- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ২৪, ২০২৬
তারাতলায় মৃত্যু ৪ শ্রমিকের, ধ্বংসস্তূপে আটকে বহু, উদ্ধারকার্যে সেনা-এনডিআরএফ। শহরের সব নির্মাণকার্যে স্থগিতাদেশ মুখ্যমন্ত্রীর
কলকাতার বুকে ভয়াবহ নির্মাণ-বিপর্যয়। বুধবার দুপুরে তারাতলার ব্রেসব্রিজ সংলগ্ন একটি নির্মীয়মাণ বিশাল গুদামের ছাদ ও লোহার কাঠামো আচমকা ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে লোহার বিম, কংক্রিটের চাঁই ও ভারী নির্মাণসামগ্রীর নীচে চাপা পড়েন বহু শ্রমিক। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা উদ্ধার অভিযানে ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক আহত শ্রমিককে বের করে আনা হলেও প্রশাসনের আশঙ্কা, এখনও ১২ থেকে ১৫ জন ভিতরে আটকে রয়েছেন। এসএসকেএম হাসপাতাল সূত্রে শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ৩ জনে শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ২২ জন।
বিকেল পৌনে ৫টা নাগাদ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজের অগ্রগতি খতিয়ে দেখেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেনা, এনডিআরএফ, দমকল, সিভিল ডিফেন্স এবং কলকাতা পুলিশের আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নেন তিনি। পরে নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ‘২১ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। চার থেকে পাঁচ জনের অবস্থা সঙ্কটজনক। এখনো ১২ থেকে ১৫ জন ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে রয়েছেন।’ যদিও পরে হাসপাতাল সূত্রে মৃতের সংখ্যা বেড়ে চার হওয়ার খবর সামনে আসে।
উদ্ধারকারী দল সূত্রে জানা গিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা কয়েক জনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের কাছে পাইপের মাধ্যমে জল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অক্সিজেন সরবরাহেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। শুকনো খাবার পাঠানোর চেষ্টা চলছে। রাতভর উদ্ধার অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। এক উদ্ধারকারী আধিকারিক জানান, ‘ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে এখনো মানুষের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আশা ছাড়ছি না। তবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।’ দুপুরেই বিপর্যয়ের খবর পেয়ে প্রথমে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় দমকল ও পুলিশ। পরে সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরাও উদ্ধারকাজে যোগ দেন। বিকেল ৩টার পর রাজ্য প্রশাসনের অনুরোধে সেনাবাহিনী উদ্ধার অভিযানে নামে। জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-এর বিশেষ দলও পৌঁছে যায়।
জানা যাচ্ছে, চলমান উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশালাকার লোহার বিম ও কংক্রিটের স্তূপ। ক্রেন দিয়ে সেগুলি সরাতে গেলে নীচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণেই সেনা ও এনডিআরএফ-এর বিশেষ ড্রিলিং যন্ত্র ব্যবহার করে ধাপে ধাপে কাঠামো কেটে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীও জানিয়েছেন, ‘ওখানে শক্ত লোহার চাঙ্গড় পড়ে রয়েছে। সরাসরি ক্রেন ব্যবহার করলে ভিতরে আটকে থাকা মানুষদের বিপদ হতে পারে। তাই অত্যাধুনিক ড্রিলিং যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনী অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে সহযোগিতা করছে।’ উদ্ধারকাজে গতি আনতে ঘটনাস্থলে আনা হয়েছে প্রায় ৫০ টন ওজন বহনে সক্ষম একটি হাইড্রোলিক ক্রেন। ক্রেনের সাহায্যে ধসে পড়া কাঠামোর বিপজ্জনক অংশগুলিকে ধরে রাখা হয়েছে, যাতে নতুন করে আর কোনও অংশ ভেঙে না পড়ে।
উদ্ধারকারীরা প্রথমে গুদামের পিছন দিকে মাটি কেটে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে সাফল্য না মেলায় পরে উপরের অংশে পৌঁছে কংক্রিটে ছিদ্র করা হয়। সে ছিদ্রপথ দিয়েই বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আটকে পড়া ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে আকস্মিক এ দুর্ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের বয়ানে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। তাঁদের দাবি, সকাল থেকেই নির্মীয়মাণ গুদামের লোহার কাঠামো অস্বাভাবিক ভাবে দুলছিল। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে কয়েক জন শ্রমিক উপরে ওঠেন। অনেকেই নীচেও কাজ করছিলেন। ঠিক সে সময়েই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে বিশাল ছাদ। এক প্রত্যক্ষদর্শীর জানিয়েছেন, ‘প্রথমে একটা বিকট শব্দ হয়। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ছাদটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। কেউ বের হওয়ার সুযোগই পাননি।’
স্থানীয়দের মারফত জানা গেছে, প্রায় দেড় বছর ধরে ওই গুদামের নির্মাণকাজ চলছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষের জমি লিজ নিয়ে একটি বেসরকারি সংস্থা সেখানে বিশাল গুদাম নির্মাণ করছিল। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত সংস্থার নাম বেহরা ব্রাদার্স। সংস্থার কর্ণধার শম্ভুনাথ বেহরা পোর্ট ট্রাস্টের জমি লিজ নিয়েছিলেন। গুদামটির আয়তন প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট বলে প্রাথমিক ভাবে অনুমান। ভিতরে কোনো বিভাজক দেওয়াল বা পৃথক কক্ষ না থাকায় গোটা কাঠামোটাই একসঙ্গে ধসে পড়ে বলে মনে করছেন উদ্ধারকারীরা। অতিরিক্ত ভার বহন করতে না পেরে লোহার বিমগুলি জায়গায় জায়গায় বেঁকে গিয়েছিল বলেও প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নবান্নে পৌঁছে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভেঙে পড়া গুদামটির নকশা চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি অনুমোদিত হয়েছিল। কলকাতা পুরসভার প্রকৌশলীদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নকশাগত ত্রুটির ইঙ্গিত মিলেছে বলেও দাবি করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রাথমিক ভাবে ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়েছেন, নকশায় কিছু ত্রুটি ছিল। প্রযুক্তিগত বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পাশাপাশি, কড়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কলকাতা পুর এলাকার মধ্যে তৃণমূল সরকারের আমলে অনুমোদিত সমস্ত নির্মীয়মাণ ভবন, বহুতল ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের কাজ আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
পূর্ত দফতর, দমকল, সিভিল ডিফেন্স, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার আধিকারিকদের নিয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হবে। তারা প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্পের নকশা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নির্মাণপদ্ধতি খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দেবে। রিপোর্টে সন্তোষজনক মূল্যায়ন পাওয়া প্রকল্পগুলিকেই ১ অগস্ট থেকে পুনরায় কাজ শুরুর অনুমতি দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, একই ধরনের নিরাপত্তা-পর্যালোচনা পরবর্তী পর্যায়ে হাওড়া এবং বিধাননগর পুর এলাকাতেও চালানো হবে।
❤ Support Us





