- প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ১৩, ২০২২
বাঙালির গৌরবে ‘সোনার’ পালক। বিশ্বসভায় বাংলাভাষার স্বীকৃতি।
বিশ্বব্যপী যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যমের স্বীকৃতি পেল বাংলা ভাষা। এর সঙ্গে হিন্দি আর উর্দুকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১০ জুন,রাষ্ট্রপুঞ্জের ৭৬তম সাধারণ অধিবেশনে আরও ৬টি ভাষার সঙ্গে পাক-ভারত উপমহাদেশের ৩ ভাষাকে সরকারি যোগাযোগের মাধ্যমের মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবটি এনেছিল ভারত। একে সমর্থন জানায় ৮০ টি দেশ। এই স্বীকৃতির জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘের ডিপার্টমেন্ট অফ গ্লোবাল কমউনিকেশন-এর প্রশংসা করে মহাসচিব বলেছেন, পর্তুগিজ, হিন্দি, কিসওয়াহিলি, ফার্সি, বাংলা আর উর্দু বেসরকারি ভাষা হিসেবে অনেকদিন থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রথম বাংলা, হিন্দি ও উর্দুকে সরকারি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ আমাদের দাবিকে যথাযোগ্য মান্যতা দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বহু দিন ধরে বাংলা ভাষার এই স্বীকৃতি দাবি করে আসছিলেন। অর্থনৈতিক ও অন্যান্য কারণে এ উদ্যোগ বেশি দূর এগোয়নি। এবার বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারত সরাসরি প্রস্তাবটির পাশে দাঁড়ায় এবং কাঙ্খিত স্বীকৃতির দাবি রাষ্ট্রপুঞ্জ মেনে নেয় ।
রাষ্ট্রসঙ্ঘে হিন্দির প্রসার ও গুরুত্ব বাড়াতে ২০১৮ সালে ভারত ৮ লক্ষ মার্কিন ডলার খরচ করে । ভারতের প্রয়াস বিফল হয়নি। রাষ্ট্রপুঞ্জে অবস্থানকারী ভারতীয় প্রতিনিধি ত্রিমূর্তি বলেছেন, এই প্রথম বাংলা, উর্দু, ও হিন্দিকে আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে সংযুক্ত করা হল। বহুভাষাবাদের বিস্তারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতদিন আরবি, মানদারিন, ইংরেজি, ফরাসি, রুশ ও স্প্যানিশ রাষ্ট্রসঙ্ঘের যোগাযোগের ভাষা ছিল। এবার ভারতীয় উপমহাদেশের তিনটি প্রধান ভাষা সমসারিতে চলে এল এবং রাষ্ট্রসঙ্ঘের সচিবালয়ে এসব ভাষার মাধ্যমে কজকর্ম শুরু হবে।
বাংলাদেশের একান্ত চেষ্টায় একুশে ফ্রেবুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পেয়েছিল— এই তথ্য সর্বজনবিদিত। শেখ হাসিনা বাংলাকে রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাজকর্মে ব্যবহার করার যে প্রয়াস শুরু করেছিলেন, সে প্রয়াসে ভারত যেভাবে সমর্থন করেছে, বিশ্বের ভাষা বিস্তৃতির ইতিহাসে তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ব্যপ্তি ও জনসংখ্যার নিরিখে চিনের মানদারিন বিশ্বের বূহত্তম ভাষা। ১৪০.২১ কোটি লোক এ ভাষায় কথা বলেন । চিনের সরকারি কাজে ভাষাটির ব্যবহার বাধ্যতামূলক । দৈনন্দিন জীবনে ইংরেজি বব্যহার করেন ১৩৪ কোটি ৮০ লক্ষ । তাঁরা বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে আছেন । হিন্দি ব্যবহারের মানচিত্রে ৬০ কোটি মানুষ জড়িত । স্প্যানিশে কথা বলা ও বব্যহারকারীদের সংখ্যা ৫৪ কোটি ৩০ লক্ষ। আরবি ভাষির সংখ্যা ২৭ কোটি ৪০ লক্ষ । তাঁরা মূলত পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের বাসিন্দা। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম ও বিদেশে বসবাসকারী বাংলাভাষীর সংখ্যার নির্দিষ্ট সমীক্ষা হয়নি। খাতা কলমে ২৬ কোটি ৮০ লক্ষ হলেও বেসরকারি সমীক্ষার অনুমান, সম্ভবত ৩৫ কোটি লোক বাংলা ভাষা ব্যবহার করেন। ভারত ও পাকিস্তানের প্রাত্যহিক জীবন-যাপনে উর্দু ব্যবহারকারীদের সংখ্যা নেহাত নগণ্য নয়। পাকিস্তানে চার প্রদেশে উর্দু সরকারি যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। ভারতের উত্তরপ্রদেশ, জন্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব-হরিয়ানা, রাজস্থান ও দাক্ষিণাত্যের বহু অঞ্চলের মৌখিক জবান হিসেবে তার বিস্তার অব্যাহত । এখানে দুটি সমস্যা— উর্দুভাষীদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তাঁদের ব্যবহৃত ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। একই জটিলতায় হিন্দিও ‘আক্রান্ত’ । হিন্দি ও উর্দুভাষীদের জাতিগত পরিচয় সনাক্ত করা কঠিন। এদিক থেকে মান্দারিন ও বাংলাভাষীরা ভাগ্যবান। এই দুই ভাষা ব্যহারকারীদের আত্ম-পরিচিতির ভিত সুপ্রতিষ্ঠিত । বাংলায় যাঁরা কথা বলেন তাঁদের ৯০ শতাংশেরও বেশি জাতিপরিচয়ে বাঙালি। এরকম বড়ো এবং ঐতিহ্যশালী জাতির মুকুটে এবার আরেক গৌরবের পালক জুড়ে দিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ।
❤ Support Us







