- দে । শ
- জুন ২৪, ২০২৬
তিস্তাপারে বিস্ময় ! কালিম্পঙে দেখা মিলল দেশের প্রথম সাদা অজগরের
উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ জগতে এক বিরল ঘটনার সাক্ষী থাকল তিস্তা উপত্যকা। কালিম্পং সংলগ্ন ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে লিখুভির এলাকায় তিস্তা নদীর চরে দেখা মিলেছে এক বিশালাকার ধবধবে সাদা অজগরের। মঙ্গলবার গভীর রাতে স্থানীয় কয়েক জন প্রথম সরীসৃপটিকে দেখতে পান। অন্ধকারের মধ্যে নদীর পাথুরে চর পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে দেখা যায় সাপটিকে। প্রথমে অনেকেই সেটিকে অন্য কিছু ভেবে ভুল করলেও পরে স্পষ্ট হয়, সেটি একটি বিরাট আকারের অজগর। সে দৃশ্যের ভিডিও সমাজমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। তার পর থেকেই প্রকৃতিপ্রেমী, বন্যপ্রাণ গবেষক, আলোকচিত্রী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাপটি ‘অ্যালবিনো ইন্ডিয়ান রক পাইথন’ গোত্রের। সাধারণ ভারতীয় অজগরের শরীরে বাদামি, খয়েরি কিংবা কালচে রঙের জটিল নকশা থাকে। কিন্তু এই সাপটির শরীরে পরিচিত সে নকশার কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং গোটা শরীর জুড়ে রয়েছে দুধসাদা বা ফ্যাকাশে হলদেটে আভা, যা অ্যালবিনিজমেরই লক্ষণ বলে মনে করা হচ্ছে। স্বাভাবিক রঞ্জকের সম্পূর্ণ বা প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির কারণেই এমন অস্বাভাবিক বর্ণের সৃষ্টি হয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
তিস্তা নদী অববাহিকা ভারতীয় অজগরের সুপরিচিত আবাসস্থল। নদীর তীরবর্তী ঝোপঝাড়, পাথুরে চর ও সংলগ্ন বনাঞ্চলে মাঝেমধ্যেই এই প্রজাতির সাপের দেখা মেলে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বহু বছর ধরে এলাকায় বসবাস করেও তাঁরা কখনো এমন শ্বেতশুভ্র অজগর দেখেননি। সে কারণেই এ ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বনদফতর এবং বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা যদি সরকারিভাবে সাপটির পরিচয় নিশ্চিত করেন, তবে এটি ভারতের উন্মুক্ত বন্য পরিবেশে ‘অ্যালবিনো ইন্ডিয়ান রক পাইথন’-এর প্রথম প্রামাণ্য উপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রাণীবিদ্যা ও সরীসৃপ গবেষণার ক্ষেত্রে তা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, অ্যালবিনো প্রাণীদের জন্য বন্য পরিবেশে টিকে থাকা তুলনামূলক ভাবে কঠিন। স্বাভাবিক রঙের প্রাণীরা পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়ে শত্রুর চোখ এড়াতে পারে। কিন্তু সাদা বর্ণের কারণে অ্যালবিনো সাপ সহজেই নজরে পড়ে যায়। ফলে শিকারি প্রাণী কিংবা মানুষের নজরে পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। সেই কারণে প্রকৃতিতে পূর্ণবয়স্ক অ্যালবিনো সরীসৃপের দেখা পাওয়া অত্যন্ত বিরল। যে এলাকায় সাপটির দেখা মিলেছে, সেই তিস্তা নদী সংলগ্ন এনএইচ-১০ করিডর উত্তরবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য অঞ্চল। পূর্ব হিমালয়ের পাদদেশ, নদী অববাহিকা ও পার্বত্য বনাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে এই অঞ্চল। হাতি, চিতা, হরিণ, নানা প্রজাতির সরীসৃপ ও পাখির বিচরণক্ষেত্র হিসেবেও এর পরিচিতি রয়েছে। জীববৈচিত্র্যের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এমন একটি বিরল জিনগত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রাণীর উপস্থিতি পরিবেশবিদদের কাছে নতুন গবেষণার ক্ষেত্র খুলে দিতে পারে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
‘ইন্ডিয়ান রক পাইথন’ ভারতের বৃহত্তম সাপ প্রজাতিগুলির অন্যতম। দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এই সাপ। বিষহীন হলেও শক্তিশালী পেশির সাহায্যে শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার ক্ষমতা রাখে। ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি এবং অন্যান্য সরীসৃপ এদের প্রধান খাদ্য। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এই প্রজাতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভারতীয় ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আইন, ১৯৭২’-এর অধীনে ভারতীয় অজগরকে সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাঘ, সিংহ বা গন্ডারের মতোই এ প্রজাতির ক্ষতি করা বা শিকার করা আইনত গুরুতর অপরাধ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন)-এর রেড লিস্টেও প্রজাতিটিকে ‘নিয়ার থ্রেটেনড’ বা সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে, যা প্রজাতিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের ইঙ্গিত বহন করে।
তিস্তা অঞ্চলের ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বনদফতরের হস্তক্ষেপের দাবি উঠেছে। বন্যপ্রাণ সংরক্ষণকর্মীদের দাবি, অবিলম্বে সাপটির অবস্থান শনাক্ত করে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ, অস্বাভাবিক বর্ণের কারণে প্রাণীটি সহজেই মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, যা তার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক। একই সঙ্গে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো দরকার। প্রাণীটিকে কোনো রকম বিরক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত না করার জন্য স্থানীয়দের সচেতন করারও প্রয়োজন রয়েছে।
❤ Support Us





