে রেখেছেন তিনি। এ দৃশ্য শুধু উদ্ধারকর্মীদের নয়, উপস্থিত সকলকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ‘এ দৃশ্য ভোলার নয়।’ এমনকি ঘটনাস্থলে উপস্থিত মধ্যপ্রদেশের পর্যটনমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র ভাব সিং লোধিও আবেগ সামলাতে পারেননি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ২৯ জন পর্যটক ও ২ জন কর্মী নিয়ে একটি ছোট ক্রুজ নৌকা বার্গী বাঁধের জলে ভ্রমণে বেরিয়েছিল। নর্মদা নদীর বিস্তৃত জলরাশির মাঝামাঝি পৌঁছতেই আচমকা বদলে যায় আবহাওয়া। শুরু হয় প্রবল ঝড়, সঙ্গে দমকা হাওয়া। মুহূর্তে উত্তাল হয়ে ওঠে জল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, নদীর ঢেউ ক্রমশ বেড়ে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তীর থেকে অনেকেই নৌকার চালককে বারবার সতর্ক করেছিলেন। দ্রুত ফিরে আসার অনুরোধও করা হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছিল। ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ক্রুজটি একদিকে হেলে পড়ে, ধীরে ধীরে জলের তলায় তলিয়ে যায়। পারে দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে সে দৃশ্য দেখছিলেন অন্যান্য পর্যটকরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা তৎপর হয়ে ওঠেন। দড়ির সাহায্যে যাঁদের পরনে লাইফ জ্যাকেট ছিল, এমন কয়েক জন যাত্রীকে টেনে তোলা হয়। কিন্তু অনেকেই নৌকার ভিতরে আটকে পড়েন। জানা গিয়েছে, নৌকাটি উল্টে যাওয়ার সময় তার ছাদের অংশ জলের নীচে চলে যায়, ফলে ভেতরে থাকা যাত্রীদের বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, সব যাত্রীকে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়নি। এ অভিযোগই আরও জোরদার হয়েছে বেঁচে ফেরা যাত্রীদের কথায়। তাঁদের দাবি, যাত্রা শুরুর সময় নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হয়নি। লাইফ জ্যাকেট পরে ওঠার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। বরং বিপদ ঘনিয়ে আসার পর তড়িঘড়ি করে তা বিলি করা হয়, আর সেখান থেকেই তৈরি হয় হুড়োহুড়ি ও বিশৃঙ্খলা।
ঘটনার পর থেকেই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু হয়েছে উদ্ধার অভিযান। ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে সেনা, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), রাজ্য দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া বাহিনী (এসডিআরএফ) সহ একাধিক উদ্ধারকারী দল। রাতভর চলে তল্লাশি। বৃহস্পতিবার, প্রাথমিকভাবে ৪টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। শুক্রবার সকালে আরও ৫ টি দেহ মেলে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ডুবে থাকা নৌকার ভিতরে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। ভাঙা কাঠামো, বেরিয়ে থাকা লোহার রড, কাদামাটি এবং প্রায় শূন্য দৃশ্যমানতা— সব মিলিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপই ঝুঁকিপূর্ণ। তবু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে তল্লাশি। এখনো বেশ কয়েক জন নিখোঁজ, ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করছে প্রশাসন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত রয়েছেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র ভাব সিং লোধি, বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মুখ্য সচিব এবং বিজেপি বিধায়ক আশিস দুবে। জেলশাসজ রাঘবেন্দ্র সিং এবং পুলিশ সুপার সম্পদ উপাধ্যায় উদ্ধারকাজের তদারকি করছেন। মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদব জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী বাহিনী পূর্ণ শক্তিতে তল্লাশি ও উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত পদক্ষেপের ফলে ইতিমধ্যেই ১৫ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। নিখোঁজদের খোঁজে জোর তল্লাশি চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এই কঠিন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে রাজ্য সরকার সর্বতোভাবে রয়েছে ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। এই দুর্ঘটনায় প্রাণহানিকে ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিহতদের পরিবারের জন্য ৪ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বার্গী বাঁধ জবলপুরের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। এখানে নিয়মিত ছোটো ছোটো ক্রুজে করে পর্যটকদের নৌকাভ্রমণের ব্যবস্থা রয়েছে। সে জায়গাতেই এহেন দুর্ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, প্রশাসন সতর্ক থাকলে এ বিপর্যয় কি এড়ানো যেত? আবহাওয়ার সতর্কবার্তা কি উপেক্ষিত হয়েছে? পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল কি না? আপাতত উত্তর জানা নেই। তবে, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে মধ্যপ্রদেশ সরকার।
❤ Support Us








